আধুনিক বিজ্ঞান ও ওহী

0
871
Miracles of Holy Quran VS Miracles of Science
Miracles of Holy Quran VS Miracles of Science

ওহী আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ বিশেষ এক মাধ্যম, যার সাহায্যে আল্লাহ তা’আলা নিজ অসীম ক্ষমতাবলে বিশেষ প্রক্রিয়ায় নবী-রাসূলগণের প্রতি নির্দেশনা কিংবা বিধি-বিধান প্রত্যাদেশ করেন। এই ওহীর মাধ্যমেই এ পৃথিবীতে সমগ্র সৃষ্টিকুলের সাথে ওপর থেকে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা’আলার যোগসূত্র স্থাপিত হয়।

তবে ওহীর সার্বিক অবস্থা কিংবা এর কাঠামো ক্ষণস্থায়ী এ পৃথিবীতে সীমিত শক্তির অধিকারী মানব জাতির জন্য পুরোপুরি অনুধাবন করা সম্ভব নয়। কারণ এ ওহীর মাধ্যমে উর্ধ্বজগত থেকে আল্লাহ তা’আলার সাথে কয়েক দিনের এ পার্থিব জগতের অধিবাসীদের সাথে সম্পর্ক স্থাপিত হয়। অনন্ত অসীম শক্তি ও চিরস্থায়ী জগতের সাথে সীমিত সময়ের পার্থিব জগতের এই সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে ওহীর ভূমিকা থাকায় স্বাভাবিকভাবেই সীমিত এই জগত থেকে ওহীকে বুঝা আমাদের জন্য পূর্ণমাত্রায় সম্ভব নয়; আর এটাই বাস্তবসম্মত বিষয়। তবে কুরআন ও হাদীসের সহায়তায় এ ব্যাপারে ধারণা আমরা অবশ্যই লাভ করতে পারি। আর সামান্য ধারণা লাভ করা এবং পুরোপুরি অনুধাবন করা কখনোই এক নয়।

সমগ্র সৃষ্টি ও মানব জাতির মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা’আলাকে অস্বীকারকারী লোকদের পক্ষে আরো আগেই ওহীর প্রকৃতি বুঝা সম্ভব নয়। কারণ ওহীর মাধ্যমে মানুষের যার সাথে সম্পর্ক স্থাপিত হচ্ছে, তাকেই যদি অস্বীকার করা হয় কিংবা তাঁর প্রতি অবিশ্বাস স্থাপন করা হয়, তা হলে সম্পর্কের সূত্র তথা ওহী সম্পর্কে তারা কিই বা আর বুঝবে?

ফলে যা হবার তাই হয়েছে। ওহীর প্রকৃতি সম্পর্কে না বুঝার কারণে এখন ওহীকেই অস্বীকার করা হচ্ছে। এই সব বিষয়কে তারা সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে থাকে। আবার অনেকেই ওহীকে পরিষ্কার অস্বীকার করে রূপক কিসসা-কাহিনীর আওতায় নিয়ে ফেলে। আবার অনেকেই ওহীকে সরাসরি অস্বীকার করে না বটে; কিন্তু বিজ্ঞানের এই চরম উন্নতির যুগে ওহীর আলোচনা করতে তারা সংকোচ বোধ করে।

বস্তুতঃ ওহীর বিষয়ে আলোচনা করার আগে সর্বপ্রথম আমাদের এ বিষয়টির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে, বিশ্বজগতের কি কোনো সৃষ্টিকর্তা আছেন? না কারো সৃষ্টি ব্যতিরেকেই এই বিশ্ব অস্তিত্ব পেয়েছে? যদি কোনো লোক সর্বোপরি আল্লাহ তা’আলার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে, তবে তার সম্মুখে ওহীর প্রমাণ করা উত্থাপন করা অবান্তর। কেননা এই ব্যক্তির পক্ষে ওহীর প্রকৃতি সম্পর্কে ধীরস্থীরভাবে চিন্তা করা এবং আন্তরিকভাবে তা গ্রহণ করা মোটেও সম্ভবপর নয়। তার সাথে সর্বাগ্রে আল্লাহ তা’আলার অস্তিত্ব সম্পর্কেই আলোচনা করতে হবে।

অপরদিকে যারা আল্লাহ তা’আলার অস্তিত্বকে স্বীকার করে এবং মনেপ্রাণে আল্লাহ তা’আলার অপরিসীম ক্ষমতার প্রতি ঈমান রাখে, তাদের পক্ষেও বুদ্ধির মাধ্যমেই ওহীর যথার্থতা ও প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করা মোটেই অসম্ভব নয়। যদি কেউ এ কথা বিশ্বাস করে যে, এই মহাবিশ্বে এবং বিশ্বের যা কিছু আছে, সব কিছু এক মহাজ্ঞানী সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি; তিনিই পরম নিপুণতার সাথে নিজ নিয়ন্ত্রণে এই বিশ্বপ্রকৃতি পরিচালনা করছেন এবং তিনি বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে ‘আশরাফুল-মাখলুকাত’ মানবজাতিকে এই দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন; তবে স্বাভাবিকভাবেই তার এ কথাও বিশ্বাস করতে হবে যে, পরম দয়াময় সৃষ্টিকর্তা মানবজাতিকে অর্পিত দায়িত্বের কোনো নিয়ম-কানুন অথবা ইঙ্গিত-ইশারা না দিয়ে দুনিয়াতে প্রেরণ করেননি।

এই দুনিয়ার মানুষের কি দায়িত্ব ও কর্তব্য, কি তাদের জীবনের উদ্দেশ্য, কিভাবে কোন পদ্ধতির মাধ্যমে তারা স্বীয় জীবনের উদ্দেশ্য সাধন করতে পারবে- এ সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান নিশ্চয় স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাই মানবজাতিকে দান করেছেন এবং প্রতিটি প্রয়োজনের মুহূর্তে তা পরিবেশন করছেন।

কোনো সুস্থ মস্তিষ্ক ও সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি সম্পর্কেও কি এরূপ ধারণা করা যায় যে, সে তারা কোনো কর্মচারীকে ভিনদেশে পাঠালো; কিন্তু পাঠানোর সময় অথবা তারপরেও লোক মারফত বা পত্রযোগে সে খবর দিলো না যে, সফরে সেই ব্যক্তির কর্তব্য কি বা কোন কোন কাজ সমাধা করে তাকে দেশে ফিরতে হবে এবং সফরে কিভাবে সে সময় কাটাবে। যদি এই সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষটি সম্পর্কেও এরূপ দায়িত্বহীন আচরণের কল্পনা না করা যায়, তবে সেই মহাজ্ঞানী আল্লাহ তা’আলা সম্পর্কে এরূপ ধারণা শুধু অমূলকই নয়; বরং ধৃষ্টতাও বটে।

কারণ যিনি এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, কল্পনাতীত নৈপুণ্যের সাথে চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, আকাশ-বাতাস প্রভৃতিকে সুনির্দিষ্ট যথা নিয়মে পরিচালনা করছেন, তিনি তার বান্দাদের এই দুনিয়ার বিশেষ কিছু গুরু-দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন; কিন্তু কোনো  বিশেষ নির্দেশনামা এবং জীবন পথে চলার মতো কোনো সঠিক হিদায়াত বা পথনির্দেশ প্রেরণের সু-ব্যবস্থা করেননি- বিশ্ব সৃষ্টিকর্তার প্রতি এরূপ ধারণা করা অজ্ঞতা ও বাড়াবাড়ি ছাড়া আর কী হতে পারে???

আল্লাহ তা’আলার মহান সত্তা সম্পর্কে যাদের সঠিক ঈমান আছে, তারা অবশ্যই স্বীকার করতে বাধ্য যে, মহান আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে অন্ধকারে হারিয়ে বিপদগ্রস্থ হওয়ার জন্য হিদায়াতবিহীন অবস্থায় ছেড়ে দেননি; বরং তাদের সঠিক পথের সন্ধান দেওয়ার জন্য একটি বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেছেন। মূলতঃ এই বিশেষ নির্দেশনাই হচ্ছে ‘ওহীয়ে ইলাহী’।

উক্ত আলোচনার মাধ্যমে আমরা সহজে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, ‘ওহী’ কেবল ধর্ম-বিশ্বাসের অন্তর্গত একটি আকীদা মাত্র নয়; বরং সাধারণ বুদ্ধি-জ্ঞানের মানদন্ডেও তা একটি বাস্তব প্রয়োজনও বটে। সুতরাং ওহীকে অস্বীকার করা মূলতঃ আল্লাহতা’আলার প্রজ্ঞাবান সত্তাকে অস্বীকার করা বৈ আর কিছু নয়।

অনুপস্থিতি কিংবা অবোধগম্য বিষয় অস্তিত্বহীনকে সাব্যস্ত করে না

যদি বলা হয় যে, ওহীর বিষয়টি আমাদের বুদ্ধি-জ্ঞানে আসে না, তবে এটা ওহীকে অস্বীকার করার জন্য কোনো প্রমাণই হয় না। কারণ কোনো বিষয়ের বাস্তব অস্তিত্ব ও প্রয়োজনীয়তা যদি অকাট্য দলীল ও প্রমাণের মাধ্যমে প্রমাণিত থাকে, তবে শুধু বুঝে না আসা অথবা প্রত্যক্ষ করতে না পারার কারণে সেটাকে অস্বীকার করা যায় না।

উদাহরণস্বরূপঃ আজ থেকে একশত বৎসর আগে যদি একথা বলা হতো যে, অতি সত্বর মানুষ উড়োজাহাজে চড়ে হাজার হাজার মাইলের দূরত্ব মাত্র কয়েক ঘণ্টায় অতিক্রম করবে, তা হলে নিশ্চয় এ সব কথাকে তখনকার লোকেরা কাল্পনিক কিচ্ছা-কাহিনী ও মিথ্যা-বানোয়াট মনে করতো। কিন্তু সে যুগে উড়োজাহাজের কথা বুঝে আসেনি অথবা প্রত্যক্ষ করা হয়নি বলে আজকের দুনিয়ায় উড়োজাহাজের বাস্তব অস্তিত্ব কি মিথ্যায় পরিণত হয়েছে?

আজকাল বিজ্ঞানের চরম উন্নতির যুগেও প্রত্যন্ত এলাকার বহু লোক এমন রয়েছে, যারা মানুষের চন্দ্রালোকে গমনের কথা বিশ্বাস করতে চায় না। তাতে কি চন্দ্রালোকে গমনের সত্যতা মিথ্যায় পরিণত হয়েছে? কিছুতেই নয়।

প্রত্যন্ত এলাকার লোকদের নিকট যদি কম্পিউটার সিস্টেমের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলা হয় যে, বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি যন্ত্রের সাহায্যে মানব মস্তিষ্কের কাজও হয়, তাহলে দেখা যাবে, সে এই বিশ্লেষণের ব্যাপারে খামাখা সন্দেহই প্রকাশ করে যাচ্ছে। তবে এই সব প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’- এর মাধ্যমে না হয়ে, ‘না’- এর মাধ্যমে হয় এবং নিশ্চয়ই তা ‘না’- এর মাধ্যমেই হবে; তবে যে ওহীর প্রয়োজনীয়তা ও যথার্থতা সর্বসম্মত যুক্তি-প্রমাণ ও অকাট্য দলীল দ্বারা সুপ্রমাণিত, দুনিয়ার লক্ষাধিক শ্রেষ্ঠ মহামানবরা যা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন, তা শুধু সন্দেহের কারণে বা বুঝে না আসার কারণে মিথ্যা ও ভুল প্রমাণিত হয় কী করে?

সুতরাং ওহীর উল্লেখিত পন্থাসমূহে যুক্তি-বুদ্ধির নিরিখেও অসম্ভবের কিছু নেই। কেননা তা হলে বলতে হবে- মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা’আলা ওহীর এই সব পদ্ধতির ওপর কোন ক্ষমতা রাখেন না; অথচ তা অবাস্তব ও অসম্ভব। 

বর্তমান বিশ্বের বিজ্ঞানীরা যদি তাদের সীমিত জ্ঞান-বুদ্ধির বলয়ে সংবাদ প্রেরণের ও প্রতিবেদনের জন্য টেলিফোন, টেলিপ্রিণ্টার, রেডিও এবং টেলিভিশন প্রভৃতির মতো বিস্ময়কর যোগাযোগ মাধ্যম আবিষ্কার করতে পারে, তবে কি আল্লাহ তা’আলা এতটুকু ক্ষমতাও রাখেন না যে, স্বীয় বান্দাগণের প্রতি পয়গাম পাঠানোর জন্য তিনি এমন একটি সূত্র প্রস্তুত করেন- ‘যা দুনিয়ার সকল যোগাযোগ ব্যবস্থার চাইতে অধিক শক্তিশালী, দ্রুত, বিশ্বস্ত ও নিশ্চিত হয়????

বস্তুতঃ ওহীর হাকীকত এই যে, আল্লাহ তা’আলা স্বীয় পবিত্র বাণী কারোর মাধ্যমে অথবা কোনো মাধ্যম ব্যতীতই পয়গাম্বরের প্রতি অবতীর্ণ করেন। শুধু এতোটুকু কথা স্বীকার করতে যুক্তির দিক দিয়ে অসুবিধার কিছু নেই।

সূফী সাধকদের তাসাররুফ-ই-খেয়ালি

ওহী সংক্রান্ত বিষয়ে আমরা মানবীয় জ্ঞান-বুদ্ধির কোনো আবিষ্কার অথবা কীর্তি উদাহরণ পেশ করতে দ্বিধাবোধ করি। কিন্তু এরপরেও প্রকৃত বিষয়টি উপলব্ধি করার নিমিত্ত প্রমাণ স্বরূপ আমরা এ পর্যায়ে মানবীয় একটি কীর্তির দৃষ্টান্ত উপস্থিত করছি। এতে বিশেষ এক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজন মানুষ অপর একজন মানুষের অন্তর এবং মস্তিষ্ককে সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। অতঃপর স্বীয় ইচ্ছানুযায়ী ক্রিয়াগ্রস্ত ব্যক্তির অন্তর ও মস্তিষ্কের ওপর যে কোনো প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। সূফী-শাস্ত্রের পরিভাষায় এই কীর্তিকে ‘তাসাররুফ-ই-খেয়ালি’ বলা হয়। সূফী-সাধকদের জীবনালেখ্যে উক্ত কীর্তির অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যায়।

আধুনিক বিজ্ঞানে হিপ্নোটিজম আবিস্কার

বস্তুপূজারীগণ ইতিপূর্বে কিছুকাল যাবৎ সূফী-সাধকদের এই তাসাররুফ শক্তির বাস্তবতাকেও অস্বীকার করে আসছিলেন; তাদের অনুকরণে কিছু মুসলিমও উক্ত তাসাররুফকে কাল্পনিক কিস্সা-কাহিনী বলে অভিহিত করেছেন। অবশেষে খৃষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝির দিকে সুইজারল্যান্ডের প্রখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ ম্যাসমার (Mesmer) মানব মস্তিষ্ককেই স্বীয় গবেষণার বিষয়বস্তুরূপে গ্রহণ করেন।  

পরবর্তী সময়ে ১৭৭৫ খৃষ্টাব্দে এক নিবন্ধে তিনি এই তথ্য পরিবেশন করেন- ‘সন্মোহন-ক্রিয়ার মাধ্যমে মানব মস্তিষ্ককে পরাভূত করে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।’

উক্ত প্রক্রিয়াকে তিনি সন্মোহন ক্রিয়া (Anima Masnestism) নামে অভিহিত করেন। ফ্রান্সে অবস্থানকালে তিনি উক্ত প্রক্রিয়ার বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষা আরম্ভ করেন এবং এ বিষয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ও সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হন। কিন্তু উক্ত তথ্যময় বিষয়টি তিনি তখনকার সমকালীন লোকদেরকে বুঝিয়ে পূর্ণ সন্তুষ্ট করতে পারেননি।

অতঃপর ১৮৪২ খৃষ্টাব্দে ইংল্যান্ডে জেম্স ব্রেইড (James Braid) নামে আরেক ব্যক্তির আবির্ভাব হয়। তিনি উক্ত প্রক্রিয়াকে বৈজ্ঞানিক প্রণালীর মাধ্যমে নতুনভাবে গোড়া থেকে প্রমাণিত করেন এবং তার নাম দেন সম্মোহন ক্রিয়া অথবা হিপ্নোটিজম (Hypnotism)।’

জেমস ব্রেইডের আবিষ্কৃত হিপ্নোটিজমের বিভিন্ন স্তর রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে প্রক্রিয়াগ্রস্থ ব্যক্তির অবস্থা এই দাঁড়ায় যে, তার শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং শিরা-উপশিরা নিস্তেজ ও অবশ হয়ে পড়ে এবং সাথে সাথে তার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ইন্দ্রিয়সমূহ অকেজো হয়ে পড়ে। অবশ্য উক্ত প্রক্রিয়ার আরেকটি মধ্যবর্তী স্তরও রয়েছে, তবে এতে মানবদেহ অনুভূতিশূন্য ও অচেতন হয় না।

ওয়ার্ল্ড ফ্যামিলী ইনসাইক্লূপেডিয়াতে এ সম্পর্কে লিখেছেন-

“সম্মোহন ক্রিয়া যদি কিছুটা হালকাভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে প্রয়োগকৃত ব্যক্তি এতটুকু স্বাভাবিকতায় স্থির থাকে যে, তখন সে বিভিন্ন বস্তুর কল্পনা করতে সক্ষম হয়। যেমন প্রয়োগকর্তার নির্দেশানুযায়ী সে এই অবস্থায় নিজেকে অন্য কোনো ব্যক্তিরূপে বিশ্বাস করতে পারে। অনুরূপভাবে সে এমন কিছু জিনিস চোখের সামনে দেখতে পায়, যা বাস্তবে তার সম্মুখে বিদ্যমান থাকেন। অথবা সে নিজের মধ্যে এক অস্বাভাবিক অনুভূতি উপলব্ধি করে। তখন সে প্রয়োগকর্তার নির্দেশক্রমে চলতে বাধ্য থাকে।”

জেম্স ব্রেইডের দীর্ঘ গবেষণা ও অভিজ্ঞতার পর হিপ্নোটিজমকে বস্তুপূজারীগণও মানতে বাধ্য হয়েছেন। যারা ইতিপূর্বে বিষয়টিকে স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিলেন না। এমনকি বর্তমানে পাশ্চাত্যে দেশগুলিতে বিষয়টি সর্বসাধারণের জন্য এক আকর্ষণীয় বস্তুরূপে পরিণত হয়েছে। বহুলোক উক্ত প্রণালী দ্বারা যথেষ্ট পরিমাণে অর্থও উপার্জন করছে। ব্যাধিগ্রস্ত লোকদের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এর দ্বারা যথেষ্ট উপকার লাভ করা হচ্ছে।

মোটকথা, তাসাররুফ-ই-খেয়ালি বহু শতাব্দী ধরে মুসলিম সাধকবৃন্দের নিকট এক নিতান্ত সাধারণ এবং পরিচিত বস্তুরূপে চলে আসছে, সাধারণভাবে যাকে কাল্পনিক বিষয় বলে প্রত্যাখান করা হতো। সেটাই আজ বিজ্ঞানের এই আধুনিক যুগে ‘হিপ্নোটিজম’ নামে বাস্তব এক সত্যে পরিণত হয়েছে।  

এমনকি অধুনা যুগের তথাকথিত বিজ্ঞান পূজারীরাও এতোদিন পর আজকে এর সত্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, যাদের দৃষ্টিতে মুসলিমদের প্রতি আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ নির্দেশনা ও বিধানের বিষয়টি কাল্পনিক কিসসা-কাহিনীরূপে বিবেচিত হয় এবং পাশ্চাত্যের নিছক সাধারণ জ্ঞানের কথাও ‘বৈজ্ঞানিক তথ্য’ রূপে পরিগণিত হয়।

সর্বোপরি মেস্মারিজম অথবা হিপ্নোটিজমের আসল-আকৃতি ‘একজন মানুষকে ক্রিয়াগ্রস্ত করে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে ইচ্ছানুযায়ী তার অন্তর ও মস্তিষ্ককে ব্যবহার করা’ ছাড়া আর কিছুই নয়।

তাই এখন প্রশ্ন এই যে, যে সৃষ্টিকর্তা মানুষের ‘তাসাররুফে খেলাফী’ অথবা সম্মোহন ক্রিয়ার মধ্যে এতো শক্তি নিহিত রেখেছেন, যা দ্বারা সাধারণ যে কোনো ব্যাপারে বরঞ্চ অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অহেতুক কাজে অন্যায়ভাবে মস্তিষ্ক ও অন্তরকে প্রভাবিত করা হয়- তবে কি সেই মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা’আলা এতোটুকু শক্তিও রাখেন না- যা দ্বারা তিনি মানবজাতিকে সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য একজন নবীর অন্তরকে আয়ত্তাধীন করে স্বীয় পবিত্র বাণী তাতে নিক্ষেপ করবেন??

তথ্যসূত্রঃ কুরআন সংকলনের ইতিহাস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.