আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসঃ আমাদের পথচলা

0
667
21 February
21 February

মনের ভাব প্রকাশ করতে যে ধ্বনি মুখ থেকে উচ্চারিত হয়, তাকে ভাষা বলে। আর মায়ের ভাষাকে মাতৃভাষা বলে। সুতরাং মাতৃভাষার মধ্যে ভাষার গুরুত্ব ছাড়াও এক অনাবিল সম্পর্কের অনুভূতিও কাজ করে। যে অনুভূতির তুলনা পৃথিবীতে আর হয় না। এই ভাষা আল্লাহ তা’আলার দান। এটা তাঁর বিশেষ নেয়ামত। কুরআনে তিনি ভাষার কথা এভাবে ঘোষণা করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন-
আসমান ও যমীনের সৃষ্টি তাঁর নিদর্শন বহন করে। এছাড়াও তোমাদের ভাষা ও বর্ণের ভিন্নতার মধ্যেও তাঁর নিদর্শন রয়েছে। জ্ঞানী লোকদের জন্য এতে শিক্ষা রয়েছে। (সূরা রোম-২২)

পৃথিবীতে সমস্ত মানুষই মনের ভাব কিংবা অনুভূতি প্রকাশ করে। তবে তা প্রকাশ করার ভাষা সবার এক নয়। দেশ, জাতি বা অঞ্চলভেদে ভাষার ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। আল্লাহ তা’আলা যেহেতু ভাষার ভিন্নতাকে তাঁর নিদর্শন বলে উল্লেখ করেছেন, তাই পৃথিবীর সমস্ত ভাষাই আল্লাহ তা’আলার নেয়ামত। কোনো কারণেই কোনো ভাষার প্রতি কটাক্ষ অথবা শত্র“তা মনোভাব পোষণ করা যাবে না।
ভাষার গুরুত্ব সবখানে। এর প্রয়োজনীয়তা প্রতি মুহুর্তেই। সর্বপ্রথম নিজের মাতৃভাষাভাষী লোকদেরকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য এবং তাদের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেওয়ার জন্য উদ্যোগী হতে হবে। কিন্তু আমরা এক্ষেত্রে এখনো অনেক পিছিয়ে রইছি। বর্তমান শতাব্দীর ইতিহাসখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নাদাবী রহ. ১৯৮৪ এবং ১৯৯৪ সনে পরপর দুইবার বাংলাদেশে আগমন করে বাংলা সাহিত্যের প্রতি বাঙালী আলিমগণের উদাসীনতা দেখে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন-
মাতৃভাষা ও বাংলা সাহিত্যের প্রতি উদাসীনতা এ অঞ্চলের আলিমগণের জন্য আত্মহত্যার মতো।
হাকীমূল উম্মত আশরাফ আলী থানবী রহ. বলেন- স্বজাতীয় ভাষার জ্ঞানার্জন করা আবশ্যক।
ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের সিপাহসালার সাইয়্যেদ হোসাইন আহমাদ মাদানী রহ. বলেন- বাংলাদেশের মানুষের পথভ্রষ্টতার মূল কারণ হলো বাঙালী আলিমগণের মাতৃভাষা সম্পর্কে অজ্ঞতা।
পাকিস্তানের মুফতী শফী রহ. বলেন- আমার মতে মাদরাসা শিক্ষাকে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ করেছে মাতৃভাষা ও ইতিহাস শিক্ষার প্রতি অবহেলা প্রদর্শন।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণ এবং তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীন ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে পৃথিবীর যেখানেই গিয়েছেন, সেখানকার স্থানীয় ভাষায় ইসলামের পরিচয় ও শিক্ষা উপস্থাপন করেছেন। পরবর্তী সময়ে এই ধারা সব যুগেই অব্যাহত ছিলো। প্রতি বছর ফেব্র“য়ারী মাসে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। অথচ বছরের অন্য সময়ে বাংলা ভাষার গুরুত্ব আমরা যেনো ভুলে যাই। যেহেতু আমরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে দিবসের পরিমন্ডলে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি- এই কারণেই বারবার দিবসের প্রসঙ্গ সামনে চলে আসে। আল্লাহ তা’আলা যেসব আমল ও বিধি-বিধানকে কোনো সময়ের সাথে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, সেগুলো ছাড়া অন্য কোনো কিছু কোনো নির্দিষ্ট সময় কিংবা বিশেষ দিবসের সাথে সম্পৃক্ত নয়।

ভারত উপমহাদেশে দীর্ঘদিনের বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পর ভারতে মুসলিম জাতির জন্য স্বতন্ত্র ও স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট থেকেই মাতৃভাষা আন্দোলনের সূচনা ঘটে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে- তা নিয়ে বিতর্ক ও আলোচনা শুরু হয় ১৯৪০ সনের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর থেকেই। তবে ভাষা আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ১৯৪৭ সনে ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা লাভের পর। মুসলিম জাতির স্বাধীন আবাসভূমি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে- সে প্রশ্নে তৎকালীন মুসলিম লীগের আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার আগেই পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে। ফলে বাংলা ভাষা আন্দোলনের গতিপথ অন্যদিকে মোড় নেয়। শুরু হয় নতুন ইতিহাসের।

বৃটিশ শাসনের অবসানে পাকিস্তানের স্বাধীনতা অর্জনের কিছুদিন পর ১৯৪৭ সনের পহেলা সেপ্টেম্বর কতিপয় বুদ্ধিজীবীর উদ্যোগে তমদ্দুন মজলিস নামে একটা সাংস্কৃতিক সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। উক্ত সংস্থার পক্ষ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দূ’ শীর্ষক একটা পুস্তিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলনের মূল যাত্রা শুরু হয়। এই পুস্তিকা প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষক সমাজ এবং বিভিন্ন বুদ্ধিজীবীর মাঝে ব্যাপকভাবে আলোচনা ও বৈঠক শুরু হয়। তৎকালীন সরকারের প্রতি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে দেশের খ্যাতিমান সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের স্বাক্ষরসহ স্মারকলিপি পেশ করা হয়।

তখন ১৯৪৭ সনেই একটা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। অতঃপর ১৯৪৮ সনের ৪ জানুয়ারি পূর্ব বঙ্গীয় মুসলিম ছাত্রলীগের একাংশ পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ নামে একটা স্বতন্ত্র ছাত্রসংস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তারা শুরু থেকেই সক্রিয়ভাবে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। এই ছাত্রসংস্থা আত্মপ্রকাশের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদকে পুনর্গঠিত করা হয়। এ সময়ে পাকিস্তান গণপরিষদের এক অধিবেশনে কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ইংরেজি এবং উর্দূর পাশাপাশি বাংলা ভাষায়ও বক্তৃতা করার দাবি উত্থাপন করেন। কিন্তু তার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়। এরপর পাল্টে যায় ভাষা আন্দোলনের চিত্র।

পাকিস্তান থেকে ভাষা আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশেও। এরপর সময়ের পরিক্রমায় পাকিস্তানের কায়েদে আযম জিন্নাহ ১৯ মার্চ ঢাকায় এসে ২১ মার্চে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় এবং ২৪ মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তনে কার্জন হলে বক্তৃতা করার সময় উর্দূ ভাষাকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। তার এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। বাঙালী তরুণদের ক্ষোভ বিস্ফারণে রূপ নেয়।
১৯৪৯ সন থেকে ১৯৫১ সন পর্যন্ত প্রতি বছর ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস হিসেবে পালিত হতো। এরপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। ইতিমধ্যে কায়েদে আযম জিন্নাহর পর ১৯৫২ সনের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ঢাকার পল্টন ময়দানে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দূ বলে পুনরায় ঘোষণা করার পর ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে রূপ নেয়। এই বিশ্বাসঘাতকতার সমুচিত জওয়াব দেওয়ার লক্ষ্যে নতুন করে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ ঘটিত হয়। উক্ত সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ২১ ফেব্র“য়ারি সারা পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশে) প্রতিবাদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। তবে তৎকালীন সরকার এই কর্মসূচী বানচাল করার নিমিত্তে ২০ ফেব্র“য়ারি হঠাৎ করে ১৪৪ ধারা জারি করে।

কিন্তু পরদিন ভোরবেলায় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নতুন করে সূচিত হয়। ওই দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে দলে দলে সম্মুখপানে এগিয়ে যেতে থাকে। এক পর্যায়ে হঠাৎ শুরু হয় মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ। ঢাকার রাজপথে লুটিয়ে পড়তে থাকে আব্দুস সালাম, আব্দুল জাব্বার, আবুল বরকত, রফীক প্রমুখ তরুণ ছাত্রসহ নাম না জানা আরো অন্যান্যদের রক্তাক্ত দেহ। রাজপথ লাল হয়ে যায় ভাষা শহীদদের তাজা খুনে। এর মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলন এক নতুন ঐতিহাসিক অধ্যায়ে প্রবেশ করে। ২১ ফেব্র“য়ারি হয় আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা দিবস। পৃথিবীর মধ্যে ভাষার জন্য আন্দোলনের ইতিহাস শুধুই আমাদের। তাই এই আন্দোলন অন্যসব আন্দোলনের চেয়ে আলাদা।

জাতিসংঘের ইউনেস্কোর সাধারণ পরিষদের ৩০তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে ২১ শে ফেব্র“য়ারীর দিনকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। এর মূল প্রেক্ষাপট আমাদরেকে বুঝতে হবে। স্বীয় মাতৃভাষাকে কোনো দিবসের সাথে নির্দিষ্ট করে ফেলার জন্য উক্ত দিনকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বলে ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বরঞ্চ এর মাধ্যমে বাংলার বীর জওয়ানরা তাদের বাংলা মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যে যে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো এবং স্বীয় মাতৃভাষার প্রতিষ্ঠার জন্য অকাতরে বুকের তাজা রক্ত রাজপথে ঢেলে দিয়েছিলো- তার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা কোনো দিবসের সাথেই সীমাবদ্ধ নয়। এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা পৃথিবীর অন্যসব ভাষার মতো প্রতি মুহুর্তেই রয়েছে। সুতরাং বছরের অন্য সবদিনে স্বীয় মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে শুধু ২১ ফেব্র“য়ারির দিনে মাতৃভাষা দিবসের নামে বাংলা ভাষা নিয়ে মেতে উঠা ভাষার প্রতি সম্মান নয়; বরং এটা স্বীয় মাতৃভাষার প্রতি আন্তর্জাতিক অবহেলা ও অবজ্ঞা প্রদর্শন। এজন্য আমি বলি- বাংলা আমার মায়ের ভাষা। বাংলা আমার প্রথম ভাষা। আর তা সবখানে ও প্রতি মুহুর্তে।

আব্দুল্লাহ আল মাসূম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.