আমাদের জাতীয় নাম কী? আমরা ভুল করছি না তো!!

0
685
islam unity
islam unity

পৃথিবীতে মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে বাস করে। সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ এভাবেই পৃথিবী আবাদ করে এসেছে। বংশধারা ক্রমশ বিস্তৃতি লাভ করার সাথে সাথে তা বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার পর গোত্র বা গোষ্ঠীর নাম ধারণ করে আসছে। বংশের সর্বাধিক যোগ্য কিংবা উল্লেখযোগ্য কোনো পূর্বপুরুষের নাম বা পরিচয়ে উক্ত গোষ্ঠী নিজেদের পরিচয় দেয়। এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। পরিচয়ের জন্য এটার প্রয়োজনও আছে বটে। আল্লাহ তা’আলা কুরআনে এর প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করেছেন এভাবে। ইরশাদ হচ্ছে-
يا أيها الناس إنا خلقناكم من ذكر وأنثي وجعلناكم شعوبا وقبائل لتعارفوا-
হে মানব জাতি! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে। আর তোমাদেরকে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও গোত্রে ভাগ করেছি, যাতে তোমারা একে অপরকে চিনতে পারো। (সূরা হুজুরাত-১৩)
উপরোক্ত আয়াতে পরিচয় পেতে যেনো মানুষ বিপাকে পড়ে না যায়- এজন্য গোষ্ঠী বা গোত্রের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া অন্য কোনো প্রয়োজনীয়তা বা উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়নি। প্রয়োজন পুরণের ব্যবস্থাকে প্রয়োজনের সীমার ভিতরেই রাখা হয়েছে।

তবে এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, পরিচয় লাভের জন্য মানুষকে বিভিন্ন গোত্রে ভাগ করা হলেও মানুষের জাতীয় পরিচয় বা আদর্শকে ভাগ করে দেওয়া হয়নি। মানুষের আদর্শ বা কর্মধারার কথা আলাদা বলা হয়েছে, তবে তা একক রাখা হয়েছে। বিভক্তি কিংবা কোনো ধরণের ফাটল থেকে নাম ও আদর্শকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করে দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ তা’আলার তাওহীদবাদ ও নবীর আদর্শকে সমন্বয় করে এর নাম রাখা হয়েছে ইসলাম। আর যারা এর ধারক-বাহক হবে, তাদের নাম মুসলিম রাখা হয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
إن الدين عند الله الإسلام-
অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলার মনোনীত দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) হলো ইসলাম। (সূরা আলে ইমরান-১৯)
هو سماكم المسلمين-
অর্থঃ তিনি (ইবরাহীম আলাইহিস সালাম) তোমাদের নাম মুসলিম রেখেছেন। (সূরা হজ্জ-৭৮)
এটা হলো আমাদের জাতীয় নাম ও পরিচিতি। ইসলাম হলো আমাদের দ্বীন ও আদর্শ। আর আমরা এর ধারক-বাহক হওয়ার কারণে হয়েছি মুসলিম।
আল্লাহ তা’আলার বিধান বর্ণনা করা হয়েছে কুরআনে। নবীর আদর্শ বলে দেওয়া হয়েছে হাদীসে নববীতে। এছাড়া আমাদের এ নাম-পরিচয় ও আদর্শকে একক করা হয়েছে। অর্থাৎ এর মধ্যে ভাগাভাগি কিংবা বিভক্তির কোনো সুযোগ নেই। এ জন্য আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলা হয়েছে। পৃথিবীর সবখানে সব সময় কোনো সময়ই কোনো স্থানেই এর মধ্যে পার্থক্য করা যাবে না। এ কথা আল্লাহ তা’আলা অপর এক আয়াতে ইরশাদ করেছেন। তিনি আমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন-
واعتصموا بحبل الله جميعا ولا تتفرقوا-
তোমরা সবাই আল্লাহ তা’আলার রশিকে আঁকড়ে ধরে রাখো। আর তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেও না।
(সূরা আলে ইমরান-১০৩)

সুতরাং ইসলাম একতার ধর্ম। এটা ঐক্যবদ্ধ আদর্শের আশ্রয়স্থল। যারা এর ধারক-বাহক হবে, তাদের নাম মুসলিম। উক্ত একতার প্রধান ও মৌলিক সূত্র দুটি। কুরআন ও নবীর সুন্নাহ বা আদর্শ।
এ দুটি নিয়েই আমাদেরকে চলতে হবে, এগিয়ে যেতে হবে। কোনো একটিকে ধরে বা কোনো একটিকে ছেড়ে দিলে আমাদের মূল পরিচয়ের বিচ্যুতি ঘটবে। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা হাদীসে ইরশাদ করেছেন। তিনি বলেন-
إني تركت فيكم أمرين- لن تضلوا ما تمسكتم بهما- كتاب الله وسنة رسوله-
আমি তোমাদের মাঝে দুটি বিষয় রেখে যাচ্ছি। যতক্ষণ তোমরা এ দুটিকে আঁকড়ে ধরে রাখবে, ততক্ষণ তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। উক্ত দুটি বিষয় হলো আল্লাহ তা’আলার কিতাব (কুরআন) এবং তাঁর রাসূলের সুন্নাত।
আল্লাহ তা’আলার নবীর প্রিয় সাহাবায়ে কেরাম থেকে শুরু করে তাবেয়ীন, তাবে-তাবেয়ীন এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্মের যাদের অবিস্মরণীয় অবদানের ফলে আমরা আজ ইসলাম নিয়ে গৌরববোধ করছি, তাঁদের কেউই উপরোক্ত একতার সূত্র থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁদের কেউই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না।

ইসলামের প্রশ্নে আদর্শের বেলায় তাঁরা সবাই ছিলেন একই পথের পথিক। মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে। আর এটা স্বাভাবিক বিষয়। এটা তাঁদের মধ্যেও বিদ্যমান ছিলো। কিন্তু তাঁরা নিজেদের পারস্পরিক মতভিন্নতা স্বত্ত্বেও ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। একে অপরের প্রতি তাঁরা পূর্ণ সম্মান ও শ্রদ্ধা বজায় রেখে চলতেন। সবাই সবাইকে মন থেকে ভালোবাসতেন। একে অপরের প্রতি কল্যাণকামী থাকতেন।
কিন্তু আমরা সত্য ও একতার মহান এ সূত্র থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছি। যেনো ঐক্যের প্লাটফর্ম থেকে আমরা ছিটকে পড়ে গেছি। মত ও পছন্দের ভিন্নতাকে বিচ্ছিন্নতা পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছি। অথচ মতভিন্নতা এবং বিচ্ছিন্নতা কখনোই এক নয়। এ দুটি একটি অপরটির সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা ভুলে গেছি, মতভিন্নতা কাকে বলে আর বিচ্ছিন্নতা কাকে বলে?
আরবীতে প্রথমটিকে ইখতিলাফ বলে এবং দ্বিতীয়টিকে ইফতিরাক বলে। ইখতিলাফ যে কোনো বিষয়েই হতে পারে। আর এটা তো পৃথিবী ও মানব জাতির সৃষ্টির আগে থেকেই ছিলো। যথা- আল্লাহ তা’আলা ফিরিশতা জাতি সৃষ্টি করেছেন নুর দ্বারা, জিন জাতি সৃষ্টি করেছেন আগুন দ্বারা এবং মানব জাতি সৃষ্টি করেছেন মাটি দ্বারা। সৃষ্টিগত পাস্পরিক ভিন্ন এসব জাতির কাউকেই অপর জাতির শত্র“ বলে আখ্যায়িত করেননি।
তিনি মানব জাতির মধ্যে কাউকে ফর্সা করে সৃষ্টি করেছেন আবার কাউকে একেবারে কালো করে সৃষ্টি করেছেন। এক্ষেত্রেও ভিন্নতা হয়েছে। কিন্তু তাই বলে তিনি সাদা মানুষকে কালো মানুষদের অথবা কালো মানুষকে সাদা মানুষদের জন্য শত্র“ করেননি। অথচ আমরাই একে মিত্র ও শত্র“র মাপকাঠি বানিয়েছি। বর্ণবাদের এ বিভক্তি আমরাই করেছি।

এছাড়া পৃথিবীতে সাদা, কালো, লাল, সবুজ ইত্যাদি নানা রকমের রঙ আছে। কারো কাছে সাদা পছন্দ আর কারো কাছে লাল রঙ পছন্দ। এ রকম হতেই পারে। আর এটাই হলো মত বা পছন্দের ভিন্নতা। আরবীতে একেই ইখতিলাফ বলে।
অপরদিকে কোনো আদর্শগত কিংবা লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের মিল না হওয়ার কারণে দুই পক্ষের প্রত্যেকে একে অপরকে প্রতিপক্ষ মনে করে। ফলে এক পক্ষ অপর পক্ষের সাথে চলাফেরা ছেড়ে দেয়। সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির মাঝে উভয় পক্ষ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সর্বশেষে এক পক্ষ অপর পক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এটাকে আরবীতে ইফতিরাক তথা বিচ্ছিন্নতা বলে।
ইসলাম ছাড়া অন্য সব পক্ষকে আল্লাহ তা’আলা শত্র“ বলেছেন। তিনি এটাও বলেছেন- যারা ঈমান আনেনি, যারা ইসলামকে মানেনি, তারা কখনো তোমাদের অবিভাবক হতে পারে না। আর ইসলামকে তিনি তাওহীদবাদ দ্বারা সুরক্ষিত করে দিয়েছেন। স্বাভাবিক পছন্দের ভিন্নতা কিংবা মতপার্থক্যের বিষয়টিকে তার স্থানমতো রেখে ইসলামের পতাকাতলে আশ্রয় নেওয়া সবাইকে তিনি এক ও অভিন্ন বলে আখ্যায়িত করেছেন।

মোটকথা, আমাদের নাম এক আদর্শও এক। আমাদের জাতিসত্ত্বাও এক। অতএব শুধু কুরআন দিয়ে বা শুধু হাদীসের নাম লাগিয়ে অথবা ইসলামের রাষ্ট ও ঐতিহ্যের মৌলিক অবকাঠামোর প্রধান উপকরণ সমূহের কোনো একটি নাম ধারণ করে তথা- আহলে কুরআন, আহলে সুন্নাহ, আহলে হাদীস, আহলে জামা’আহ, ইসলামের জামাত, খেলাফতের আন্দোলন, খেলাফতের মজলিস, ইসলামী শাসন, আল্লাহর দল, তাওহীদের কাফেলা বা দল প্রভৃতি নামে পরিচয় দেওয়ার ফলে ইসলামের জাতীয়তা অক্ষুন্ন থাকছে না; বরং বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে।
এছাড়া এতে ইসলামের ছদ্মবেশি দুশমনরা ইসলামের বিরুদ্ধে কুটিলতা ও ষড়যন্ত্র করার সুযোগ পাচ্ছে। এর দ্বারা তারা মুসলিম জাতির ভিতরে বিভিন্ন নাম ভাঙ্গিয়ে ইসলাম ও মুসলিম জাতিস্বত্ত্বাকে ছিন্নভিন্ন করার প্রয়াস পাচ্ছে। যুগে যুগে আবির্ভুত হওয়া ইসলামকে ব্যবহার করে নামধারি ফিরকাবাজ গোষ্ঠীগুলো আমাদের এ ভুলেরই পরিণতি। বিষয়টি আমাদেরকে গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.