আলেম-উলামাদের শানদার সিয়াসাত- সৈয়দ শামছুল হুদা

0
312
S. Shamsul Huda Hafizahullah
S. Shamsul Huda Hafizahullah

ক্ষমতা আর রাজনীতি যেন পাশাপাশি চলে। যার ক্ষমতা যত বেশি তিনি ততবড় রাজনীতিবিদ। যিনি যত বড় রাজনীতিবিদ তিনি তত বড় ক্ষমতাবান। ক্ষমতার চর্চাটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এক মজাদার জিনিস। এই জায়গাটায় একবার যে বসতে পেরেছে সে আর এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। ক্ষমতা হলো বাঘের পিঠে বসে রাজ্য শাসন। একবার কোনভাবে বাঘের পিঠে চড়ে বসতে পারলে নামাটা বড় কঠিন। বড় ঝুকিপূর্ণ। তবে একবার কোনভাবে বাঘের পিঠে বসে পরতে পারলে সব আদর্শ, চিন্তা, লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা সম্ভব মনে করা হয়।

কিন্তু এই ঝুকিপূর্ণ কাজে আলেম-উলামাগণকে কেন দেখা যায় না, কেন আলেম উলামাগণ বাঘের পিঠে আরোহনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় না, এটা নিয়ে অনেকের মধ্যে আফসোস করতে দেখা যায়। তারা বলে, এদেশের আলেম-উলামারা ইক্বামতে দ্বীনের কোন কাজই করে না। এরা শুধু খায়-দায়, মোটা-তাজা হয়। কেউ কেউ ইক্বামতে দ্বীনের কাজ করতে করতে হয়রান হয়ে যাচ্ছে, জীবন-যৌবন সব বিলিয়ে দিচ্ছে, ফাঁসিতে ঝুলছে, অথচ আলেম-উলামারা তাদেরকেও কোনরূপ সমর্থন দেয় না। বড় আশ্চর্য এক বিষয়!!

আবার কেউ কেউ মনে করে এদেশে আফগানের মতো উলামায়ে কেরাম কেন অস্ত্র নিয়ে তাগুতের বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে না? তালেবানরা কত কষ্ট করে, কোরবানী করে আমেরিকার বিরুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে এসেছে, এদেশের আলেমরা কেন সে পথে যায় না? আমীরুল মুমেনীন মোল্লা উমর রহ. এরমতো অস্ত্র হাতে উলামায়ে কেরাম ঝাপিয়ে পড়লেই এদেশে ইসলামী হুকুমত কবেই কায়েম হয়ে যেতো!! এদের নিকটও এদেশের আলেম সমাজ বড় অপরাধী। বড় সুবিধাবাদী!!

Darul Uloom Hathazari Madrasah
Darul Uloom Hathazari Madrasah

কেউ কেউ মনে করে, এদেশে আস্তে আস্তে সব সেক্টরগুলো নিজেদের আয়ত্বে নিয়ে আসতে পারলেই ইক্বামতে দ্বীনের কাজটা পূর্ণতা লাভ করবে। একটা একটা করে ডিসি, এসপি’র পদ নিজেদের দলীয় লোক দিয়ে দখল করতে হবে। এমপি-সচিব বানাতে হবে। ভিপি-ভিসি বানাতে হবে। চেয়ারম্যান-মেম্বার বানাতে হবে। সব জায়গাতেই দলীয় আনুগত্যশীল লোক বসাতে পারলে এদেশে ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আর কোন বাধাই থাকবে না।

সবাই যার যার আঙ্গিনা থেকে সংগ্রাম করছে, চিন্তা করছে, কাজ করছে। কিন্তু একবারও ভাবছে না, এদেশের লাখ লাখ সেনাবাহিনীর সদস্য, বিডিআর সদস্য, পুলিশের সদস্য, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, প্রশিক্ষিত নৌ বাহিনী, বিমানবাহিনী, আনসার, ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, মিডিয়াকর্মী, সংবাদমাধ্যম, ব্যবসায়ী, এরা কি ভিন্ন দেশ থেকে ভেসে আসা কেউ? ইক্বামতে দ্বীনের যে কর্মপদ্ধতি একজন একজন করে সবাইকে মানুষ বানিয়ে গোটা দেশ দখলের পরিকল্পনা, বা ইসলামী হুকুমত কায়েমের স্বপ্নে বিভোর আফগান স্টাইলে দেশ দখলের যে ভাবনা তা এই দেশে কতটা প্রযোজ্য?

আফগানের রাজনীতি বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য কী না এটা নিয়ে আমরা কি ভেবেছি? তালেবানরা যে পথ ও পদ্ধতির কঠিন সময় পার করে এ পর্যায়ে এসেছে সে পথে আমাদের যাত্রা কতটা নিরাপদ তা কি একবার ভেবেছি? তালেবানরা কি কোন স্বাভাবিক পথে এ পর্যন্ত এসেছে? এত রক্ত, এত কোরবানী কি আমাদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব? আফগানের মানুষ শত বছর ধরে সংগ্রাম করার যে ঐতিহ্য, নীতি ও আদর্শের সাথে অবিচল থাকার সংস্কৃতি লালন করে আসছে এর সাথে বাঙ্গালীর চরিত্রের কতটা মিল আছে? তা কি একবার ভেবেছি? আমরা বৃটিশ দ্বারা শাসিত হয়ে, পাকিস্তান দ্বারা শাসিত হয়ে, ভারত দ্বারা শোষিত হয়ে যে পর্যায়ে এসেছি, আমরা যে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তুলেছি, আমরা যে ভৌগলিক অবস্থানে বিরাজ করছি, এর সাথে আফগানে অনুসৃত যুদ্ধনীতি অনুসরণ করে কতটা সফল হবো? তা কি একবার ভেবেছি? নাকি আমাদের এ দেশ ও এদেশের ভৌগলিক অবস্থায় স্বতন্ত্র ধারা, স্বতন্ত্র নীতি অনসুরণ করা কতটা প্রয়োজন তা নিয়ে গবেষণা করেছি?

ব্রাদারহুড যে রাজনীতি অনসুরণ করে, তারা ক্ষমতায় আসার পর যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে তা থেকেও কি আমরা কিছু শিখেছি? শিক্ষা গ্রহন করেছি? আমার মনে হয় আমরা কেউ-ই তা থেকে শিক্ষা নিইনি। ইক্বামতে দ্বীনের যে নীতি, আদর্শ, পলিসি লালন করা হয়, সেভাবে এগিয়ে যেতে থাকলে এবং ক্ষমতার কাছাকা্ছি গেলে বারবার রাবেয়া স্কয়ারের মতো ঘটনা ঘটতে থাকবে। এটাই আমার বিশ্বাস। আমার ধারণা।

তাহলে এই পরিস্থিতিতে এদেশের আলেম-উলামাদের আসলে করণীয় কি? তাদের কী করণীয় ছিল? তারা কী করছে? আমি বিশ্বাস করি যে, নিকট অতীতে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কতিপয় আলেম যে সংগ্রামী ভূমিকা পালন করেছে এদেশের আলেমদের সে পথেই যাওয়া উচিত।

এদেশের আলেমগণ যাদেরকে অনুসরণ করতে পারে, তারা হলেন :
তুরস্কের বিখ্যাত আলেম বদীউজ্জামান সাঈদ নূরসী রহ.। তাঁর বিশাল রেসালায়ে নূর থেকে যতটুকু পড়ার সুযোগ হযেছে তাতে বুঝে এসেছে যে, আলেমদের কাজ সরাসরি ক্ষমতা দখলের মিশন নয়, বরং আলেমদের কাজ হলো- যারা ক্ষমতায় যাবে তাদের মন-মেজাজ ইসলামী ছাঁচে তৈরী করে দেওয়া। বদিউজ্জামান সাঈদ নূরসী ফাঁসির মঞ্চের খুব কাছাকাছি থেকেও নিজ আদর্শ, লক্ষ্য থেকে সামান্য বিচ্যুত হননি। বাতিলের চোরাবালিতে পা রাখেননি। লোভের ফাঁদে পা রাখেননি। এমনকি আজ তাঁর লাশটি কোথায় তা পর্যন্ত কেউ জানে না। কিন্তু তিনি যে শানদার সিয়াসতের কাজ করে গেছেন তা তাঁকে গোটা বিশ্বে মহান সংস্কারকের আসনে বসিয়ে দিয়েছে।

Turkey
Turkey

জামাল উদ্দীন আফগানী রহ. প্যানইসলামিজম এর বার্তা নিয়ে সারা মুসলিম বিশ্বে মুক্তির যে শ্লোগান তৈরী করে গিয়েছেন সেটাই হতে পারে আলেমদের শানদার সিয়াসতের অন্যতম পথ ও পদ্ধতি। শুধু আমি, আমার দল ক্ষমতায় বসতে পারলেই ইসলাম কায়েম হয়ে যাবে এই চিন্তার সাথে সবসময় ভিন্নমত লালন করি। কোটি কোটি মুসলমানদেরকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে কতিপয় মানুষের সীমিত দলীয় চিন্তার দ্বারা সমগ্র মুসলিম বিশ্বের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা যাবে সেটা বোধগম্য নয়। সেজন্য আফগানীর উম্মাহকেন্দ্রিক চিন্তা করতে হবে। কালেমায় বিশ্বাসী সকল মুসলমানকে ভাই হিসেবে বুকে টেনে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়তে হবে। মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন তৈরী করে কোনদিন পূর্ণাঙ্গ সফলতা অর্জন করা যাবে না। ইক্বামতে দ্বীনের কাজ করতে গিয়ে এদেশের গোটা আলেম সমাজকে তিরস্কার করে, কোটি কোটি পীর অনসুারী মানুষদের দূরে ঠেলে দিয়ে, লক্ষ লক্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে চুড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছা যে অসম্ভব কাজ সে ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করতে পারি না। রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে এদেশের আলেম-উলামাগণ জামাল উদ্দীন আফগানীকে অনসুরণ করতে পারেন। ক্ষমতায় না বসেও উনারা শানদার রাজনীতিবিদ।

সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. উলামাদের শানদার রাজনীতির শিক্ষা দিয়ে গিয়েছেন। তিনি ইসলামী সিয়াসতের ময়দানে মুকুটহীন সম্রাট। তিনি উলামায়ে কেরামকে বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে সকল মুসলমানদের ভ্রাতৃত্ববন্ধনের যে অসাধারণ তত্ত্ব উপহার দিয়ে গিয়েছেন তা এক কথায় অসাধারণ। ভারতের মতো একটি শত্রু রাষ্ট্রে বাস করেও তিনি গোটা মুসলিম বিশ্বে মুসলমানদের জাগরণের প্রেরণা হয়ে উঠেছিলেন। এদেশের আলেম-উলামাদেরকে শানদার সিয়াসতে নেতৃত্ব দিতে হলে সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.কে খুব ভালো করে জানতে হবে। অনুসরণ করতে হবে। আলেমদের রাজনীতির ধরণ কী হবে তা বুঝতে আলী নদভীর চেয়ে উত্তম আর কাউকে আমি দেখি না।

Shaikh Sayyid Abul hasan A. Al Nadwi 4
Shaikh Sayyid Abul hasan A. Al Nadwi 4

চিনতে হবে আল্লামা ইকবালকৈ। আল্লামা ইকবাল শুধু একজন কবিই নন। মুসলমানদের জন্য একজন মহাচিন্তানায়ক। তাঁর প্রতিটি কবিতা এতটাই শক্তিশালী রাজনৈতিক দর্শন যা হাজার পুস্তক দিয়েও বুঝানো যাবে না। এদেশের আলেম-উলামাদের রাজনীত কী হবে, কীভাবে গোটা মুসলিম সমাজে আলেম-উলামাগণ নেতৃত্বের আসনে থাকবেন তার দর্শন তিনি শিখিয়ে গিয়েছেন। এদেশের সকল আলেম-উলামাকে আল্লামা ইকবালের প্রতিটি কথাকে হৃদয়াঙ্গম করতে হবে। সে মোতাবেক কাজ করতে হবে। এটাই হবে আলেম-উলামাদের বড় রাজনীতি।

আমরা কেউ কেউ মনে করি, মেম্বার-চেয়ারম্যন পদে, এমপি পদে নির্বাচন করে পাশ করতে পারলেই সমাজ বদলে দেওয়া যাবে। আলেম-উলামারা এসব পদে বসে যেতে পারলেই কেল্লা ফতেহ। সমাজের মানুষের মনন পরিবর্তন করতে না পারলে বাংলাদেশের ৩০০ আসনের সবকটি পদে বিজয়ী হলেও ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আর সে জন্যই আলেম-উলামাদের রাজনীতি হবে ইকবালের রাজনীতি, সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভীর রাজনীতি, জামাল উদ্দীন আফগানীর রাজনীতি, বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসীর রাজনীতি অনুসরণ করা।

বাংলাদেশের অন্যতম আলেম আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ.ও এদেশের আলেম সমাজকে কী ধরণের রাজনীতি করতে হবে তার শিক্ষা দিযে গিয়েছেন। তার নির্দেশনা দিয়ে গিযেছেন। দুর্ভাগ্য হলো, এদেশের আলেম সমাজ এদেরকেও অনুসরণ করে না। এদেশের আলেমদেরকে আলেমানাহ শান নিয়েই রাজনীতি করতে হবে। কিন্তু এদেশের আলেম সমাজও ভোগবাদি চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত। সরকার ও রাষ্ট্র দ্বারা প্রভাবিত। কতিপয় আলেম সুবিধাবাদি নীতি দ্বারা ভ্রষ্ট।

Bangladesh
Bangladesh

মনে রাখতে হবে এ দেশ মুসলমানদের। এদেশের সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিডিআর, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ব্যাংকার, রাষ্ট্রের অন্যান্য সকল প্রতিষ্ঠিত শক্তি ও ব্যক্তি মুসলমান। এরা কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক আদর্শ থেকে অধিকাংশই বিপথগামী। এদেরকে সুপথে ফিরিয়ে আনাই হবে এদেশের আলেম সমাজের অন্যতম রাজনীতি। এটা করতে পারলেই আলেমগণ থাকবেন মুকুটহীন সম্রাট হয়ে। আলেমগণ কর্তৃক কিছু পদ-পদবী দখলের দ্বারা গোটা সমাজ ব্যবস্থা বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। বর্তমান আলেমকূল থেকে এমন একটি বিশেষ শ্রেণি তৈরী হতে হবে যারা বর্তমানে ক্ষমতার মঞ্চে আছে, আগামীতে যারা ক্ষমতার মঞ্চে আসতে পারে তাদেরকে তৈরী করা। এ জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া।

আলেম-উলামাদের দিতে হবে কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক ব্যাখ্যা। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা থেকে মুখ বুজে ঘরে বসে থাকলে হবে না। নিজেদেরকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিলেই হবে না মুক্তি। আলেম-উলামাদেরকে সময়ের ভাষা বুঝতে হবে। সময়ের জ্ঞান-বিজ্ঞান বুঝতে হবে। ইসলামী ঐতিহ্যের অতীত ও বর্তমান বুঝতে হবে। জ্ঞানহীন চাপাবাজি থেকে দূরে থাকতে হবে। সকল মুসলমানদেরকে আপন মনে করতে হবে। অন্তরে সকল প্রকার বিভেদ-বিচ্ছেদের মানসিকতা নির্মূল করতে হবে। কথায় কথায় ইহুদী-নাসারার ষড়যন্ত্র খুঁজা বন্ধ করতে হবে। ভিন্নমতের সকল মুসলমানকে কাফের, মুরতাদ, বেঈমান বলার ট্রাডিশন বন্ধ করতে হবে। কুরআন ও হাদীসের আলোকে নিজেদের আখলাক গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই আলেম-উলামাদের শান বৃদ্ধি পাবে। মুসলমানরা মুক্তি পাবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সঠিক বিষয়টা বুঝার তৌফিক দান করুন। আর আমার এ চিন্তায় ভুল হয়ে থাকলে আল্লাহ তায়ালা আমাকেও ক্ষমা করুন।

জেনারেল সেক্রেটারী
বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট বিআইএম

রুফাকা টাওয়ার, টঙ্গী
23.04.2020

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.