আল্লামা ইকবালের সাহিত্য চিন্তা

0
318
সাহিত্য সাধনা
সাহিত্য সাধনা

আহমাদ সাব্বির :

‘ইসলামের জ্যোতির্ময় পয়গাম কাব্যের রঙে মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার জন্যে আল্লাহ তা’লা নির্বাচন করেছিলেন আল্লামা ইকবালকে৷’

 –আবুল হাসান আলী নাদাবি

১.

সাহিত্য হলো কালের দর্পণ৷ সাহিত্যের আয়নায় পাঠক দেখে ওঠে কালের হালচাল৷ আবার কালের গতিপথ পাল্টে দিতে সাহিত্য পালন করে অগ্রণী ভূমিকা৷ যুগে যুগে সমাজের অনাচার রুখে দিয়েছে সাহিত্য, মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে কত সামাজিক বৈষম্য ও অনৈক্যের৷ শতেক বছরের সাহিত্যের ইতিহাস আমাদের তা-ই জানাচ্ছে৷

এখন প্রশ্ন হতে পারে— সমাজ বদলের ক্ষেত্রে যেখানে এত বড় হাতিয়ার হতে পারে সাহিত্য সেখানে কেবল ‘সাহিত্যের জন্যেই সাহিত্য’, অন্যভাবে বললে ‘আর্ট ফর আর্ট সেক’ কতোটা যৌক্তিক? সাহিত্য কী জীবনের জন্যে নয়? সমাজ, রাষ্ট্র, জন মানস এসবের প্রতি কি সাহিত্যিকের, একজন শিল্পীর কোনো দায়বদ্ধতা নেই?

কেউই অস্বীকার করবে না যে, একজন শিল্পী যখন তার শিল্প সৃষ্টি করেন তখন তিনি হন নিঃসঙ্গ এবং একা; যদিও সমাজের বহুত্বের ভেতরেই তার বাস। যেহেতু তিনি সমাজের একজন বিবেকবান ব্যক্তিত্ব কাজেই মানুষ ও সমাজের সাথে তিনি গ্রন্থিবদ্ধ নানা দৃঢ় সূত্রে৷ আর এই পোক্ত বন্ধনই শিল্পীকে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এনে দেয়। সৃষ্টিকর্মে তার একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতা থাকা সত্ত্বেও তিনি স্বেচ্ছাচারী, আত্মকেন্দ্রিক কিংবা জীবনবিমুখ হতে পারেন না। তাকে বরং অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হয় সত্য সুন্দর ও কল্যাণের প্রতি।

বিষয়টি সর্বজনগ্রাহ্য তর্কাতীত মনে হলেও কিছু মতাদর্শ তাকে জটিল করে তুলেছে। একদল সাহিত্য বিশ্লেষকের মতে শিল্পীর দায়বদ্ধতা প্রধানত তার শিল্পের প্রতি। তাকে দায়বদ্ধ থাকতে হবে অন্তরের প্রেরণা, বিশ্বাস ও স্বপ্নের প্রতি৷ জেমস জয়েস তার ‘আ পোর্ট্রেট অব দি আর্টিস্ট এজ আ ইয়াং ম্যান’ গ্রন্থে লিখেছেন— শিল্পীর কোনো দেশ নেই, সমাজ নেই, অনুশাসনের বন্ধন নেই৷ সে স্বাধীন-মুক্ত-স্বেচ্ছাচারী। তার একমাত্র কমিটমেন্ট তার শিল্পের প্রতি। ইংরেজি সাহিত্যের অঙ্গনে ‘প্রি র‌্যাফেলাইট’ শিল্পীগোষ্ঠী এবং ১৮৯০-এর দশকে ‘অস্কারওয়াইল্ড’ প্রমুখ এই তত্ত্বের ওপরই জোর দিয়েছিলেন। যার পরিণতিতেই জন্ম নেয় ‘আর্ট ফর আর্ট সেক’ এই স্লোগান।

সেই প্রাচীনকাল থেকেই শিল্পী-সাহিত্যিকদের একটা ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে, সমাজের উপকার এবং সমাজকে কলুষমুক্ত করাই শিল্পী-সাহিত্যিকদের কর্তব্য। পরবর্তীতে রোমান্টিক যুগে এসে শিল্পের জন্য শিল্প স্লোগানটি প্রচারিত হতে থাকলেও বার্নাড শ কঠোরভাবে এর বিরোধিতা করেন। তার বক্তব্য ছিল ‘আর্ট ফর লাইফ সেক’— শিল্প হতে হবে জীবনের জন্য৷ এই বিতর্কের প্রভাবে দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে শিল্পের কেন্দ্রগুলো: শিল্পের জন্যে শিল্প এবং জীবনের জন্যে শিল্প৷

শিল্প ও সাহিত্যকর্মীরা যখন স্পষ্টতই এই দুই ‘মাযহাবে’ বিভক্ত আল্লামা ইকবাল তখন শুরু থেকেই তার সাহিত্যিক মতাদর্শ নির্ধারণ করে নেন৷ এ ক্ষেত্রে কোনো দ্বিধা কিংবা সংশয় তাকে স্পর্শ করে না৷ এবং প্রকাশ্যেই উচ্চকণ্ঠে তিনি ঘোষণা দিয়ে বসেন— ‘আর্ট ফর আর্ট সেক’ তথা ‘সাহিত্যের জন্যেই কেবল সাহিত্য’ এই মতবাদ হচ্ছে একটা সুচতুর উদ্ভাবন আমাদেরকে জীবন ও শক্তি থেকে বঞ্চিত করবার জন্যে৷ [ভূমিকা, আসরারে খুদি]

আল্লামা ইকবাল মনে করতেন— মানব জীবনের সকল কর্মশক্তির শেষ লক্ষ্য হচ্ছে এক জীবন— যা হবে মহিমান্বিত, শক্তিমান ও উচ্ছ্বসিত৷ সকল মানবীয় কলা এই শেষ লক্ষ্যের অধীন এবং সকল জিনিসের মূল্য নিরূপণ করতে হবে তার জীবন-সংরক্ষণী শক্তির মানদণ্ড দিয়ে৷ সেটাই হচ্ছে শ্রেষ্ঠতম কলা— যা জাগ্রত করে দেয় আমাদের ঘুমন্ত ইচ্ছাশক্তিকে এবং শক্তিমান করে তোলে আমাদের অন্তরকে৷ যাতে করে আমরা সমর্থবান হতে পারি জীবনের তাবৎ বাধা বিঘ্নতা উপেক্ষা করে এগিয়ে যেতে৷ যা কিছু তন্দ্রাভিভূত করে আমাদেরকে এবং আমাদের চক্ষুকে অন্ধ করে দেয় চারিদিকের বাস্তব থেকে সেই কলা, সেই সাহিত্য হচ্ছে ধ্বংস এবং মৃত্যুর বাণী৷ [প্রাগুক্ত]

বিজ্ঞান ও কলা জীবনের ভৃত্য,
যে ভৃত্য জন্ম নিয়েছে ও পালিত হয়েছে
তার আপন গৃহে৷

(ইকবাল/সৈয়দ আবদুল মান্নান)

.

সাহিত্যকে ইকবাল বিবেচনা করতেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিন্তায়৷ তিনি যে দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেছেন সাহিত্যকে, যেভাবে অনুভব করে উঠেছেন সাহিত্যের অস্তিত্বকে তেমন করে করেনি আর কেউ৷

ইকবাল মনে করতেন— সাহিত্য যেন জীবন্ত প্রাণ এক৷ যার নিজস্ব অনুভূতিশক্তি রয়েছে৷ সাহিত্যের রয়েছে ব্যথাতুর হৃদয়; ব্যাথা পেলে যা কাঁদে৷ আবার রয়েছে এমন আনন্দানুভূতি হরষে যা হয়ে ওঠে শিহরিত৷ যদি এমন প্রাণশক্তি না থাকে সাহিত্যে, যদি তাতে অনুপস্থিত থাকে তীব্র অনুভূতির আঁচড় তবে সেটা সাহিত্যই নয়৷ অলস মস্তিষ্কের বিনোদন আর কালক্ষেপণের মাধ্যম সাহিত্য হতে পারে না৷ সাহিত্য আরও মহৎ; তার লক্ষ্য আরও উচ্চতর৷ মানব মানসের মনোবল উচ্চ করতে এবং তার হৃদয়ের গহনে গভীর দৃঢ়তর প্রভাব সৃষ্টি করতে না পারলে তা আর সাহিত্য কীসে!

اے اہل نظر ذوق نظر خوب ہے لیکین + جوشے کی حقیقت کو نہ دیکھے وہ نظر کیا

مقصود ہنر سوز حیات ابدی ہے + یہ ایک نفس یا دو نفس مثل شرر کیا

جس سے دل دریا متلاطم نہی ہوتا + اے قطرۂ نسیاں وہ صدف کیا وہ گہر کیا

شاعر کی نواہو کے مغنی کا نفس ہو + جس سے چمن افسردہ ہو وہ باد سحر کیا

بے معجزہ دنیا مے ابھرتی نہی قومین + جو ضرب کلمی نہیں رکھتا وہ ہنر کیا

সমসাময়িকদের সাথে ইকবালের মূল তফাৎটা ছিল বিশ্বাসগত৷ আল্লামা ইকবাল দৃঢ়বিশ্বাসী মুসলিম ছিলেন৷ দৃঢ় বিশ্বাসী মুসলিম বলতে আমি বোঝাচ্ছি— ইসলামের চিন্তা, দর্শন ও মুল্যবোধ সম্পর্কে কোথাও সামান্য সংশয় ছিল না তার৷ ইসলামের প্রতিটি বিধানের প্রাজ্ঞতা নিয়ে ছিল তার বিস্ময়কর অবিচলতা৷ ‘তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন— ইসলাম নামক তরীই পারে মানবতাকে চির মুক্তির তীর পার করাতে৷ একমাত্র ইসলামেরই রয়েছে সে সক্ষমতা৷ মানুষকে তার অর্থনৈতিক দাসত্ব, বুদ্ধিবৃত্তিক গোলামী এবং সকল ধরণের বৈষম্যের থেকে উদ্ধারের জন্য ইসলামই কাফি৷ ইসলাম থাকতে সেখানে নতুন কোনো ইজম প্রতিষ্ঠা অনর্থক৷’ (আলি মিয়া নদবি, নুকুশে ইকবাল)

আর এই বিশ্বাসগত বিভেদের কারণেই ইকবালের সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি হয়েছিল জীবনমুখী৷ আরও স্পষ্ট করে বললে জীবনের চূড়ান্ততম লক্ষ্য আখিরাতমুখী

যা কিছু করো তুমি,
লক্ষ্য হোক তোমার আল্লার নৈকট্যলাভ,
যেনো তাঁর গৌরব প্রকাশিত হয়
তোমা দ্বারা
শান্তি হয়ে ওঠে অশান্তি— যদি তার উদ্দেশ্য হয় অপর কিছু;
যুদ্ধ তখনই শ্রেয়,
যখন তার লক্ষ্য হয় আল্লাহ৷
যদি আল্লার গৌরব সপ্রকাশ না হয়
আমাদের তরবারি দ্বারা,
তখন যুদ্ধ অবমানিত করে মানবকে৷

(ইকবাল/সৈয়দ আবদুল মান্নান)

৩.

এ জাতির রয়েছে হৃদয়
তবে নেই কোনো ‘হৃদয়দার’,
প্রেমের অগ্নি জ্বালে বুকে, তবে;
জানে না ‘প্রেমিক’ কে তাহার!

(ইকবাল/আহমাদ)

কবিকে ভাববাদী হতে হয়৷ ভাবের অতলে ডুব দিয়ে কুড়িয়ে আনতে হয় মণিমাণিক্য-জহরত৷ ভাবের সে জগতে আল্লামা ইকবাল ও আন্দোলিত হতেন৷ তবে ইকবালের সাহিত্য চিন্তা যেহেতু ছিলো আসমানমুখী তাই তার ভাববাদও ছিলো সে মুখো৷ ইকবালের ভাববাদ উৎসারিত ইসলামের মৌলিকতা থেকে৷ তার ভাববাদ প্রোথিত ছিলো জীবন-দর্শন ও ধর্মের গভীরে৷

ইকবাল গবেষক মুহাম্মাদ ইউসুফ আলী দুইজন সমসাময়িক বড় কবি -রবীন্দ্রনাথ ও ইকবালের- সাহিত্য চিন্তার মধ্যবর্তী সম্পর্ক ও পার্থক্য বর্ণনা করতে গিয়ে ইকবাল-সাহিত্যে ভাববাদী দর্শনের কথা বলেছেন৷ তবে সেই সাথে ইউসুফ আলী আমাদেরকে এটাও জানিয়েছেন— রবীন্দ্রনাথ এবং ইকবাল উভয়েই যদিও ছিলেন ভাববাদী অন্তর্দৃষ্টির পক্ষপাতী তারপরও একদিক দিয়ে তাদের মধ্যে পার্থক্য ছিলো৷ এবং এই পার্থক্যটি নানা বিচারেই অগ্রাহ্য ছিল না; বরং দুজনের ভাববাদী সাহিত্য চিন্তার যেন দুটি ভিন্ন সংজ্ঞায়ন করে গেল: একজন (রবীন্দ্রনাথ) যখন ভাববাদকেই তার লক্ষ্যবস্তু মনে করতেন, অপরজন (ইকবাল) তখন সেটাকে ব্যবহার করতেন একটা চলমান কর্মোন্মাদনা সৃষ্টির জন্যে৷ এবং তিনি, আল্লামা ইকবাল সাহিত্যে ভাববাদিতার চর্চা করতেন নিদ্রাকর ঔষধরূপে ভাববাদকে গ্রহণ করার কুফলের বিরূদ্ধে মানুষকে সতর্কীকরণের উদ্দেশ্য নিয়ে৷ ইকবাল মনে করতেন— প্রাচ্যদেশের বহু বিপত্তির মূল কারণ নিহিত আল্লাহর দেওয়া ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে প্রকৃতিকে বশীভূত করে নিজের কাজে লাগাতে না পারার ভেতর৷ ইকবাল দর্শনের এই বৈশিষ্ট্যকে মুহাম্মাদ ইউসুফ আলী বলেছেন— ভাববাদের বিরূদ্ধে এক ভাববাদী প্রতিবাদ৷

ওঠ, প্রেরণা দাও আবার়
প্রত্যেক জীবিত আত্মাকে;
বলো— ‘জাগ্রত হও’—
আর তোমার বাণীর যাদুতে
জেগে উঠুক জীবন্ত আত্মা!
ওঠ— বাড়িয়ে দাও তোমার চরণ
অন্যতর পথে—
দূর করো সব অতীতের
এক-ঘেয়েমীর তন্দ্রা!

(ইকবাল/সৈয়দ আবদুল মান্নান)

৪.

‘আত্মা বা ব্যক্তিত্ব মানুষের জীবন-কেন্দ্রে পরিণত হয়৷ ব্যক্তিত্ব দ্যুতিমান হয় সম্প্রসারণশীলতার মাধ্যমে এবং তা বজায় থাকে ততোদিন যতোদিন জীবন-কেন্দ্ররূপেই তার সংরক্ষণ হয়৷ যতক্ষণ ব্যক্তিত্ব বা সম্প্রসারণশীল মনোবৃত্তি মানব জীবনের শ্রেষ্ঠতম বিশেষত্ব বলে বিবেচিত হয় ততক্ষণ সে শ্লথ মনোভাব আসতে দেয় না নিজের মধ্যে৷ যা কিছু এই সম্প্রসারণশীল মনোবৃত্তিকে বজায় রাখে তাই আমাদেরকে করে তোলে অমরতার দাবীদার৷ এমনি করেই ব্যক্তিত্বের ধারণা আমাদেরকে এনে দেয় একটা মান-বোধ (standard of value)৷ ভালোমন্দের প্রশ্নের সমাধান হয় তাতেই৷ ব্যক্তিকে সংরক্ষিত করে যা কিছু তাই উৎকৃষ্ট; আর যা কিছু দুর্বল করে তাকে, তাই অপকৃষ্ট৷” (ইকবাল, ভূমিকা, আসরারে খুদি)

ইকবালের সাহিত্য সাধনার ‘রূহ’ ছিল আত্মার রহস্যানুসন্ধান ও তার দ্যুতির বিস্তার৷ কাব্যের মধ্য দিয়ে মুসলিম মানসে আত্মার ইসলামানুসারী বিবর্তনকে ফুটিয়ে তুলতে এবং হৃদয়ের পরতে পরতে তাকে ছন্দায়িত করতে চেয়েছিলেন আল্লামা ইকবাল৷ তিনি মনে করতেন— জীবনের সব কিছু আত্মার বিকাশের অধীন৷

জীবন যখন শক্তি সঞ্চয় করে
আত্মা থেকে,
জীবন-তটিনী বিস্তার লাভ করে
সমুদ্রের মহত্বে৷

(ইকবাল/ সৈয়দ আবদুল মান্নান)

জীবনের সবকিছু আত্মার বিকাশের অধীন— রুমীর বিখ্যাত মসনভী ও দিওয়ানের বহু যায়গায় এ চিন্তাধারার ছাপ প্রকটভাবে চোখে পড়ে৷ জালাল উদ্দীন রুমী নিজেও এই চিন্তা লালন করতেন৷ ইকবাল যে রুমী দ্বারা প্রভাবিত সেটা তো গোপন কিছু নয়৷ ইকবাল তার কাব্যে বহু যায়গায় অকপট তার স্বীকারোক্তিও প্রদান করেছেন৷ কিন্তু ইকবাল গবেষকেরা প্রশ্ন তোলেন যে ব্যাপারে— জার্মান দার্শনিক নিটশের কোন প্রভাব ইকবালের ‘আত্মশক্তি বর্ধন’ মতবাদের ওপর পড়েছিল কিনা! কোনো প্রভাব পড়ে থাকলেও তা কতোখানি!

তবে ইকবাল গবেষক মুহাম্মাদ ইউসুফ আলী এ কৌতূহলের সমাধান দিয়েছেন দারুাণভাবে৷ মুহাম্মাদ ইউসুফ বলেন— নিটশের ‘অতিমানুষের ধারণা’ ও ইকবালের ‘অত্মদর্শনে’র মধ্যে নিবিড় সাদৃশ্য রয়েছে— তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই৷ কিন্তু ইকবালের লেখার সাথে ঘনিষ্ঠ পরিচয় হলে দেখা যায় যে, তার রচনার উপর নিটশের প্রভাব থাকলেও বিশ্বের কাছে ইকবালের আনীত সুসংবাদের উৎসমূল প্রোথিত ইসলামী ভাবধারার ভেতর৷ নিটশের কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস ছিলো না৷ কিন্তু ইকবাল ধর্মকে বিশ্বাস করতেন জীবন ও শক্তির উৎসরূপে৷ তাদের উভয়ের সাহিত্য চিন্তার মধ্যে রয়েছে এই মূলগত তফাৎ৷

ইকবাল যে ইসলামী ধর্মদর্শনের নিবিড় পরিচয়ে তার নিজস্ব সাহিত্য চিন্তাকে সুসংহত করে তুলেছিলেন তা তার সাহিত্যে ভাস্বর হয়ে ফুটে আছে৷ তিনি তার কাব্যে ইসলামী পরিভাষা এবং মুসলিম সাহিত্যে প্রচলিত উমপাসমূহ ব্যবহার করেছেন বিষয়ানুরূপ উপযোগিতার উপর দৃষ্টি রেখে৷ ইসলামের বিভিন্ন আদর্শগত বিষয়ের ওপর তিনি দিয়েছেন বিশেষ জোর৷ কারণ তিনি আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করতেন যে, আধুনিক সভ্যতার সংকট সমাধানের নির্দেশনা রয়েছে ইসলামের এইসব আদর্শেরই ভেতর; অন্য কোথাও ভিন্ন কোনো ইজমের মধ্যে নয়৷ তার সাহিত্য ও কাব্যে এই বিশ্বাসেরই চর্চা করে গেছেন তিনি জীবনভর৷ তার সাহিত্য চিন্তার সৌধ নির্মিত এই আসমানী দর্শনেরই পাটাতনে

৫.

কতো রাত্রি ধরে
ক্রন্দন করেছি আমি মানবের জন্য
যেন আমি ছিঁড়ে ফেলতে পারি
জীবন-রহস্যের পর্দা;
তুলে আনতে পারি জীবনের গঠন-রহস্য
প্রকৃতির বিজ্ঞানাগার থেকে
আমি সৌন্দর্য বিতরণ করি রাত্রিকে
চন্দ্রের মতো,
আমি শুধু ধুলিকণার মতো ভক্তি-বিনত
সত্য ধর্মের কাছে—
(ইসলামের কাছে),
যে ধর্ম বহু পরিচিত পর্বতে প্রান্তরে,
জ্বালিয়ে দেয় যে মানব হৃদয়ে
অমর-সংগীতের অগ্নি—

(ইকবাল/সৈয়দ আবদুল মান্নান)

FATEH.24 থেকে সংগৃহীত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.