আল্লাহ তা’আলার দ্বীন প্রতিষ্ঠায় প্রতিরোধ নয়; পারস্পরিক সহযোগিতা কাম্য

0
303
Masjid
Masjid

এই যুগের সবচেয়ে বড় দুঃখজনক বিষয় হলো দ্বীনের শাখাসমূহ- যা একটি অপরটির সহায়ক, অনাকাঙ্খিতভাবে এগুলোকে পরস্পরের বিরোধী ভাবা হচ্ছে। কর্মপন্থা যদিও ভিন্ন, কিন্তু উদ্দেশ্য সকলের অভিন্ন। আর তা এটাই যে, আল্লাহ তা’আলা ও রাসূলের সঠিক পরিচয় জানার পর তাঁদের নির্দেশ ও দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করা।
তবে দুঃখের বিষয় হলো উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের পূর্ণ নমুনা অনুধাবন না করার কারণে ধর্মের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় সুযোগ সন্ধানী লোকরা পরস্পরে ঝগড়া-বিবাদ লাগিয়ে রেখেছে। প্রত্যেকেই নিজ কর্মপদ্ধতিকে সঠিক ও বিশুদ্ধ আখ্যা দিচ্ছে। অথচ এই সকল শাখাই একত্রে দ্বীনের শাখা।
কোনো শাখা নি®প্রয়োজন ও অনর্থক আখ্যা দেওয়া যায় না। মাদরাসা, খানকাহ ও তাবলীগ ও জিহাদ সকল শাখাই আপন আপন স্থানে অবশ্যই সঠিক ও উপকারী। কিন্তু প্রত্যেক শাখায় আমলকারী ও অবস্থানকারীগণ নিজ শাখাকে সঠিক এবং অন্যগুলোকে নিচু ও নি®প্রয়োজন মনে করার কারণে এগুলোর পরস্পরের মাঝে বিশাল দূরত্ব ও মতভেদ সৃষ্টি করেছে। যার ফলে এক শাখার কিছু মেধাহীন লোক অপর শাখার লোকদেরকে অপরচিত ও খারাপ চোখে দেখে।

অথচ নবীজির যামানা থেকে বর্তমান যুগের ইতিহাস পর্যন্ত যদি দৃষ্টিপাত করা হয়, তাহলে স্পষ্ট হবে যে, তারাই একমাত্র দ্বীনের সঠিক খেদমত করেছেন- যারা দ্বীনের ভিন্ন ভিন্ন তিন গুরুত্বপূর্ণ শাখাসমূহ একত্রে আকড়ে ধরে সবগুলোর ওপর আমল করার চেষ্টা করেছেন।

যথা- আল্লামা সাইয়্যেদ সুলাইমান নাদাবী রহ. দ্বীনের বিভিন্ন শাখায় একত্রে আমলের প্রয়োজনীয়তা এবং দ্বীনের সফলতা ও উন্নতি দ্বীনের এ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শাখার সাথে সমানভাবে সংশ্লিষ্ট হওয়ার বিষয়টি এভাবে বর্ণনা করেছেন-
মুসলমান জাতি নবুওয়তের দায়িত্বসমূহের মধ্য হতে ভালো কাজের দাওয়াত এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করার স্থলাভিষিক্ত। এই কারণে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নবুওয়তের যে তিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তথা- তিলাওয়াত, কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেওয়া এবং আত্মশুদ্ধি করা এ তিনটির প্রত্যেকটিই ফরযে কেফেয়ার ভিত্তিতে উম্মতের যিম্মায় আসবে।
তাই যুগের পর যুগ উম্মতের বিশিষ্ট মণীষীগণ এই তিন দায়িত্ব আদায়ের জন্য পুরোপুরি মেহনত করেছেন। তাদের চেষ্টার ফলেই আজো ইসলাম আলোকিত। নিম্নোক্ত আয়াতে নবুওয়তের তিন দায়িত্ব সম্পর্কে একত্রে বলা হয়েছে-
لقد من الله علي المؤمنين إذ بعث فيهم رسولا منهم يتلوا عليهم آياته ويزكيهم ويعلمهم الكتاب والحكمة-
অর্থঃ আল্লাহ তা’আলা মু‘মিনদের প্রতি দয়া করেছেন যে, তাদের মাঝে স্বীয় রাসূল প্রেরণ করেছেন। যে রাসূল তাদেরকে ১. আল্লাহ তা’আলার আয়াত পাঠ করে শুনান ২. তাদের পরিষ্কার ও শোধন করেন ৩. এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমতের তালিম দেন। (সূরা আলে ইমরান-১৬৪)

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই তিন দায়িত্বই সুন্দর ও উত্তমভাবে আদায় করেছেন। মানুষদেরকে প্রভুর বিধান ও আয়াত পাঠ করে শুনাতেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিতেন। এখানেই ক্ষ্যান্ত না করে তাদেরকে স্বীয় সোহবতে (সংশ্রব) রেখে এবং বিভিন্ন কর্মপন্থার মাধ্যমে তাদেরকে পবিত্র ও আত্মাশুদ্ধি করেছেন। মানবাত্মার রোগসমূহের চিকিৎসা করেছেন।
আত্মা থেকে খারাপ ও মন্দের মরিচা ও ময়লা দূর করে মানবতার স্বভাব-চরিত্র তাদের মাঝে স্থায়ী করে দিয়েছেন। এই দুই বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব সমান গুরুত্বসহকারে আদায় করেছেন। এমনিভাবে সাহাবী, তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীগণের তিন প্রজন্ম পর্যন্ত এই দুই বাহ্যিক আধ্যাত্মিক দায়িত্ব একত্রেই ছিলো। যিনি শিক্ষক ছিলেন- তিনিই আধ্যাত্মিক মুরব্বী ছিলেন। যিনি দিনের বেলা শিক্ষা দানের মসনদ অলংকৃত করতেন- তিনিই একাকিত্বে রাত্রি জাগরণ করতেন এবং নিজ সহচরদের আত্মশুদ্ধি ও পবিত্র করার যিম্মাদার ছিলেন।

শিক্ষক ও শায়খের ফারাক

এই তিন প্রজন্মে শিক্ষক ও শায়খ (আধ্যাত্মিক মুরব্বী)-এর মাঝে পার্থক্য পাওয়া যায় না। তারপর আসলো সেই যুগ- যাতে বাহ্যিক মসনদের আদিষ্টকে মুর্দারিস (শিক্ষা) আর আধ্যাত্মিক মুরব্বীকে শায়খ বলা শুরু হলো এবং এক শ্রেণী অন্য শ্রেণীর জ্ঞানশূন্য হতে থাকলো আর উভয়ের মাঝে দূরত্ব বাড়তে থাকলো।
তা সত্ত্বেও প্রথম তিন প্রজন্মের পরও এমন এমন ব্যক্তিত্ব জন্মগ্রহণ করেছেন- যারা নবুওয়তের রং এর উভয় রঙ্গেই রঙ্গীন ছিলেন। যথা- ইমাম গাযালী রহ. যিনি বাহ্যিক জ্ঞানের যেমন ধারক ছিলেন, ঠিক তেমন আধ্যাত্মিক জ্ঞানেরও বাহক ছিলেন।
শায়খ আবুন নাজীব সাহরাওয়ারদী রহ. একদিকে ছিলেন আধ্যাত্মিক পথের শায়খ আর অপরদিকে মাদরাসায়ে নিযামিয়ার শিক্ষকও ছিলেন। শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী ইলমের মসনদে আপন সময়ের ইমাম হওয়ার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক শায়খও ছিলেন। এমনকি ওইসব লোক- যাদেরকে মানুষ শুধু বাহ্যিক ইলমের বাহক মনে করে, তারাও আধ্যাত্মিক ইলমে পরিপূর্ণ ছিলেন। যথা-
ইমাম বুখারী, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ., সুফইয়ান সাওরী রহ. প্রমুখ ও অন্যান্য আলিমগণ।
মধ্যযুগের আল্লামা ইবনে তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল কাইয়্যিমকে অজ্ঞ লোকেরা আধ্যাত্মিক জ্ঞানশূন্য মনে করে। অথচ ইবনুল কাইয়্যিম রহ.-এর কিতাব ‘মানাযিলুস সাইরীন’-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘মাদারিজুস সালেকীন’ অধ্যয়ন করলে বোঝা যায়, তিনি বাহ্যিক জ্ঞানের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক জ্ঞানে সুসজ্জিত ছিলেন।

ভারতবর্ষে মণীষীদের হিজরত

ভারতবর্ষে যেসব বুযুর্গদের পদধুলির বিনিময়ে ইসলাম লাভ করে- তারা মূলত এমন আলিমই ছিলেন- যারা মাদরাসা ও খানকাহ উভয়ের গুণেই গুণান্বিত ছিলেন। ভারতবর্ষের ক্ষণজন্মা বিদগ্ধ আলিম শাহ আব্দুর রহীম থেকে নিয়ে শাহ্ ইসমাঈল শহীদ রহ. পর্যন্ত প্রত্যেকেই দরস-তাদরীস, দাওয়াত, দ্বীন প্রচার ও আত্মশুদ্ধি এবং তাযকিয়ায়ে নফস-এর কাজ করেছেন- যা তাঁদের উভয় জ্ঞানে গুণাান্বিত হওয়ার নিদর্শন বহন করে।
কেউ কেউ বর্তমান খানকাহর লোকদের দেখে এ কথা মনে করেন যে, পূর্বকার বিশিষ্ট আলিমগুণও বুঝি এমন খানকাহওয়ালাই ছিলেন।
তাদের এই ধারণা আগাগোড়া ভুল। উল্লেখিত বুযুর্গ ব্যক্তিবর্গের জীবনী অধ্যয়ন করে দেখুন- বুঝতে পারবেন, তাঁরা কোথাকার বাসিন্দা ছিলেন। তারা ইলম ও রুহানিয়্যাত কোথা থেকে অর্জন করেছেন। যা অর্জন করেছেন- তা কোথায় কোথায় বণ্টন করেছেন। কোথায় তাঁরা শেষ বিশ্রামের জন্য মাটির আশ্রয় পেয়েছেন।
তাঁরা এই বিস্তৃত দ্বীনি খেদমত ও ভ্রমণ তো সে সময় করেছেন, যখন বর্তমান যামানার আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা তথা- ট্রেন, বাস ও উড়োজাহাজের কোনো অস্তিত্ব ছিলো না। খাজা মইনুদ্দীন চিশতী রহ. সিস্তানে জন্মগ্রহণ করেছেন। আফগানিস্তানের চিশত থেকে ইলম শিখেছেন। এরপর ভারতের রাজপুতানা এলাকার কুফরিস্তানে এসে হকের আলো ছড়িয়েছেন।
হযরত ফরীদ শোকরগঞ্জ সিন্ধুর উপকুল পথ হয়ে দিল্লী পর্যন্ত, দিল্লী থেকে পাঞ্জাব পর্যন্ত চলাচল করেছেন। তাঁর শিষ্য-খলীফাগণের অবস্থা দেখুন। তাঁদের সফরের স্থান এবং কবরসমূহ কত দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে রয়েছে।
দেখলেই বোঝা যায়, তাঁরা কত দূর-দূরান্ত পর্যন্ত সফর করেছেন। কেউ গেছেন দক্ষিণাত্যে, কেউ মালয়ে, কেউ বর্তমান বাংলাদেশের দূর প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আবার কেউ যুক্তপ্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।

(সাইয়্যেদ সুলাইমান নাদাবী কর্তৃক লিখিত ‘দ্বীনি দাওয়াত’ কিতাবের ভূমিকাঃ পৃ-১০-২৪)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.