আসরারে খুদী : ইকবালের চোখে ইনসানে কামেল

0
233
Asrare Khudi
Asrare Khudi

আবুল কাসেম আদিল :

দার্শনিকের চিন্তার বাহন মস্তিষ্ক, অন্যদিকে কবির মূল অবলম্বন হৃদয়। তা সত্ত্বেও কবিতার সঙ্গে দর্শনের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক আছে। যেমন সম্পর্ক আছে হৃদয়ের সঙ্গে মস্তিষ্কের। তারপরও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বলছে, দার্শনিক মাত্রই কবি নন; আর কবি মাত্রই নন দার্শনিক। সীমিত হলেও দার্শনিক কবির দেখা পাওয়া মুশকিল নয়, যাঁরা কবিতার মধ্য দিয়ে দর্শনের প্রকাশ করেন। যেমন আল্লামা ইকবাল। আল্লামা ইকবাল কবি না দার্শনিক, একটি তর্কসাপেক্ষ ব্যাপার। মূলত তিনি দার্শনিক ও কবি। এক কথায় দার্শনিক-কবি। তাঁর দর্শন আত্মস্থ হয়ে যায় কবিতায়, কবিতা বাঙ্ময় হয়ে ওঠে দার্শনিক অভিব্যক্তিতে। তিনি একজন কবি হিসেবে কাব্যরসিকদের কাছে যেমন বরিত, তেমনি দার্শনিক হিসেবেও চিন্তক সমাজের আগ্রহের পাত্র।

আল্লামা ইকবাল বেড়ে ওঠেন ব্রিটিশ-শাসিত অবিভক্ত ভারতে, জন্মগ্রহণ করেন অভিজাত মুসলিম পরিবারে, দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করেন, একদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ করেন, অন্যদিকে সমকালীন আলেমদের সান্নিধ্য লাভে ধন্য হন। এই নানামাত্রিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যে ইকবাল তৈরি হন, তিনি সমকালীন সবার চেয়ে ভিন্ন। ভিন্ন ও অনন্য। প্রকরণগত দিক দিয়ে আধুনিক, স্বভাবগতভাবে প্রাচ্যদেশীয় ও জীবনাদর্শের দিক দিয়ে ধার্মিক। তাঁর এই স্বতন্ত্র ও অনন্য ব্যক্তিত্বের প্রভাব থেকে মুক্ত নয় তাঁর কাব্য ও দর্শনও।

আল্লামা ইকবালের কবিতার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মানুষ। মানুষের মধ্যে তিনি মানবতাবোধের জাগরণ দেখতে চেয়েছেন। আল্লামা ইকবালের মতে ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও মানবতাবোধের মধ্য দিয়ে মানবজীবনের সার্থকতা, আল্লাহর প্রতি চূড়ান্ত নিবেদনের মাধ্যমে তার পূর্ণতা। বাধ্যতার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা, বন্দিত্বই মুক্তি ও মানব-কর্তব্য সম্পাদনের মধ্য দিয়ে আল্লাহর নৈকট্যের অনুশীলন— এই হলো আল্লামা ইকবালের জীবনযাপন বিষয়ক চিন্তা।

আল্লামা ইকবালের কাছে যে মানুষের মর্যাদা সবচেয়ে বেশি, তাঁর কবিতায় বারবার এই কথাটা ফুটে উঠেছে।

نہ تو زمین کے لئے ہے، نہ آسمان کے لۓہے
جہاں ہے تیرے لئے، تو نہیں جہاں کے لئے

‘তুমি জমিনের জন্যও নও, তুমি আসমানের জন্যও নও।
পৃথিবী তোমার জন্য, তুমি পৃথিবীর জন্য নও।’

(বাল-ই জিবরীল)

عروج آدم خاکی سے انجمن سہمے جاتے ہیں
کہ یہ ٹوٹا ہوا تارا مہِ کامل نہ بن جائے

‘মাটির আদমের উত্থানে তারকারা আতঙ্কিত হয়ে যায়,
না জানি এই ভগ্ন তারারা খাঁটি মধু হয়ে যায়।’

(বাল-ই জিবরীল)

আল্লামা ইকবাল যুগচৈতন্যের আলোকে একটি মহৎ ও বলিষ্ঠ দর্শনের অনুসন্ধানী হয়ে সৃষ্টি করেন ‘আসরারে খুদী’ বা আত্মজ্ঞানের রহস্য। যেখানে তিনি ইনসানে কামেলের স্বরূপ বর্ণনা করতে গিয়ে স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মর্দে মুমিনের চিত্র অঙ্কন করেন। আসরারে খুদী বা আত্মজ্ঞানের রহস্য সন্ধানেই তিনি সীমিত থাকেন না। কারণ খুদীর দর্শন যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের কথা বলে, তা অনেকটাই অসম্পূর্ণ। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তির চারপাশে অনতিক্রম্য দেয়াল তুলে দেয়।

এজন্য তিনি পরবর্তীতে রচনা করেন ‘রমুযে বেখুদী’ বা আত্মলয়ের রহস্য। খুদী ও বেখুদী মিলিত হয়েই ইকবালের খুদীর দর্শন পূর্ণতা পায়। মিল্লাতের অন্তর্গত হয়েই খুদী সার্থক হয়ে ওঠে। ব্যক্তিত্বের স্বাতন্ত্র্য যেমন তাঁর কাম্য, তেমনি কাম্য সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি অভিন্ন মিল্লাতও। সমাজের মধ্যে আত্মবিলোপ করেই ইকবালের প্রার্থিত খুদী, মর্দে মুমিন তথা ইনসানে কামেল বিকশিত হয়।

মোটকথা ইকবালের নিকট ইনসানে কামেল আত্মনির্ভরশীল, আত্মপরিচয় সম্পর্কে সচেতন, জাগ্রত ও সজাগ মর্দে মুমিন। সকল সদগুণ সম্পন্ন মানবিক বোধ সম্পন্ন মর্দে মুমিনই ইকবালের চোখে প্রার্থিত ইনসানে কামেল। কারণ পরনির্ভরশীল ও অসচেতন মানুষ জাতির বোঝা। সুস্থ জাতিগঠনে এদের উপস্থিতি ক্ষতিকর। এজন্যই ইকবাল নিজের মধ্যেই নিজেকে ডুব দিয়ে আত্ম-অনুসন্ধানের আহ্বান করেছেন। বলেছেন—

اپنے من میں ڈوب کر پا جا سراج زندگی
تو اگر میرا نہیں بنتا نہ بن اپنا تو بن

‘নিজের মনের মধ্যে ডুব দিয়ে জীবনের প্রদীপ সন্ধান করো;
তুমি যদি আমার না হও, হবে না; তবু নিজের হও।’

(বাল-ই জিবরীল)

ইকবাল ব্রিটিশ-শাসিত ভারতে হিন্দু-মুসলমানের হানাহানি দেখেছেন। এই উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি দেখেছেন, এখানকার মানুষ বিভিন্ন গোত্র ও শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে আছে। তীক্ষ্ণ সংবেদনশীল কবি-দৃষ্টি দিয়ে এসব দেখে তিনি মানসিকভাবে পীড়িত বোধ করেছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিম জাতিসত্তার কবি উপাধীধারী ইকবাল এই বলে মানবিকতার সবক দিয়েছেন—

ہوس نے کر ديا ہے ٹکڑے ٹکڑے نوع انساں کو
اخوت کی بیاں ہوجا، محبت کی زباں ہو جا

‘লালসা মানুষজাতিকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দিয়েছে।
ভ্রাতৃত্বের নিদর্শন ও ভালোবাসার ভাষা হয়ে যাও।’

(বাঙ্গে দারা)

ইকবাল বস্তুগত উৎকর্ষের বিরোধী ছিলেন না। তবে তিনি এই বিষয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন যে, আধুনিক তথা পশ্চিমা সভ্যতা মানুষের মানবিকতা হ্রাস করছে। যদি এই উৎকর্ষ মানবিকতার উৎকর্ষ হতো, তাহলে তা-ই হতো প্রকৃতিলগ্ন। কিন্ত এই সভ্যতা মানবিকতা হ্রাস করছে। উৎকর্ষের চেয়ে অবনতি বেশি ঘটাচ্ছে। প্রকৃতিবিরুদ্ধ হওয়ায় নিশ্চিতভাবে এই সভ্যতার একদিন বিনাশ হবে বলে তিনি মনে করতেন।

تمہاری تہذیب اپنے خنجر سے آپ خود کشی کریگی
جو شاخ نازک پہ آشیانہ بنے گا، ناپائیدار ہوگا

‘তোমাদের সভ্যতা নিজের খঞ্জরে নিজে আত্মহত্যা করবে।
ভঙ্গুর ডালে যে বাসা বাঁধবে, তা ভেঙে পড়বে।’

আল্লামা ইকবাল যদিও পশ্চিমা সভ্যতার বিরোধী ছিলেন, তথাপি তিনি পশ্চিমের অনাবশ্যক ও অযৌক্তিক বিরোধী ছিলেন না। অনেক ক্ষেত্রে পশ্চিমের প্রশংসা করতেও তিনি কুণ্ঠিত হন নি। যেমন :

ضمیر مشرق ہے راہبانہ، ضمیر مغرب ہے تاجرانہ
وہاں دگرگوں ہے لحظہ لحظہ، يہاں بدلتا نہيں زمانہ

‘প্রাচ্যের বিবেক সন্নাসী, প্রতীচ্যের বিবেক বাণিজ্যিক।
সেখানে মুহূর্তে মুহূর্তে পরিবর্তন হয়, এখানে যুগ পরিবর্তন হয় না।’

(আরমুগানে হিজায)

সর্বক্ষেত্রে আল্লামা ইকবাল প্রতীচ্যের এই বাণিজ্যিক বিবেকের বিরোধিতা করেন না। তিনি এই বাণিজ্যক্ষেত্রের অমানবিকতার বিরুদ্ধাচরণ করেন। অনেক ক্ষেত্রে ইকবাল প্রাচ্য ও প্রতীচ্যকে একই পাল্লায় মেপেছেন। প্রাচ্যকেও বিন্দুমাত্র ছাড় দেননি।

خودی کی موت سے مغرب کے اندروں بے نور
خودی کی موت سے مشرق ہے مبتلائے جذام

‘আত্মার মৃত্যুর ফলে পাশ্চাত্যের অন্তর আলোহীন,
আত্মার মৃত্যুর ফলে প্রাচ্যের অন্তর কুষ্ঠরোগগ্রস্ত।’

(যরবে কালীম)

মূলত প্রাচ্যও নয়, প্রতীচ্যও নয়—ইকবাল বিশ্বমানবতার কথা বলতেন। যে মানবতা দেশ, কাল ও বর্ণের উর্ধ্বে। তিনি কওমিয়াত ও মিল্লাতের কথা বলতেন। যে মিল্লাত ও কওম ধর্মনিরপেক্ষ নয়, কিন্তু ভূখণ্ড-নিরপেক্ষ। মোটকথা আল্লামা ইকবাল দৈশিক জাতীয়তার উর্ধ্বে উঠে ইসলামের বৈশ্বিক চেতনা লালন করতেন।

مشرق سے ہو بیزار نہ مغرب سے حذر کر
فطرت کا اشارہ ہے کہ ہر شب کو سحر کر

‘প্রাচ্যের প্রতি নারাজ হবে না, আর পশ্চিমকে করবে না ভয়;
সব রাতকেই মোহিত করা প্রকৃতিলগ্নতার লক্ষণ।’

(যরবে কালীম)

چین و عرب ہمارا ہندوستاں ہمارا
مسلم ہیں ہم، وطن ہے سارا جہاں ہمارا
توحید کی امانت سینوں میں ہے ہمارے
آساں نہیں مٹانا نام و نشاں ہمارا

চীন-আরব আমাদের, হিন্দুস্তান আমাদের;
আমরা মুসলিম, সারা জাহান আমাদের দেশ।
আমাদের হৃদয়ে রয়েছে তাওহিদের আমানত,
আমাদের নাম-নিশানা নিশ্চিহ্ন করা সহজ নয়।

(বাঙ্গে দারা)

ইকবাল মানুষের মধ্যে স্বাধীন চিত্তের উন্মেষ দেখতে চেয়েছিলেন। স্বাধীনতাকে মানুষের জীবনের অগ্রসরতা ও সফলতার জন্য অনিবার্য মনে করতেন। ইকবালের মতে যেখানে স্বাধীনতা নেই, সেখানে জীবনীশক্তি নেই। পরাধীনতা মানুষের অনেক সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়। স্বাধীনতা-বঞ্চিত হওয়া প্রকারান্তরে মানবিকতা থেকে বঞ্চিত হওয়ার নামান্তর। এমনিভাবে ইকবাল ভালোবাসাকে—যা মানবিকতা ও ভ্রাতৃত্বের মূল—দুনিয়ার সফলতার উসিলা বলে সাব্যস্ত করেন।

محبت ہی سے پائی ہے ، شفا بیمار قوموں نے

‘একমাত্র ভালোবাসা দিয়ে অসুস্থ জাতি সুস্থ হয়েছে।’

(বাঙ্গে দারা)

আল্লামা ইকবালের কবিতা দেশ, অঞ্চল ও ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ করা চলে না। তিনি যখন মানব ও মানবিকতার কথা বলেন, দেশ ও ভূখণ্ড নিরপেক্ষভাবে বলেন। ওয়াতানিয়াতের সীমাবদ্ধতামুক্ত মানবিকতার কথা বলেন। তাতে সব দেশ ও অঞ্চলের মানুষ অনায়াসে শামিল থাকে। তবে তাঁর এই মানবিকতাবোধের ভিত্তি কী? এ ব্যাপারে তিনি নিজেই স্পষ্ট করেছেন, তা ইসলাম। তাঁর জীবনদর্শন ইসলামের দেয়া জীবনদর্শন থেকে উৎসারিত।

তিনি কাব্য, শিল্প, রাজনীতি, জ্ঞান ও ধর্মকে একাকার ও কেন্দ্রীভূতরূপে দেখেছেন। এর মধ্যেই তিনি মানবজীবনের মুক্তির সন্ধান পেয়েছেন। ইসলামের দেয়া মানবিকতার ধারণাই তিনি তাঁর কাব্যের মধ্য দিয়ে প্রস্ফুটিত করে তুলেছেন। এক চিঠিতে তিনি লেখেন—আমার নিকট ফ্যাসিজম, কমিউনিজম ও বর্তমান কালের কোনো ইজমের তাৎপর্য নেই। আমার বিশ্বাস, ইসলামই একমাত্র বাস্তবধর্মী ব্যবস্থা, যা সর্বক্ষেত্রে মানুষের মুক্তিদাতা।

ইকবাল আল্লাহপ্রেম ও আল্লাহকে পাওয়ার চেষ্টায় নিরত থাকাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। তবে আল্লাহকে পাওয়ার চেষ্টার প্রক্রিয়া বলতে গিয়েও তিনি মানবপ্রেমের জয়গান গান। মূলত তিনি মানুষের কথাই বলেন, মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের ব্যাপারেই চিন্তা করেন— ইসলামের মৌলিক জীবনাদর্শের আলোকে।

خدا کے عاشق تو ہیں ہزاروں، بنوں میں پھرتے ہیں مارے مارے
مَیں اُس کا بندہ بنوں گا جس کو، خدا کے بندوں سے پیار ہوگا

‘খোদার প্রেমিক আছে হাজারো বনে-বাঁদাড়ে ইতস্তত ঘোরে,
আমি সেই বান্দার ভৃত্য হব খোদার বান্দাদের প্রতি যার প্রেম রয়েছে।’

(বাঙ্গে দারা)

আল্লামা ইকবালের কাছে মুসলমানিত্ব সবচে বেশি মর্যাদার। তিনি মুসলমানিত্বকে প্রেম ও ভালোবাসার সমার্থক বলে ব্যক্ত করেন। তিনি ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধ, মানবপ্রেম ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ধারণ করার প্রতি উৎসাহিত করেন। ইকবাল মুসলমানিত্বকে ‘ফিতরাত’ বলে সাব্যস্ত করেন, যা মূলত হাদীসের ভাষা ও ভাষ্য। একদিকে তিনি মুসলমানিত্বের জয়গান করেন, অন্যদিকে দৈশিক জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করেন; যা মূলত ইসলামী উম্মাহ-ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ।

یہی مقصودِ فطرت ہے یہی رمزِ مسلمانی
اخوت کی جہانگیری، محبت کی فراوانی
بُتانِ رنگ و خُوں کو توڑ کر مِلّت میں گُم ہو جا
نہ تُورانی رہے باقی، نہ ایرانی نہ افغانی

‘এটিই প্রকৃতির লক্ষ্য, মুসলমানিত্বের রহস্য;
বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার প্রাচুর্য।
বর্ণ ও রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন করে মিল্লাতের মধ্যে শামিল হয়ে যাও,
তুরানিও থাকবে না, থাকবে না ইরানি এবং আফগানিও।’

(তুলূয়ে ইসলাম)

আল্লামা ইকবালের ইসলাম-ব্যাখ্যা অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত ব্যাখ্যার চেয়ে ভিন্ন। তিনি ইসলাম গ্রহণ ও ধারণের মাপকাঠি সাব্যস্ত করেছেন প্রেম। তিনি ইসলাম বুঝতে চেয়েছেন প্রেমের ভাষায়, ভালোবাসার ভাষায়। বরং তিনি ভালোবাসাহীন ইসলামকে ইসলাম থেকেই খারিজ করে দেন।

اگر ہو عشق تو ہے کفر بھی مسلمانی
نہ ہو تو مردِ مسلماں بھی کافر و زندیق

‘যদি থাকে প্রেম, তাহলে কুফরিও মুসলমানিত্ব;
প্রেম না থাকলে মুসলমানও মূলত কাফের।’

(বাল-ই জিবরীল)

প্রেমের মাহাত্ম বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি আরো বলেন—

عقل و دل و نگاہ کا مرشدِ اولیں ہے عشق
عشق نہ ہو تو شرع و دیں بتکدہ ء تصورات

‘বুদ্ধি, বিবেক ও দৃষ্টির প্রথম মুরশিদ হলো প্রেম।
প্রেম না থাকলে দ্বীন ও শরীয়ত কল্পনাতীত।’

(বাল-ই জিবরীল)

আল্লামা ইকবাল জাগ্রত দিল ও সুস্থ চেতনা সম্পন্ন মুসলিম কামনা করেছেন। তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন— ইয়া রব দিলে মুসলিম কো ওহ যিন্দা তামান্না দে / জু কলব কো গরমা দে, জু রূহ কো তড়পা দে।

আল্লামা ইকবালের সৃষ্টির কাঠামোতে উপাদান যুগিয়েছে ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। মহাগ্রন্থ কুরআন, মহানবীর বাণী ও জীবনী ইসলামী গবেষকদের চিন্তা ও গবেষণা ইকবালের চিন্তার সৌধ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। ইকবালের কাব্য-কাঠামোতে ইসলামী ঐতিহ্য থেকে প্রাপ্ত শব্দ ও উপমা তাঁর ইসলাম-ঘনিষ্ঠতা প্রমাণ করে।

ইকবালের চিন্তা ও রচনা অলস চিন্তা-বিলাসের উপলক্ষ নয়। তিনি শুধু শিল্পের জন্য শিল্পরচনা করেন নি। তাঁর শিল্পরচনার যে একটি মহোত্তম উদ্দেশ্য আছে, তা তাঁর রচনাবলির প্রতি চোখ বুলালেই বোঝা যায়। তাঁর রচনার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, মানব ও মানবতার মুক্তি। শুধু মানবতার মুক্তি বললে আংশিক বলা হবে। মূলত তা ছিল, ইসলামী পথনির্দেশের আলোকে মানবমুক্তি। তাঁর রচনায় এই কথাটাই বারবার ধ্বনিত হয়েছে। বর্তমান যুগচিত্তের সংকট নিরসনে ইকবালের চিন্তা আমাদের জন্য হতে পারে আলোর পথের দিশারী।

তথ্যসূত্র :

রাওয়াইউ ইকবাল, আবুল হাসান আলী নাদাবি

কুল্লিয়াতে ইকবাল, আল্লামা ইকবাল

মাকালাতে ইকবাল, আল্লামা ইকবাল

নুকুশে ইকবাল, আবুল হাসান আলী নাদাবি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.