ইতিহাসের পাতায় ঈসায়ী সন- আব্দুল্লাহ আল মাসুম

0
631
2020 1
2020 1

ঈসায়ী সনের পরিচয় ও গুরুত্ব
ঈসায়ী সনের গণনা হয় সূর্যকে কেন্দ্র করে। এ কারণে ঈসায়ী সনকে সৌরবর্ষও বলা হয়। সৌরবর্ষ মূলত সৌরজগতের বার্ষিক হিসাবের সাথে সম্পৃক্ত। সৌরজগতের সকল গ্রহ, উপগ্রহ বিশেষ করে পৃথিবীর পরিবেশ-প্রকৃতি ও আবহাওয়া সূর্য্যকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। আবহাওয়ার পরিবর্তন, সময়ের প্রকৃতির বিভিন্নতার ফলে পৃথিবীতে মানব ও অন্যান্য প্রাণীকুলের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানেরও পরিবর্তন ঘটে। ভিন্ন ভিন্ন খাদ্যের মধ্যে মানব ও অন্যান্য প্রাণীকুলের জন্য রয়েছে বিভিন্ন রকমের উপকারিতা- যা সময় অনুযায়ী প্রয়োজন হয়ে থাকে। সূর্য্যরে প্রভাবে সৌরজগতের এই পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে বছরের যে হিসাব প্রচলিত, তাকেই সৌরবর্ষ বলে। সৌরবর্ষ ১২ মাসে গণনা করা হয়ে থাকে। তবে সূর্য্যরে পরিক্রমার সাথে চাঁদের পরিক্রমার সময় ভিন্ন হওয়ার কারণে সৌরবর্ষ ও চন্দ্রবর্ষের দিন কম-বেশি হয়ে থাকে।
বলাবাহুল্য, মানব ও অন্যান্য প্রাণীকুলের খাদ্য উপাদান ও সময় অনুযায়ী এর প্রয়োজনীয়তার ভিন্নতার কারণে সূর্য্যকেন্দ্রিক সৌরবর্ষের হিসাব-নিকাশ মানবজাতির পার্থিব জীবন-যাত্রায় অপরিহার্য। এই কারণে সৌরবর্ষের হিসাবকে ইসলামে শুধু বৈধই করা হয়নি; বরং এই হিসাবকে আল¬¬াহ তা’আলার পক্ষ থেকে অনুগ্রহ বলা হয়েছে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
فمحونا آية الليل وجعلنا آية النهار مبصرة لتبتغوا فضلا من ربكم ولتعلموا عدد السنين والحساب-
অর্থঃ আমি রাতের চিহ্ণকে দূর করে দিনের চিহ্ণকে দৃশ্যমান করলাম, যাতে তোমরা আল¬াহ তা’আলার অনুগ্রহ তথা রুযী-রোজগার করতে পারো এবং যাতে তোমরা বছরের ও সময়ের হিসাব জানতে পারো।
(সূরা বনী ইসরাঈলঃ আ-১২)
তবে অন্যান্য সনের তুলনায় হিজরী সন বিভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ ও মহিমান্বিত। হিজরী সন চাঁদকে কেন্দ্র করে গণনা করা হয়।

ঈসায়ী সন বা সৌরবর্ষের প্রচলন
বর্তমান যুগে খৃষ্টীয় সাম্রাজ্যবাদের প্রভাবে পৃথিবীর সমস্ত কায়-কারবার ও মানব জীবনের সর্বক্ষেত্রে বার্ষিক হিসাব ইংরেজী সন নামে পরিচিত এই সৌরবর্ষকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হচ্ছে। তারিখ কিংবা দিন গণনা করলেই সৌরবর্ষের কথা সামনে চলে আসে। পৃথিবীর অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্যের হিসাব ও প্রতিষ্ঠানে সৌরবর্ষের হিসাব অনুযায়ী তারিখ লিখা হয়।

সৌরবর্ষ গণনা ও কার্যকর হওয়ার ইতিহাস
পৃথিবীর বর্ষ গণনা মূলত গাণিতিক হিসাব থেকে তৈরি হয়েছে। গণিতশাস্ত্র আগে দর্শন ছিলো। গ্রীক সভ্যতার যুগে গণিতশাস্ত্রের প্রচলন ও উৎকর্ষ সাধন হয়। গ্রীকদের সময়েই গণিতশাস্ত্র দর্শনের বৃত্ত থেকে বের হয়ে হিসাবের নির্দেশনায় পরিণত হয়। গ্রীকরা গণিতে অনেক এগিয়ে গেলেও গাণিতিক হিসাবে তারা বর্ষ গণনা তৈরি করে যেতে পারেনি। গ্রীকদের পরবর্তী রোমক সভ্যতা গণিতের নিয়মে বর্ষ গণনার প্রচলন করে। রোমকরা ছিলো বস্তুবাদে বিশ্বাসী। বস্তুবাদী বিশ্বাস ও আদর্শে অগ্রসর হয়ে কর্মজীবি মানুষকে তারা শৃংখলিত ব্যবস্থাপনায় আনতে চেয়েছিলো। এই বস্তুবাদী বিশে¬ষণের সাহায্যেই তারা বর্ষ গণনার নিয়ম প্রবর্তন করেছিলো।

রোমক সম্রাট জুলিয়াস সিজারের আমলে আধুনিক বর্ষ গণনা উদ্ভাবিত হয় এবং গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা ও গণনার মাধ্যমে একটি বছরের মাসিক বিভাজন নির্ণয় করা হয়। তখন সৌরজগতের সূর্য্যরে পরিক্রমাকে ৩৬৫ দিনের হিসেবে ধরা হয় এবং প্রতি চতুর্থ বর্ষকে ৩৬৬ দিনের গণনায় নির্ধারণ করা হয়। এই পদ্ধতি এখনো অব্যাহত আছে। জুলিয়াস সিজারের এই ক্যালেন্ডারকে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার বলা হয়। সম্রাট অগষ্টাস সিজারের আমলে এই ক্যালেন্ডার কিছুটা সংশোধন করা হয়।

এরপর ত্রয়োদশ গ্রেগরি ১৫৮২ খৃস্টাব্দে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের সংশোধন করেন। ক্রয়োদশ গ্রেগরি বিশ্ব ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের পোপ ছিলেন। সৌরজগতের গতিবিধিকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশে¬ষণ করে সূর্য্য পরিক্রমার সময়কাল যথাযথভাবে নির্ণয় করতে গিয়ে দেখা গেলো- জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের গণনায় প্রতিটি বার্ষিক পরিক্রমায় ১১ মিনিট ১০ সেকেন্ড বেশি হয়। তখন পোপ গ্রেগরি কর্তৃক নিযুক্ত জ্যোতির্বিদগণ সামগ্রিক গণনা থেকে ১০ দিন বাদ দেন, যাতে বর্ষ গণনাটি যথার্থ ও সঠিক হতে পারে।
পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরির আমলে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের পুনরায় সংশোধন হওয়ার কারণে পরবর্তীতে তা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত হয়। ১৭৫১ সনে গ্রেট বৃটেন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারটি গ্রহণ করে। তখন আবারো উক্ত ক্যালেন্ডারটি সংশোধন করা হয়। মূল গণনা থেকে ১১ দিন বাদ দিয়ে ক্যালেন্ডারটি চূড়ান্তভাবে সংশোধন করা হয়। গ্রেট বৃটেনের সংশোধিত সেই ক্যালেন্ডারটিই বর্তমানে পৃথিবীতে প্রচলিত রয়েছে। যাকে ইংরেজী সন বা খৃস্টাব্দ বলেও আখ্যায়িত করা হয়।

সৌরবর্ষ সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা
প্রচলিত সৌরবর্ষের সাথে ইসলামের কোনো সংঘর্ষ নেই আবার সাদৃশ্যও নেই। এর সাথে ইসলামের কোনো কিছুর যোগসূত্র নেই। সৌরবর্ষের হিসাবের সাথে ইসলামের কোনো বিধি-বিধানেরও কোনো সম্পর্ক নেই। তবে সূর্য্য উদিত এবং অস্ত যাওয়ার সাথে ইসলামের কিছু বিধি-বিধানের সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন সূর্য্য উদিত হয়ে পুনরায় অস্ত যাওয়ার বিভিন্ন পরিক্রমায় কিছু বিধানের সময় নির্ণিত হয়। যথা- নামায, রোযা, সাহরী, ইফতার ইত্যাদি। এছাড়া মানবজাতির পার্থিব জীবন-যাত্রায় সৌরবর্ষের হিসাব-নিকাশ অবশ্যই অপরিহার্য। এর কারণ সম্পর্কে আগে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

পক্ষান্তরে চন্দ্রমাস কেন্দ্রিক হিজরী সনের সাথে ইসলামের অনেক বিধি-বিধান ও সময়সীমার অচিচ্ছেদ্য সম্পর্ক থাকার কারণে আমাদের জীবনে হিজরী সনের গণনাকে সামনে রাখা একান্ত জরুরী। এটা ঈমানের দাবীও বটে। এছাড়া ইসলামের অনুশাসন, ইসলামের শিক্ষা ও ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হিসেবে এর প্রয়োজনীয়তা আরো বেশি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.