ইলমে ফিকাহ কী ও কেনো?

0
682
معنى الفقه
معنى الفقه

ইলমের যে শাখার দ্বারা ফিকাহর ইলম অর্জিত হয়- তাকে ইলমে ফিকাহ বলা হয়। নিম্নে ইলমে ফিকাহ-এর সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো-
الفقه علم بالأحكام الشرعية من أدلتها التفصيلية-
শরীয়তের বিস্তারিত দলীলসমূহ (কুরআন, হাদীস, ইজমা ও ক্বিয়াস) থেকে আহকাম ও মাসায়েলের জ্ঞান অর্জন করাকে ইলমে ফিকাহ বলা হয়। (ফাওয়াতিহুর রাহামূত-শরহে মুসাল্লামুস সুবূত ঃ খন্ড-১, পৃঃ ১০-১১)
গাইরে মুকাল্লিদ আলিম ওয়াহিদুয যামান ইলমে ফিকাহকে সর্বোত্তম ইলম বলে অভিহিত করেছেন। ফিকাহ বিষয়ে তার কিতাব “নুযূলুল আবরার”-এর ভূমিকায় তিনি লিখেন-
وبعد: فإن أعلي العلوم قدرا وأجلها عزا وفخرا علم الفقه المستنبط من الكتاب والسنة- فإنه عن مكائد الشيطان جنة-
সকল ইলমের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদা ও গৌরবের অধিকারী ইলম হলো ফিকাহ। যা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে আহরিত। কেননা এই ইলম মানুষকে শয়তানের চক্রান্ত থেকে রক্ষা করে। (নুযূলুল আবরার ঃ খন্ড-১, পৃঃ ২)

মোটকথা, মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মতিক্রমে ইসলামী শরীয়তের স্বীকৃত দলীল চারটিঃ কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস। এই চার দলীল থেকে মুসলিম জীবনের পবিত্রতা থেকে শুরু করে মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তির সাথে সংশ্লিষ্ট পর্যন্ত জীবনের সকল ক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় মাসায়েল বিভিন্ন অধ্যায় ও পরিচ্ছেদের অধীনে সন্নিবেশিত করা হয়েছে এবং প্রত্যেক মাসআলার সাথে দলীল-প্রমাণাদি উল্লেখ করা হয়েছে। এই সংকলিত ও সুবিন্যস্ত রূপকে “ইলমে ফিকাহ” বলা হয়।
অথচ অপরদিকে এক শ্রেণির মানুষের এই ধারণা রয়েছে যে, ফিকাহ ইসলামের কোনো অংশ নয়। এটা কুরআন ও হাদীস থেকে একটি বিচ্ছিন্ন বিষয়। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হলো, “ইলমে ফিকাহ”ই একটি মুসলিম জীবনের মূল বুনিয়াদ। একটি দেহের জন্য মাথা যে রকম, ইসলামী জীবনের জন্য “ইলমে ফিকাহ”ও সে রকম। ইলমে ফিকাহর উপরোক্ত সংজ্ঞা থেকে এটাই প্রমাণিত হয়।

ইলমে ফিকাহর মূলনীতি
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ أَطِيعُواْ اللَّهَ وَأَطِيعُواْ الرَّسُولَ وَأُوْلِي الأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ- ذلك خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً-
অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করো, তবে আনুগত্য করো আল্লাহর, আনুগত্য করো রাসুলের এবং তাদের- যারা তোমাদের মধ্যে দায়িত্বশীল।
কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটলে তা উপস্থাপিত করো আল্লাহ ও রাসুলের নিকট। এটাই উত্তম এবং পরিণামে সর্বোৎকৃষ্ট। (সূরা নিসা- ৫৯)
মুসলমানের জীবন যে মূলনীতির অধীনে পরিচালিত হবে- তা কুরআনুল কারীমের উপরোল্লিখিত আয়াতে বলে দেওয়া হয়েছে।
তার কর্তব্য হলো- তাওহীদ ও রিসালাত-এর অর্থ সঠিকভাবে অনুধাবন করে হৃদয়ের গভীর থেকে তা গ্রহণ করা। অতঃপর ইসলামের শিক্ষা ও এর সঠিক নির্দেশনার জ্ঞান অর্জন করে সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
ইসলামের মূল শিক্ষা বা এর নির্দেশনা পেতে হলে একমাত্র আসমানী ইলম- যা আল্লাহ তা’আলা স্বীয় দূত জিবরাঈল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে তাঁর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট পৌছিয়েছেন এবং যে দ্বীনকে তিনি কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানব জাতির জন্য সার্বজনীনরূপে চূড়ান্তভাবে মনোনীত করেছন- তার শরণাপন্ন হতে হবে। এই জন্য এই আসমানী ইলমের প্রকৃত ধারক বাহকদের কাছে যাওয়া এবং তাদের আনুগত্য করা।

এক্ষেত্রে নিজ বুদ্ধি-বিবেক বা যুক্তি ও চিন্তা-ভাবনাকে মাপকাঠি বানানো যাবে না। আমার বিবেক যা সমর্থন করে, কিংবা যুক্তিতে যা সাব্যস্ত হয়, তাই হবে- এমনটি নয়; বরং শরীয়ত যাকে মাপকাঠি বানিয়েছে- সে আলোকেই সব কিছু নির্ণিত হবে। উপরের আয়াতে এ দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।
অথচ আজকাল মুসলমানদের মধ্য থেকেই এমন এক দলের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে- যারা শরীয়তের মূল ভিত্তির পরওয়া না করে স্বীয় বুদ্ধি বা যুক্তিকে সর্বাগ্রে তুলে ধরার প্রয়াস চালান। কিংবা সারা জীবন এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার ব্যস্ততার পিছনে দৌড়ে শেষ জীবনে অবসরে এসে অনুবাদ নির্ভর জ্ঞান নিয়ে গবেষণায় (!) লেগে যান। কেউ আবার বইও লিখে ফেলেন। বিষয়টি এমন যে, কেউ চিকিৎসা বিষয়ক রেফারেন্স পড়েই শল্যচিকিৎসক বনে গেলো।
কিন্তু ইসলাম কি এমন যে, যার যে রকম মনে হয় বা সুবিধা হয়- সেভাবেই ইসলামকে বানিয়ে ফেলবে! এটা তো দুনিয়ার মানবরচিত আইন-কানুনের বেলায় হতে পারে। একটা আইন প্রনয়ণ করা হলো, কয়েকদিন পরে দেখা গেলো- এটা তো ফিট হচ্ছে না, কিংবা অন্য কোনো স্থানে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে, তো ব্যাস- এটাকে আবার কাঁট-ছাট করো, সংশোধন করো, সংস্কার করো।

অপরদিকে ইসলাম ধর্ম একমাত্র আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত সুনির্দিষ্ট অপরিবর্তনীয় মাপকাঠির উপর গঠিত সর্বকালের জন্য সার্বজনীন অবিস্মরণীয় জীবন-বিধান। সমস্যাবহুল মানব জীবনের বিভিন্ন জটিলতার গ্রন্থি উম্মোচনের জন্য যে অনুপম বিধান ইসলাম প্রবর্তন করেছে- অন্য কেউ তা পারেনি।

উপরোল্লিখিত আয়াতের তাফসীরে ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহ. বলেন-
আলিমগণ বলেছেন- শরীয়তের মূল ভিত্তি চারটিঃ কুরআন, সুন্নত, ইজমা ও কিয়াস। উপরের আয়াত থেকে তা প্রমাণিত হয়। কেননা উপরোক্ত আয়াতে أطيعوا الله বলে কুরআনের আনুগত্যকেই বুঝানো হয়েছে। أطيعوا الرسول বলে সুন্নাহর আনুগত্যকে বুঝানো হয়েছে। وأولى الأمر منكم দ্বারা প্রমাণ হয় যে, ইজমা শরীয়তের দলীল। আর فإن تنازعتم في شيئ فردوه إلى الله والرسول দ্বারা কিয়াসের প্রামাণ্যতা সাব্যস্ত হয়েছে। (তাফসীরুল কাবীরঃ খন্ড- ১০, পৃঃ ১৪৩)
আল্লামা ইবনে খালদুন রহ. বলেন-
اتفق جمهور العلماء أن هذه هي أصول الأدلة وإن خالف بعضهم في الإجماع والقياس إلا أنه شذوذ-
আলিমগণ এ বিষয়ে একমত যে, শরীয়তের দলীল মৌলিকভাবে এ চারটিই। কেউ কেউ ইজমা ও কিয়াস সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করলেও তা একটি বিচ্ছিন্ন মত ছাড়া আর কিছুই নয়। (ইবনে খালদুন- আল মুকাদ্দিমাঃ পৃঃ ৪০৩)

গাইরে মুকাল্লিদদের মাঝে “শাইখুল ইসলাম” উপাধীপ্রাপ্ত আলিম মাও. সানাউল্লাহ অমৃতসরী ‘ব্যক্তি-তাকলীদ’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধে লিখেন- অধিকাংশের মতে দ্বীনের মূলনীতি চারটিঃ কুরআন, সুন্নত, ইজমা ও কিয়াস।
কুরআন-হাদীস বুঝার জন্য লুগাত, নাহ্ব, সরফ, মা’আনী, বয়ান, উসূলে ফিকাহ ইত্যাদি বিষয়ে শাস্ত্রীয় জ্ঞান অপরিহার্য। এই শাস্ত্রীয় জ্ঞানের সাহায্যেও যে বিষয়গুলোর সমাধান সরাসরি কুরআন-হাদীস থেকে নেওয়া সম্ভব নয়, সে বিষয়গুলোতে “ইজমায়ে উম্মত” অনুসরণ করতে হবে। আর “ইজমা” তেও যে মাসআলার সমাধান মিলবে না- তাতে কোনো মুজতাহিদের কিয়াস (উসূলে ফিকাহর শর্তাবলী অনুযায়ী ) আমল করা হবে। (সানাউল্লাহ অমৃতসরী- আহলে হাদীস কা মাযহাবঃ পৃ-৫৪)

মোটকথা উপরোল্লিখিত চারটি মূলনীতির উপর ইসলামের সৌধ নির্মিত। এগুলোই শরীয়তের স্বীকৃত দলীল। এতদসত্ত্বেও মু’তাযিলা, শি’আ ও যাহেরী সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ এবং বর্তমান যুগের এদের অনুসারীরা কিয়াসকে শরীয়তের দলীল হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। ইবনে খালদুন রহ. মুসলিম উম্মাহর স্বীকৃত মত ও পথ থেকে বিচ্ছিন্ন বলে এদের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। আল্লাহ তা’আলাই একমাত্র সঠিক পথের দিক নির্দেশনাকারী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.