ইসরা ও মি’রাজের ব্যাপারে ইসলামের আকীদা

0
587
isra miraj
isra miraj

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মিরাজ মূলত দুটি ধাপে সংঘটিত হয়েছে। প্রথমতঃ কাবা প্রান্তর থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত এবং দ্বিতীয়তঃ সেখান থেকে উর্ধ্বজগতে সাত আসমান ও মহাবিশ্বের শেষ প্রান্ত অতিক্রম করে দয়াময় রবের একান্ত সান্নিধ্য পর্যন্ত।
মিরাজের এই দুই ধাপেরই কথা কুরআনে উল্লেখিত হয়েছে। বাইতুল মুকাদ্দাস (মসজিদুল আকসা) পর্যন্ত সফরের উল্লেখ হয়েছে কুরআনে কারীমের সূরা বনী ইসরাঈলের শুরুতে এবং উর্ধ্বজগতের সফরের কথাটি উল্লেখিত হয়েছে সূরা নাজমের ১৩ থেকে ১৮ নং আয়াতে।
এছাড়া মিরাজের ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ সহীহ হাদীসে নির্ভরযোগ্য সনদে উল্লেখিত হয়েছে। আর মি’রাজের হাদীস সনদের বিবেচনায় ‘মুতাওয়াতির’ এবং তা ‘সহীহ’ হওয়ার ব্যাপারে সমগ্র উম্মাহর ইজমা রয়েছে। তাই এর বিষয়বস্তু একটি ইসলামী আকীদা হিসেবে গোটা উম্মাহ্র কাছে ‘মুতালাক্কা বিল কবূল’ অর্থাৎ অবিসংবাদিত।

এ জন্য মি’রাজের ঘটনার সত্যতার ব্যাপারে ঈমান রাখা ফরয এবং তা ইসলামের অকাট্য আকীদা সমূহের একটি। তদ্রƒপ এই সফর স্বপ্নে কিংবা শুধু রূহানীভাবে হয়নি; বরং জাগ্রত অবস্থায় স্বশরীরে হয়েছিলো- এর বিষয়টিও অকাট্য এবং ঈমানের অংশ। নিঃসন্দেহে নবীজি সাল্লাল্ল¬াহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম জাগ্রত অবস্থায় স্বশরীরে মিরাজ ভ্রমণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে কাযী ইয়ায রহ. বলেন-
قال قاضى عياض فى الشفاء: وذهب معظم السلف والمسلمين إلى أنه إسراء بالجسد وفى اليقظة وهذا هو الحق-
সালাফ এবং খালাফের সকল আলিমগণের মতামত হল- নবীজি সাল্লাল্ল¬াহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬ামের মি’রাজ সজাগ অবস্থায় স্বশরীরে হয়েছে। (আশ-শিফা বিতা’রীফি হুকুকিল মুসতাফা)
তবে কোনো কোনো গবেষকের মতে নবীজি সাল্লাল্ল¬াহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬ামের এ শারীরিক মিরাজের আগে ভূমিকা হিসেবে রূহানী মিরাজও হয়েছিলো। যেমন ওহী নাযিল হওয়ার আগে তিনি স্বপ্ন দেখতেন। যাতে তার উর্ধ্বজগতের বিষয়সমূহের সাথে পরিচয় ঘটে। তেমনিভাবে পবিত্র মহিমান্বিত মিরাজে বড় বড় নিদর্শনসমূহ প্রত্যক্ষ করা এবং মিরাজ ভ্রমণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য স্বপ্ন এবং রূহজগতে তার মিরাজ হয়েছিলো।

ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক রহ. এ ব্যাপারে বলেন-
‘নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই রাতের সফর ও তাতে সংঘটিত ঘটনাবলী এ সবই হলো ঈমানের পরীক্ষা এবং কাফির-মুমিনের পার্থক্য নির্ণায়ক এবং আল্লাহ তা’আলার কুদরতের একটি নিদর্শন। এতে বুদ্ধিমানের জন্য রয়েছে শিক্ষার উপকরণ এবং যারা আল্লাহ তা’আলার প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাঁর কর্মের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রেখেছে, তাদের জন্য এতে রয়েছে হিদায়েত, রহমত ও দৃঢ়তা। আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাকে রাতের বেলায় নিয়ে গেছেন, যেভাবে তিনি ইচ্ছা করেছেন, তাঁকে তাঁর পালনকর্তার কিছু নিদর্শন দেখানোর জন্য। ফলে তিনি আল্লাহ তা’আলার শান ও অসীম কুদরতের অনেক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তাঁর কুদরতের প্রত্যক্ষ পরিচয় লাভ করেছেন।’ (সীরাতে নববী- ইবনে হিশামঃ ৩/৩৯৫-৩৯৬)

ইমাম আবুল খাত্তাব উমর ইবনে দিহয়াহ বলেন-
‘ইসরার হাদীসের ব্যাপারে মুসলিমদের ইজমা রয়েছে এবং বে-দ্বীন ও নাস্তিক সম্প্রদায় তা থেকে বিমুখ হয়েছে। তারা চায় ফুঁৎকারে আল্লাহ তা’আলার নূর নিভিয়ে দিতে। আর আল্লাহ তা’আলা তাঁর নূরকে পূর্ণ করবেন যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।’
এখানে এ বিষয়টিও লক্ষ্যণীয় যে, কিছু কিছু বক্তাকে গবেষণার ভাষায় বলতে শোনা যায়, বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত যে সফর হয়েছিলো- তা কুরআন দ্বারা প্রমাণিত আর অন্য বিষয়গুলো এসেছে শুধু হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। তারা এ কথাটি এমন ভঙ্গিতে বলেন, যেনো যে বিষয়গুলো শুধু হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়- তা দুর্বল পর্যায়ের কথা। এগুলো অস্বীকার করলে তেমন কোনো অসুবিধা নেই। নাঊযু বিল্লাহি মিন যালিক। মূলত এ ধরণের উপস্থাপনা খুবই ভয়াবহ এবং ঈমানের জন্য খুবই মারাত্মক।
কারণ হাদীসে নববী শরীয়তের একটি স্বতন্ত্র দলীল। হাদীস দ্বারা প্রমাণিত অসংখ্য বিধান ও আকায়েদ ঠিক কুরআন দ্বারা প্রমাণিত আহকাম ও আকায়েদের মতোই অকাট্য। কেননা হাদীসের একটি বড় অংশ তাওয়াতুর পর্যায়ে বর্ণিত এবং আরেকটি বড় অংশ ‘তালাক্কি বিল কবূল’ ও ইজমা দ্বারা সমর্থিত। অতএব এ ধরণের বর্ণনাগুলো শাস্ত্র ও বাস্তবতার নিরিখে অকাট্য।

তাছাড়া যে হাদীসগুলো ‘আখবারে আহাদে সহীহা’ তথা একক সহীহ সূত্রের ভিত্তিতে প্রমাণিত তা-ও হাদীসেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুতরাং কাবা প্রান্তর থেকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত গমন এবং সকল নবী-রাসূলগণের ইমামতি শেষে সেখান থেকে জিবরীল আলাইহিস সালামের সাথে সাত আসমান ও সমগ্র জগত পাড়ি দিয়ে উর্ধ্বগমনে ভ্রমণ পর্যন্ত মিরাজের পুরোটাই অকাট্য ও বাস্তব। একটু বলা হয়েছে, মি’রাজের হাদীসটি মুতাওয়াতির এবং উম্মাহর ইজমা ও ‘তালাক্বি বিল কবূলর’ দ্বারাও প্রমাণিত। তাই এটি বর্ণনাধারা ও মর্ম উভয় দিক থেকে অকাট্য ও সংশয়হীনভাবে প্রমাণিত। অতএব মিরাজের এই সবগুলো ধাপের ওপর বিশ্বাস করা ইসলামের আকীদার অন্তর্ভুক্ত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.