ইসলামে ঈদের সূচনা ও নামকরণ

0
757
Eid Mubarak
Eid Mubarak

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মাতৃভূমি মক্কা মুকাররামাহ ত্যাগ করে মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরত করেন- তখন থেকে মুসলিমদের সংঘবদ্ধ সামাজিক জীবন শুরু হয়। এরপর থেকেই ইসলামে ঈদের সূচনা হয়। ইসলামের আবির্ভাবের আগে থেকেই মদীনাবাসীরা বছরে দু’টি নির্দিষ্ট দিনে আমোদ-প্রমোদে মেতে উঠতো। তারা বসন্ত এবং হেমন্তের পূর্ণিমার রজনীতে মিহিরজান এবং নওরোয নামে দু’টি উৎসব পালন করতো। এই উৎসব দু’টিতে যে আচার-অনুষ্ঠান হতো- তা ইসলামী শরীয়ত সমর্থিত ছিলো না।
হিজরতের পর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখলেন, মদীনাবসী বছরের দুটি নির্দিষ্ট দিনে উৎসব পালন করে। তখন তিনি এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা বললো- আমরা জাহেলি যুগ থেকেই এভাবে উৎসব পালন করে আসছি। তখন নবীজি ঘোষণা করেন- আল্লাহ তা’আলা তোমাদের এই উৎসবের পরিবর্তে অন্য দু’টি দিন তোমাদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। একটি ঈদুল ফিতর, অন্যটি ঈদুল আযহা। এভাবেই ইসলামে ঈদের সূচনা হয়।

ঈদ শব্দের অর্থ
‘ঈদ’ হচ্ছে আরবী শব্দ। এর অর্থ- উৎসব, পুনরাগমন, পুনরাবৃত্তি। আরবী ভাষাবিদগণ বলেন- আরবী عيد শব্দটি আরবী হরফ ع و د সমৃদ্ধ عود ধাতু হতে গঠিত। এর অর্থ পুনরাগমন। প্রতি বছর পর্যায়ক্রমে এই ঈদের পুনরাগমন হয় বলেই একে ঈদ বলে।

ঈদ সারা বিশ্বের মুসলিমদের ঘরে-ঘরে বয়ে আনে আনন্দের সওগাত। এই বিশ্ব চরাচরে মানুষ যে কত রকমের রয়েছে, তার কোনো সীমা পরিসীমা নেই। কেউ কালো, কেউ সাদা, কেউ তামাটে, কেউ বেঁটে কেউ লম্বা, কেউ চিকন, কেউ মোটা, কারও চুল কোঁকড়ানো, কারও সরু-মসৃণ এছাড়াও আছে কেউ মহিলা কেউ পুরুষ, কেউ শিক্ষিত, কেউ অশিক্ষিত, কেউ ধনী, কেউ গরীব, কেউ শহরবাসী, কেউ গ্রামবাসী, কেউ কৃষক, কেউ শ্রমিক, কেউ চাকুরে, কেউ ব্যবসায়ী, মোটকথা সকল মুসলিমই ঈদের আগমনে আনন্দিত হয়। সকলেই ঈদের আনন্দে শরিক হয়। কেউ হয়তো যাকাত দিতে পারে না, কিন্তু ঈদ করেনি বা ঈদের আগমনে আনন্দিত হয়নি- এমন মুসলিম বোধহয় কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই ঈদ সারা বিশ্বের মুসলিমদের সার্বজনীন উৎসব। ‘ঈদ’ শব্দ উৎসব অর্থে কুরআনেও ব্যবহৃত হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে-
قال عيسي بن مريم اللهم ربنا أنزل علينا مائدة من السماء تكون لنا عيدا لأولنا وآخرنا و آية منك- وارزقنا وأنت خير الرازقين-
অর্থঃ মরিয়মের পুত্র ঈসা আলাইহিস সালাম বললেন- হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্যে আসমান হতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করো। যা আমাদের, আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের জন্য হবে আনন্দ-উৎসবস্বরূপ এবং তোমার নিকট হতে নিদর্শন এবং আমাদের জীবিকা প্রদান করো, আর তুমিই শ্রেষ্ঠ জীবিকাদাতা। (সূরা মায়েদাহঃ আ-৭)

ইসলামে দুই ঈদঃ কখন ও কী কী?
ইসলামে দুটি দিনকে আনন্দ উদযাপন করার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। একটি ঈদুল ফিতর এবং দ্বিতীয়টি ঈদুল আযহা। ঈদুল ফিতর রমযান মাসের পর শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে এবং ঈদুল আযহা জিলহজ মাসের দশম তারিখে অনুষ্ঠিত হয়। এই দুই ঈদের দিনই মূলত মুসলিম জাতির ধর্মীয় ও জাতীয় উৎসবের দিন। এই দুই দিন ছাড়া অন্যান্য দিনে যেসব উৎসব সমাজে প্রচলিত, সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই এবং এগুলো কোনোটিই শরীয়ত সমর্থিত নয়।

হাদীসে নববীতে দুই ঈদের বর্ণনা
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
قدم النبي صلي الله عليه وسلم المدينة ولهم يومان يلعبون فيهما- فقال ما هذان اليومان؟ قالوا: كنا نلعب فيهما في الجاهلية- فقال رسول الله صلي الله عليه وسلم: قد أبدلكم الله بهما خيرا منهما يوم الأضحي ويوم الفطر-
অর্থঃ মদীনায় এসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখতে পেলেন- মদীনাবাসী বছরের দুটি নির্দিষ্ট দিনে উৎসব পালন করে। তিনি তাদেরকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন- এই বিশেষ দিনে তোমাদের আনন্দ-উল্লাসের কারণ কী? তখন মদীনার অধিবাসীগণ বললো- আমরা জাহেলি যুগে এই দুই দিনে এভাবে উৎসব পালন করতাম। (যা আজ পর্যন্ত প্রচলিত।) তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- আল্লাহ তা’আলা তোমাদের এই উৎসবের পরিবর্তে অন্য দু’টি দিন তোমাদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। একটি ঈদুল ফিতর, অন্যটি ঈদুল আযহা।
(মা’আরিফুল হাদীসঃ ৩/৩৯৮)

ঈদুল ফিতরের দিন যখন আসে, আল্লাহ তা’আলা রোযাদার লোকদের পক্ষে গর্ব করে ফিরিশতাদের বলেন- হে আমার ফিরিশতাগণ! তোমরাই বলো, কী বদলা হতে পারে সে শ্রমিকের, যে নিজের দায়িত্ব পূর্ণভাবে আদায় করেছে। ফিরিশতাগণ আরয করেন- হে মা’বুদ! উপযুক্ত বদলা হলো যথাযথ মজুরি (পারিশ্রমিক) প্রদান করা।
আল্লাহ তা’আলা বলেন- আমার বান্দা ও বান্দীগণ আমার দেওয়া কর্তব্য আদায় করে তাকবীর ধ্বনির সাথে নামায আদায় করার জন্য ঈদগাহের দিকে বের হয়েছে। আমার ইজ্জত ও বুযুর্গীর কসম, আমার দয়া, দান ও মহত্ত্বের কসম, আমি তাদের দো’আ অবশ্যই কবুল করবো।
তারপর বান্দাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা’আলা বলেন- যাও। আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম। তোমাদের মন্দগুলো পূণ্যে পরিণত করলাম। তারপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- এভাবে তারা ক্ষমার ওয়াদা পেয়ে ঘরে প্রত্যাবর্তন করে। (সুনানে বায়হাকী)
যে ব্যক্তি পাঁচটি রাত ইবাদতের মাধ্যমে জিন্দা রাখে- তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়। ৮ই জিলহজ্জের রাত, আরাফাতের রাত, ঈদুল আযহার রাত, ঈদুল ফিতরের রাত এবং ১৫ই শাবানের রাত।
(আত-তারগীব ওয়াত-তারহীবঃ হা-২৫৫)
সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
এমন কোনো দিন নেই, যে দিনে কৃত নেক আমল এসব দিন অর্থাৎ জিলহজ্জের প্রথম দশ দিনের নেক আমলের মতো আল্লাহ তা’আলার নিকট সর্বাধিক প্রিয়। সাহাবীগণ আরয করলেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের মতো (নেক) আমলও কি নয়? তিনি বললেন- না। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের মতো নেক আমলও নয়। তবে যে ব্যক্তি তার জান ও মাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় বের হলো এবং এর কোনোটা নিয়েই আর ফিরে এলো না, ওই ব্যক্তির এই আমল আল্লাহ তা’আলার কাছে অনুরূপ প্রিয়।
(সহীহুল বুখারীঃ ১/১৩২; তারগীব ওয়া তারহীবঃ হা-২৭১; সুনানে আবি দাউদঃ ২/৩৩১)

দুই ঈদের রাত্রিবেলার ফযীলত
সাহাবী আবু উমামা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
من قام ليلتي العيدين محتسبا لم يمت قلبه يوم تموت القلوب-
অর্থঃ যে ব্যক্তি সাওয়াবের আশায় দুই ঈদের রাতে ইবাদত করবে, তার অন্তর-সেদিনও (কিয়ামতের দিন) মরবে না, যেদিন অন্য সবার অন্তর মরে যাবে। (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীবঃ ২/৩৮৪)
তবে কোনো কোনো আলিমের মতে উপরোক্ত হাদীসের অর্থ হলো, দুই ঈদের রাতে ইবাদতকারীর অন্তর দুনিয়ার মোহে পড়ে অন্ধ হবে না। এটাই মূলত অন্তরের মৃত্যু। এছাড়া ওই ব্যক্তি অপমৃত্যু থেকে নিরাপদ থাকবে। সুতরাং দুই ঈদের রাতে ইবাদত করা মুস্তাহাব। (ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়াহঃ ২/৩৩৫)

ঈদুল ফিতরের সুন্নাত
১. শরীয়তসম্মত সাজ-সজ্জা অবলম্বন করা।
২. গোসল করা।
৩. মিসওয়াক করা।
৪. উত্তম পোশাক পরিধান করা।
৫. সুগন্ধি ব্যবহার করা।
৬. খুব ভোরে জাগ্রত হওয়া।
৭. সকালে ঈদগাহে গমন করা।
৮. ঈদগাহে যাওয়ার আগে বে-জোড় সংখ্যক খোরমা-খেজুর কিংবা মিষ্টি জাতীয় কিছু খাওয়া।
৯. ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার আগে সাদকাতুল ফিতরা আদায় করা।
১০. ঈদের সালাত ঈদগাহে আদায় করা।
১১. ঈদের সালাতের জন্য ঈদগাহে এক পথে যাওয়া আর অন্য পথে ফিরে আসা।
১২. পায়ে হেঁটে ঈদগাহে গমন করা।
১৩. মৃদুস্বরে তাকবীর বলতে বলতে চলা-
الله أكبر الله أكبر- لا إله إلا الله والله أكبر الله أكبر ولله الحمد-

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.