ইসলামে কুরবানীর গুরুত্ব ও বিধান

0
475
Colective Qubani
Colective Qubani

কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। শরীয়তের বিধান অনুযায়ী প্রত্যেক সামর্থ্যবান নর-নারীর ওপর কুরবানী ওয়াজিব। এটি মৌলিক ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। আদম আলাইহিস সালাম থেকে সকল যুগে কুরবানী ছিলো। তবে তা আদায়ের পন্থা এক ছিলো না। শরীয়তে মুহাম্মাদীর কুরবানী মিল্লাতে ইবরাহীমীর সুন্নত। সেখান থেকেই এসেছে এই কুরবানী। এটি শা’আইরে ইসলাম তথা ইসলামের প্রতীকি বিধানাবলীর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং এর মাধ্যমে শা’আইরে ইসলামের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূলের শর্তহীন আনুগত্যের শিক্ষা রয়েছে কুরবানীতে।

কুরআন ও হাদীসে কুরবানীর বর্ণনা
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন- فصل لربك وانحر-
অর্থঃ অতএব আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামায পড়–ন এবং কুরবানী আদায় করুন। (সূরা কাউসার-২)
قل إن صلاتي ونسكي ومحياي ومماتي لله رب العالمين-
অর্থঃ (হে রাসূল!) আপনি বলুন- আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ (অর্থাৎ আমার সবকিছু) আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য উৎসর্গিত। (সূরা-আনআম-১৬২)
لن ينال الله لحومها ولا دمائها ولكن يناله التقوي منكم-
অর্থঃ (মনে রেখো, কুরবানীর পশুর) গোশত অথবা রক্ত আল্লাহর কাছে কখনোই পৌঁছে না; বরং তাঁর কাছে কেবলমাত্র তোমাদের পরহেযগারীই পৌঁছে। (সূরা-হজ্জ-৩৭)

হাদীসের বর্ণনায় কুরবানী
সাহাবী আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, কুরবানীর গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
من وجد سعة لأن يضحي فلم يضح- فلا يقربن مصلانا-
অর্থঃ যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী করলো না, সে যেনো আমাদের ঈদগাহে না আসে।
(মুসনাদে আহমদঃ ২/৩২১; মুস্তাদরাকে হাকেমঃ হা-৭৬৩৯; আত্-তারগীব ওয়াত-তারহীবঃ ২/১৫৫)
সাহাবী ইবনে ওমর রাযি. বলেন- أقام رسول الله صلي الله عليه وسلم بالمدينة عشر سنين يضحي-
অর্থঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনা মুনাওয়ারায় দশ বছরের জীবনে প্রতি বছর কুরবানী করেছেন। (সুনানে তিরমিযীঃ ১/১৮১)

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, কুরবানীর ফযীতৈ সম্পর্কে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
ما عمل آدمي من عمل يوم النحر أحب إلي الله من إهراق الدم- إنه ليأتي يوم القيامة بقرونها وأشعارها وأظلافها- وإن الدم ليقع من الله بمكان قبل أن يقع من الأرض- فطيبوا بها نفسا-
কুরবানীর দিনের আমলসমূহের মধ্য থেকে পশু কুরবানী করার চেয়ে কোনো আমল আল্লাহ তা’আলার নিকট অধিক প্রিয় নয়। কিয়ামতের দিন এই কুরবানীকে তার শিং, পশম ও ক্ষুরসহ উপস্থিত করা হবে। আর কুরবানীর রক্ত যমীনে পড়ার আগেই আল্লাহ তা’আলার নিকট কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে কুরবানী করো। (সুনানে তিরমিযীঃ হা-১৪৯৩)
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাযি. বলেন- قلت يا رسول الله! أستدين وأضحي؟ قال: نعم- فإنه دين مقضي-
আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম- আমি ঋণ করে কুরবানী করবো কি না? নবীজি বললেন- হ্যাঁ, করো। আল্লাহ তা’আলা তোমার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দিবেন। (দারা কুতনীঃ হা-৪৭১০)

সাহাবী যায়েদ বিন আকরাম রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
قال أصحاب رسول الله صلي الله عليه وسلم: يا رسول الله ما هذه الأضاحي؟ قال سنة أبيكم- قالوا فما لنا فيها يا رسول الله قال: بكل شعرة حسنة- قالوا فالصوف يا رسول الله؟ قال: بكل شعرة من الصوف حسنة-
সাহবায়ে কেরাম নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই কুরবানী প্রথাটা কী? তিনি ইরশাদ করেন- এটা তোমাদের পিতা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সুন্নাত। সাহাবায়ে কেরাম পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! এতে আমাদের লাভ কী?
তখন নবীজি বলেন- কুরবানীর পশুর প্রত্যেকটা চুলের পরিবর্তে একটি করে নেকী পাওয়া যাবে। সাহাবায়ে কেরাম আবার জিজ্ঞাসা করলেন, যে সমস্ত পশুর মধ্যে পশম রয়েছে- ওগুলোর মধ্যে কি সাওয়াব হবে? তিনি বললেন- ওগুলোতেও প্রতিটি পশমের বদলে একটি করে নেকী পাওয়া যাবে।
(সুনানে ইবনে মাজাঃ ২/২২৬, তারগীবঃ ২৫৫, মিশকাতঃ ১/১২৯)

সাহাবী আবু সাঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
قال رسول الله صلي الله عليه وسلم: يا فاطمة! قومي إلي أضحيتك فاشهديها- فإن لك بأول قطرة تقطر من دمها أن يغفر لك ما سلف من ذنوبك قالت: يا رسول الله! لنا خاصة أهل البيت أو لنا وللمسلمين؟ قال: بل لنا وللمسلمين-
একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফাতেমা রাযি.-কে ডেকে ইরশাদ করেন- হে ফাতেমা! তুমি তোমার কুরবানীর পশুর নিকট যাও। কেননা, কুরবানীর পশু যবেহ করার পর রক্তের প্রথম ফোঁটা মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তোমার যাবতীয় গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। ফাতেমা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটা কি শুধু আমার জন্য? নবীজি বললেন- এটা আমাদের জন্যে এবং সকল মুসলিমের জন্যে। (আত-তারগীব- মুনযারিঃ ২৫৬)
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- عظموا ضحاياكم- فإنها علي الصراط مطاياكم-
তোমরা মোটাতাজা পশু কুরবানী করো। কারণ এটা পুলসিরাতে তোমাদের সাওয়ারি হবে। (বাদায়েউস সানায়েঃ ৫/৮০)
অন্য স্থানে বর্ণিত হয়েছে-
قال الرجل: أرأيت إن لم أجد إلا منيحة أنثي أفأضحي بها؟ قال: لا ولكن تأخذ من شعرك وأظفارك وتقص شاربك وتحلق عانتك فتلك تمام أضحيتك عند الله-
এক সাহাবী নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! এক ব্যক্তি দুধ খাওয়ার জন্যে আমাকে একটি উট দিয়েছে। আমি কি তা দ্বারা কুরবানী করবো? নবীজি তাঁকে নিষেধ করলেন এবং বললেন, তবে তুমি নখ, চুল ইত্যাদি কাটো। এটাও তোমার জন্য আল্লাহর দরবারে পূর্ণ কুরবানী। এ বলে নবীজি ওই গরীব সাহাবীকে সুসংবাদ দিলেন। (সুনানে আবি দাউদঃ ২/৩৮৫; সুনানে নাসায়ীঃ ২/১৭৯; সুনানে দারা কুতনীঃ ৪/২০২)

এছাড়া হাদীসের গ্রন্থসমূহে কুরবানীর ফাযায়েল সম্পর্কিত অনেক হাদীস রয়েছে। সব এখানে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। বলাবাহুল্য, ইবাদতের মূল কথা হলো আল্লাহ তা’আলার আনুগত্য এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই যে কোনো ইবাদতের পূর্ণতার জন্য দুটি বিষয় জরুরি। ইখলাস তথা একমাত্র আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পালন করা এবং শরীয়তের নির্দেশনা মোতাবেক তা সম্পাদন করা।
উপরোক্ত বর্ণিত এ সমস্ত ফযীলত ওই সময় অর্জিত হতে পারে- যখন কুরবানী শরীয়ত অনুযায়ী সম্পন্ন হয়। অন্যথায় সাওয়াবের আশা করা কল্পনাতীত। অতএব, এ অসংখ্য সাওয়াব হাসিলের লক্ষ্যে কুরবানীর মাসায়েল ও আহ্কাম সম্পর্কে ভালোভাবে জ্ঞান অর্জন করে সে অনুযায়ী কুরবানী করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য কর্তব্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.