ইসলামে সিয়াম ও রমযানঃ পরিচয় ও বিধান

0
311
Ramadan Kareem
Ramadan Kareem

সিয়াম ইসলামের পাঁচ বুনিয়াদের অন্যতম একটা বুনিয়াদ। প্রত্যেক বালেগ মুকীম ও মুমিনের ওপর পুরো রমযান মাসে প্রতিদিন সিয়াম রাখা ফরয। এর বিধানকে অবজ্ঞাকারী কিংবা অস্বীকারকারী ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়। আর সিয়াম ফরয হওয়া সত্ত্বেও যে তা আদায় করে না, সে মারাত্মক গোনাহ্গার ও ফাসেক সাব্যস্ত হয়। এই সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَي الِّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ-

অর্থঃ হে মুমনি সকল! তোমাদের ওপর রমযানের সিয়াম ফরয করা হলো, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীগণের ওপর সিয়াম ফরয করা হয়েছিলো। যেনো তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।

(সূরা বাকারা-১৮৩)

ramadan kareem
ramadan kareem

হাদীসে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-

مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيْمَانًا وَاِحْتِسَابًا- غُفِرَلَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِه-

অর্থঃ যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় রমযানের সিয়াম রাখে, আল্লাহ তা’আলা তার অতীতের সমস্ত গোনাহ মাফ করে দেন।

(সহীহুল বুখারীঃ হা-১৯০১)

এছাড়া বছরের অন্যান্য দিনেও সিয়াম রাখা যায়। তবে সেগুলো নফলের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু যদি কেউ রমযান ছাড়া অন্য কোনো সময়ে সিয়াম রাখার মান্নত করে, তাহলে ওই সিয়াম রাখা মান্নতের বিধান অনুসারে তার ওপর ওয়াজিব হবে। উল্লেখ্য, পুরো বছরের মোট পাঁচ দিনে সিয়াম রাখা হারাম। সেই দিনগুলো হলো বছরের দুই ঈদের দিন এবং জিলহজ্জ মাসের ১১, ১২ এবং ১৩ তারিখ। সিয়ামের সময় সুবহে সাদিক থেকে নিয়ে সূর্য অস্ত যাওয়ার আগ পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে পানাহার এবং যৌনতা থেকে বিরত থাকাকে সিয়াম বলে।

পূর্ববর্তী যুগে সিয়াম সাধনা

মানুষের কামরিপু দমন করে ধৈর্য্য, আত্মত্যাগ ও সংযম অনুশীলনের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন করার লক্ষ্যে আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক নবী-রাসূল ও তাঁদের উম্মতগণের ওপর সিয়াম ফরয করেছিলেন। আগের উম্মতের ওপর বিভিন্ন যুগে সিয়াম ফরয ছিলো বটে, তবে এর পদ্ধতি কিংবা মেয়াদ সর্বযুগে একই রকম ছিলো না। বিধর্মী গোষ্ঠীর মধ্যেও উপবাসের প্রচলন রয়েছে। সে ধারাবাহিকতায় শেষ নবীর উম্মতের ওপরও সিয়াম ফরয করে এর পরিপূর্ণতা ঘোষণা করা হয়। আল্লামা আলুসী রহ. লিখেছেন-
কুরআনের আয়াতে তোমাদের পূর্ববর্তী” বলে নবী আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে ঈসা আলাইহিস সালাম পর্যন্ত সকল যুগের মানুষকে বুঝানো হয়েছে। (তাফসীরে রুহুল মা’আনী)
নবী আদম আলাইহিস সালামের যুগে সিয়ামের ধরণ কেমন ছিলো- তা সঠিক জানা যায় না। তবে আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. বলেন-
ইসলামের প্রাথমিক যুগে প্রতি মাসে তিনদিন করে সিয়াম রাখার প্রচলন ছিলো। পরবর্তীতে রমযানের সিয়াম ফরয হলে তা রহিত হয়ে যায়। সাহাবী মু’আয রাযি., সাহাবী ইবনে মাসউদ রাযি., সাহাবী ইবনে আব্বাস রাযি., তাবেয়ী আতা রহ., কাতাদা রহ. এবং যাহহাক রহ.-এর মতে প্রতি মাসে তিনদিন সিয়াম রাখার বিধান আল্লাহর নবী নুহ আলাইহিস সালামের যুগ থেকে শুরু করে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত কার্যকর ছিলো। পরে আল্লাহ তা’আলা রমযানের সিয়াম ফরয করে ওই বিধান রহিত করে দেন।

(তাফসীরে ইবনে কাসীর)

নবীজির রমযানের প্রস্তুতি

রমযান মাসের প্রতিটি মুহুর্ত প্রতিটি সময় অনেক অনেক দামী। আল্লাহ তা’আলার অফুরন্ত অসীম কল্যাণ ও বরকতের ভান্ডার থেকে সবকিছু এ মাসে অবারিত করে খুলে দেওয়া হয়। বছরের অন্যান্য সময়ের পাপ-পঙ্কিলতা ও শরীর-মনের যাবতীয় অপবিত্রতা থেকে মুক্ত ঝরঝরে হয়ে যাওয়ার জন্য রমযান এক সুবর্ণ সুযোগ। আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে মাগফিরাতের দরজা সরাসরি উম্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
এ কারণেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমযান কাছাকাছি এসে পড়লে কেমন যেনো অন্যমনস্ক হয়ে যেতেন।

মাগফিরাত ও কল্যাণ এবং সবকিছু নতুন করে শুরু করার জন্য রমযান পেতে তিনি উদগ্রীব হয়ে পড়তেন। দুই মাস আগে থেকেই রজব মাস শুরু হলেই তিনি এ দো’আ শুরু করতেন-

اللهم بارك لنا في رجب وشعبان، وبلغنا رمضان.

অর্থঃ হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসে বরকত দান করুন এবং রমযান পর্যন্ত আমাদেরকে পৌছিয়ে দিন। (মুসনাদে আহমাদ (যাওয়ায়েদ)ঃ ১/২৫৯)

কুরআনের বর্ণনায় রমযান ও সিয়াম

রমযান আরবী বছরের ৯ম মাস। হিজরী সনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং মহিমান্বিত মাস এই রমযানুল মুবারক। পুরো রমযানব্যাপী রোযা রাখা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরয। রমযানে রোযা রাখা ইসলামের তৃতীয় বুনিয়াদ। এ মাসে রাতে তারাবীহর নামায পড়া এবং তারাবীহর নামাযে কুরআন খতম করা সুন্নাত। এছাড়া এ রমযানেই কুরআন নাযিল হয়।

Ramadan in Quranil Kareem 2
شهر رمضان

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ –

অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যে রকম ফরয করা হয়েছিলো তোমাদের আগের সম্প্রদায়ের লোকদের ওপর। যাতে তোমরা পরহেযগারি অর্জন করতে পারো।

أَيَّامًا مَّعْدُودَاتٍ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ فَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ وَأَن تَصُومُوا خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ –

অর্থঃ নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য সিয়াম ফরয হয়েছে। তবে তোমাদের মধ্যে যারা অসুস্থ হবে কিংবা সফরে থাকবে, সে অন্য সময়ে সিয়াম পূর্ণ করে নিবে। আর যাদের জন্য সিয়াম রাখা একেবারেই কষ্টকর, তারা সিয়ামের পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্য প্রদান করবে। যে ব্যক্তি আনন্দের সাথে সৎ কর্ম সম্পাদন করে, তা তার জন্য কল্যাণকর সাব্যস্ত হয়। তবে এরপরেও সিয়াম রাখলে তা আরো অধিকতর কল্যাণকর। যদি তোমরা তা বুঝতে পারো।

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ وَلِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ –

অর্থঃ এ হলো রমযান মাস, যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে- যা মানুষের জন্য হিদায়াতের পথ দেখায় এবং এই কুরআন এমন স্পষ্ট নিদর্শনাবলী সম্বলিত, যা সত্য ও মিথ্যার মাঝে চুড়ান্ত ফয়সালা করে দেয়। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে এ রমযান মাস পাবে, সে যেনো এ মাসে সিয়াম রাখে।
তবে তোমাদের মধ্যে যারা অসুস্থ হবে কিংবা সফরে থাকবে, সে অন্য সময়ে সিয়াম পূর্ণ করে নিবে। আল্লাহ তা’আলা তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তিনি তোমাদের জন্য কঠোরতা কামনা করেন না। যাতে তোমরা সিয়াম গণনা করে পূর্ণ করতে পারো এবং তিনি তোমাদেরকে হিদায়াত করার কারণে তোমরা তার বড়ত্ব বর্ণনা করতে পারো। এর সাথে সাথে তাঁর শুকরিয়াও আদায় করো।

أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلَىٰ نِسَائِكُمْ هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ عَلِمَ اللَّهُ أَنَّكُمْ كُنتُمْ تَخْتَانُونَ أَنفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَعَفَا عَنكُمْ فَالْآنَ بَاشِرُوهُنَّ وَابْتَغُوا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ وَلَا تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَقْرَبُوهَا كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ

অর্থঃ রমযানের রাতে তোমাদের জন্য স্ত্রীর সাথে সহবাস করা হালাল করা হলো। তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ। আল্লাহ তা’আলা জানেন যে, তোমরা নিজেদের ওপর খিয়ানত করে ফেলেছিলে। এখন তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়ে তোমাদেরকে অব্যাহতি প্রদান করেছেন।
সুতরাং তোমরা স্ত্রীগণের সাথে সহবাস করে আল্লাহ তা’আলার দেওয়া রিযিক আহরণ করে নাও। আর তোমরা রাতের কালো রেখা থেকে সুবহে সাদিকের সাদা রেখা পরিস্কার হওয়ার আগ পর্যন্ত পানাহার করতে পারো। এরপর সিয়াম পূর্ণ করো রাত পর্যন্ত। আর তোমরা মসজিদ সমূহে ইতিকাফ করাবস্থায় স্ত্রীগণের সাথে সহবাস করো না। এটা হলো আল্লাহ তা’আলার নির্ধারিত সীমারেখা; এর কাছে যেও না। আল্লাহ তা’আলা এভাবেই আয়াত সমূহ বর্ণনা করেন মানুষের জন্য, যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করতে পারে।

(সূরা বাকারাহ-১৮৩, ১৮৪, ১৮৫, ১৮৭)

সিয়াম সম্পর্কে কুরআনে এ চারটি আয়াত নাযিল হয়েছে। সিয়াম শব্দটি আরবী। এর অর্থ বিরত থাকা। শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে তাঁরই বিধান অনুযায়ী সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব রকমের পানাহার ও কামাচার থেকে বিরত থাকাকে সিয়াম বলা হয়।

হাদীসের বর্ণনায় মহিমান্বিত রমযান

রমযান সম্পর্কে হাদীসে নববীতে বিভিন্ন সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে, যা আগের কোনো উম্মতকে প্রদান করা হয়নি। সাহাবী সালমান ফারেসী রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাসের শেষ তারিখে আমাদেরকে ইরশাদ করেন-
তোমাদের মাথার ওপর এমন একটি মর্যাদাশীল বরকতময় মাস ছায়াস্বরূপ আসছে, যে মাসে লাইলাতুল কদর নামে একটি রাত আছে। এ রাতটি হাজার মাস থেকেও উত্তম। এ মাসে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের ওপর সিয়াম ফরয করেছেন এবং রাত্রি জাগরণ অর্থাৎ তারাবীহ আদায় করাকে তোমাদের জন্য পুণ্যের কাজ করে দিয়েছেন।
যে ব্যক্তি এ মাসে একটি নফল আদায় করলো, সে যেনো রমযানের বাইরে একটি ফরয আদায় করার সমতুল্য সাওয়াব অর্জন করলো। আর যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরয আদায় করলো, সে যেনো রমযানের বাইরে সত্তরটি ফরয আদায় করার সমতুল্য সাওয়াব অর্জন করলো।

তিনি আরো ইরশাদ করেন-
এ রমযান মাস ধৈর্য্য ধারণ করার মাস এবং এই ধৈর্য্য ধারণের বিনিময়ে আল্লাহ তা’আলা জান্নাত রেখেছেন। এ মাস মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করার মাস। এ মাসে মুমিন লোকের রিযিক বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। যে ব্যক্তি কোনো সিয়াম আদায়কারীকে ইফতারি করাবে, এটা তার জন্য মাগফিরাত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের কারণ হবে এবং সে উক্ত সিয়াম আদায়কারীর সাওয়াবের সমপরিমাণ সাওয়াব অর্জন করবে অথচ এ কারণে উক্ত সিয়াম আদায়কারীর সাওয়াব বিন্দু পরিমাণও কমবে না।
সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন- আমাদের অনেকেরই তো এমন সামর্থ নেই যে, কাউকে ইফতারি করাবো? নবীজি বললেন- কাউকে ইফতারি করানোর জন্য পেট ভরে খাওয়ানোর জন্য প্রয়োজন নেই। এক টুকরা খেজুর দিয়ে ইফতারি করালেও সে উক্ত সাওয়াবের অধিকারী হবে।

r 2 2
Iftari in Ramadan

তিনি আরো ইরশাদ করেন-
রমযান এমন এক মাস, যে মাসের প্রথম অংশে রহমত অবতীর্ণ হয়। দ্বিতীয় অংশে মাগফিরাত এবং শেষ অংশে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। যে ব্যক্তি রমযান মাসে তার কর্মচারীদের কাজের চাপ হালকা করে দেয়, আল্লাহ তা’আলা তাকে ক্ষমা করে দিবেন এবং জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি প্রদান করবেন।
তিনি আরো ইরশাদ করেন-
রমযান মাসে তোমরা চার কাজ বেশি বেশি করবে। প্রথম দুই কাজ একমাত্র আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য এবং পরের দুই কাজ এমন, যা না করে তোমাদের উপায় নেই। প্রথম দুটি কাজ হলো- কালিামা তাইয়্যেবাহ বেশি বেশি পড়া এবং ইসতিগফার করা। পরের দুটি কাজ হলো- জান্নাত লাভ করার জন্য প্রার্থনা করা এবং জাহান্নাম থেকে রেহাই চাওয়া।
যে ব্যক্তি এই রমযান মাসে কোনো সিয়াম আদায়কারীকে পানি পান করাবে, আল্লাহ তা’আলা তাকে কিয়ামতের দিবসে আমার হাইযে কাওসার থেকে এমন পানি পান করাবেন, যা পান করার পর জান্নাতে প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত আর পিপাসা লাগবে না।

(সহীহ ইবনে খুযাইমাহ; বায়হাকী- শু’আবুল ঈমান)

সাহাবী আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
রমযান উপলক্ষে আমার উম্মতকে এমন পাঁচটি বৈশিষ্ট্য দেওয়া হয়েছে, যা আগের কোনো উম্মতকে দেওয়া হয়নি।

এক. সিয়াম আদায়কারীর মুখের গন্ধ আল্লাহ তা’আলার নিকট মৃগনাভীর থেকেও উত্তম।
দুই. সমুদ্রের মাছ সিয়াম আদায়কারীর জন্য দো’আ করে।
তিন. জান্নাতকে প্রতিদিন সিয়াম আদায়কারীর জন্য সুসজ্জিত করা হয়। তখন আল্লাহ তা’আলা বলতে থাকেন- আমার বান্দাগণ খুবই দ্রুত পৃথিবীর কষ্ট-যাতনা দুরে নিক্ষেপ করে তোমার নিকট চলে আসবে।
চার. রমযান মাসে দুর্বত্ত শয়তানকে শৃংখল দিয়ে বেঁধে আটকে রাখা হয়। যার ফলে শয়তান মানুষকে ওই সমস্ত পাপাচারিতা করার জন্য প্ররোচনা দিতে পারে না, যা রমযানের বাইরে করে থাকে।
পাঁচ. শেষ রাতে সিয়াম আদায়কারীর সর্বপ্রকার গোনাহ মাফ হয়ে যায়।
সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন- এই ক্ষমা কি লাইলাতুল কদরে হয়ে থাকে? নবীজি বললেন- না; বরং নিয়ম হলো- শ্রমিক কাজ শেষ করার পর তার পারিশ্রমিক লাভ করে থাকে।

(মুসনাদে আহমাদ; মুসনাদে বাযযার; বায়হাকী)

রমযানে সিয়াম সাধনার বাস্তব অনুশীলন ও এর মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি যে মাত্রায় অর্জিত হবে, আল্লাহ তা’আলার কাছে এর পুরস্কারও তত মাত্রায় উন্নত ও মহামূল্যবান বলে বিবেচিত হবে। এ কারণে আল্লাহ তা’আলা নিজে হাদীসে কুদসীতে বলেন-
এ সিয়াম একমাত্র আমার জন্যই। আমি আমার সিয়াম আদায়কারী বান্দাকে নিজ হাতে পুরস্কার প্রদান করবো।

রমযানে তারাবীহ আদায়

রমযানে এশার সালাত আদায় করার পরে বিশ রাকাত তারাবীহ জামাতের সাথে আদায় করা সুন্নাত। পুরো রমযান মাসে এ তারাবীহ সালাতে কুরআন খতম করা স্বতন্ত্র সুন্নাত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে তারাবীহ সালাত আদায় করেছেন। তবে উম্মাহর ওপর এ সালাত ফরয হয়ে যাওয়ার আশংকায় মাঝে মাঝে তিনি তারাবীহ আদায় করা ছেড়ে দিয়েছেন।
কারণ নবীজির নিয়মিত কোনো আমল উম্মতের ওপর ওয়াজিব বলে গণ্য হতো। এ প্রসঙ্গে তিনি ইরশাদ করেন- আমার ভয় হয় যে, আমার উম্মতের ওপর তারাবীহ ফরয হয়ে যায় কিনা।
অবশ্য নবীজির সাহাবীগণ নিয়মিত তারাবীহ আদায় করেছেন। নববী ও ইসলামের প্রথম যুগে মদীনা মুনাওয়ারার বিভিন্ন স্থানে তারাবীহর জামাত হতো। পরবর্তীতে ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা ওমর ইবনুল খাত্তাব রাযি.-এর যুগে সম্মিলিতভাবে জামাতের সাথে বিশ রাকাআত তারাবীহ আদায় করার ব্যাপারে উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

xthumbnail outlines.png.pagespeed.ic .053D6GWr6a
صلاة التراويح

হাদীসের বর্ণনায় তারাবীহ আদায়

তারাবীহ সম্পর্কে হাদীসে সাহাবী সালমান ফারেসী রাযি. সূত্রে বর্ণিত হয়েছে-
এ মাসে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের ওপর সিয়াম ফরয করেছেন এবং রাত্রি জাগরণ অর্থাৎ তারাবীহ আদায় করাকে তোমাদের জন্য পুণ্যের কাজ করে দিয়েছেন। (সহীহ ইবনে খুযাইমাহ; বায়হাকী- শু’আবুল ঈমান)

সিয়ামের নিয়ত

রমযানের সিয়ামের নিয়ত করা ফরয। এক্ষেত্রে প্রতি সিয়ামের জন্য সুবহে সাদিকের আগে অথবা দ্বিপ্রহরের আগে আগে এই নিয়ত করা যে, আমি সিয়াম আজ রাখছি অথবা সিয়াম রাখলাম। দ্বিপ্রহরের সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেলে নিয়ত হবে না। আর নিয়ত না হলে সিয়ামও আদায় হবে না। তবে নফল সিয়ামের নিয়ত দিনের যে কোনো সময়েই করা যায়।

সাহরী ও ইফতার

সিয়ামদারের জন্য সাহরী ও ইফতার করা সুন্নাত। সুবহে সাদিকের আগে সিয়াম রাখার নিয়তে কিছু খাওয়াকে সাহরী বলে। সাহরীর শেষ সময় সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত। বিশেষ কিছু না পেলেও সাধারণ খাবার অথবা সামান্য পানি পান করলেও সাহরীর সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে।
অপরদিকে সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে কোনো কিছু খেয়ে সিয়াম শেষ করাকে ইফতার বলে। খুরমা কিংবা খেজুর দ্বারা ইফতার করা সুন্নাত। তা না পেলে পানি দ্বারা ইফতার করবে। ইফতারের কিছুক্ষণ আগে নিম্নোক্ত দো’আ বেশি বেশি পড়বে- يَا وَاسِعَ الْفَضْلِ اِغْفِرْلِيْ-
অর্থঃ হে মহাক্ষমাশীল! আমাকে ক্ষমা করুন। (শু’আবুল ঈমান-বায়হাকীঃ ৩/৪০৭)

এরপর এই দো’আ পড়ে ইফতার শুরু করবে-

اَللّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ وَعَلي رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ-

অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি আপনারই জন্য সিয়াম রেখেছি। আপনারই ওপর ঈমান এনেছি এবং আপনারই ওপর ভরসা করেছি। আর আপনারই দেওয়া রিযিক দ্বারা ইফতার করছি।

(সুনানে আবি দাউদঃ ১/৩২২)

Dua for breaking Fast 2
Dua for breaking Fast

ইফতারীর দাওয়াত খেলে মেজবানের উদ্দেশ্যে এই দো’আ পড়বে-

أَفْطَرَ عِنْدَكُمُ الصَّائِمُوْنَ- أَكَلَ طَعَامَكُمُ الْأَبْرَارُ- وَصَلَّتْ عَلَيْكُمُ الْمَلَائِكَةُ-

অর্থঃ আপনার বাড়িতে যেনো সিয়ামদারগণ ইফতার করেন এবং নেক লোকেরা যেনো আপনার খাবার খান। আর ফিরিশতাগণ যেনো আপনার ওপর রহমতের দো’আ করেন।

(আস-সুনানুল কুবরা লিন-নাসাঈঃ ৬/৮১; ইবনুস সুন্নীঃ ৪৩৩)

সিয়ামের ফরয

সিয়ামের ফরয একটি। তা হলো নিয়ত করা। রমযানের প্রতিটি সিয়ামের জন্য আলাদাভাবে সুবহে সাদিকের আগে অথবা দ্বিপ্রহরের আগে আগে নিয়ত করতে হবে। অন্যথায় সিয়াম আদায় হবে না।

সিয়ামেরর সুন্নাত সমূহ

 রমযানের চাঁদ দেখে সিয়াম রাখা। শাওয়ালের চাঁদ দেখে সিয়াম ভঙ্গ করা। (সুনানে ইবনে মাজাহঃ হা-১৬৫৪)
 সাহরী খাওয়া। (মুসনাদে আহমাদ)
 সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করা। (সহীহুল বুখারীঃ হা-২৫৩)
 খেজুর কিংবা খুরমা অথব পানি দিয়ে ইফতার করা। (সুনানে ইবনে মাজাহঃ হা-১৬৮৯)
 ইফতার করার সময় এই দো’আ পড়া-
اَللّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ وَعَلي رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ-
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি আপনারই জন্য সিয়াম রেখেছি। আপনারই ওপর ঈমান এনেছি এবং আপনারই ওপর ভরসা করেছি। আর আপনারই দেওয়া রিযিক দ্বারা ইফতার করছি। (সুনানে আবি দাউদঃ ১/৩২২)
 ইফতারীর দাওয়াত খেলে মেজবানের উদ্দেশ্যে এই দো’আ পড়া-
أَفْطَرَ عِنْدَكُمُ الصَّائِمُوْنَ- أَكَلَ طَعَامَكُمُ الْأَبْرَارُ- وَصَلَّتْ عَلَيْكُمُ الْمَلَائِكَةُ-
অর্থঃ আপনার বাড়িতে যেনো সিয়ামদারগণ ইফতার করেন এবং নেক লোকেরা যেনো আপনার খাবার খান। আর ফিরিশতাগণ যেনো আপনার ওপর রহমতের দো’আ করেন।
(আস-সুনানুল কুবরা লিন-নাসাঈঃ ৬/৮১; ইবনুস সুন্নীঃ ৪৩৩)
 পূর্ণ রমযান মাসে তারাবীহর বিশ রাকাত নামায আদায় করা।
(তাবারানী)
 তারাবীহ নামাযে পূর্ণ কুরআন একবার তিলাওয়াত করা অথবা শোনা।
 তারাবীহ নামায জামাতে আদায় করা।
 রমযানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করা।

যেসব দিনে সিয়াম রাখা সুন্নাত

 মুহাররমের দশ তারিখে তথা আশুরার দিনে সিয়াম রাখা। (সুনানে ইবনে মাজাহঃ হা-১৭৩৩)
 শাবান মাসের ১৫ তারিখে সিয়াম রাখা।
 শাওয়াল মাসে ৬ সিয়াম রাখা। (সুনানে ইবনে মাজাহঃ হা-১৭১৬)
 জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকে সিয়াম রাখা।
(সুনানে ইবনে মাজাহঃ হা-১৭২৮)
 আরাফার দিনে। (সুনানে ইবনে মাজাহঃ হা-১৭১৩১)
 প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে।
(সুনানে ইবনে মাজাহঃ হা-১৭০৭)
 সোম ও বৃহস্পতির দিনে সিয়াম রাখা।

যেসব দিনে সিয়াম রাখা নিষেধ

 শুধুমাত্র জুমু’আর দিনে। (সুনানে ইবনে মাজাহঃ হা-১৭২৩)
 আইয়ামে তাশরীকের দিনগুলোতে। অর্থাৎ জিলহজ্জ মাসের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখে। (সুনানে ইবনে মাজাহঃ হা-১৭১৯)
 উভয় ঈদের দিনে। (সুনানে ইবনে মাজাহঃ হা-১৭২২)
 শুধু শনিবার দিনে। (সুনানে ইবনে মাজাহঃ হা-১৭২৬)

কী কী কারণে সিয়াম ভঙ্গ হয় না?

 ভুলক্রমে পানাহার করা।
 আতর সুগন্ধি ব্যবহার করা।
 ফুল কিংবা অন্য সুগন্ধিযুক্ত বস্তুর ঘ্রাণ নেওয়া।
 নিজ মুখের থুথু বা কফ জমা না করে গিলে ফেলা।
 শরীর বা মাথায় তৈল ব্যবহার করা।
 ঠান্ডার জন্য গোসল করা।
 ঘুমের মধ্যে স্বপ্নদোষ হওয়া।
 মিসওয়াক করা।
 অনিচ্ছাকৃত বমি হওয়া।
 শরীর থেকে রক্ত বের হওয়া।
 চোখে ঔষধ অথবা সুরমা ব্যবহার করা।
 যে কোনো ধরণের ইনজেকশন নেওয়া।

(রদ্দুল মুহতার ও দুররুল মুখতারঃ ২/৩৯৪)

সিয়াম মাকরূহ হওয়ার কারণসমূহ

 মিথ্যা কথা বলা।
 গীবত বা চোগলখুরি করা।
 ঝগড়া বিবাদ বা হানাহানি করা।
 সিনেমা দেখা অথবা অন্য কোনো কবীরা গোনাহ করা।
 সকাল বেলায় নাপাক অবস্থায় থাকা।
 সিয়ামের কারণে অস্থিরতা বা কাতরতা প্রকাশ করা।
 কয়লা, মাজন, টুথ পাউডার, টুথপেষ্ট অথবা গুল দিয়ে দাঁত মাজা।
 অনর্থক কোনো জিনিস মুখে দিয়ে রাখা।
 অনর্থক কোনো জিনিস চর্বন করা।
 কুলি করার সময় গড়গড়া করা।
 নাকের ভিতর পানি টেনে নেওয়া (উক্ত পানি গলায় পৌঁছলে রোযা ভেঙ্গে যাবে)।
 ইচ্ছাকৃতভাবে মুখে থুথু জমা করে গিলে ফেলা।
 ইচ্ছাকৃতভাবে অল্প বমি করা।

(দুররুল মুখতারঃ ২/৪১৬; বাদায়েউস সানায়েঃ ২/৬৩৫; কিতাবুল ফিকাহঃ ১/৯২৩)

সিয়াম ভঙ্গের কারণসমূহ
যেসব কারণে সিয়াম ভঙ্গ হয়- এগুলোর মধ্য থেকে কোনোটির কারণে পরবর্তীতে শুধু সিয়াম কাযা আদায় করতে হবে, কাফ্ফারাহ দেওয়া লাগবে না। আবার এমন কিছু বিষয় আছে- যেগুলোর কারণে সিয়াম কাযা আদায় করতে হবে এবং এর সাথে কাফ্ফারাহও দেওয়া ওয়াজিব হয়। এখানে প্রথমে যেসব কারণে সিয়াম ভঙ্গ হলে শুধু সিয়াম কাযা আদায় করতে হবে, কিন্তু কাফ্ফারাহ দেওয়া লাগবে না- সেগুলো উল্লেখ করা হলো-
— কুলি করার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে হঠাৎ পানি গলার ভিতর চলে যাওয়া।
— নাকে বা মাথার ভিতর ঔষধ পৌঁছে যাওয়া।
— অসুস্থতার কারণে ঔষধ সেবন করা।
— অসুস্থতার কারণে পায়খানার রাস্তায় ঔষধ নেওয়া।
— মাটি কিংবা পাথর জাতীয় অখাদ্য কোনো কিছু গিলে ফেলা।
— স্বেচ্ছায় মুখ ভরে বমি করা।
— সাহরীর সময় এখনো আছে মনে করে খেতে থাকা।
— ভূল করে কোনো কিছু খেয়ে ফেলার পর ইচ্ছাকৃতভাবে পুনরায় কোনো কিছু খাওয়া।
— নিয়ত করা ছাড়া সিয়াম রাখা।
— মুখে রক্ত বের হলে তা গিলে ফেলা।
— নারীদের হায়েয-নিফাস শুরু হওয়া।
— সূর্য অস্ত গেছে মনে করে প্রকৃতপক্ষে সূর্য অস্ত যাওয়ার আগেই ইফতার শুরু করা।
অপরদিকে যেসব কারণে সিয়াম ভঙ্গ হলে সিয়ামের কাযা এবং কাফ্ফরা উভয়টাই ওয়াজিব হয়, সেগুলো নিম্নরূপঃ
— সিয়াম অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করা।
— সিয়াম থাকাবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে নারী সঙ্গম করা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.