ঈমানের বিষয় কী কী? ধারাবাহিক-৪

0
361
Eemaan bil Ambia A.
Eemaan bil Ambia A.

চার. নবী-রাসূল আলাইহিমুস সালামের ওপর ঈমান
নবী-রাসূল আলাইহিমুস সালামের ওপর ঈমান আনার অর্থ এই কথা বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ তা’আলা মানুষের হিদায়াতের জন্য এবং তাদেরকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য স্বীয় বান্দাদের মধ্য থেকে বাছাই করে বহুসংখ্যক পয়গাম্বর অর্থাৎ নবী-রাসূল আলাইহিমুস সালাম মনোনীত করে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। যাতে মানুষ আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি হাসিল করে দুনিয়াতে কামিয়াব হতে পারে এবং পরকালে দোযখ থেকে মুক্তি লাভ করে বেহেশত হাসিল করতে পারে।
নবী-রাসূল আলাইহিমুস সালাম সকলেই নিষ্পাপ; তাঁরা কোনো প্রকার পাপ করেন না। নবীগণ মানুষ। তাঁরা খোদা নন কিংবা খোদার পুত্র নন। খোদার রূপান্তর (অবতার) নন। বরং তাঁরা হলেন আল্লাহ তা’আলার প্রতিনিধি। নবীগণ আল্লাহ তা’আলার বাণী হুবহু পৌঁছে দিয়েছেন।
আল্লাহ তা’আলা তাঁদের সঠিক সংখ্যা কুরআন বা হাদীসে বর্ণনা করেননি। কাজেই নিশ্চিতভাবে তাঁদের সঠিক সংখ্যা কেউ বলতে পারে না। এই কথা যদিও প্রসিদ্ধ যে, এক লক্ষ চব্বিশ হাক্ষিণবী-রাসূল দুনিয়াতে আগমন করেছেন, কিন্তু কোনো সহীহ হাদীস দ্বারা তা প্রমাণিত নয়।
আল্লাহ তা’আলার হুকুমে তাঁদের দ্বারা অনেক অসাধারণ ও অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। ওইসব ঘটনাকে মু’জিযা বলে। নবীগণের মু’জিযাসমূহ বিশ্বাস করাও ঈমানের অঙ্গ।

নবী-রাসূল আলাইহিমুস সালামের মধ্যে সর্বপ্রথম দুনিয়াতে আগমন করেছেন হযরত আদম আলাইহিস সালাম এবং সর্বশেষ অথচ সর্বপ্রধান এবং সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন আমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাঁর পরে অন্য কেউ দুনিয়াতে নবী বা রাসূল হিসেবে আগমন করেননি এবং করবেনও না।
তবে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম কিয়ামতের পূর্বে যদিও আগমন করবেন, কিন্তু তিনি তো আগেই নবী ছিলেন। নতুন নবী হিসেবে তিনি আগমন করবেন না। তিনি আমাদের নবীর উম্মত হয়ে আগমন করবেন। আমাদের নবী খাতামুন নাবিয়্যীন বা শেষ নবী।
তাঁর পরে নতুনভাবে আর কোনো নবী আসবেন না; তাঁর পরে আসল বা ছায়া কোনরূপ নবীই নেই। বরং তাঁর আগমনের মাধ্যমে নবুওয়তের দরযা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।
আমাদের নবীর নবুওয়াত প্রাপ্তির পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবীতে যত জীন বা ইনসান ছিলো, আছে বা সৃষ্টি হবে, সকলের জন্যই তিনি নবী। সুতরাং কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত পৃথিবীতে একমাত্র তাঁরই হুকুম এবং তরীকা সকলের মুক্তি ও নিরাপত্তার জন্য অদ্বিতীয় পথ হিসেবে বহাল থাকবে। অন্য কোনো ধর্ম, পদ্ধতির অনুসরণ কাউকে আল্লাহ তা’আলার দরবারে কামিয়াব করতে পারবে না।
আমাদের নবীর পরে অন্য কেউ নবী হয়েছেন বা নবী হবেন বলে বিশ্বাস করলে তার ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে। তেমনিভাবে কেউ নতুন নবী হওয়ার দাবি করলে বা তার অনুসরণ করলে, সেও কাফির বলে গণ্য হবে।
হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম এখনও আসমানে জীবিত আছেন। তাঁকে জীবিত অবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন, একথা সত্য।
কুরআন হাদীস দ্বারা তা প্রমাণিত। তাই এটা বিশ্বাস করতে হবে, অন্যথায় ঈমান থাকবে না, তিনি কিয়ামতের আগে আসমান থেকে যমীনে অবতরণ করবেন আমাদের নবীর অনুসারী হয়ে। হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে পুত্রবাদ ও ত্রিত্ববাদের বিশ্বাস করা কুফরী।
দুনিয়াতে যত নবী-রাসূল এসেছেন, সকলেই আমাদের মাননীয় ও ভক্তির পাত্র। তাঁরা সকলেই আল্লাহ তা’আলার হুকুম প্রচার করেছেন। তাঁদের মধ্যে পরস্পরে কোনো বিরোধ ছিলো না।
সকলেই পরস্পর ভাই ছিলেন। হ্যাঁ, আল্লাহ তা’আলা অবশ্য হিকমতের কারণে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন হুকুম জারি করেছেন। আর এই সামান্য বিভিন্নতাও শুধু আমলের ব্যাপারে, ঈমান-আকীদার ব্যাপারে নয়।
আকীদাসমূহ আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত চিরকাল এক। আকীদার মধ্যে কোনো প্রকার রদ-বদল বা পরিবর্তন হয়নি, আর হবেও না কখনো। নবী-রাসূল সকলেই পরিপূর্ণ ছিলেন। কেউ অসম্পূর্ণ ছিলেন না।
অবশ্য তাঁদের মধ্যে কারো মর্যাদা ছিল বেশি, কারো মর্যাদা ছিলো তুলনামূলকভাবে কম। সকল নবী নিজ নিজ কবরে জীবিত আছেন। এ জন্য নবীগণকে ‘হায়াতুন্নবী’ বলা হয়।
উল্লেখ্য, আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মর্যাদা সর্বাপেক্ষা অধিক। তাই বলে নবীগণের মধ্যে তুলনা করে একজনকে বড় এবং একজনকে হেয় বা ছোট করে দেখানো করা সম্পূর্ণ নিষেধ।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সমস্ত কথা মেনে নেয়া জরুরী। তাঁর একটি কথাও অবিশ্বাস করলে বা সে সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করলে কিংবা তা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করলে বা তার মধ্যে দোষ বের করলে ঈমান নষ্ট হয়ে যায়।

ঈমানের জন্য আমাদের নবীর সশরীরে জাগ্রত অবস্থায় মিরাজ ভ্রমণের কথা বিশ্বাস করাও জরুরী। যে মিরাজ বিশ্বাস করে না, সে বিধর্মী। তার ঈমান নষ্ট হয়ে গেছে।

কুরআনের বর্ণনায় আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে প্রেরিত নবী-রাসূলগণ
آمَنَ الرَّسُوْلُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَّبِّه وَالْمُؤْمِنُوْنَ- كُلٌّ آمَنَ بِاللهِ وَمَلَائِكَتِه وَكُتُبِه وَرُسُلِه- لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْ رُسُلِه- وَقَالُوْا: سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا- غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيْرُ-
অর্থঃ রাসূল ঈমান আনয়ন করেছেন ওই সকল বস্তু সম্পর্কে যা তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানরাও। সবাই ঈমান রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফিরিশতাগণের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি এবং তাঁর নবীগণের প্রতি।
তারা বলেন- আমরা তাঁর নবীগণের মাঝে কোন পার্থক্য করি না এবং তারা আরো বলে, আমরা শুনেছি এবং কবুল করেছি। আমরা আপনার নিকট ক্ষমা চাই, ওহে আমাদের পালনকর্তা! আমরা সকলেই আপনার দিকে প্রত্যাবর্তন করি। (সূরা বাকারাহ-২৮৫)
آمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَأَنفِقُوا مِمَّا جَعَلَكُم مُّسْتَخْلَفِينَ فِيهِ فَالَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَأَنفَقُوا لَهُمْ أَجْرٌ كَبِيرٌ-
অর্থঃ তোমরা আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো এবং তিনি তোমাদেরকে যে সম্পদের উত্তরাধিকারী করেছেন, তা থেকে ব্যয় করো। (সূরা হাদীদ-৭)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَآمِنُوا بِرَسُولِهِ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْنِ مِن رَّحْمَتِهِ وَيَجْعَل لَّكُمْ نُورًا تَمْشُونَ بِهِ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ-
অর্থঃ তোমরা আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করো এবং তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো। এর ফলে তিনি নিজ অনুগ্রহের দ্বিগুণ অংশ তোমাদেরকে দিবেন। (সূরা হাদীদ-২৮)
تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ-
অর্থঃ তোমরা আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং নিজেদের জান-মাল দ্বারা আল্লাহ তা’আলার রাস্তায় জিহাদ করবে। (সূরা সফ-১১)
فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَالنُّورِ الَّذِي أَنزَلْنَا وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ-
অর্থঃ অতএব তোমরা আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূল এবং অবতীর্ণ নুরের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করো। তোমরা যা কিছু করো, সে সব বিষয়ে আল্লাহ তা’আলা সম্যক অবগত। (সূরা তাগাবুন-৮)
وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ-
অর্থঃ আমি এ কারণেই রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে আল্লাহ তা’আলার নির্দেশে তাঁদের আদেশ-নিষেধ মান্য করা হয়। (সূরা নিসা-৬৪)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا آمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَىٰ رَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي أَنزَلَ مِن قَبْلُ وَمَن يَكْفُرْ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا-
অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ তা’আলার ওপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করো। বিশ্বাস স্থাপন করো তাঁর রাসূল ও তাঁর কিতাবের ওপর। যা তিনি অবতীর্ণ করেছেন তাঁর রাসূলের ওপর এবং তাঁর পূর্ববর্তী রাসূলগণের ওপর।
যে আল্লাহ তা’আলার ওপর, তাঁর ফিরিশতাগণের ওপর, তাঁর কিতাব সমূহের ওপর, তাঁর রাসূলগণের ওপর এবং কিয়ামতের দিনের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবে না, সে পথভ্রষ্ট হয়ে অনেক দুরে গিয়ে পতিত হবে। (সূরা নিসা-১৩৬)
إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَن يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَن يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَٰلِكَ سَبِيلًا- أُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا-
অর্থঃ নিশ্চয় যারা আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূলের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারী এবং আল্লাহ তা’আলা ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাসে তারতম্য করতে চায় আর এ কথা বলে- আমরা কিছু বিশ্বাস করি এবং কিছু বিশ্বাস করি না; এবং এর মধ্যবর্তী অন্য কোনো পথ অবলম্বন করতে চায়, প্রকৃতপক্ষে এরাই সত্য প্রত্যাখ্যানকারী।
এ সব সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের জন্য আমি প্রস্তুত করে রেখেছি অপমানজনক শাস্তি। (সূরা নিসা-১৫০-১৫১)
مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَٰكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا-
অর্থঃ মুহাম্মাদ তোমাদের কোনো ব্যক্তির পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহ তা’আলার রাসূল ও শেষ নবী। আল্লাহগ তা’আলা সব বিষয়ে ভালোভাব অবগত আছেন। (সূরা আহযাব-৪০)

সাহাবীগণ সম্পর্কে আকীদা
পরম সৌভাগ্যবান যেসব মণীষীগণ প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ঈমান সহকারে জাগ্রত অবস্থায় সাক্ষাত লাভ করেছেন এবং ঈমানের ওপরই মৃত্যুবরণ করেছেন, তাঁদেরকেই সাহাবী বলা হয়। (জাওহারুল উসূল)
সাহাবীগণের অনেক ফযীলতের কথা কুরআন ও হাদীসে এসেছে। সমস্ত সাহাবীগণের সাথে মুহাব্বত রাখা এবং তাঁদের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা পোষণ করা আমাদের একান্ত কর্তব্য। তাঁদের কাউকে দোষারোপ করা মন্দ বলা আমাদের জন্য সম্পূর্ণরূপে নিষেধ।
সাহাবীগণ যদিও নিষ্পাপ নন, কিন্তু তাঁরা আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রাপ্ত। সুতরাং পরবর্তী লোকদের জন্য তাঁদের সমালোচনা করার কোনো অধিকার নেই। তাঁরা সবাই সব ধরণের সমালোচনার ঊর্ধ্বে।
তাঁরা সকলেই আদিল অর্থাৎ নির্ভরযোগ্য সত্যবাদী এবং সত্যের মাপকাঠি। তাঁদের দোষ চর্চা করা হারাম এবং ঈমান বিধ্বংসী কাজ। ‘আকীদাতুত তাহাবী’ কিতাবে উল্লেখ আছে-
সাহাবীগণের প্রতি মুহাব্বত-ভক্তি রাখা দ্বীনদারী ও ঈমানদারী এবং দ্বীনের ও ঈমানের পূর্ণতা। আর তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা বা তাদের বিরূপ সমালোচনা করা কুফরী, মুনাফেকী এবং শরীয়তের সীমার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

সাহাবীগণের মাঝে চারজন সর্বপ্রধান। তাঁদের মধ্যে প্রথম হচ্ছেন- আবু বকর সিদ্দীক রাযি.।
তিনিই প্রথম খলীফা এবং তিনি সমস্ত উম্মতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। দ্বিতীয় খলীফা উমর ফারুক রাযি., তৃতীয় খলীফা উসমান গনি রাযি. এবং চতুর্থ খলীফা আলী ইবনে আবি তালিব রাযি.।
সকল সাহাবীগণের ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলার চির সন্তুষ্টির সুসংবাদ দিয়েছেন। বিশেষ করে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দশজন সাহাবীর ব্যাপারে জান্নাতী বলে সরাসরি এক হাদীসে উল্লেখ করেছেন। এই দশজনকে আশারায়ে মুবাশশারা (সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন) বলা হয়। তাঁরা হলেন-
১. আবু বকর রাযি.
২. উমর ফারুক রাযি.
৩. উসমান ইবনে আফফান রাযি.
৪. আলী ইবনে আবি তালিব রাযি.
৫. তালহা রাযি.
৬. যুবায়ের রাযি.
৭. আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাযি.
৮. সা’আদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাযি.
৯. সাঈদ ইবনে যায়েদ রাযি.
১০. আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাযি.

কুরআনে সাহাবীগণের ব্যাপারে আলোচনা
وَإِن يُرِيدُوا أَن يَخْدَعُوكَ فَإِنَّ حَسْبَكَ اللَّهُ هُوَ الَّذِي أَيَّدَكَ بِنَصْرِهِ وَبِالْمُؤْمِنِينَ-
অর্থঃ হে নবী! যদি মুনাফিকরা আপনাকে প্রতারিত করতে চায়, তা হলে আপনার জন্য আল্লাহ তা’আলাই যথেষ্ট। এর সাথে তিনি আপনাকে স্বীয় সাহায্য এবং মুমিন লোকদের (সাহাবীগণ) দ্বারা শক্তিশালী করেছেন। (সূরা আনফাল-৬২)
لِلْفُقَرَاءِ الْمُهَاجِرِينَ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِن دِيَارِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا وَيَنصُرُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَٰئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ-
অর্থঃ এই ধন-সম্পদ ওই সব দেশত্যাগী নিঃস্ব লোকদের (মুহাজির সাহাবীগণ) জন্য, যারা আল্লাহ তা’আলার অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টির উদ্দেশে নিজেদের বাস্তুভিটা ও সহায়-সম্পত্তি থেকে বহিস্কৃত হয়েছে। আর তাঁরা (সাহগাবীগণ) আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূলকে সহযোগিতা করেছে। (সূরা হাশর-৮)
مُّحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ ذَٰلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنجِيلِ كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْأَهُ فَآزَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَىٰ عَلَىٰ سُوقِهِ يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا-
অর্থঃ মুহাম্মাদ আল্লাহ তা’আলার রাসূল। আর তাঁর সহচরগণ কাফিরদের বেলায় কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল। আল্লাহ তা’আলার অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাঁদেরকে (সাহাবীগণকে) রুকু ও সিজদায় অবনত দেখবেন।
তাঁদের মুখমন্ডলে সিজদার চিহ্ণ আছে। তাওরাত ও ইনজিল কিতাবের বর্ণনায় তাঁদের (সাহাবীগণ) অবস্থা এমন চারাগাছের মতো, যা থেকে কিশলয় নির্গত হয়, অতঃপর তা শক্ত ও মজবুত হয়ে কান্ডের ওপর এমনভাবে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে যায়, যা কৃষককে আনন্দিত করে তোলে।
এভাবে আল্লাহ তা’আলা উদাহরণ পেশ করেন, যাতে কাফিরদের অন্তর্জালা সৃষ্টি হয়। যারা তাদের মধ্যে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং সৎ কর্ম সম্পাদন করবে, আল্লাহ তা’আলা তাঁদেরকে ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের ওয়াদা দিয়েছেন। (সূরা ফাতাহ-২৯)
لَّقَد تَّابَ اللَّهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِن بَعْدِ مَا كَادَ يَزِيغُ قُلُوبُ فَرِيقٍ مِّنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ إِنَّهُ بِهِمْ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ-
অর্থঃ আল্লাহ তা’আলা ক্ষমা করে দিলেন নবীকে এবং মুহাজির ও আনসার সাহাবীগণকে, যারা সংকটকালে তাঁর অনুগামী হয়েছিলো। এমনকি ওই সময় তাঁদের অনেকেই ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার উপক্রম হয়েছিলো। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা তাঁদেরকে (সাহাবীগণকে) ক্ষমা করে দিলেন।
কারণ তিনি তাঁদের (সাহাবীগণ) প্রতি করূণাময় পরম দয়ালু। (সূরা তাওবা-১১৭)
لِّيُدْخِلَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَيُكَفِّرَ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَكَانَ ذَٰلِكَ عِندَ اللَّهِ فَوْزًا عَظِيمًا-
অর্থঃ আল্লাহ তা’আলা মুমিন নর-নারী (পুরুষ ও মহিলা সাহাবীগণ) কে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশ দিয়ে নহর প্রবাহিত হবে। সেখানে তাঁরা (পুরুষ ও মহিলা সাহাবীগণ) চিরকাল থাকবেন।
আল্লাহ তা’আলা তাঁদের (পুরুষ ও মহিলা সাহাবীগণ) পাপ মোচন করে দিবেন। প্রকৃতপক্ষে এটাই আল্লাহ তা’আলার কাছে মহাসাফল্য। (সূরা ফাতাহ-৪)
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ-
অর্থঃ মুহাজির ও আনসার সাহাবীগণের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা তাঁদের অনুসরণ করেছেন, আল্লাহ তা’আলা তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট; তাঁরাও আল্লাহ তা’আলার প্রতি সন্তুষ্ট। তিনি তাঁদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে নহর প্রবাহিত হয়। সেখানে তাঁরা চিরকাল থাকবেন। এটাই প্রকৃত সফলতা। (সূরা তাওবাহ-১০০)

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিবি ও আওলাদ সম্বন্ধে আকীদা
প্রিয় নবী প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিবি ও তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বিশেষভাবে শ্রদ্ধা করা উম্মতের ওপর ওয়াজিব। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সন্তানগণের মধ্যে ফাতিমা রাযি. এবং বিবিগণের মধ্যে খাদীজা এবং আয়েশা রাযি.-এর মর্যাদা সবচেয়ে বেশি।

আউলিয়ায়ে কেরাম সম্বন্ধে আকীদা
আউলিয়ায়ে কেরামের কারামত সত্য। কিন্তু আউলিয়ায়ে কেরাম যত বড়ই হোন না কেনো, তাঁরা নবী-রাসূল আলাইহিমুস সালাম তো দূরের কথা, একজন সাধারণ সাহাবীর সমতুল্যও হতে পারেন না।
অবশ্য হাক্কানী পীর-মাশায়েখ ও উলামায়ে কিরাম যেহেতু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উত্তরসুরী এবং দ্বীনের ধারক-বাহক, তাই তাঁদের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা রাখা, তাঁদের সঙ্গ লাভ করা এবং তাদের প্রতি বিদ্বেষ না রাখা, সকল মুসলমানের জন্য জরুরী। দ্বীনের খাদেম হিসেবে তাঁদেরকে হেয় করা, কিংবা গালি দেওয়া কুফরি কাজ।
মানুষ যতই আল্লাহ তা’আলার প্রিয় হোক না কেনো, হুঁশ-জ্ঞান থাকতে শরীয়তের হুকুম-আহকামের পাবন্দী অবশ্যই তাকে করতে হবে। সালাত-সিয়াম, হজ্জ-যাকাত কখনো মাফ হবে না।
তেমনিভাবে মদ খাওয়া, গান-বাদ্য করা, পরস্ত্রী দর্শন বা স্পর্শ করা কখনো তার জন্য জায়েয হবে না। হারাম বস্তুসমূহ হারামই থাকবে এবং হারাম কাজ করে কিংবা ফরয বন্দেগী ছেড়ে দিয়ে কেউ কখনো আল্লাহ তা’আলার নৈকট্য অর্জন করতে পারে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.