ঈমানের বিষয় কী কী? ধারাবাহিক-৫

0
357
alamat e Qiayamat
alamat e Qiayamat

পাঁচ. কিয়ামত দিবসের ওপর ঈমান
কিয়ামত দিবসের ওপর ঈমান আনার অর্থ- কুরআন ও হাদীসে কিয়ামতের যতগুলো বড়-ছোট বিভিন্ন রকমের নিদর্শনাবলী বর্ণিত হয়েছে, তা নিশ্চয়ই ঘটবে- দৃঢ়ভাবে এই কথা বিশ্বাস করা।
এর সাথে সাথে কিয়ামতের দিবসে বিচার ও হিসাবের নির্ধারিত কয়েকটি ঘাটি অতিক্রম করে সৎ পথে উত্তীর্ণ হলে জান্নাত এবং ব্যর্থ হলে জাহান্নামে গমন করতে হবে- এই কথার ওপরও পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করা।

পৃথিবীতে কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
মূলত কিয়ামতের নিদর্শনাবলীর প্রকৃতি হলো অস্বাভাবিকতা। অর্থাৎ পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়মের ব্যতিক্রম যা কিছুই ঘটবে, এ সবই কিয়ামতের নিদর্শন। কারণ পৃথিবী যখন থেকে তার নির্ধারিত নিয়মে না চলে এর বিপরীত অবস্থায় পতিত হবে, তখনই কিয়ামত হবে।

কিয়ামতের এ সব নিদর্শনাবলী সাধারণত দুই রকমের হবে। প্রথমতঃ ছোট নিদর্শন; দ্বিতীয়তঃ বড় নিদর্শন।
ছোট নিদর্শনঃ পৃথিবীতে কিয়ামতের ছোট নিদর্শনের সর্বমোট সংখ্যা কুরআন ও হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী প্রায় ১৩৫ টি। এ সব ছোট ছোট নিদর্শনগুলো দেখে বুঝা যাবে যে, কিয়ামতের সময় কাছাকাছি চলে এসেছে।

এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু নিদর্শনাবলী নিম্নরূপঃ
— কিয়ামতের ছোট নিদর্শনের সর্বপ্রথম নিদর্শন হলো- পৃথিবীতে শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাব। এ কারণেই আগের উম্মতের ওপর অবতীর্ণ আসমানী কিতাব সমূহে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপাধি ছিলো- نبي الساعة অর্থাৎ কিয়ামতের নবী।
— নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অব্যবহিত হওয়ার পর মুরতাদ হওয়ার ফিতনা। যা নবীজির ইনতিকালের পরে আরবে সংঘটিত হয়েছিলো। দলে দলে লোকেরা ইসলাম ত্যাগ করতে শুরু করেছিলো। অতঃপর ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর রাযি. কঠোর হস্তে এই ফিতনা সফলভাবে দমন করেন।
— ইলমের মর্যাদা ও গুরুত্ব কমে যাবে এবং ইলমও উঠে যাবে।
— ব্যাভিচার ও মদ্যপান লাগামহীন বেড়ে যাবে। এমনকি প্রকাশ্যে সর্বত্র অশ্লীল কাজ হবে।
— নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং পুরুষের সংখ্যা কমে যাবে। এমনকি এক পর্যায়ে ৫০ জন নারীর তত্ত্বাবধানকারী হবে একজন পুরুষ।
— ওয়াকফকৃত জায়গা-সম্পত্তিকে লোকেরা নিজের সম্পদ মনে করে ভোগ করবে।
— ধনী লোকেরা যাকাত দেওয়াকে অর্থদণ্ড কিংবা জরিমানা মনে করবে।
— আমানতের সম্পদকে নিজের সম্পদ মনে করে তাতে হস্তক্ষেপ করবে।
— পুরুষ লোকেরা স্ত্রী লোকদের আনুগত্য করবে।
— সন্তান মায়ের না-ফরমানি করবে।
— পিতাকে পর মনে করে দুরে সরিয়ে দিবে আর বন্ধুকে কাছে আনবে।
— বন্ধু-বান্ধবকে সবচেয়ে বেশি আপন মনে করবে।
— অসৎ ও পাপিষ্ঠ লোকেরা ক্ষমতাসীন হবে; তারা রাজত্ব করবে।
— অযোগ্য মুর্খ লোকেরা বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করবে।
— অত্যাচারের ভয়ে লোকেরা যালিমকে সম্মান করবে।
— নাচ-গান ও বাদ্য-বাজনার প্রচলন সর্বত্র ছাড়িয়ে যাবে।
— বাঁদী তার মনিবকে প্রসব করবে।
— সমাজের নিঃস্ব অভাবী মেষ রাখালরা বড় বড় ইমারত নির্মাণ নিয়ে পরস্পরে গর্ব করবে।

হাদীসের বর্ণনায় কিয়ামতের ছোট নিদর্শন
উপরোল্লিখিত কিয়ামতের বিভিন্ন ছোট ছোট নিদর্শনগুলো একাধিক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। যথা- সাহাবী আনাস বিন মালিক রাযি. বলেন- নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
إن من أشراط الساعة أن يرفع العلم ويكثر الجهل ويكثر الزنا ويكثر شرب الخمر ويقل الرجل ويكثر النساء حتي يكون لحمسين إمرأة القيم الواحد-
সাহাবী জাবির বিন সামুরা রাযি. বলেন- নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
إن بين يدي الساعة كذابين- فاحذروهم-
সাহাবী আবু হুরায়রা রাযি. বলেন- একবার বেদুইন লোক নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলো- কিয়ামত কবে হবে? তখন তিনি ইরশাদ করলেন-
إذا ضيعت الأمانة فانتظر الساعة- قال: كيف إضاعتها؟ قال: إذا وسد الأمر إلي غير أهله فانتظر الساعة-
(সহীহুল বুখারী; সহীহ মুসলিম)
হাদীসে জিবরীলে বর্ণিত হয়েছে, সাহাবী ওমর বিন খাত্তাব রাযি. বলেন-
فأخبرني عن الساعة؟ قال: ما المسئول عنها بأعلم من السائل- قال: فأخبرني عن أماراتها؟ قال: أن تلد الأمة ربتها وأن تري الحفاة العراة العالة رعاء الشاء يتطاولون في البنيان-
একবার জিবরীল আলাইহিস সালাম নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন- বলুন হে নবী! কিয়ামত কবে হবে?
নবীজি বললেন- প্রশ্নকারীর চেয়ে আমি বেশি জানি না।
জিবরীল আলাইহিস সালাম বললেন- তা হলে কিয়ামতের কিছু নিদর্শন বলে দিন।
নবীজি বললেন- বাঁদী তার মনিবকে প্রসব করবে এবং সমাজের নিঃস্ব অভাবী লোক ও মেষ রাখালরা বড় বড় ইমারত নির্মাণ নিয়ে পরস্পরে গর্ব করবে। (সহীহুল বুখারীঃ ১/১২; সহীহ মুসলিম; মিশকাত শরীফঃ ১/১১)

এছাড়া একটি দীর্ঘ হাদীসে কিয়ামতের ছোট নিদর্শন সমূহ সম্পর্কে নবীজি আরো বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। যথা- সাহাবী আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
إذا اتخذ الفيئ دولا والأمانة مغنمًا والزكاة مغرمًا- تعلم لغير الدين- وأطاع الرجل إمرأته و عق أمه وأدني صديقه وأقصي باه وظهرت الأصوات في المساجد و ساد القبيلة فاسقهم و كان زعيم القوم أرذلهم وأكرم الرجل مخافة شره و ظهرت القينات والمعازف و شربت الخمور ولعن آخر هذه الأمة أولها- فارتقبوا عند ذلك ريحًا حمراء و زلزلة و خسفًا و مسخًا و قذفًا وآيات تتابع كنظام قطع سلكه فتتابع-
অর্থঃ যখন ওয়াকফকৃত কিংবা গণীমতের সম্পদে হস্তক্ষেপ হবে, আমানতকে নিজের সম্পদ মনে করা হবে, যাকাতকে জরিমানা মনে করা হবে, পার্থিবুনাফার উদ্দেশে ইলম অর্জন করা হবে, পুরুষ লোকেরা নারীদের আনুগত্য শুরু করবে, সন্তান মায়ের না-ফরমানি করবে, বন্ধুকে কাছে আনবে এবং পিতাকে দুরে সরিয়ে দিবে, মসজিদে শোরগোল করবে, ফাসিক লোকেরা নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হবে, সমাজের নিকৃষ্ট লোকেরা সরদার হবে, অত্যাচারের ভয়ে লোকেরা যালিমকে সম্মান করবে, নাচ-গান ও বাদ্য-বাজনার প্রচলন সর্বত্র ছাড়িয়ে যাবে, মদ্যপান বেড়ে যাবে, শেষ যুগের লোকেরা আগের যুগের লোকদেরকে অভিশাপ দিবে, তখন তোমরা অপেক্ষা করো রক্তিম বর্ণের প্রবল ঝড়ের, ভূমিকম্পের, ভূ-পৃষ্ঠে ধ্বসে যাওয়া, অঙ্গবিকৃতি এবং পাথর বৃষ্টির। এছাড়া ওই সময় এ জাতীয় আরো কিছু বিপদ লাগাতারভাবে প্রকাশ পাবে; যেমন নাকি মালার সুতা ছিড়ে গেলে দানাগুলো একটার পর একটা বের হয়ে যায়। (সুনানে তিরমিযীঃ হা-২২১১)

বড় নিদর্শনঃ কিয়ামতের সময় ঘনিয়ে এলে এর বড় বড় কিছু নিদর্শন পৃথিবীতে প্রকাশ পাবে। কুরআন ও হাদীসের বিভিন্ন স্থানে এ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। সংক্ষেপে সেগুলো নিম্নরূপঃ
– ইমাম মাহদী আলাইহিস সালামের আবির্ভাব;
– দাজ্জালের ভয়াবহ ফিতনা;
– আসমান থেকে ঈসা আলাইহিস সালামের অবতরণ;
– ইয়াজুজ ও মাজুজ গোষ্ঠীর উৎপাত;
– দাব্বাতুল আরদের বহিঃপ্রকাশ;
– দাব্বাতুল আরদের বহিঃপ্রকাশের কিছুকাল পর এক ধরণের ঠান্ডা বাতাস প্রবাহিত হওয়া;
– ধোঁয়া;
– পৃথিবীর প্রাচ্যে, পশ্চিমে ও আরব উপদ্বীপে ৩ টি ভূমিধ্বস;
– পশ্চিম দিক থেকে সূর্য্যােদয়;
– ইয়ামান থেকে অগ্নিকুন্ড প্রকাশ পাওয়া ইত্যাদি।

হাদীসের বর্ণনায় কিয়ামতের বড় নিদর্শন
সাহাবী হুযাইফা বিন উসাইদ গিফারি রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
اطلع النبي صلي الله عليه وسلم علينا ونحن نتذاكر- فقال: ما تذكرون؟ فقلنا: نذكر الساعة- قال: إنها لن تقوم حتي تروا قبلها عشر آيات- فذكر الدخان و الدجال و الدابة و طلوع الشمس من مغربها و نزول عيسي بن مريم و يأجوج ومأجوج و ثلاثة خسوف- خسف بالمشرق و خسف بالمغرب و خسف بجزيرة العرب و آحر ذلك نار تخرج من اليمن- تطرد الناس إلي محشرهم-
আমরা কয়েকজন একবার বসে কিয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। এমতাবস্থায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগমন করে আমাদের আলোচনার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা কিয়ামতের আলোচনার কথা জানালাম।

তখন তিনি বললেন-
হ্যাঁ, অচিরেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। তবে এর আগে তোমরা বিশেষ দশটি নিদর্শন দেখতে পাবে। সেগুলো হলো- ধোঁয়া, দাজ্জালের আবির্ভাব, অদ্ভুত আকৃতির এক প্রাণির আত্মপ্রকাশ, পশ্চিম দিক থেকে সূর্য্যােদয়, ঈসা বিন মারইয়াম আলাইহিস সালামের অবতরণ, ইয়াজুজ-মাজুজের প্রকাশ এবং তিনটি ভূমিকম্প।
একটি হবে প্রাচ্যে, আরেকটি হবে পাশ্চাত্যে এবং তৃতীয়টি হবে আরব উপদ্বীপে। এছাড়া আগুনের একটি কুন্ডলী ইয়ামান থেকে বের হয়ে মানুষকে হাশরের দিকে ধাওয়া করে নিয়ে যাবে। (সহীহুল বুখারী; সহীহ মুসলিম)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.