উপমহাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদ | আদিপর্বের খেরোখাতা

0
222
Islam in Hind
Islam in Hind

লিখেছেনঃ নুর নবী দুলাল 


ভারতের মুসলিম ইতিহাসের আদিপর্ব বিবেচনায় নিলে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নামটি হচ্ছে গজনীর সুলতান মাহমুদ। গজনী ছিল ভারত থেকে মাত্র ২০০ মাইল দূরে অবস্থিত। এই রাজ্যের সীমা বর্তমান আফগানিস্তান থেকে সিরিয়া হয়ে মিশর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। ১০০১ সালে মাহমুদ লাহোর আক্রমণ করেন। পাঞ্জাবের রাজা তখন জয়পাল। কিছুকাল আগেই তিনি মাহমুদের পিতার সঙ্গে যুদ্ধে জড়ান। জয়পালসহ দিল্লী, কনৌজ ও কালিঞ্জরের রাজাদের সম্মিলিত বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করে জয়লাভ করেন সবুক্তগীন। সেই থেকে ভারতের শাসনকার্যে মুসলিমদের আনাগোণা শুরু। কিন্তু এটাকে স্থায়ী ও শক্ত ভিত্তি দেন তার পুত্র মাহমুদ। তিনি ১২ বার ভারত আক্রমণ করেছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন এলফিনস্টোন। স্যার হেনরী ইলিয়টের মতে, মাহমুদ মোট ১৭ বার ভারত আক্রমণ করেন। মাহমুদের ভারতীয় উপমহাদেশ আক্রমণের প্রধান কারণ ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক। তিনি ভারতে রাজ্য বিস্তারের ইচ্ছা পোষণ করতেন। ১০২৮ সালে সমগ্র পারস্য মাহমুদের করতলগত হয়। যুদ্ধের জন্য তার দরকার ছিল তহবিল। ভারতে তার বাহিনী অর্ধেকের বেশি হামলা চালিয়েছিল কেবল মন্দির ও রাজপ্রাসাদ লুট করতে। ১০৩০ সালে তার মৃত্যু ঘটে। সবুক্তগীন রাজবংশের পতন ঘটে ১১৫২ সালে, প্রতিষ্ঠার ১৮৭ বছর পর। গজনী এরপর ঘুর রাজবংশের দখলে আসে। ১২০৬ সাল পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর ঘুরদের আধিপত্য ছিল।

ভারতে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে কেবল ইসলাম আসেনি। তার আসার আগে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে কোথাও সনাতন ধর্ম কোথাও বা বৌদ্ধ ধর্মও রাষ্ট্রীয় মৌলবাদ জারি রেখেছিল। প্রাচীন ইরানীয়দের সঙ্গে যে ভারতীয়দের যোগাযোগ ছিল, এর প্রমাণ মেলে সোয়াট, পাঞ্জাব ও হরিয়ানার খননকার্যে। সেখান থেকে প্রাপ্ত জিনিসপত্র পরীক্ষা করে ইতালীয় ও ভারতীয় প্রত্নবিদরা একমত হয়েছেন যে, সোয়াটের সমাধিক্ষেত্রটির মালিক ছিল ইরান থেকে আগত আর্য কোনো উপজাতি। তাদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র নির্দেশ করে, খ্রীস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষদিকে এই আর্যরা ভারতে এসেছিল। ঐতিহাসিকরা বলছেন, ঋগ্বেদ খ্রীস্টপূর্ব এগারো থেকে দশ শতকে লিখিত। আর্যদের আসা যাওয়া ইতোমধ্যে প্রায় এক হাজার বছর অতিক্রম করেছে। ঠিক সে সময়টাতেই ভারত ছোট ছোট ‘জন’সমাজ থেকে রাষ্ট্র গঠনের দিকে এগুচ্ছিল। কিছু কিছু জায়গায় রাষ্ট্রের কাঠামো তৈরী হয়ে গিয়েছিল। আদিবেদ তথা ঋগ্বেদে এর বর্ণনাও আছে। বৈদিক সাহিত্যের পরবর্তী পুঁথিগুলি রচিত হয়েছে ভারতে রাষ্ট্রগঠনকার্য সমাধার পরে, খ্রীস্টপূর্ব আট থেকে ছয় শতকে।

ভারতে রাষ্ট্রের অভ্যুদয়কালেই ধর্মের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ঋগ্বেদের প্রথম ও পরের দিককার মন্ডলগুলোর দিকে তাকালে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রধর্মের সম্পর্কের প্রমাণ মেলে। পারসিক শব্দ ‘পিশত্রা’ ও ভারতীয় ‘বর্ণ’ বলতে একই জিনিস বোঝানো হতো তখন। যাকে এখন আমরা জাত-পাত বলি। পিশত্রা ও বর্ণের আভিধানিক শব্দার্থও একই- রঙ। এর দ্বারা তিনটি বর্ণকে নির্দেশ করা হতো- সৈনিক, ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী। ঋগ্বেদের প্রথম নয় মন্ডলে এই তিন জাতের বর্ণনাই আছে। কিন্তু দশম মন্ডলে প্রথম দেখা মেলে চার বর্ণের। ঐতিহাসিকরা বলেন, প্রথম নয় মন্ডলের রচনাকালে রাষ্ট্রগঠনকার্য পরিণত হচ্ছিল। দশম মন্ডলের রচনার আগেই রাষ্ট্রগঠন কিছুকিছু জায়গায় পরিপূর্ণতা লাভ করে। রাষ্ট্রগঠনের প্রাকপর্বে যোদ্ধাশ্রেণীর একক কর্তৃত্ব থাকলেও রাষ্ট্র গঠনের পর শাসনের স্বার্থেই ধর্মীয় অনুশাসনকে ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি হয়। গুরুত্ব বাড়ে পুরোহিতদের। ঋগ্বেদের দশম মন্ডলে তারই প্রমাণ মেলে। এই মন্ডলেরই ‘পুরুষ সূক্ত’-এ প্রথম বর্ণিত হয় চার বর্ণের কথা। যার প্রথমেই অবস্থান পুরোহিত তথা ব্রাহ্মণদের, যাদের সৃষ্টি হয়েছে ‘পুরুষ’ বা পরম ব্রহ্মের মুখগহবর থেকে। এভাবেই শাসনের স্বার্থে শাসকরা ধর্মকে ব্যবহার করে আর উচ্চশ্রেণীর মর্যাদায় আসীন হয় পুরোহিতরা।

মৌর্যযুগে, তথা অশোকের আমলে বৌদ্ধ ধর্ম রাষ্ট্রধর্মের স্বীকৃতি পেয়েছিল। তৎকালীন রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে ভূমিকা রাখতো ‘পরিষদ’ নামক মন্ত্রীমন্ডলীর সংগঠন। সম্রাট অশোকের অনুশাসনগুলোতে এর যে উল্লেখ পাওয়া যায়, তা নির্দেশ করে এই পরিষদের সদস্য ছিলেন যোদ্ধা, অভিজাত ও ধর্মগুরুরা। পরিষদের দায়িত্ব ছিল ‘ধর্ম অনুযায়ী কর্তব্যাদি সম্পন্ন করার বিষয়টি তদারক’ করা। সম্রাটকে না জানিয়ে এই পরিষদের সভা হতো না। জরুরী অবস্থায় সভা হলে দ্রুতই সম্রাটকে জানানোর নির্দেশনাও ছিল।

n 1

শুধু ইসলাম নয় ; রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বৌদ্ধ ও সনাতন ধর্মও কম রক্তপাত ঘটায়নি। অশোকের কলিঙ্গ রাজ্য আক্রমণের একটি প্রতীকী চিত্র।

কৈবর্ত বিদ্রোহের কথাও স্মরণ করতে পারেন। বাংলার প্রথম যুগের স্বাধীন পাল রাজা তৎকালীন দ্বিতীয় মহীপালের (১০৭০-১০৭৭) পাল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। পাল কর্মচারী দিব্যের নেতৃত্বে শুরু হওয়া কৈবর্ত সম্প্রদায়ের এ বিদ্রোহকে বাংলাদেশ এমনকি ভারতবর্ষের প্রথম সফল বিদ্রোহ হিসেবেও অভিহিত করা হয়। এই বিদ্রোহের মাধ্যমে কৈবর্ত নেতারা বরেন্দ্রীকে নিজেদের অধীনে আনতে সক্ষম হন। ১০৮২ খ্রিস্টাব্দে পাল রাজা রামপাল সামান্তরাজাদের সহযোগিতায় পরবর্তী কৈবর্ত নেতা ভীমকে হারিয়ে পিতৃভূমি বরেন্দ্রীকে নিজের দখলে নেন। এর মাধ্যমে বাঙ্গালীদের প্রথম রাষ্ট্রবিপ্লবের সমাপ্তি ঘটে। কৈবর্তেরা মূলত জেলে শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। পূর্বপুরুষ থেকে তারা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। অন্যদিকে পাল রাজারা বৌদ্ধ ছিলেন বলে ধর্মীয় দিক থেকে অহিংস নীতির কারণে তারা মাছ মাংস ভক্ষণের বিরোধী ছিলেন এবং এ সমস্ত পেশাকে তারা নিরুৎসাহিত এমনকি বাধাগ্রস্তও করতেন। এর ফলে সমাজে কৈবর্তদেরকে নানাভাবে নির্যাতিত হতে হতো। এছাড়া সিংহাসনে আরোহণের সময় পাল রাজা দ্বিতীয় মহীপাল তার দুই ভাই দ্বিতীয় শুরপাল ও দ্বিতীয় রামপালকে বন্দী করেন। ফলে বন্দী দুই ভাইয়ের সমর্থক কিছু স্থানীয় সামন্তও এই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। পাল রাজাদের শুরুটা ভালোই ছিল। কিন্তু দেবপাল, ধর্মপালের শাসনের স্বর্ণযুগ পেরিয়ে শেষ দিকে এসে তারা পুরনো গৌরব হারিয়ে ফেলে। ক্রমশ দমন ও অরাজকতা বাড়তে থাকে। তাদের এই অরাজকতা থেকে রক্ষা পাওয়াই ছিল কৈবর্ত বিদ্রোহের প্রধান উদ্দেশ্য। তবে এক্ষেত্রে রাষ্ট্রধর্মীয় নির্যাতন ছিল একটা বড় ব্যাপার। এবার তাকানো যাক এ অঞ্চলে ইসলামের রাষ্ট্রধর্ম হয়ে ওঠার আদি পর্বের দিকে।

খোরাসান, গজনীর আধিপত্যের সমকালে ভারতের আলোচিত রাজ্য ছিল লাহোর, পাঞ্জাব ও কনৌজ। এ সময় দিল্লী ছিল নগণ্য এক রাজ্যের রাজধানী। ১২০৬ সাল থেকে ১২৮৮ সাল পর্যন্ত দিল্লীর ক্ষমতা ছিল মামলুক (দাস) রাজাদের হাতে। এর মধ্যেই ১২১৭ সালে চেঙ্গিস খাঁর বাহিনী ভারত আক্রমণ করে। মুঘলরা মুলতান ও সিন্ধু ছারখার করে সিন্ধু নদ পেরিয়ে চলে যায়। এতে আগে থেকেই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবস্থান করা মুঘল আমাত্যদের শক্তিবৃদ্ধি ঘটে। ভারতের কিছু রাজ্যে তখন মুঘল, শাহ, ঘুর, সবুক্তগীন, তাহিরিদ, সাফারিদ, সামানিদ, খান, সেলজুক, মামলুক, এরকম বিভিন্ন রাজবংশ-গোত্রের লোকেরা সেনাবাহিনীর বড় পদ ও রাজ্যের আমাত্যবর্গের পদে ছিলেন। এদের মধ্যে ক্ষমতার কামড়াকামড়ি ছিল এক নিয়মিত ব্যাপার।

বাংলার সঙ্গে মুসলিম শাসনের সম্পর্ক খিলজী বংশের হাত ধরে। খিলজী বংশের প্রথম পুরুষ হিসেবে ১২৮৮ সালে জালাল উদ্দিন খিলজী দিল্লীর সিংহাসনে বসেন। ১২৯৩ সালে একটি মুঘল আক্রমণ পরাভূত করে তিনি সমস্ত বন্দীদের মুক্ত করে দেন। এর আগে ক্ষমতাসীন রাজা কায়কোবাদ এক ভোজসভার সময় বিষ খাইয়ে তার দরবারের সমস্ত মুঘল আমাত্যকে হত্যা করেছিলেন। কিন্তু খিলজীর আমলে মুক্তি পাওয়া ৩০০০ মুঘল আবার দিল্লীতে বসবাস শুরু করে। জালাল উদ্দিনের ভ্রাতুষ্পুত্র আলাউদ্দিন এর পরপরই দেবগিরির (দৌলতাবাদ) হিন্দু রাজাকে আক্রমণ করেন। আচমকা চড়াও হয়ে তার বাহিনী নগর দখল করে লুট চালায় এবং আশেপাশের স্থানগুলো থেকে শাস্তিস্বরূপ ক্ষতিপূরণ আদায় করে। সেখান থেকে দিল্লীতে ফিরে যখন চাচা জালাল উদ্দিন খিলজীর সঙ্গে কোলাকুলি হচ্ছিল, আলাউদ্দিন তখন চাচার বুকে ছুরি মেরে তাকে হত্যা করেন।

মুসলিম শাসন আমলের গোড়া থেকেই দেখা যায় রাজপদে আসীন আমাত্যবর্গের মধ্যে চরম অবিশ্বাস, সন্দেহ, দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ। খিলজীদের অন্যতম সফল শাসক আলাউদ্দীনকে দেখা যায় ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য বিরাট রক্তপাত ঘটাতে। ১২৯৫ সালে আলাউদ্দীন ক্ষমতা দখল করেন। চাচাকে হত্যার পর বিধবা চাচি ও তার সন্তানদেরও হত্যা করেন তিনি। এতে বিদ্রোহ সৃষ্টি হলে তা কঠোরভাবে দমন করেন এই হিংস্র রাজা। বিদ্রোহী ও তাদের নারী-শিশু সবাইকেই হত্যা করা হয়। ১২৯৮ সালে এক ভ্রাতুষ্পুত্র যুবরাজ সোলায়মানের হাতে আলাউদ্দীন জখম হন। সোলায়মান ও আরো দুই ভ্রাতুষ্পুত্রের গর্দান গেল। ফলত আবার বিদ্রোহ, আবারো নৃশংসভাবে দমন।

আলাউদ্দীন খিলজীর চরিত্র আর সব মুসলিম রাজপূতদের চেয়ে আলাদা ছিল না। এক রাজকবি তাকে ইতিহাসে প্রেমিক হিসেবে অমরত্ব দিয়েছেন বটে! কবি মালিক মোহাম্মদ জায়সীর ‘পদুমাবত’ কাব্যে চিতোরের রাণী পদ্মিনীর প্রতি আলাউদ্দীনের আসক্তিকে প্রেমময়তায় মুড়ে বর্ণনা করা হয়েছে। যদিও আলাউদ্দীনের তখনও বিরাট হেরেম। তার মধ্যেই রানী পদ্মিনীর রূপের খ্যাতি শুনে তিনি ১৩০৩ সালে চিতোরের রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করেন। চিতোর তখন রাজস্থানের রাজধানী। রাণীকে হেরেমে পাওয়ার জন্য আলাউদ্দীন চিতোরের রাজবাড়ী ও সেখানকার রাজা রতন সিংসহ রাজবাড়ীর সমস্ত সদস্যকে হত্যা করেন। রাণী অবশ্য আগেই আগুনে ঝাঁপ দিয়ে সম্ভাব্য যৌনদাসত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করেছিলেন।

R 1

কুতুব মিনার কমপ্লেক্সে অবস্থিত আলাউদ্দীন খিলজীর উদ্যোগে নির্মিতব্য অসমাপ্ত আলাই মিনার, যা আজো ভারতে মুসলিম রাজত্বের নৃশংসতা, দাম্ভিকতা ও লাম্পট্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।

১৩০৪ সালে মুঘলরা তিন দফা হিন্দুস্তান দখলের চেষ্টা চালায় এবং প্রতিবারই তারা আলাউদ্দীনের বাহিনী কর্তৃক প্রতিহত হয়। প্রতিবার যত মুঘল গ্রেপ্তার হয়েছিল, সবাইকে হত্য করা হয়। ১৩১০ সালে আলাউদীনের সিপাহসালার, তার পূর্বতন ক্রীতদাস খোঁজা মালিক কাফুরের নেতৃত্বে দক্ষিণে এক বিরাট বাহিনী পাঠান। মালিক কাফুর তখন কর্নাট এবং কুমারিকা অন্তরীপ পর্যন্ত সমগ্র পূর্ব উপকূল জয় করেন। কুমারিকা অন্তরীপে দিগ্বিজয়ের চিহ্ন হিসেবে তিনি একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। তামিল ভূমিতে এটাই ছিল প্রথম মুসলিম আক্রমণ। এর আগে ১৩০৯ সালে মালিক কাফুর দখল করেন তেলেঙ্গানা, আর ১৩০৬ সালে দেবগিরি দখল করে সেখানকার হিন্দু রাজাকে পরাজিত করে দিল্লী এনে আমৃত্যু আটকে রাখেন আলাউদ্দীনের নির্দেশে। ১৩১০ সালে বিদ্রোহের আশঙ্কায় আলাউদ্দীন দিল্লীর অধিবাসী ১৫ হাজার মুঘলকে হত্যা করেন। এভাবেই ভারতীয়দের সঙ্গে রাজধর্ম ইসলামের পরিচয় ঘটে। জনগণের কাছে মুসলিম রাজাদের পরিচয় ছিল ধর্মভিত্তিক। তারা ধর্ম কায়েমের জন্যই দিগ্বিজয়ে বেরিয়েছেন বলে ঘোষণা দিতেন। ফলে তাদের ক্ষমতা দখল, দেশ দখলটা চলত ধর্মের নামে। খুন, লুট, শোষণ, নিপীড়ন সবই হতো ধর্মের দোহাই দিয়ে।

১৩১৬ সালে আলাউদ্দীন মারা গেলে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেন মালিক কাফুর। কিন্তু আলাউদ্দীনের ছেলে মুবারক খিলজী হত্যা করেন তাকে। ১৩১৭ সালে সিংহাসনে বসে মুবারক প্রথমেই তার তৃতীয় ভাইকে অন্ধ করে দেন। সিংহাসনলাভে তাকে যে দুজন সেনাপতি সাহায্য করেছিল, তাদেরও হত্যা করেন তিনি। ১৩২০ সালে তিনি খুন হন নিজ দাস খসরু খাঁর হাতে, যাকে তিনি নিজেই উজির বানিয়েছিলেন। লাম্পট্যের স্রোতে গা ভাসানো অন্যতম রাজা হিসেবে মুবারক খ্যাতি পেয়েছিলেন। তাকে হত্যার সঙ্গে দিল্লীর খিলজী বংশের সবাইকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

১৩২১ সালে পাঞ্জাবের শাসনকর্তা গিয়াস উদ দীন তুঘলক বিরাট বাহিনী সমেত দিল্লী দখল করেন। বঙ্গের শাসকদের হঠিয়ে তিনি নিজ পুত্র জুনা খাঁর হাতে ক্ষমতা তুলে দেন। ১৩২৫ সালে তোরণের নিচে চাপা পড়ে মারা যান বিচক্ষণ এই শাসক। মোহাম্মদ বিন তুঘলক নাম নিয়ে ক্ষমতায় আসেন তার পুত্র জুনা খাঁ। তিনি ছিলেন অপরাপর যেকোনো মুসলিম শাসকদের চেয়ে আলাদা। মার্কস তার সম্পর্কে বলেছেন, ‘তাঁর কালের সবচেয়ে প্রতিভাবান রাজা তিনি ছিলেন বটে, কিন্তু অতিশয় সুদূরপ্রসারী নানা পরিকল্পনার ফলে নিজের সর্বনাশ ঘটান।’

‘তুঘলকী কাণ্ড’ বাগধারাটির জন্মদাতা ছিলেন মোহাম্মদ বিন তুঘলক। বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতার বয়ানে এসেছে, এতসব পদক্ষেপ ও কৌশল তিনি নিয়েছিলেন যে, লোকে তাকে পাগলা রাজা বলে ডাকতো। টাকা দিয়ে তিনি মুঘলদের এমনভাবে বশ করছিলেন যে, তার আমলে একবারও মুঘল আক্রমণ হয়নি। এরপর তিনি দাক্ষিণাত্যকে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করেন। বিশ্বজয়ের পরিকল্পনাও ছিল তার।

১৩২৫ থেকে ১৩৫১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন মোহাম্মদ তুঘলক। পারস্য জয়ের জন্য তিনি বিরাট এক বাহিনী বানিয়েছিলেন। এত বড় বাহিনীর খরচ জোগানোর সামর্থ্য তার ছিল না, ফলে সেই বাহিনী ভেঙে দেয়া হলো। এরপর তিনি চীন দখলের জন্য হিমালয় হয়ে একটা রাস্তা আবিস্কারের জন্য এক লাখ লোক পাঠান, তারা সবাই প্রাণ হারাল। রাজার কোষাগার অনেক আগেই শূণ্য, তাই প্রজাদের ওপর চাপানো হলো বিরাট করভার। শুরু হলো দুর্ভিক্ষ, ফলাফল বিদ্রোহ! ১৩৪০ সালে বঙ্গ থেকে শুরু করে কুমারিকা অন্তরীপ পর্যন্ত বিদ্রোহ সফল হলো। যদিও দমন করা হলো মালব ও পাঞ্জাবের বিদ্রোহ। তেলেঙ্গানা ও কর্ণাটের বিদ্রোহও এ সময় সফল হলো। রাজা মোহাম্মদ তুঘলক বিদ্রোহ দমনের জন্য তখন দেশের এমাথা-ওমাথা করে বেড়াচ্ছিলেন। ১৩৫১ সালে সিন্ধুতে অবস্থানকালে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। তার ভ্রাতুষ্পুত্র ফিরোজ তুঘলক ক্ষমতায় এসে বঙ্গ দখলের পুনঃচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন।

P 1

রাজধর্ম ইসলাম ভারতে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছিল। আকবর, ইলিয়াস শাহদের নাম দিয়ে এই ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না।

মুসলিম শাসনের প্রথম দিককার রাজাদের মধ্যে রাষ্ট্র দখল ও তা ভোগের জন্য নিজের অবস্থান নিরাপদ রাখার তীব্র চেষ্টা দেখা যায়। শাসনব্যবস্থা, জনপদ ও জনগণের উন্নয়নের কিংবা সমাজ সংস্কারের চেষ্টা এদের মধ্যে তেমন একটা দেখা যায়নি। এর একটা বড় কারণ ছিল, এই রাজারা বিভিন্ন এলাকা দখলে নিলেও তাকে ‘বিদেশ’ মনে করতেন। যে কোনো সময় খুন হওয়া বা ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কাও ছিল। ফলে এই রাজাদের আমলে রাজধর্মের প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন স্থানে মসজিদ প্রতিষ্ঠা হলেও ধর্মের প্রসারটা গণ পর্যায়ে কম ছিল। শাসকশ্রেণীর বিভিন্ন অংশ, গোত্র, বংশের মধ্যেই ধর্মীয় বিষয়াদি সীমিত ছিল। কিন্তু মোহাম্মদ তুঘলক থেকে শুরু করে পরবর্তী রাজাদের, বিশেষ করে বাংলায় ইলিয়াস শাহ, ও পরবর্তীতে আকবর- এরকম আরও কিছু শাসকের আমলে গণপর্যায়ে রাজধর্ম ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।

দুর্ভিক্ষ ও বিদ্রোহের সুযোগে ১৩৪২ সালে ইলিয়াস শাহ দখল করেন লখনৌতি। লখনৌতির অপর নাম হলো লক্ষ্মণাবতী। বর্তমান পশ্চিম বঙ্গের মালদা জেলায় এর অবস্থান। বখতিয়ার খিলজী নদীয়া জয় করার পর পরই লক্ষ্মণাবতীতে আসেন এবং এখানে তাঁর রাজধানী স্থাপন করে মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইলিয়াস শাহ বঙ্গ দখল করতে আরো কিছু সময় ব্যয় করেন। ১৩৫২ সালে বাংলা দখলে নেয়ার পর সাতগাঁও ও লখনৌতির সঙ্গে একে যোগ করে গঠন করেন সালতানাত। তিনি এ সম্মিলিত রাজ্যের নামকরণ করেন বাঙ্গালাহ এবং এর অধিবাসীদের অভিহিত করেন বাঙালি নামে।

কূটনীতিজ্ঞ ইলিয়াস শাহ উপলব্ধি করেন সুশাসন ছাড়া জনসমর্থন মিলবে না। বাংলার স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখার জন্য স্থানীয় জনগণকে উদারভাবে সুযোগ সুবিধা দিয়ে তিনি তার শাসনকে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। তিনি বর্ণ, গোত্র ও ধর্ম নির্বিশেষে যোগ্য লোকদের চাকরিতে নিয়োগ লাভের সুযোগ দেন। তিনিই প্রথম মুসলিম শাসক, যিনি স্থানীয় জনগণকে অধিক সংখ্যায় সৈন্যবাহিনীতে নিয়োগ করেন। ইলিয়াস শাহ নিজেও ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন। সুফি দরবেশ ও হিন্দু সন্ন্যাসীদের প্রতি তাঁর ছিল গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর শাসনামলে সাদত, উলামা ও মাশায়েখদের পাশাপাশি হিন্দু সাধু-সন্ন্যাসীরাও সরকার থেকে বৃত্তি পেতেন। তিনি বাংলার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে উন্নতি সাধন করার জন্য চেষ্টা করেন। বস্তুত, তিনি উদার নীতি গ্রহণ করে জনগণের মধ্যে সংহতি স্থাপনের মাধ্যমে সমাজে এক নতুন জীবনধারার সূচনা করেন। ফলে বাংলার আপামর জনগণ অভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক ও ভাষার অঙ্গনে সমবেত হয়।

এরপর বঙ্গে দীর্ঘদিন অস্থিরতা ছিল না, ফলত এর বিভিন্ন অংশে বিস্তৃতি ঘটছিল রাজধর্ম ইসলামের। বাংলায় অস্থিরতা রপ্তানী হয় আবার দিল্লী থেকে। তুঘলক বংশের নৃশংস রাজা মামুদ তুঘলকের আমলে দিল্লীতে শুরু হয় বিরাট বিশৃঙ্খলা। এর মধ্যেই, ১৩৯৮ সালে তৈমুর লঙ হিন্দুস্তান আক্রমণ করেন। দিল্লী লুণ্ঠিত ও দগ্ধ হলো, হাজার হাজার অধিবাসী মারা পড়ল। তৈমুর দেশে ফিরে যাওয়ার আগে খিজির খাঁকে দিল্লি, মুলতান এবং দীপালপুরের শাসন ভার দিয়ে যান । এই খিজির খাঁ তুঘলক বংশকে উচ্ছেদ করেন। ১৪১৪ সালে সৈয়দ পদবি গ্রহণ করে তিনি নিজেকে সার্বভৌম রাজা বলে ঘোষণা দেন। ১৪৫০ পর্যন্ত দিল্লী শাসন করে এই সৈয়দ বংশ। যদিও সৈয়দ বলা হতো নবী মোহাম্মদের ‘খাস’ বংশধরদের, কিন্তু খিজির খাঁ এটাকে পদবী বানিয়ে নেন। শাসকদের কাছে যে, ধর্ম নিছক ব্যবহার্য সামগ্রী মাত্র, এটা খিজির খাঁর মতো অনেক শাসকই প্রমাণ দিয়েছন।

১৪৫০ সালে বাহলল খাঁ লোদী যখন দিল্লী অধিকার করেন তখন ক্ষমতায় ছিলেন খিজির খাঁর প্রপৌত্র সৈয়দ আলাউদ্দীন। বাহলল লোদীর পুত্র সিকান্দার লোদী ছিলেন খুবই শান্তিপ্রিয়। কিন্তু তার মৃত্যুর পর ১৫০৬ সালে ক্ষমতায় বসে পুত্র ইব্রাহিম লোদী। তিনি ছিলেন হিংস্র প্রকৃতির। নিজ দরবারের সমস্ত ওমরাহদের হত্যা করেন। একইভাবে ইব্রাহিল যখন পাঞ্জাবের শাসনকর্তাকে হত্যার চেষ্টা করে, পাঞ্জাবের শাসক তখন বাবরের নেতৃত্বে মুঘলদের সাহায্য প্রার্থনা করেন। ১৫২৪ সালে বাবর ভারত আক্রমণ করেন। সাহায্যপ্রার্থী সেই শাসনকর্তাকে বন্দি করে তিনি লাহোর দখল করে নেন। ইব্রাহিম লোদীর ভাই আলাউদ্দীন বাবরের দলে যোগ দেন। প্রথম দফায় আলাউদীনের নেতৃত্বে বাহিনী পাঠান বাবর। তারা পরাজিত হয়। পরবর্তীতে দিল্লী দখলে বাবর নিজেই বাহিনীসমেত অগ্রসর হন। দিল্লীর উত্তরে পাণিপথ নামক স্থানে মহালড়াই বাধে ১৫২৬ সালে। ইব্রাহিম ও তার নিজের লোকদের প্রাণ যায়। সঙ্গে থাকা প্রায় ৪০ হাজার হিন্দু যোদ্ধাও প্রাণ দেন। এভাবেই দিল্লীতে স্থাপিত হয় সুদীর্ঘ মুঘল শাসনামলের ভিত্তি। যা অবধারিতভাবে কিছুকালের মধ্যেই বাংলাকে আন্দোলিত করে।

মুঘল শাসনের আগ অবধি ভারতে মুসলিম শাসনের এই ঘটনাপঞ্জি প্রমাণ করে যে, রাজধর্ম ইসলাম এখানে যতটা না শান্তি প্রচার করেছিল, তার চেয়ে বেশি করেছিল রক্তপাত, আর অবধারিতভাবেই জন্ম দিয়েছিল হিংসা, বিদ্বেষ ও অনাস্থার। ভারতে মুসলিম শাসনামলে এত রক্তপাতের কারণ হিসেবে ঐতিহাসিকরা শাসকদের ধর্মীয় উৎসাহ ও সম্পদের লোভকে দায়ী করেছেন। রবীন্দ্রনাথ তার ‘মুসলমান রাজত্বের ইতিহাস’ প্রবন্ধে সেই উপলব্ধিকে ব্যক্ত করেন এভাবে, ‘ইতিহাসে দেখা যায়… মুসলমানেরা যুদ্ধ করিয়াছে, আর হিন্দুরা দলে দলে আত্মহত্যা করিয়াছে। মুসলমানদের যুদ্ধের মধ্যে এক দিকে ধর্মোৎসাহ, অপর দিকে রাজ্য অথবা অর্থ-লোভ ছিল; কিন্তু হিন্দুরা চিতা জ্বালাইয়া স্ত্রীকন্যা ধ্বংস করিয়া আবালবৃদ্ধ মরিয়াছে’।

যদিও মুসলিম শাসকদের কেউ কেউ রাজধর্মের বাইরে লোকধর্ম হিসেবে ইসলামকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালালেও, মূলধারাটা ছিল তরবারির জোরে ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে মসজিদ প্রতিষ্ঠা। এই ধারার বিকাশ আজো ঘটে চলেছে। শাসকশ্রেণীর ক্ষমতা চর্চ্চার মধ্যে যে ইসলামের উপস্থিতি দেখা যায়, তা আজ অবধি রক্তপিপাসু। পাকিস্তান পর্বে, বাংলাদেশ পর্বে ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত বা ক্ষমতার ছায়ায় বেড়ে ওঠা মুসলিম সংগঠনসমূহ ও তাদের দ্বারা চালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকান্ড বিচার করলেও একই ধারার অস্তিত্ত্ব দেখা যায়। উল্টো দিকে লোকধারায় চলমান মুসলিম চর্চ্চা এর থেকে আজ অবধি বেশ খানিকটা তফাতেই আছে।

গ্রন্থপঞ্জী
————
Elphinstone, The history of India, London, 1843.
ভারতবর্ষের ইতিহাস, কোকা আন্তোনভা, গ্রিগোরি কতোভ্‌স্কি, গ্রিগোরি বোন্‌গার্দ-লেভিন। প্রগতি প্রকাশন। মস্কো, ১৯৮৮।
সত্যেন সেন, ‘বিদ্রোহী কৈবর্ত’। খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি। ঢাকা, ২০০৮।
কার্ল মার্কস। ভারতীয় ইতিহাসের কালপঞ্জী (৬৬৪-১৮৫৮)। প্রগতি প্রকাশন, মস্কো। ১৯৭১।
নিহাররঞ্জন রায়, বাঙালির ইতিহাস (আদিপর্ব), কলকাতা, ১৪০০ বা.স।
JN Sarkar (ed), History of Bengal, vol. II, Dhaka, 1948.
Muhammad Mohar Ali, History of the Muslims of Bengal, vol. 1A, Riyadh, 1985.
সুখময় মুখোপাধ্যায়, বাংলায় মুসলিম অধিকারের আদিপর্ব (বাংলা), কলকাতা, ১৯৮৮।
আব্দুল করিম, বাংলার ইতিহাস (সুলতানী আমল), ঢাকা, ১৯৭৭।
ABM Shamsuddin Ahmed, Bengal under the Rule of the Early Iliyas Shahi Dynasty, Unpublished Thesis, Dhaka University, Dhaka, 1987।
সুখময় মুখোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাসের দুশো বছর: স্বাধীন সুলতানদের আমল, কলকাতা, ১৯৬২।
The Imperial Gazetteer of India, New edition, Oxford, Clarendon Press, 1908-1931 [v. 1, 1909]
একেএম আবদুল আলীম, ভারতে মুসলিম রাজত্বের ইতিহাস। মওলা ব্রাদার্স। ঢাকা। ২০১১।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.