এপ্রিল ফুল (April Fool): ইসলামকে ধবংস করার সুক্ষ্ম ফাঁদ

0
327
April 1
April 1

এপ্রিল ফুল (April Fool)। একটি প্রতারণা। জঘণ্যতম ও বর্বরতার উল্লাসের একটি বেদনাদায়ক উপাখ্যান। এর অর্থ এপ্রিলের বোকা। প্রতি বছর ১ এপ্রিল একে অপরকে বোকা বানিয়ে নিজেকে চালাক প্রতিপন্ন করার জন্য এক শ্রেণির লোককে বিশেষভাবে তৎপর হয়ে উঠতে দেখা যায়। এ উপলক্ষে এসব লোকেরা বিভিন্ন রকমের ক্রীড়া-কৌতুকে মেতে উঠে।
মূলত ১ এপ্রিল বলে স্পেনের গ্রানাডায় মুসলিমদেরকে মিথ্যা ছল-চাতুরির ফাঁদে ফেলে আগুন জালিয়ে ধবংস করে দেওয়ার জঘন্যতম কান্ডকে বুঝানো হলেও এই এপ্রিলে অপরকে বোকা সাব্যস্ত করে তামাশা করার প্রচলন আরো আেিগ থেকেই শুরু হয়। আর সে সূত্র ধরেই স্পেনের গ্রানাডায় হৃদয় বিদারক এ বর্বরতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
সর্বপ্রথম এপ্রিল ফুলের প্রচলন শুরু করে ফ্রান্সের জনগণ। সারা বিশ্বে বর্তমানে ইংরেজি নববর্ষ যেমন জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হয়, ঠিক সেখানে ফ্রান্সের লোকেরা ১৭০০ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত তাদের বছরের সূচনা করতো এপ্রিল মাস দিয়ে।
এপ্রিল একটা গ্রীক শব্দ। ফ্রান্সের জনগণ এপ্রিল নামক তাদের এক দেবতার পূজা করতো। সে দেবতার নামেই বছরের প্রথম মাস গণনা শুরু করতো। এছাড়াও এপ্রিল মাসে তারা এ দেবতার নামে নানা রকমের আচার-অনুষ্ঠান এবং পূজা-অর্চনা ইত্যাদির আয়োজন করতো। এগুলোর একটি হলো অপরকে ধোঁকা দিয়ে বোকা সাব্যস্ত করা। এটা ছিলো তাদের খেলার একটা অংশও। ক্রমান্বয়ে এটা মানব সমাজে প্রচলিত হয়ে পুরো পৃথিবীতে পালিত হতে শুরু করে।

‘‘এ্যানসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটেনিকা’’ নামীয় বিশ্বকোষের প্রথম খন্ডে উল্লেখিত একটি কলামে এপ্রিল ফুল সম্পর্কে আরেকটি কারণ লিখা হয়েছে। তা হলো- ২৬ মার্চ থেকে শুরু করে ইউরোপ মহাদেশে ঋতুর পরিবর্তন শুরু হতো। অর্থাৎ ২১ মার্চের আগে সেখানে শীত থাকতো। আর ২১ মার্চ থেকে প্রকৃতির মাঝে পরিবর্তন আসতে থাকতো। তখন লোকেরা মনে করতো, প্রকৃতি আমাদের সাথে তামাশা শুরু করেছে। এতদিন প্রকৃতি এক রকম ছিলো, এখন অন্য রকম হয়ে গেছে। এভাবে চলতে চলতে এপ্রিল মাস শুরু হতে হতে প্রকৃতি পুরোটাই পরিবর্তিত হয়ে যেতো। তখন এ কারণে প্রকৃতি তামাশা করছে বলে লোকেরাও এপ্রিল মাসের প্রথম দিনে এক অপরের সাথে তামাশা শুরু করতো। এভাবেই এপ্রিল ফুলের প্রচলন ঘটে।
তবে এপ্রিল ফুলের বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রসার ঘটে স্পেনের করূণ কাহিনীর সূত্র ধরে। এই স্পেন ছিলো মুসলিম জাতির। আরব থেকে মুসলিম বাহিনীর বিশ্বজয়ের ধারাবাহিকতায় যখন স্পেনের উপকুলে মুসলিম বাহিনীর জাহাজ এসে ভিড়লো, তখন মুসলিম সেনাপতি উচ্চকন্ঠে বললেন- হে মুসলিম বাহিনীর যোদ্ধাগণ! তোমাদের সামনে শত্র“সেনা আর পিছনে ভূ-মধ্যসাগরের উত্তাল তরঙ্গমালা। এখন তোমরা কি ভূ-মধ্যসাগরে ডুবে আত্মহত্যা করতে চাও? নাকি অত্যাচারি স্পেনীয় শাসক রডারিকের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেনের বুকে বিজয় পতাকা ওড়াতে চাও? তা হলে ামনে অগ্রসর হও।
৭১১ খৃষ্টাব্দে মুসলিম বাহিনীর পুরো নৌবহরকে ভূ-মধ্যসাগরের তীরে জালিয়ে দিয়ে সেনাপতি যখন এ ঘোষণা দিলেন, তখন রডারিকের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করে মুসলিম বাহিনীর মাত্র কয়েকজন নিবেদিত সেনা স্পেন জয় করে সেখানে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করেন। তখন থেকেই ইসলাম ও ইউরোপের অধ্যায়ে নতুন ইতিহাসের সূচনা হয়। এরপর প্রায় ৮০০ বছর ধরে মুসলিমরাই স্পেন শাসন করে। গ্রানাডা-কর্ডোভার মত বৃহৎ নগরগুলোতে গড়ে উঠেছিলো বিশাল মসজিদ-পাঠশালা ও দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্র। সেখানে বসে ইসলামের আলিমগণ কুরআন-সুন্নাহর দরস দিতেন। স্পেনের এসব মসজিদগুলোতেই কুরআনের বড় বড় তাফসীরের কিতাব রচিত হয়। এককালে কর্ডোভা শহরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এটাই ছিলো পৃথিবীর বুকে প্রথম ইসলামের বিশ্ববিদ্যালয়। এমনকি খৃষ্টানরাও তৎকালীন সময়ে পড়ালেখার জন্য স্পেনের মসজিদে আসতো।

তখন এই স্পেন থেকে শিক্ষা ও জ্ঞানের বিপ্লব ঘটে। বিভিন্ন বিদ্যা শাস্ত্রীয় আকারে প্রতিষ্ঠিত রূপ পায় এ স্পেন থেকেই। এভাবেই ন্পেন ও ইউরোপজুড়ে গড়ে উঠেছিলো ৮০০ বছরের এমন এক ইসলামী সভ্যতা- যা সারা ইউরোপে শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো।
কিন্তু কালের পরিক্রমায় এ গৌরবময় ইতিহাস বেশিদিন টিকেনি। মুসলিম শাসকদের নৈতিক অধঃপতন এবং কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা থেকে ক্রমান্বয়ে দূরে সরে পড়ার কারণে খৃষ্টবাহিনীর জন্য পথ পরিস্কার হতে শুরু করে। ইসলামের চেতনা ও শিক্ষার দূর্বলতার সুযোগে ধীরে ধীরে তারা চারদিক থেকে স্পেন ঘিরে ফেলে।
খৃষ্টজাতির শাসকেরা সংগঠিত হয়ে ঘোষণা দিতে শুরু করে- পিরিনিজ পর্বতমালা আক্রমণকারী দুর্ধর্ষ মুসলিম বাহিনীকে যদি বিতাড়িত করা না যায়, তা হলে আগামী দিনগুলোতে ইউরোপের সকল গির্জা থেকে আযানের ধ্বনি শোনা যাবে।
এর সাথে সাথে বিজয়কে তরান্বিত করার লক্ষ্যে পর্তুগিজ রানী ইসাবেলা পাশ্ববর্তী রাজ্যের রাজা ফার্ডিন্যান্ডের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। নব দম্পতি রাজা-রানী উভয়ে খৃষ্টবাহিনীর নেতৃত্ব দেন। এদিকে খৃষ্টবাহিনী তৎকালীন মুসলিম খলীফাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ব্যর্থ হয়ে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করলো। তখনকার খলীফা ছিলেন হাসান। খলীফা হাসানের ছেলের নাম ছিলো আবু আব্দুল্লাহ। খৃষ্টবাহিনীর সালারগণ খলীফার ছেলে আবু আব্দুল্লাহকে ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে জন্মদাতা পিতা খলীফা হাসানের বিরুদ্ধে উসকে দিলো। পুত্র আবু আব্দুল্লাহ বিদ্রোহ করে বসলে খৃষ্টবাহিনী তাকে সমর্থন দিলো। ফলে পিতা হাসান কোনো উপায় না দেখে কাপুরুষের মতো পালিয়ে গেলেন।

পরিশেষে খৃষ্টান জাতি আবু আব্দুল্লাহকে ক্ষমতায় বসিয়ে তার কাছ থেকে কৌশলে মুসলিম জাতির তখনকার শাসনকেন্দ্র পৃথিবী বিখ্যাত আল-হামরা প্রাসাদের চাবি নিয়ে নিলো। এরপর খৃষ্টানরা আরেক চক্রান্তে মেতে উঠে। তারা আবু আব্দুল্লাহকে বলতে লাগলো- তুমি একজন গাদ্দার! পিতার সাথে তুমি ক্ষমতা নিয়ে গাদ্দারি করেছো। তাঁর বিরুদ্ধে তুমি বিদ্রোহ করেছো। অথচ এটা তারাই করিয়েছিলো। এভাবে খৃস্টান জাতি পিতা ও পুত্রের মাঝে ক্ষমতার মোহ ঢুকিয়ে রাজনৈতিক দ্বন্দ লাগিয়ে দেয়।
এরপর কিছু মুসলিমকে খৃস্টানরা মরক্কোতে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা বলে বন্দর থেকে জাহাজে উঠার প্রস্তাব দেয়। ভূ-মধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে যখন মুসলিম শরনার্থীরা মাঝ সাগরে পৌঁছালো, তখন তারা মুসলিমদের বহনকারী জাহাজে আগুন লাগিয়ে দিয়ে উল্লাসে মেতে উঠে।
পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে ইসলাম ও মুসলিম জাতির প্রতিকুল হতে থাকে আর খৃস্টানরা স্পেন ঘেরাও করতে শুরু করে। মুসলিম বাহিনী কোনো উপায় না দেখে রাজধানী গ্রানাডায় আশ্রয় নেয়। আর এদিকে খৃস্টবাহিনী ক্রমশ অগ্রসর হতে থাকে। অবশেষে ফার্ডিন্যান্ড-ইসাবেলার যৌথবাহিনীও গ্রানাডায় এসে পৌঁছায়। রাজধানী গ্রানাডা অবরোধ করে খৃস্টবাহিনী মুসলিমদের সাথে শেষ প্রতারণা করে।
ফার্ডিন্যান্ড ঘোষণা দেয়- মুসলিমগণ যদি শহরের ফটক উম্মুক্ত করে দেয় এবং এবং নিরস্ত্র অবস্থায় মসজিদে আশ্রয় নেয়, তা হলে বিনা রক্তপাতে তাদেরকে মুক্তি দেওয়া হবে। ভীত সন্ত্রস্থ মুসলিম বাহিনী আল্লাহ তা’আলার ওপর ভরসা না রেখে যুদ্ধের বিরতি করে এবং ফার্ডিন্যান্ডের কথামতো মসজিদে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

কিন্তু রাজা ফার্ডিন্যান্ড তার কথা না রেখে মুসলিমদের সাথে চরম পর্যায়ের তামাশার খেলা খেলে। মসজিদের চারিদিকে সে আগুন লাগিয়ে হাজার হাজার মুসলিমকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। অনেক মুসলিমকে বলপূর্বক খৃস্টান করা হয়। সেদিন ছিলো ১ এপ্রিল ১৪৯২ সন।
এভাবেই ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ৮০০ বছরের গড়ে উঠা কালজয়ী ইসলামী সভ্যতা খৃস্টান রাজা ফার্ডিন্যান্ডের প্রতারণায় জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যায়। স্পেনের গ্রানাডার রাজপথে বইতে অসংখ্য মুসলিমের তাজা খুন।
মুসলিমরা যখন তাজা খুনে ভেসে যেতে থাকে এবং মসজিদগুলো আগুনে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছিলো, তখন ফার্ডিন্যান্ড উল্লাসের হেসে মেতে উঠে। সে বলতে থাকে- হায় মুসলিম! তোমরা এপ্রিলের বোকা (অঢ়ৎরষ ঋড়ড়ষ)।
খৃস্টানজাতি কর্তৃক মুসলিমদেরকে বোকা বানিয়ে এই নিষ্ঠুর বিশ্বাসঘাতকতাকে অবিস্মরণীয় করে রাখার জন্য পশ্চিমা জগত প্রতি বছরের ১ এপ্রিলে খেলে জঘণ্য রসিকতার খেলা। আর মুসলিমদেরকে নিয়ে উপহাস ও নির্লজ্জ হাসিতে তারা এদিন মেতে উঠে। যা সত্যিই অত্যন্ত নির্মম ও বেদনাদায়ক।
এখন যারা মুসলিম হয়ে স্বীয় জাতির প্রতি প্রতারণাকারী খৃস্ট জগতের সাথে প্রতি বছর ১ এপ্রিলে একে অপরকে বোকা বানিয়ে তামাশায় মেতে উঠে, তাদের কী বলা যেতে পারে? এটা ভাবাই মুশকিল হয়ে পড়ে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.