কুরআনুল কারীম কেনো সর্বশ্রেষ্ঠ ?

0
1008
reading quran
reading quran


শায়খ আল্লামা আব্দুল মালেক

আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে যত নিয়ামত দান করেছেন- এগুলোর মধ্যে ঈমানের পর সর্বোত্তম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত হলো কুরআন ও কুরআনের ইলম। তিনি আমাদেরকে কুরআন দিয়েছেন এবং সাথে সাথে তিনি আমাদেরকে কুরআনের ইলম দ্বারা ভূষিত করেছেন; এর চেয়ে মূল্যবান নিয়াম কিংবা সৌভাগ্য আর হয় না। হতেও পারে না।
কারণ সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্ব ও তাদের ভারসাম্য একমাত্র কুরআনের ওপরই নির্ভর করে। অর্থাৎ কুরআন থাকলে মানব জাতির অস্তিত্ব থাকবে; কুরআনের সাথে সম্পর্ক থাকলে মানব জাতির ভিতর মানবতা থাকবে। অন্যথায় মানব জাতি অস্তিত্বে থাকেব ঠিক, কিন্তু এদের ভিতর থাকবে না কোনো মানবতা। আকারে হবে ইনসান তথা মানব, কিন্তু ভিতরে হবে হাইওয়ান অর্থাৎ পাশবিকতায় এ মানবগুলো ছেয়ে যাবে।

এছাড়া আল্লাহ তা’আলা কুরআনের কথাকে তাঁর গুণবাচক নাম রহমান-এর সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। এ প্রসঙ্গে শায়খুল হাদীস মুহতারাম হযরত আযীযুল হক রহ. বলতেন-
আল্লাহ তা’আলার একেকটি নিয়ামত তাঁর একেকটি গুণবাচক নামের সাথে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে কুরআনের মতো মহিমান্বিত নিয়ামত আল্লাহ তা’আলার অন্যতম গুণবাচক নাম রহমান-এর সাথে সম্পৃক্ত। এটা এ কথারই ইঙ্গিত বহন করে যে, কুরআন আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ। তিনি দয়া করে অনুগ্রহ করেই এ কুরআন আমাদেরকে দান করেছেন। যথা- আল্লাহ তা’আলা মানব জাতিকে লক্ষ্য করে ইরশাদ করেন-
الرحمن- علم القرآن- خلق الإنسان-
অর্থঃ তিনি হলেন রহমান। তিনি শিখিয়েছেন কুরআন। আর তিনি সৃষ্টি করেছেন ইনসান।
(সূরা রহমান-১-৩)
উল্লেখ্য, সূরা রহমানের প্রথম এ কয়েকটি আয়াতে আল্লাহ তা’আলা তাঁর অন্যতম গুণবাচক নাম রহমান শব্দ উল্লেখ করেছেন। এরপর তিনি কুরআনের কথা উল্লেখ করেছেন। এর দ্বারাই প্রতীয়মান হয় যে, কুরআনের নিয়ামত আল্লাহ তা’আলার গুণবাচক নাম রহমান- এর সাথে সম্পৃক্ত। তিনি মানব জাতিকে এ কুরআন দান করে তাদের প্রতি কত বড় অনুগ্রহের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন- তা অনুধাবন করতে পারা সত্যিই দুস্কর।

আবার তিনি উপরোক্ত আয়াত সমূহে মানব জাতির সৃষ্টির কথা উল্লেখ করার আগে কুরআন শিক্ষা দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। এ দ্বারা এ কথাই বুঝানো হয়েছে যে, কুরআনের ওপরই মানব জাতির অস্তিত্ব নির্ভর করে। অর্থাৎ কুরআন থাকলে এ মানব জাতির অস্তিত্ব ও তাদের জীবন সার্থক। মানবিকতা ও নৈতিকতার ভারসাম্য সবার মাঝে বজায় থাকবে। আর যদি এ কুরআনকে এড়িয়ে চলা হয় অথবা কুরআনকে অস্বীকার করা হয়, তা হলে মানব জাতির অস্তিত্বে থাকার কোনো মূল্য নেই। তাদের অস্তিত্ব থাকবে ঠিক; চলাফেরা ও পৃথিবীর বুকে নড়াচড়া সবই হবে, কিন্তু তারা আকারে মানব থাকবে। তবে ভিতরে তাদের মানবতা বলতে কিছুই থাকবে না। পাশবিকতা ও ভারসাম্যহীনতা তাদেরকে গ্রাস করে ফেলবে।

উপরোক্ত আয়াতে এ বিষয়ের দিকেই ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে- যে জাতির মধ্যে কুরআনের শিক্ষা, কুরআনের প্রতি ভালোবাসা থাকবে, তারাই সঠিক পথের ওপর থাকবে। তারাই পৃথিবীতে প্রকৃতরূপে সফল জাতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে। যথা- অন্য আয়াতে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
ذلك الكتاب، لا ريب فيه- هدي للمتقين-
র্অথঃ এটা এমন এক কিতাব- যার মধ্যে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এ কিতাব মুত্তাকী লোকদের জন্য হিদায়াতস্বরূপ।
(সূরা বাকারা-২)
এরপর আল্লাহ তা’আলা মুত্তাকী লোকদের পরিচয় উল্লেখ করার পর পরের আয়াতে ইরশাদ করেন-
أؤلئك علي هدي من ربهم، وأؤلئك هم المفلحون-
অর্থঃ তাঁরাই তাঁদের রবের পক্ষ থেকে হিদায়াতের ওপর রয়েছে এবং তাঁরাই প্রকৃত সফলকাম। (সূরা বাকার-৫)
এছাড়া হাদীসে নববীতে এ কুরআনের মর্যাদার স্বীকৃতি দিতে গিয়ে কুরআনওয়ালার প্রতি এমন সম্মান ও পুরস্কারের কথা বলা হয়েছে- যা সচরাচর অন্য কোনো ক্ষেত্রে বলা হয়নি। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
يقال لصاحب القرآن: اقرأ وارتق ورتل كما كنت ترتل في الدنيا- فإن منزلتك عند آخر آية تقرأها-
কিয়ামতের দিবসে সাহিবে কুরআনকে (কুরআনের আলিমকে) তুমি কুরআন পড়তে থাকো এবং জান্নাতের স্তরসমূহে উন্নীত হতে থাকো। আর তুমি থেমে থেমে পড়ো, যেভাবে তুমি পৃথিবীর বুকে থেমে থেমে কুরআন পড়তে। আর জান্নাতে তোমার সর্বোচ্চ মর্যাদা ও স্তর সেখানেই হবে, যেখানে তুমি কুরআন পড়তে পড়তে শেষ আয়াতে গিয়ে পৌঁছাবে। (মুসনাদে আহমাদ; সুনানে তিরমিযী; সুনানে আবি দাউদ; সুনানে নাসায়ী; সহীহ ইবনে হিব্বান)

উক্ত হাদীসের প্রেক্ষিতে অনেকে বলে থাকেন- কিয়ামতের দিবসে সাহিবে কুরআন তথা কুরআনের হাফিয যে আয়াতে গিয়ে তিলাওয়াত শেষ করবেন, সেখান পর্যন্তই জান্নাতে তাঁর ঠিকানা হবে। অথবা এভাবে বলা হয়- যে কয়টি আয়াত সাহিবে কুরআন তিলাওয়াত করবেন, জান্নাতে তাঁর সে পরিমাণ তলাবিশিষ্ট বাড়ি হবে।
হাদীসে নববীর আলিমগণের ব্যাখ্যানুযায়ী উক্ত হাদীসের অর্থের প্রতি লক্ষ্য রেখে উপরোক্ত দুটি ব্যাখ্যারই অবকাশ রয়েছে। অর্থাৎ সাহিবে কুরআন তিলাওয়াত করতে করতে যেখানে গিয়ে থেমে যাবেন, সেখান পর্যন্ত মর্যাদার স্তরে তিনি উন্নীত হবেন।
অথবা যে কয়টি আয়াত তিলাওয়াত করা হবে, সে পরিমাণ তলাবিশিষ্ট জান্নাতের বাড়ি হবে। যথা- ১০০ আয়াত তিলাওয়াত করলে তাঁর বাড়িও ১০০ তলাবিশিষ্ট বাড়ি হবে। আর যদি পুরো কুরআন তিলাওয়াত করেন, তা হলে তাঁর বাড়ির তলা হবে ৬২৩৬ টি। অনেকে কুরআনের আয়াতের সংখ্যা ৬৬৬৬ বলে থাকেন; মূলত এটা ভুল হিসাব। কুরআনের প্রথম সূরা ফাতিহা থেকে শুরু করে সর্বশেষ সূরা নাস পর্যন্ত প্রত্যেক সূরার শুরুতে উক্ত সূরার মোট আয়াতের সংখ্যা উল্লেখ করা আছে। প্রত্যেক সূরার মোট আয়াতের সংখ্যা যোগ করলে পুরো কুরআনের সর্বমোট আয়াতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬২৩৬ টি। সুতরাং যে সাহিবে কুরআন প্রকৃত বদলা ও পুরস্কার প্রাপ্তির দিন তথা কিয়ামতের দিবসে পুরো কুরআন তিলাওয়াত করবেন, তাঁকে ৬২৩৬ তলাবিশিষ্ট বাড়ি দেওয়া হবে। যে বাড়ি শেষ হয়ে যাওয়া তো দূরের কথা, ক্ষয় হওয়ারও কোনো আশংকা নেই।

তবে এ কথা লক্ষ্যণীয় যে, হাদীসের বক্তব্য অনুযায়ী যে মর্যাদাই দেওয়া হোক না কেনো, কখনোই এ কথা মনে করা যাবে না যে, সাহিবে কুরআনের মর্যাদা শুধু এতোটুকুই- যা উপরোক্ত হাদীসে ইরশাদ করা হয়েছে। এছাড়া সাহিবে কুরআনের আর কোনো মর্যাদা হতে পারে না। কারণ এ মর্যাদার প্রকৃতি কিংবা মর্ম একমাত্র আল্লাহ তা’আলাই ভালো জানেন।
এ জন্য আমরা কুরআনের ইলম অর্জন করবো। শুধু কুরআন পড়া শিখেই ক্ষ্যান্ত করবো না; বরং আমরা কুরআন হিফয করবো। আবার হিফয করেই শেষ করে দিবো না; বরং হিফয করার পর কুরআনের ইলমও আমাদেরকে অর্জন করতে হবে। অন্যথায় কুরআনের হক যথাযথ আদায় করা হলো না।
বর্তমানে আমাদের প্রচলিত সমাজে দেখা যায়, অনেক স্থানেই কুরআন হিফয করা শেষ হওয়ার পর কুরআন শিক্ষা ছেড়ে দেওয়া হয়। অনেকেই মনে করে থাকেন, কুরআন হিফয তো শেষ হয়ে গেছে, তাই এখন কুরআন পড়ার আর প্রয়োজন নেই। এখন অন্য পড়া শুরু করতে হবে। কুরআনের পড়া তো শেষ হয়ে গেছে। অথচ হিফযের মাধ্যমে কুরআন পড়া শেষ হয়নি; বরং কুরআনকে বুকে ধারণ করা হয়েছে মাত্র। এখন এ কুরআনের ইলম অর্জন এবং কুরআনের শিক্ষার প্রসার করতে হবে।
এ জন্য আমি মনে করি- শুধু কুরআন হিফয করেই কুরআনের শিক্ষার পরিসমাপ্তি করা সম্পূর্ণ বিদ’আত। নববী যামানা থেকে শুরু করে সাহাবী-তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীনগণের কারো সময়েই এ বিদ’আতের প্রচলন ছিলো না। সর্বযুগেই কুরআন হিফযের সাথে সাথে কুরআনের ইলম অর্জন এবং এর চর্চার ধারা অব্যাহত ছিলো।

সুতরাং আমাদেরকেও কুরআনের শিক্ষা পূর্ণরূপে অর্জন করতে হবে। শুধু হিফয করলেই যথেষ্ট হবে না। এর সাথে কুরআনের সাথে সম্পর্ক করে তা অনুযায়ী আমল করতে হবে। নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াতও করতে হবে। কুরআওেনর প্রতি পূর্ণ ঈমানও রাখতে হবে। কারণ ঈমান ছাড়া তো কোনো কিছুরই মূল্য নেই। এরপর কুরআন শিক্ষার প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে যথাসাধ্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
মোটকথা, আমি মু’মিন বিল কুরআন (কুরআনের প্রতি ঈমান আনয়নকারী) হবো, হাফিযুল কুরআন (কুরআনের হাফিয) হবো, কারিউল কুরআন (কুরআন পাঠকারী) হবো, তালিল কুরআন (কুরআন তিলাওয়াতকারী) হবো, আলিম বিল কুরআন (কুরআনের ইলম অর্জনকারী) হবো, আমিল বিল কুরআন (কুরআন অনুযায়ী আমলকারী) হবো, দায়ী ইলাল কুরআন (কুরআনের দিকে আহবানকারী) হবো।
এ সবগুলো যখন আমাদের ভিতর এসে যাবে, তখন কুরআনের নিয়ামতের হক যথাযথ আদায় হবে। ইনশা-আল্লাহ….

শ্র“তিলিখন ও সম্পাদনা- আব্দুল্লাহ আল মাসূম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.