কুরআনের তাজবীদ কী ও কেনো??

0
2515
Tajweedul Quran
Tajweedul Quran

তাজবীদের পরিচয়
তাজবীদের শাব্দিক অর্থঃ
تجويد শব্দটি হলো মাসদার। এর অর্থ সুন্দর করা।
তাজবীদের পারিভাষিক অর্থ
পরিভাষায় তাজবীদ হলো হরফ সমূহকে হক অনুযায়ী আদায় করা। এবং প্রতিটি হরফ মূল মাখরাজ এবং সিফাত অনুযায়ী আদায় করা, তার সমকক্ষ হরফের সাথে তাকে যুক্ত করা, শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করা, সাধ্যমত পরিপূর্ণরূপে আদায় করা, কোনো রকম কম-বেশি, বাড়াবাড়ি এবং লৌকিকতা ছাড়া তা আদায় করা।
ইলমে কিরাআতের পরিভাষায় তারতীল সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করাকে তাজবীদ বলে। আর যে নিয়ম-নীতি কিংবা বিধি-বিধান অধ্যয়ন করলে তারতীলের বিধান ও নিয়ম-নীতি সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়- তাকে ইলমে তাজবীদ বলে।

তাজবীদের গুরুত্ব
আল্লাহ তা’আলা তাঁর মর্যাদাপূর্ণ কিতাব কুরআনকে তারতীলের সাথে তিলাওয়াত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ সম্পর্কে তিনি কুরআনে ইরশাদ করেন- ورتل القرآن ترتيلا-
অর্থঃ তোমরা তারতীল সহকারে কুরআন তিলাওয়াত করো। (সূরা মুযযাম্মিল-৪)
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা’আলা তারতীলের সাথে কুরআন তিলাওয়াত করার নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব তারতীলের সাথে কুরআন তিলাওয়াত করা ফরযে আইন। আর তারতীল বলা হয় আরবী প্রত্যেকটি হরফকে তার নির্দিষ্ট মাখরাজ থেকে সিফাত অনুযায়ী যথাযথভাবে আদায় করাপূর্বক উচ্চারণ করাকে।
সাহাবী আলী রাযি. উক্ত আয়াতের তাফসীরে বলেন-
তারতীল অর্থাৎ অক্ষর সমূহ সুন্দর করে আদায় করা, ওয়াকফের স্থান সমূহ জানা, আর ওয়াকফ হলো ওই সকল উত্তম স্থান- (আয়াতের শেষ স্থান) যেখানে শ্বাস ফেলা হয়।
এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, কুরআন শুদ্ধ করে পড়ার দ্বারা মুসলমান ইবাদতকারীরূপে গণ্য হয়। যথা- সে ইবাদতকারীরূপে গণ্য হয় কুরআনের অর্থের বিষয়ে চিন্তা করা দ্বারা এবং কুরআনের বিধান প্রতিষ্ঠা করার দ্বারা।
এজন্যই আলিমগণ তাজবীদ ছাড়া পড়াকে ভুল (লাহন) বলে গণ্য করেছেন। আর যে এভাবে পড়ে- তাকে লাহনকারী বলেছেন। লাহনকে তারা দুই ভাগে ভাগ করেছেন। جلي (জালি) এবং خفي (খফী)। জালি হলো- প্রকাশ্য ভুল- যা সাধারণ মানুষ এবং কুরআনের আলিম সকলেই বুঝতে পারেন। যথা- হরকত বা হরফ পরিবর্তন করে পরা।
অপরদিকে খফী হলো- তিলাওয়াতের সৌন্দযের্র বিষয়ে ভুল করা- যা শুধুমাত্র কুরআনের আলিম এবং ইমামগণই বুঝতে পারেন। যথা- ر কে তাকবীর করে পড়া এবং হরকতের স্থানে থামা ইত্যাদি।

তাজবীদ শিক্ষা করার বিধান
হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. বলেন-
তাজবীদ শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরয। কেননা কুরআন আরবী ভাষায় নাযিল হয়েছে। আর কুরআন আরবী ভাষায়ই তিলাওয়াত করা ফরয। আর তাজবীদ শিক্ষা করা ছাড়া আরবী ভাষার সঠিক ও যথাযথ উচ্চারণ সম্ভব নয়। সুতরাং তাজবীদ শিক্ষা করা ফরয।
প্রত্যেক হরফকে তার মাখরাজ (উদয়স্থল) থেকে উচ্চারণ এবং সিফাতসমূহ যথাযথ ভাবে আদায় করার নাম তাজবীদ। যে স্থান থেকে হরফ উচ্চারিত হয়- তাকে মাখরাজ বলা হয়। আর আরবী হরফের মাখরাজ সর্বমোট ১৭টি।
অপরদিকে যে অবস্থা ও পদ্ধতিতে হরফ উচ্চারিত হয়- তাকে সিফাত বলে। সিফাত দুই প্রকার।

প্রথমতঃ ওই সিফাত- যা অনুসরণ না করলে হরফই বদলে যায়। এমন সিফাতকে সিফাতে যাতিয়া (সত্তাগত গুণ) কিংবা সিফাতে লাযিমা (আবশ্যকীয় গুণ) বলে।
দ্বিতীয়তঃ ওই সিফাত- যা আদায় না করলে হরফ ঠিক থাকে বটে, কিন্তু তিলাওয়াতের সৌন্দর্য এবং মাধুর্য্যতা নষ্ট হয়ে যায়। এমন সিফাতকে সিফাতে আরিযা (সৌন্দর্যদায়ক গুণ) বলে।

সিফাত শিক্ষা করার বিধান
প্রত্যেক ভাষার বিশুদ্ধ উচ্চারণ ওই ভাষা নিজস্ব পদ্ধতিতে আদায়ের উপর নির্ভরশীল। যথা- উর্দূতে অনেক শব্দ আছে, যেগুলোতে ن (নূন) সাকিন হওয়া সত্ত্বেও নূনকে তার মাখরাজ থেকে বের করা হয় না; বরং নাকের বাঁশি থেকে বের করা হয়। উর্দু ভাষার পরিভাষায় একে নুনে গুন্নাহ বলা হয়।
এটা হলো ইযহার (সুস্পষ্ট করে পড়া) এবং ইদগাম (মিলিয়ে পড়া) -এর মাঝামাঝি একটি অবস্থান। এখন যদি কোনো ব্যক্তি উর্দুর এ জাতীয় শব্দগুলোর নূন স্পষ্ট করে পড়ে, যথা- পাঙ্খা শব্দকে পানখা অথবা রং শব্দকে রনগ বলে, তা হলে নিশ্চয়ই শব্দটি ভুল হবে এবং তখন এ শব্দগুলো আর উর্দূ-ফার্সীর শব্দের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে অর্থহীন শব্দে পরিণত হয়ে যাবে।

সুতরাং এভাবেই আরবী ভাষার ইদগাম শব্দে (গুন্নাহর সহিত মিলিয়ে পড়া) -এর স্থানে ইযহার (গুন্নাহ ছাড়া স্পষ্ট করে পড়া) করে পড়লেও শব্দটি আরবী থাকে না। অথচ কুরআন নাযিল হয়েছে আরবী ভাষায়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
إنا أنزلناه قرآنا عربيا- لعلكم تعقلون-
অর্থঃ আমি কুরআনকে এ জন্যই আরবী ভাষায় নাযিল করেছি, যাতে তোমরা কুরআন বুঝতে পারো (সূরা ইউসুফ-২)
إنا جعلناه قرآنا عربيا-
অর্থঃ আমি কুরআনকে আরবী ভাষায় নাযিল করেছি। (সূরা যুখরুফ-৩)
অন্য স্থানে তিনি আরো ইরশাদ করেন- بلسان عربي مبين-
কুরআন নাযিল হয়েছে সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়। (সূরা শু’আরা-১৯৫)
এ আলোকে কুরআন যেহেতু আবরী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে আর কুরআন আরবী ভাষাতেই তিলাওয়াত করতে হবে, সুতরাং আরবী ভাষার সহীহ উচ্চারণ তাজবীদের যথাযথ অনুসরণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য হয় না।
অতএব কেউ যদি তাজবীদের পরিপন্থি তিলাওয়াত করে, তা হলে সে যেনো আরবীতে তিলাওয়াত করলো না। অতএব সিফাত শিক্ষা করার গুরুত্ব কিংবা প্রয়োজনীয়তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আরবী হরফের মাখরাজের গুরুত্ব
আমরা জানি, আরবী-ফার্সী এবং উর্দূ প্রত্যেকটি ভিন্ন ভিন্ন ভাষা এবং প্রত্যেকটি ভাষার আলাদা নিজস্ব বৈশিষ্ট ও গুণাবলী রয়েছে। কোনো শব্দ ফার্সী বা উর্দূ হওয়ার জন্য যেমন সঠিক উচ্চারণ প্রয়োজন তেমনিভাবে কোনো শব্দ আরবী হওয়ার জন্যও আরবী ভাষায় তার সঠিক উচ্চারণ হওয়া প্রয়োজন। যথা- আরবী ভাষায় যে শব্দে ح রয়েছে সেখানে ه অথবা ص -এর স্থলে س পড়ার দ্বারা ভুল উচ্চারিত হবে এবং অর্থ পরিবর্তন হয়ে যাবে। এভাবে অনেক ক্ষেত্রে আরবী হরফের উচ্চারণে সামান্য এদি-ওদিক হয়ে যাওয়ার ফলে কুরআনের কোনো আয়াতে কিংবা শব্দে ঈমানের অর্থ কুফরির অর্থে রূপান্তরিত হয়ে যায়। সুতরাং আরবী মাখরাজের গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

আরবীর উচ্চারণ এবং বাকভঙ্গির প্রয়োজনীয়তা
প্রত্যেক ভাষার একটি বিশেষ উচ্চারণ পদ্ধতি ও বাকভঙ্গি রয়েছে। যথা- ফার্সীর উচ্চারণ ভঙ্গি ভিন্ন, ইংরেজির উচ্চারণ ভঙ্গি ভিন্ন এবং বাংলা ও উর্দূর উচ্চারণ ভঙ্গিও ভিন্ন ভিন্ন। প্রতিটি ভাষার উচ্চারণ ভঙ্গির আলাদা আলাদা মর্যাদা রয়েছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় যে, এই উচ্চারণ ভঙ্গিকেই আরবীর ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
আধুনিক শিক্ষিত সমাজে এটাকে অতিরিক্ত এবং অর্থহীন মনে করা হয়। তারা কুরআন তিলাওয়াত করার ক্ষেত্রে আরবীর উচ্চারণ এবং বাকভঙ্গির বিরোধী এবং এটাকে তারা অতিরিক্ত ও অর্থহীন বলে মন্তব্য করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে এ সবই কুরআনের প্রতি তাদের উদাসীনতার নিদর্শন।

তথ্যসূত্রঃ তাজবীদুল কুরআন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.