কুরআন মাজীদের প্রতি আমাদের হক সমূহ-শায়খ আল্লামা আব্দুল মালেক

0
670
quran research
quran research

আমাদের ওপর কুরআন মাজীদের বহু হক রয়েছে। তার মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হকসমূহ নিচে উল্লেখ করা হলো-

১. কুরআন মাজীদের প্রতি পরিপূর্ণ উপলব্ধির সাথে ঈমান আনয়ন
এ ঈমানের কয়েকটি দিক আছে। যথা-
এক. বিশ্বাস রাখতে হবে যে, এটা আল্লাহ তা’আলার কালাম- যা তিনি তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি নাযিল করেছেন। এ কিতাব যে আল্লাহ তা’আলার পক্ষ হতে অবতীর্ণ এবং এর যাবতীয় বিষয়বস্তু সত্য, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এতেও কোনো সন্দেহ নেই যে, নাযিলের সময় থেকে আজ অবধি এ কিতাব যথাযথভাবে সংরক্ষিত আছে এবং কিয়ামতকাল পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে। সুতরাং আমরা এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে, বর্তমানে গ্রন্থাকারে যে কুরআন আমাদের হাতে আছে, যা সূরা ফাতিহা দ্বারা শুরু হয়ে সূরা নাস -এ সমাপ্ত হয়েছে, এটাই আল্লাহ তা’আলার সেই কিতাব, যা নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি নাযিল হয়েছিলো।
দুই. বিশ্বাস রাখতে হবে, মানুষের হিদায়াত ও সফলতা কুরআনের প্রতি ঈমান আনার মধ্যেই নিহিত। এ ঈমানের মাধ্যমেই মানুষ তার প্রতিপালক আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি লাভ করতে ও আখিরাতের মুক্তি পেতে পারে। যে ব্যক্তি এ কুরআনকে নিজের দিশারী ও আদর্শ রূপে গ্রহণ করবে, দোজাহানের সফলতা কেবল তারই নসীব হবে।
তিন. কুরআনের প্রতি ঈমান কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন সম্পূর্ণ কুরআনের প্রতি ঈমান আনা হবে। কুরআন মাজীদের কিছু বিধান মানা ও কিছু না মানা এবং কুরআন মাজীদকে জীবনের ক্ষেত্র বিশেষে সিদ্ধান্তদাতা বলে স্বীকার করা ক্ষেত্র বিশেষে স্বীকার না করা, সম্পূর্ণ কুফরি আচরণ। পুরো কুরআনকে অস্বীকার করা যে পর্যায়ের কুফর, এটাও ঠিক সে রকমেরই কুফর।
চার. কুরআন মাজীদের প্রতি ঈমান গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য এটাও শর্ত যে, তা নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা মোতাবেক হতে হবে, যে শিক্ষা মহান সাহাবীগণ থেকে প্রজন্ম পরম্পরায় চলে আসছে। সুতরাং কোনো আয়াতকে তার প্রজন্ম পরম্পরায় চলে আসা সর্ববাদীসম্মত ব্যাখ্যার পরিবর্তে নতুন কোনো ব্যাখ্যায় গ্রহণ করলে সেটা কুরআন মাজীদকে সরাসরি অস্বীকার করার নামান্তর ও সেই রকমেরই কুফরি বলে গণ্য হবে।

২. কুরআন মাজীদের আদব ও সম্মান রক্ষা করা
কুরআন মাজীদ স্পর্শ করা, তিলাওয়াত করা, লেখা, দেখা ও রেখে দেওয়া ইত্যাদি কাজসমূহ আদব ও প্রযতœ সহকারে করা। কুরআন সম্পর্কে কথাবার্তা বলার সময় এবং এর অর্থ ও মর্ম সম্পর্কে আলোচনাকালে আদব রক্ষায় যতœবান থাকা, সামান্যতম বে-আদবী হয় কিংবা কিছুমাত্র অমর্যাদা প্রকাশ পায়- এ জাতীয় আচরণ ও কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা। মোদ্দাকথা, অন্তরকে কুরআনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও ভক্তি-ভালোবাসায় পরিপ্লুত রাখা এবং সর্বতোভাবে আদব-ইহ্তিরাম বজায় রাখা কুরআন মাজীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হক।

৩. কুরআন মাজীদের তিলাওয়াত
এটা পবিত্র কুরআনের একটি স্বতন্ত্র হক এবং আল্লাহ তা’আলার অতি বড় এক ‘ইবাদত’। এর বহু আদাব রয়েছে। প্রকৃত মু’মিনের বৈশিষ্ট্য হলো- সে যথাযথ আদব রক্ষা করে। এছাড়া প্রতিদিন কুরআন মাজীদ তাজবীদের সাথে তিলাওয়াত করা, মাখরাজ ও সিফাতের প্রতি লক্ষ্য রাখা এবং পাঠরীতির অনুসরণ করা তিলাওয়াতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজকাল এ ব্যাপারে চরম উদাসিনতা লক্ষ্য করা যায়। কুরআন মাজীদের অর্থ ও তাফসীর বোঝার জন্য তো সময় বের করা হয়, কিন্তু তিলাওয়াত সহীহ করার জন্য অনুশীলন করা কিংবা অনুশীলনের জন্য সময় বের করার প্রয়োজন মনে করা হয় না। যেনো মানুষের কাছে কুরআনের তিলাওয়াত সহীহ করা অপেক্ষা অর্থ বোঝাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ; অথচ এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কুরআনের প্রতি ঈমান আনার পর সর্বপ্রথম কাজই হলো অবিলম্বে কুরআনের নিত্যকার ফরযসমূহের ওপর আমল শুরু করে দেওয়া এবং সহীহ-শুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত শেখার জন্য মেহনত করা।
এমনিভাবে লক্ষ্য করা যায়, অনেকে কুরআনের প্রতি দাওয়াত দেওয়ার জন্য তো সময় বরাদ্দ করে, কিন্তু কুরআন শেখার ও তাজবীদের সাথে তিলাওয়াতের যোগ্যতা অর্জন করার জন্য সময় দিতে চায় না। এটাও এক রকমের মারাত্মক অবহেলা।
আরো লক্ষ্য করা যায় যে, সহীহ-শুদ্ধভাবে তিলাওয়াত জানা সত্ত্বেও অনেকে নিয়মিতভাবে কুরআন তিলাওয়াত করে না কিংবা তিলাওয়াতের প্রতি লক্ষ্যই দেয় না। আর এক্ষেত্রে তাদের বাহানা হলো, দ্বীনী বা দুনিয়াবী কাজের ব্যস্ততা। বলাবাহুল্য, এটাও গুরুতর অবহেলা।

সম্প্রতি এক শ্রেণির নব্যপন্থী এমন এক ফিৎনার উদ্ভব ঘটিয়েছে, যা কুরআন তিলাওয়াতের মতো মহান ইবাদতের গুরুত্ব হ্রাস করার কিংবা তার গুরুত্ব অস্বীকার করার নিকৃষ্টতম উদাহরণ। তাদের মতে অর্থ না বুঝে তিলাওয়াত করার কোনো ফায়দা নেই; বরং এরূপ তিলাওয়াত একটি গুনাহের কাজ। কে তাদেরকে বোঝাবে যে, তিলাওয়াত ধর্তব্য হওয়ার জন্য যদি অর্থ বোঝা শর্ত হতো, তবে যে ব্যক্তি অর্থ বোঝে না, তার সালাত শুদ্ধ হতো না এবং এরূপ তিলাওয়াত পৃথক কোনো ইবাদতও হতো না। কেননা অর্থ বোঝাই যখন একমাত্র উদ্দেশ্য, তখন এর জন্য তো শুদ্ধ পাঠের কোনো প্রয়োজন নেই। এমতাবস্থায় তিলাওয়াতকে ইবাদত গণ্য করা হবে কেনো?
মনে রাখতে হবে, তাদের এ চিন্তাধারা সম্পূর্ণ বে-দ্বীনি চিন্তাধারা। আসলে তারা কুরআন মাজীদকে যা কিনা মানব-রচিত বই-পুস্তকের সাথে তুলনা করে। আর সেখান থেকেই এ বিভ্রান্তির উৎপত্তি। তারা দেখছে, বই-পুস্তকে অর্থটাই আসল। অর্থ না বুঝলে পড়া নিরর্থক হয়ে যায়। কাজেই কুরআন পাঠের বিষয়টাও তেমনই হবে। তারা চিন্তা করছে না যে, কুরআন কারো রচনা নয়। এটা আল্লাহ তা’আলার কালাম, কোনো মাখলূকের বাণী নয়। এটা ওহী। এর শব্দ ও অর্থ উভয়টাই উদ্দেশ্য। এর শব্দমালার ভেতরও রয়েছে নূর ও হিদায়াত, বরকত প্রশান্তি এবং হৃদয়ের উদ্ভাস ও উদ্দীপণ। এর শব্দমালার সাথে শরী’অতের বহু বিধান জড়িত আছে। আছে বহু সৎ কর্মের সম্পৃক্ততা।
সুতরাং কুরআন মাজীদের কেবল শব্দমালার তিলাওয়াতকে নিরর্থক কাজ মনে করা একটি গুরুতর অপরাধ ও চরম বে-আদবী। আর একে গুনাহ বলাটা তো এক রকম মস্তিষ্ক-বিকৃতিরই বহিঃপ্রকাশ।
হ্যাঁ, একথা সত্য যে, তিলাওয়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ আদব হলো, কুরআন মাজীদকে বুঝে-শুনে, গভীর অনুধ্যানের সাথে পড়া এবং তার দ্বারা উপদেশ গ্রহণ করা। অর্থ বোঝা যে অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এটা কে অস্বীকার করতে পারে? কিন্তু অর্থ না বুঝলে তিলাওয়াতটাই যে সম্পূর্ণ নিষ্ফল হয়ে যাবে- এ কথার কী ভিত্তি আছে? এটা যে একটা মারাত্মক ভুল ধারণা কেবল তাই নয়; বরং কুরআন মাজীদের প্রতি এক কঠিন বে-আদবীও বটে।

৪. কুরআন মাজীদের হিদায়াত ও বিধানাবলীর অনুসরণ
এটাও কুরআন মাজীদের একটি পৃথক হক। কুরআনের প্রতি ঈমান আনার পর পরই এর পর্যায় চলে আসে। ঈমান ও ইসলামের আরকান (মৌলিক বিষয়সমূহ) ও অবশ্য পালনীয় বিষয়াবলী সম্পর্কে নির্দেশনা তো কুরআন মাজীদে আছে, কিন্তু তার জ্ঞান ইসলামী সমাজে এমনিতেই চালু রয়েছে, যেমন প্রত্যেক মুসলিম জানে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা ফরয, জুমু’আর দিন জুমু’আর সালাত আদায় করা ফরয, নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে যাকাত আদায় করা ফরয, রমযান মাসে সিয়াম পালন করা ফরয, সামর্থ্যবানের ওপর বায়তুল্লাহর হজ্জ ফরয, পর্দা করা ফরয, সুদ-ঘুষ হারাম, যুলুম করা হারাম ইত্যাদি।
এসব বিধান মানার নিয়ম এই নয় যে, আগে জানতে হবে- এসবের কোনটি কুরআন মাজীদের কোন আয়াতে বর্ণিত হয়েছে এবং তারপর সেই জ্ঞান অনুসারে তা পালন করা ফরয হবে। বরং ঈমানের পরই আমল শুরু করে দিতে হবে। কুরআনী বিধানাবলীর জ্ঞান কুরআনের তাফসীর শিখে অর্জন করা আবশ্যক নয় এবং এরূপ জ্ঞানার্জনের ওপর হুকুম পালনকে স্থগিত রাখাও জায়েয নয়। সাহাবায়ে কিরাম যে বলেছেন- تعلمنا الإيمان ثم تعلمنا القرآن-
‘আমরা আগে ঈমান শিখেছি, তারপর কুরআন শিখেছি, ফলে আমাদের ঈমান বৃদ্ধি পেয়েছে।’ এর অর্থ এটাই যে, তারা ঈমান, ঈমানের আরকান ও বিধানাবলী সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করেছিলেন আমল ও পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে। তারা এটাকে কুরআনের তাফসীর শেখার ওপর স্থগিত রাখেননি। বস্তুত তাদের সে পন্থাই দ্বীন শেখার স্বভাবসিদ্ধ পন্থা।

৫. কুরআনের তাদাব্বুর (চিন্তা-ভাবনা) ও তা থেকে উপদেশ গ্রহণ
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ
অর্থঃ হে নবী! এটা এক বরকতময় কিতাব- যা আমি আপনার প্রতি এই জন্য নাযিল করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াত সমূহে চিন্তা-ভাবনা করে এবং বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ উপদেশ গ্রহণ করে। (সূরা সাদ-২৯)
কুরআনের মাঝে তাদাব্বুর বা চিন্তা-ভাবনা করার অনেক বড় বড় উপকারিতা রয়েছে। সবচেয়ে বড় উপকার তো এই যে, এর দ্বারা ঈমান নসীব হয় ও ঈমান সজীব হয়। দ্বিতীয় উপকারিতা হলো, এর দ্বারা উপদেশ গ্রহণের নি’আমত লাভ হয়। এ জন্যই কুরআন মাজীদের তিলাওয়াত চিন্তা ও ধ্যানমগ্নতার সাথে করা বাঞ্ছনীয়। প্রয়োজনে কোনো কোনো আয়াত বা আয়াতের অংশ বিশেষ বারবার পড়তে থাকা চাই। সালাত আদায় করার সময়েও ধ্যানের সাথে কুরআন তিলাওয়াত করা ও লক্ষ্য করে শোনা একান্ত কাম্য।
তবে তাদাব্বুর ও চিন্তা-ভাবনা করার ভেতরেও স্তরভেদ রয়েছে। প্রত্যেকের জন্য প্রত্যেক স্তরের চিন্তা-ভাবনা সমীচীন নয় এবং উপকারীও নয়। (মুফতী মুহাম্মদ শফী রহ., মা’আরিফুল কুরআনঃ ২য় খন্ড, পৃ-৪৮৮-৪৮৯)

ইদানীং লক্ষ্য করা যায়, এমন কিছু লোকও কুরআনের গবেষণায় নেমে পড়েছে- যারা কুরআনের ভাষাও বোঝে না এবং কুরআন বোঝার বুনিয়াদী বিষয় সমূহ সম্পর্কেও খবর রাখে না। তাদের এ গবেষণা আগাগোড়াই নীতি বিরূদ্ধ। সুতরাং এটা কুরআনের মাঝে চিন্তা-ভাবনা করার অন্তর্ভুক্ত নয়। এ কারণেই এর দ্বারা উপদেশ গ্রহণের ফায়দা আদৌ হাসিল হয় না; বরঞ্চ কুরআনকে বিকৃত করার পথ খুলে যায়।
উল্লেখ্য, কুরআনের তাদাব্বুর কেবল অর্থ বোঝার নাম নয়। অর্থ তো আরবের কাফির, মুশরিক, মুনাফিকরাও বুঝতো, কিন্তু তারা তাদাব্বুর আদৌ করতো না। তাদাব্বুর না করার কারণে আল্লাহ তা’আলা কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে তাদের নিন্দা করেছেন। তাদাব্বুরের নির্যাস হলো- উপদেশ গ্রহণের লক্ষ্যে, ভক্তি-ভালোবাসা সহকারে, চিন্তা ও ধ্যানমগ্নতার সাথে আয়াত সমূহ পাঠ করা, সেই সঙ্গে সর্তক থাকা, যাতে আল¬াহ তা’আলার উদ্দিষ্ট মর্ম বোঝার ক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি-ভাবাবেগ ও চিন্তা-চেতনার কিছুমাত্র প্রভাব না পড়ে।
তাদাব্বুর ফলপ্রসূ ও ঝুঁকিমুক্ত হওয়ার জন্য একটি বুনিয়াদী শর্ত এই যে, লক্ষ্য রাখতে হবে, তাদাব্বুরের ফল যেনো প্রজন্ম পরম্পরায় প্রাপ্ত ‘আকীদা-বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা, চূড়ান্ত শরয়ী বিধান ও সালাফে সালিহীন বা মহান পূর্বসূরীদের ঐকমত্যভিত্তিক তাফসীরের পরিপন্থী না হয়। সে রকম হলে নিশ্চিত ধরে নিতে হবে, তাদাব্বুর সঠিক পন্থায় হয়নি।

‘আশরাফুত-তাফাসীর’-এর ভূমিকায় হযরতুল উস্তায লিখেছেন-
কুরআন মাজীদ সম্পর্কে যথার্থই বলা হয়েছে- অর্থাৎ এর শব্দমালা ও বর্ণনা শৈলীর ভিতর যে নিগূঢ় রহস্য ও গভীর তাৎপর্য নিহিত আছে, তা কখনো শেষ হওয়ার নয়। এটা আল্লাহ তা’আলার কালামের এক অলৌকিকত্ব যে, যখন অতি সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধির কেউ সাদামাঠাভাবে এ কিতাব পড়ে, তখন সাধারণ স্তরের হিদায়াত লাভের জন্য যতটুকু বোঝা দরকার, নিজ জ্ঞানমাফিক সে অতি সহজেই তা বুঝে ফেলে। আবার একজন পন্ডিতমনস্ক ব্যক্তি যখন এ কালাম থেকেই বিধি-বিধান আহরণ এবং হিকমত ও রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করে, তখন একই কালাম তাকে অতি সূক্ষ্ম ও গভীর তত্ত্ব-ভান্ডারের সন্ধান দেয়। প্রত্যেকের প্রতিভা ও জ্ঞানবত্তা অনুযায়ী এ তত্ত্ব-ভান্ডারের ব্যাপ্তি ও গভীরতা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ কারণেই কুরআন মাজীদ বিভিন্ন স্থানে তাদাব্বুরের আদেশ করেছে। কেননা এ তাদাব্বুরের ফলশ্র“তিতে অনেক সময় একেকজন ‘আলিমের কাছে এমন কোনো তত্ত্ব উদঘাটিত হয়, এর আগে যে দিকে আর কারো দৃষ্টি পড়েনি।
তবে মনে রাখতে হবে, নিত্য-নতুন তাৎপর্য খুঁজে বের করার বিষয়টি উপদেশ গ্রহণের সাথে সম্পৃক্ত কিংবা সৃষ্টি-রহস্য, তত্ত্বজ্ঞান ও শরয়ী বিধানাবলীর হিকমতের সাথে। কেবল এ ময়দানেই এমন নতুন-নতুন রহস্যের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে, যে দিকে প্রাচীনদের কারো দৃষ্টি যায়নি।
এটাকেই সাহাবী আলী বিন আবি তালিব রাযি. এভাবে ব্যক্ত করেছেন- এটা এমন উপলব্ধি, যা কোনো মুসলিম ব্যক্তিকে দান করা হয়। মোটকথা বিষয়টা উপরোক্ত ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ। ‘আকাইদ ও আহকামের ময়দান এর থেকে ভিন্ন। এখানেও যে চাইলেই কেউ গোটা উম্মাহর ইজমার বিপরীতে এমন কোনো তাফসীর করতে পারবে, যা স্বীকৃত বিশ্বাস ও বিধানের পরিপন্থী, কোনোভাবেই সে সুযোগ নেই। কেননা তার অর্থ দাঁড়াবে কুরআন যে ‘আকাইদ ও আহকামের প্রচারার্থে এসেছিলো, তা অদ্যাবধি অজ্ঞাত ও দুর্বোধ্য রয়ে গেছে। বলাবাহুল্য, তাতে ‘ইসলাম’-ই অসম্পূর্ণ ও অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায়। (আশরাফুত তাফাসীরঃ ১ম খন্ড, পৃ-১০)

৬. কুরআন মাজীদের তা’লীম ও তাবলীগ
এটাও কুরআন মাজীদের এক গুরুত্বপূর্ণ হক। এরও বিভিন্ন পর্যায় ও নানা রকম পদ্ধতি আছে এবং তার জন্য সুনির্দিষ্ট শর্তাবলী ও নীতিমালা আছে। যে ব্যক্তি প্রত্যক্ষভাবে এ হক আদায়ের কাজে অংশগ্রহণে সক্ষম নয়, সে আদব ও বিনয়ের সাথে যে কোনোভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারে। এ পন্থায় তার জন্য সাওয়াবের হকদার হওয়ার ও নিজের জন্য সৌভাগ্যের দুয়ার খোলার সুযোগ রয়েছে।

৭. নিজেকে নিজের আওলাদকে এবং অধীনস্থদেরকে কুরআনের শিক্ষা প্রদান
কুরআনের হুকূক সম্পর্কিত আলোচনা অনেক দীর্ঘ। এ প্রসঙ্গে এ স্থলে সর্বশেষ যে কথা আরয করতে চাচ্ছি, তা হলো- কোনো মু’মিন কুরআন ও কুরআনের হিদায়াত থেকে নিজে বঞ্চিত থাকবে কিংবা নিজের আওলাদ ও অধীনস্থদেরকে বঞ্চিত রাখবে- এটা কিছুতেই শোভনীয় ও গ্রহণীয় হতে পারে না। মাদরাসা ও আলিমগণের বিরুদ্ধে যে সব প্রোপ্রাগান্ডা চালানো হয়, তাতে প্রভাবিত হয়ে অথবা বিশেষ কোনো ছাত্র বা আলিমের ভ্রান্ত কর্মপন্থাকে অজুহাত বানিয়ে অথবা মাদরাসাগুলোর দুরবস্থার কারণে বীতশ্রদ্ধ হয়ে কিংবা যে রিযকের যিম্মাদারি স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা তাঁর নিজের কাছে রেখেছেন, নিজেকে তার যিম্মাদার মনে করে নিজ সন্তানকে কুরআন ও কুরআনের হিদায়াত শেখানো থেকে বঞ্চিত রাখাটা কিছুমাত্র বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক নয়; বরং এটা মারাত্মক রকমের বিভ্রান্তি। আপনি পদ্ধতি যেটাই অবলম্বন করুন, নিজের আওলাদ ও অধীনস্থদেরকে সহীহ তিলাওয়াত অবশ্যই শিক্ষা দিন এবং ‘সালাফে সালিহীন’ (মহান পূর্বসূরীগণ) থেকে প্রজন্ম পরম্পরায় প্রাপ্ত শিক্ষা-দীক্ষা ও কুরআনী হিদায়াত দ্বারা তাদেরকে ঐশ্বর্যমন্ডিত করে তুলুন।
পরিতাপের বিষয় হলো, বহু লোক কুরআন তা’লীমের কার্যক্রমে আর্থিক সাহায্য করছে, কুরআনী মকতব, হিফযখানা ও মাদরাসা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করছে, কিন্তু নিজের সন্তানকে ঈমান ও কুরআন শেখানোর ব্যাপারে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। এটা নিজেদের ক্ষতির কারণ তো বটেই, সেই সঙ্গে কুরআন মাজীদের প্রতি ভক্তি-ভালোবাসার সীমাহীন ঘাটতিরও নিদর্শন। (‘তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন- মুফতী তাকি উসমানী’ গ্রন্তের ভূমিকা থেকে সংগৃহীত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.