কুরবানীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট- আব্দুল্লাহ আল মাসুম

0
351
Jilhazz and Qurbani
Jilhazz and Qurbani

কুরবানী আদিকাল থেকেই প্রচলিত

পৃথিবীর আদিকাল থেকেই কুরবানীর প্রচলন রয়েছে। এই পৃথিবীতে প্রতিটি বস্তু, প্রতিটি জীবন অন্যের জন্য নিবেদিত। সবুজ-শ্যামল তৃণলতা নিবেদিত জীব-জন্তুর জন্য। আর জীব-জন্তু নিবেদিত মানুষের জন্য। মানুষও সর্বদা একে অপরের জন্য কুরবান হচ্ছে। মাতা-পিতা নিজ সন্তানের পিছনে বিলীন করছে নিজেদের জীবন। নীচু থেকে প্রধান সেনাপতি পর্যন্ত সকলেই নিজেদের মাতৃভূমি ও বাদশাহের জন্য কুরবান হচ্ছে। প্রচলিত কুরবানী প্রবর্তিত হয় আমাদের জাতির পিতা সাইয়্যেদুনা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মাধ্যমে।
মানুষ চায় অগ্রগতি। আর সে আশরাফুল মাখলুকাতও। সুতরাং তার একান্ত কর্তব্য আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধন। যা সকল উন্নতি-অগ্রগতির চেয়ে মহান ও শ্রেষ্ঠ। আর এই কথা তো খুব সহজেই অনুমেয় যে, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব উন্নততর বস্তুর প্রতিই ধাবিত হবে।
আল্লাহ তা’আলার সত্তা পাক ও পবিত্র। মানুষের প্রকৃতিগত আকাক্সক্ষা হচ্ছে আল্লাহ তা’আলার নৈকট্য লাভ করে তাঁর পবিত্র সত্তার মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া।

কুরবানীর সূচনা

পৃথিবীতে এমন কোনো জাতি ছিলো না- যারা স্বীয় মাযহাব অনুসারে কুরবানী করতো না। কুরবানীর এই চলমান ধারা হযরত আদম আলাইহিস সালামের যুগ থেকে চলে আসছে। তাঁর সন্তান হাবিল ও কাবিলের মধ্যে বিবাহ করা নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে তিনি তাদের ইখলাসের সঙ্গে কুরবানী করার নির্দেশ দিয়ে বলেন-
তোমাদের যার কুরবানী কবুল হবে, তার সঙ্গে আকলিমার বিবাহ দিবো। ভ্রাতৃদ্বয় কুরবানীর আদেশপ্রাপ্ত হয়ে দু’টি দুম্বা কুরবানী করলো। হাবিলের কুরবানী কবুল হলো আর কাবিলের কুরবানী কবুল হলো না। এতে সে খুব রেগে যায় এবং হাবিলকে হত্যা করে ফেলে। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-

واتل عليهم نبأ ابني آدم بالحق- إذ قربا قربانا فتقبل من أحدهما ولم يتقبل من الآخر- قال: لأقتلنك- قال: إنما يتقبل الله من المتقين-

অর্থঃ তাদের নিকট যথাযথভাবে আদম আলাইহিস সালামের দুই ছেলের কথা আলোচনা করো। যখন তারা আল্লাহ তা’আলার নিকট কুরবানী পেশ করলো। তখন একজনের কুরবানী কবুল হলো। অন্যজনের কুরবানী কবুল হলো না। যার কুরবানী কবুল হয়নি- সে অপরজনকে বললো- আমি তোমাকে হত্যা করবো। প্রতি উত্তরে সে বললো- আল্লাহ তা’আলা শুধুমাত্র মুত্তাকীদের পক্ষ থেকেই কুরবানী কবুল করেন।

(সূরা মায়েদাহঃ আ-২৭)

ইবরাহীম আলাইহিস সালামের বংশ পরিচিতি

তাওরাতে বর্ণিত হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের বংশ পরিচয় নি¤œরূপঃ
ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম ইবনে তারেখ ইবনে না-হুর ইবনে মারুজ ইবনে রাউ ফালেহ ইবনে আ’বের ইবনে সালেহ ইবনে আরফাখশায ইবনে শাম ইবনে নূহ আলাইহিস সালাম। এই বিবরণ তাওরাত ও ইতিহাস অনুযায়ী বর্ণিত। কিন্তু কুরআনুল কারীমে তাঁর পিতার নাম আযার বলা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে-

وإذ قال لأبيه آزر أتتخذ أصناما آلهة؟ إني أراك وقومك في ضلال مبين-

আর যখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম নিজের পিতা আযারকে বললেন- আপনি কি মূর্তিগুলোকে মাবুদ সাব্যস্ত করেছেন? আমি তো আপনাকে এবং আপনার পুরো সম্প্রদায়কে স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে দেখছি।

(সূরা আনআমঃ আ-৭৪)

Grave of IBRAHIM alaihis salam
Grave of IBRAHIM alaihis salam

ইবরাহীম আলাইহিস সালামের পিতা কে? এই ব্যাপারে কুরআন ও তাওরাতে বর্ণিত দু’টি নাম একই ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট। তারেক ব্যক্তিবাচক নাম এবং আযার গুণবাচক নাম।
কিছু সংখ্যক আলিম এই বিশ্লেষণও পেশ করেছেন যে, আযার একটি মূর্তির নাম, তারেক সেই মূর্তির পূজারী ও অনুরক্ত ছিলো। তাই তাকে আযারও বলা হতো।

কুরআনুল কারীমে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের নাম

কুরআনুল কারীমের হিদায়াত ও নসীহতের পয়গাম যেহেতু ইবরাহীমী ধর্মেরই পয়গাম, তাই কুরআনের স্থানে স্থানে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের নাম উল্লেখ রয়েছে। আর এই আলোচনা মাক্কী ও মাদানী উভয় সূরাতেই বিদ্যমান।
হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ঘটনার সঙ্গে অন্যান্য নবীর ঘটনাবলীও সংশ্লিষ্ট হয়েছে। যথা- তাঁর ভাতিজা হযরত লূত আলাইহিস সালাম। ইনি তাঁর অনুগামী। অনুরূপ ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দুই ছেলে হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম ও হযরত ইসহাক আলাইহিস সালাম। তাঁরা সবাই আল্লাহ তা’আলার নবী ছিলেন।

কওমের হিদায়াতের জন্য হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের প্রচেষ্টা

হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সর্বপ্রথম স্বীয় পিতা আযারকে বুঝালেন। তারপর সর্বসাধারণের সম্মুখে সত্যের আলো পেশ করলেন। অবশেষে নমরুদের সাথে বিতর্কে অবতীর্ণ হলেন। কিন্তু হতভাগ্য কওমের বিবেক নড়লো না। কওম কিছুই শুনলো না।
ফলাফল এমন হলো যে, হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এবং লূত আলাইহিস সালাম ছাড়া সে কওমের কেউ আল্লাহ তা’আলার প্রতি ঈমান আনলো না।
ইবরাহীম আলাইহিস সালামের প্রতিও কেউ ঈমান আনেনি। তাঁকে আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে প্রেরিত রাসূল হিসেবেও মেনে নেয়নি। তখন তিনি অন্য কোথাও গিয়ে আল্লাহ তা’আলার পয়গাম শুনাতে ও সত্যের দাওয়াত পৌঁছাতে মনস্থির করলেন। এ লক্ষ্যেই তিনি নমরুদের রাজত্বের অন্তর্গত স্বীয় স্থান ফাদ্দানে আরাম নামক বিখ্যাত শহর থেকে হিজরত করতে মনস্থ করলেন।

যেমন কুরআনুল কারীমে উল্লেখ রয়েছে- وقال إني ذاهب إلي ربي سيهدين-

অর্থঃ আমি আমার পরওয়ারদিগারের দিকে চলে যাবো। অচিরেই তিনি আমাকে পথ প্রদর্শন করবেন।

(সূরা সাফফাতঃ আ-৯৯)

কালদানী সম্প্রদায়ের দিকে হিজরত

পিতা ও কওম থেকে পৃথক হয়ে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ইরাকের ফোরাত নদীর পশ্চিম তীরের নিকটবর্তী এক জনপদে চলে গেলেন। যার আধিবাসীরা কালদানী সম্প্রদায় নামে প্রসিদ্ধ ছিলো। এখানে কিছুকাল অবস্থান করলেন। হযরত সারা রাযি. ও লূত আলাইহিস সালাম তাঁর সঙ্গে ছিলেন। কিছুদিন পর এখান থেকে সিরিয়ায় খায়ান কিংবা হারানের দিকে যাত্রা করেন।

ফিলিস্তীনের দিকে হিজরত

ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এরূপভাবে ধর্ম প্রচার করতে করতে ফিলিস্তীনে গিয়ে পৌঁছলেন। এই সফরেও হযরত সারা ও লূত আলাইহিস সালাম সঙ্গে ছিলেন। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ফিলিস্তীনের পশ্চিমে বসতি স্থাপন করলেন। সেকালে এই অঞ্চলটি কেনানীদের অধীনে ছিলো। তারপর অনতিকাল পরেই ইবরাহীম আলাইহিস সালাম শাকীন (ফিলিস্তীনের নাবলুস) শহরে চলে যান। তথায় কিছুকাল অবস্থান করার পরে এখানেও বেশি দিন থাকলেন না। ক্রমাগত পশ্চিম দিকেই অগ্রসর হতে লাগলেন। এমনকি শেষ পর্যন্ত যেতে যেতে মিসর পর্যন্ত পৌঁছলেন।

মিসরে হিজরত এবং হযরত হাজেরা রাযি.

ফিলিস্তীনের নাবলুস শহর থেকে হিজরত করে তিনি মিসরে পৌঁছলেন। তাঁর সঙ্গে হযরত সারাও ছিলেন। পথিমধ্যে তৎকালীন মিসরের ফেরআউন (শাসক) তাদের বন্দী করলো এবং পরে বিশেষ এক অলৌকিক ঘটনায় হযরত সারা রাযি.-এর প্রতি শ্রদ্ধাবনত হয়ে আপন কন্যা শাহজাদী হাজেরাকে হযরত সারার সেবিকারূপে উপঢৌকন দিলো। হযরত সারা রাযি. পরে তাঁকে স্বীয় স্বামীর খেদমতের জন্য দান করলেন। যাকে পরে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বিবাহ করেছিলেন।

ইসমাঈল আলাইহিস সালামের জন্ম

হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এতোদিন পর্যন্ত নিঃসন্তান ছিলেন। একদা তিনি আল্লাহ তা’আলার দরবারে দো’আ করলেন। কুরআনে তাঁর দো’আর কথা বর্ণিত হয়েছে।

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন- رب هب لي من الصالحين-

অর্থঃ হে আমার রব! আমাকে একজন নেককার সন্তান দান করুন।
আল্লাহ তা’আলা তাঁর দো’আ কবুল করে তাঁকে সান্তনা দিলেন। তাঁর এই দো’আ কবুল হয় এবং আল্লাহ তা’আলা তাঁকে এক পুত্রের সুসংবাদ দেন। ফলে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ছোটো বিবি হযরত হাজেরা গর্ভবর্তী হলেন। তারপর হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম জন্মগ্রহণ করেন।

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন- فبشرناه بغلام حليم-

অর্থঃ অতঃপর আমি তাঁকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। (সূরা সাফফাত-১০১)

হযরত সারা রাযি. তা জানতে পেরে মানবসুলভ প্রকৃতির তাড়নায় হযরত হাজেরা রাযি.-এর প্রতি ঈর্ষান্বিত হলেন। তিনি হযরত হাজেরাকে নানাভাবে উত্যক্ত করতে লাগলেন। অবশেষে একদিন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম হাজেরা রাযি. এবং তার স্তন্যপায়ী শিশু ইসমাঈলকে নিয়ে চললেন। যেখানে বর্তমান কা’বা গৃহ অবস্থিত- তথায় একটি বড়ো বৃক্ষের নীচে যমযম কূপের বর্তমান স্থানের ওপরের অংশে তাঁদের রেখে গেলেন। এই স্থানটি তৎকালীন যামানায় অনাবাদ ও জনমানবহীন এক বিরানভূমি ছিলো। পানিরও কোনো নাম-নিশানা ছিলো না। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তখন এক মশক পানি ও এক থলে খেজুর তাঁর নিকট রাখেন। এরপর মুখ ফিরিয়ে রওয়ানা হলেন।

হাজেরা রাযি. তাঁর পিছনে পিছনে এই বলতে বলতে চললেন, হে ইবরাহীম! আপনি আমাদেরকে উপত্যাকা-ভূমিতে রেখে কোথায় যাচ্ছেন? যেখানে মানুষ নেই, কোনো সহায় নেই, নেই দুঃখের কোনো সঙ্গী! হাজেরা অনবরত এরূপ বলছিলেন। কিন্তু ইবরাহীম আলাইহিস সালাম নীরবে চলে যাচ্ছিলেন। অবশেষে হাজেরা জিজ্ঞেসা করলেন- আপনার মালিক কি আপনাকে এরূপ আদেশ করেছেন?
ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বললেন- হ্যাঁ। এটা তাঁরই আদেশ। হাজেরা রাযি. এই কথা শুনে বললেন- যদি এটা আল্লাহ তা’আলারই হুকুম হয়ে থাকে, তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তিনি আমাদেরকে ধ্বংস ও বিনষ্ট করবেন না। তারপর হাজেরা রাযি. ফিরে আসলেন।

Hizrat of Ibrahim alaihis salam 3
Hizrat of Ibrahim alaihis salam

ইবরাহীম আলাইহিস সালাম চলতে চলতে এক টিলার ওপর এমন স্থানে পৌঁছলেন যে, তার পরিবারবর্গ হাজেরা ও ইসমাঈল দৃষ্টিপথ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তখন তিনি বর্তমান কা’বা গৃহের তদানীন্তন শূন্যস্থানের দিকে মুখ করে হাত উঠিয়ে এই দো’আ করলেন-

ربنا إني أسكنت من ذريتي بواد غير ذي زرع عند بيتك المحرم- ربنا ليقيموا الصلاة فاجعل أفئدة من الناس تهوي إليهم وارزقهم من الثمرات لعلهم يشكرون-

অর্থঃ হে আমাদের পরওয়ারদিগার! আমি আমার কতক আওলাদকে এমন এক ময়দান- যেখানে কৃষির নাম-নিশানাও নেই- আপনার সম্মানিত ঘরের নিকটে এনে বসবাস করতে রেখে গেলাম। হে আমাদের পরওয়ারদিগার! যেনো তারা নামায কায়েম রাখে। অতএব, আপনি কিছু লোকের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দিন এবং তাদের ফলফলাদি দ্বারা রিযিক দান করুন, যেনো তারা আপনার শোকর আদায়কারী হয়।

(সূরা ইবরাহীম-৩৭)

ইবরাহীম আলাইহিস সালামের স্বপ্ন

আল্লাহ তা’আলা কুরআনে ইরশাদ করেন-

فلما بلغ معه السعي قال: إني أري في المنام أني أذبحك فانظر ماذا تري؟ قال: يا أبت افعل ما تؤمر- ستجدني إن شاء الله من الصابرين- فلما أسلما وتله للجبين- وناديناه أن يا إبراهيم! قد صدقت الرؤيا- إني كذلك نجزي المحسنين- إن هذا لهو البلاء المبين- وفديناه بذبح عظيم-

অর্থঃ অতঃপর সে যখন পিতার সঙ্গে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হয়- তখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁকে বললেন- বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে যবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কী? দেখো। সে বললো- পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে- তাই করুন। ইনশা-আল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্য্যশীল পাবেন।
যখন পিতা ও পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করলো এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁকে যবেহ করার জন্য উপুড় করে শায়িত করলেন, তখন আমি তাঁকে ডেকে বললাম- হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে। আমি এভাবে সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই এটা একটা সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে দিলাম যবেহ করার জন্য এক মহান জন্তু। (সূরা সাফফাত-১০২-১০৭)
আলোচ্য আয়াতসমূহে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের বর্ণাঢ্য জীবনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহ তা’আলার জন্য তাঁরই নির্দেশে তাঁর একমাত্র পুত্রকে কুরবানী করেছিলেন।

এখানে কিছু ঐতিহাসিক বিবরণ আয়াতসমূহের তাফসীরের আলোকে বিশ্লেষণ সহকারে বর্ণনা করা হচ্ছে।

وقال إني ذاهب إلي ربي سيهدين-

অর্থঃ ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বললেন- আমি তো আমার পরওয়ারদিগারের দিকে চললাম।

(সূরা সাফফাত-৯৯)

দেশবাসীর তরফ থেকে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়েই তিনি এই কথা বলেছিলেন। সেখানে তাঁর ভাতিজা লূত আলাইহিস সালাম ব্যতিত কেউ তাঁর কথায় বিশ্বাস স্থাপন করেনি। পরওয়ারদিগারের দিকে চলে যাওয়ার অর্থ এই- দারুল কুফর পরিত্যাগ করে আমার পওয়ারদিগার যেখানে আদেশ করেন- সেখানে চলে যাবো।
সেখানে আমি তাঁর ইবাদত করতে পারবো। সে মতে তিনি স্ত্রী সারা রাযি. এবং ভাতিজা লূত আলাইহিস সালামকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন এবং ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চল অতিক্রম করে অবশেষে সিরিয়ায় পৌঁছলেন। তখনো হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কোনো পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেনি। তাই তিনি পরবর্তী আয়াতে বর্ণিত দো’আ করলেন-

رب هب لي من الصالحين-

অর্থঃ হে পরওয়ারদিগার! আমাকে একজন নেককার পুত্র দান করেন।
তাঁর এই দো’আ কবুল হয় এবং আল্লাহ তা’আলা তাঁকে এক পুত্রের সুসংবাদ দিয়ে ইরশাদ করেন-

فبشرناه بغلام حليم-

অর্থঃ অতঃপর আমি তাঁকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম।
“সহনশীল” বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এই নবজাত সন্তান তাঁর জীবনে সবর, ধৈর্য্য ও সহনশীলতার এমন পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করবে- যার দৃষ্টান্ত দুনিয়ার কেউ পেশ করতে পারবে না।

Qurbani 1
Qurbani

فلما بلغ معه السعي قال: إني أري في المنام أني أذبحك-

অর্থঃ অতঃপর যখন পুত্র পিতার সঙ্গে চলাফেরা করার মতো বয়সে উপনীত হলো- তখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বললেন- বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে যবেহ করছি।
কোনো কোনো রেওয়ায়াত থেকে জানা যায়, এই স্বপ্ন হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে পর পর তিন দিন ধরে দেখানো হয়। এই কথা স্বীকৃত সত্য যে, পয়গাম্বরগণের স্বপ্নও ওহী হয়ে থাকে। তাই এই স্বপ্নের অর্থ ছিলো এই যে, আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের প্রতি একমাত্র পুত্রকে যবেহ করার হুকুম করা হয়েছে।
আলোচ্য হুকুমটি সরাসরি কোনো ফিরিশতার মাধ্যমেও নাযিল করা যেতো। কিন্তু স্বপ্নে দেখানোর উদ্দেশ্য হলো ইবরাহীম আলাইহিস সালামের আনুগত্য পূর্ণ মাত্রায় প্রকাশ করা। স্বপ্নের মাধ্যমে প্রদত্ত আদেশে মানব মনের পক্ষে ভিন্ন অর্থ করার যথেষ্ট অবকাশ ছিলো। কিন্তু ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ভিন্ন অর্থের পথ অবলম্বন করার পরিবর্তে আল্লাহ তা’আলার আদেশের সামনে মাথা নত করে দিলেন।

(তাফসীরে কাবীর; তাফসীরে কুরতুবী)

এছাড়াও এখানে আল্লাহ তা’আলার প্রকৃত লক্ষ্য হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে যবেহ করা ছিলো না এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালামকেও এই আদেশ দেওয়া ছিলো না যে, প্রাণপ্রিয় পুত্রকে যবেহ করে ফেলো; বরং উদ্দেশ্য ছিলো, এই আদেশ দেওয়া যে, নিজের পক্ষ থেকে যবেহ করার সমস্ত আয়োজন সমাপ্ত করে যবেহ করতে উদ্যত হয়ে যাও। বস্তুত এই নির্দেশ সরাসরি মৌখিক দেওয়া হলে তাতে পরীক্ষা হতো না। তাই তাঁকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে যে, তিনি পুত্রকে যবেহ করছেন।

এতে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বুঝে নিলেন যে, যবেহ করার নির্দেশ হয়েছে এবং তিনি যবেহ করতে পুরোপুরি প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। এভাবে পরীক্ষাও পূর্ণতা লাভ করলো এবং স্বপ্নও সত্যে পরিণত হলো। অথচ মৌখিক আদেশের মাধ্যমে হলে তাতে পরীক্ষা হতো না। অথবা পরে রহিত করতে হতো।
উক্ত বিষয়টি কতো যে সুক্ষ্ম পরীক্ষা- সেদিকে ইঙ্গিত করার জন্য এখানে ‘সুতরাং আমি তাঁকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম।’ কথাগুলো সংযুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ অনেক কামনা-বাসনা ও দো’আ-প্রার্থনার পর পাওয়া এই প্রাণপ্রিয় পুত্রকে কুরবানী করার নির্দেশ এমন সময় দেওয়া হয়েছিলো- যখন পুত্র পিতার সঙ্গে চলাফেরার যোগ্য হয়েছিলো এবং লালন-পালনের দীর্ঘ কষ্ট সহ্য করার পর এমন সময় এসেছিলো যে, সে পিতার বাহুবল হয়ে আপদে-বিপদে তাঁর পাশে দাঁড়াবে।
মুফাসসিরগণ লিখেছেন- সে সময় হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের বয়স ছিলো মাত্র তেরো বছর। কেউ কেউ বলেন- তিনি সাবালক হয়ে গিয়েছিলেন। (তাফসীরে মাযহারী)

পুত্রের সাথে পিতার পরামর্শ

পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালামের সাথে পিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের পরামর্শের কথা আল্লাহ তা’আলা কুরআনে এভাবে ইরশাদ করেন-

فانظر ماذا تري؟ অর্থঃ অতএব তুমিও ভেবে দেখো- তোমার কী অভিমত?

ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এই কথা ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে এজন্য জিজ্ঞেস করেননি যে, তিনি আল্লাহ তা’আলার নির্দেশ পালনে কোনোরূপ দ্বিধা-দ্বন্দে ছিলেন অথবা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন; বরং প্রথমতঃ তিনি পুত্রের পরীক্ষাও নিতে চেয়েছিলেন যে, পরীক্ষায় সে কতদূর উত্তীর্ণ হয়।
দ্বিতীয়তঃ পয়গাম্বারগণের চিরন্তন কর্মপদ্ধতি এই যে, তারা আল্লাহ তা’আলার আদেশ পালনের জন্যে সর্বদা প্রস্তুত থাকেন। কিন্তু যদি পরামর্শ ছাড়া করতে উদ্যত হতেন- তাহলে বিষয়টি উভয়ের পক্ষেই কঠিন হয়ে যেতে পারতো।
তিনি পরামর্শের ভঙ্গিতে ব্যাপারটি উল্লেখ করলেন। যাতে পুত্র আগে থেকেই আল্লাহ তা’আলার হুকুমের কথা জেনে যবেহ হওয়ার কষ্ট সহ্য করার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারে। এছাড়া পুত্রের মনে কোনোরূপ দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলেও তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে সম্মত করা যেতো।

(তাফসীরে রূহুল মা’আনী; বয়ানুল কুরআন)

ইসমাঈল আলাইহিস সালামের জওয়াব

কিন্তু ইবরাহীম আলাইহিস সালামের পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালামও ছিলেন আল্লাহ তা’আলার খলীলেরই পুত্র এবং ভবিষ্যত পয়গাম্বর। তিনি জওয়াব দিলেন- قال: يا أبت افعل ما تؤمر-
অর্থঃ হে আমার পিতা! আপনাকে যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে- তা সেরে ফেলুন।

Mina 1
Mina

এতে ইসমাঈল আলাইহিস সালামের অতুলনীয় বিনয় ও আত্মনিবেদনের পরিচয় তো পাওয়া যায়ই, তদুপরি এই কথাও প্রতীয়মান হয় যে, এই কম বয়সেই আল্লাহ তা’আলা তাঁকে কী পরিমাণ মেধা ও জ্ঞান দান করেছিলেন।
ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর সামনে আল্লাহ তা’আলার কোনো নির্দেশের বরাত দেননি; বরং একটি স্বপ্নের কথা বলেছিলেন মাত্র। কিন্তু ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বুঝেছিলেন- পয়গাম্বরদের স্বপ্নও ওহী হয়ে থাকে। কাজেই এই স্বপ্ন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা’আলারই একটি নির্দেশ। অতএব তিনি জওয়াবে স্বপ্নের পরিবর্তে নির্দেশের কথা বললেন।

পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালামের পক্ষ থেকে আশ্বাস প্রদান

ইসমাঈল আলাইহিস সালাম নিজ থেকে পিতাকে এই আশ্বাসও দিলেন যে, হে পিতা! আপনি আমাকে ধৈর্যশীল অবস্থায় পাবেন। কুরআনে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন- ستجدني إن شاء الله من الصابرين-
অর্থঃ ইনশা-আল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্গত পাবেন।

উক্ত বাক্যে ইসমাঈল আলাইহিস সালামের চূড়ান্ত পর্যায়ের আদব ও বিনয় লক্ষ্যণীয়।
প্রথমতঃ তিনি ইনশা-আল্লাহ বলে ব্যাপারটি আল্লাহ তা’আলার কাছে সমর্পণ করেছেন এবং এই ওয়াদায় দাবির যে বাহ্যিক আকার ছিলো- তা খতম করেছিলেন।
দ্বিতীয়তঃ তিনি এই কথাও বলতে পারতেন- ‘ইনশা-আল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।’ কিন্তু এর পরিবর্তে তিনি বললেন- ‘ধৈর্যশীলদের অন্তর্গত পাবেন।’
এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, সবর ও সহনশীলতা একা আমারই কৃতিত্ব নয়; বরং দুনিয়াতে আরো বহু সবরকারী রয়েছে। ইনশা-আল্লাহ আমিও তাঁদের মধ্যে শামিল হয়ে যাবো। এভাবেই তিনি উপযুক্ত বাক্যে অহংকার, আত্মপ্রীতি ও অহমিকার নাম গন্ধটুকু পর্যন্ত খতম করে দিয়ে অত্যন্ত বিনয় ও বশ্যতা প্রকাশ করেছেন। (তাফসীরে রূহুল মাআনী)

Mina Tent 2
Mina Tent

فلما أسلما وتله للجبين- অর্থঃ যখন তাঁরা উভয়েই নত হয়ে গেলেন।
আলোচ্য আয়াতে বর্ণিত أسلما শব্দের অর্থ নত হওয়া, অনুগত হওয়া ও বশীভূত হওয়া। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তাঁরা যখন আল্লাহ তা’আলার নির্দেশের সামনে নত হয়ে পিতা-পুত্র যবেহ করতে এবং যবেহ হতে সম্মত হলেন।
এরপর কী হলো- তা এখানে উল্লেখ করা হয়নি। এতে উল্লেখ আছে যে, পিতা-পুত্রের এই আত্মনিবেদনমূলক কার্যক্রম এমন বিস্ময়কর ও অভাবিত ছিলো, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

শয়তানের প্রতারণা ও অপকৌশল

ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যখন স্বীয় পুত্র ইসমাঈলকে যবেহ করার জন্য নিয়ে যাচ্ছিলেন- তখন শয়তান প্রথমে হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের মমতাময়ী মায়ের কাছে উপস্থিত হয়ে আন্তরিকতা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলো- ইসমাঈল কোথায় গেছে? তাঁর মা বললেন- ইসমাঈল পিতার সাথে জঙ্গলে লাকড়ি কুড়াতে গেছে।
শয়তান বললো- তুমি তো ধোঁকার মধ্যে পড়ে রয়েছো। তোমার স্বামী তোমার সন্তানকে হত্যা করতে নিয়ে গেছে। তখন হাজেরা রাযি. বললেন- কোনো পিতা কি নিজ পুত্রকে হত্যা করতে পারে? শয়তান বললো- ইবরাহীম বলেছেন- আল্লাহ তা’আলা নাকি তাঁকে নিজ পুত্রকে যবেহ করতে বলেছেন।
এই কথা শুনে একমাত্র পুত্রের মমতাময়ী মা এমন জওয়াব দিলেন- যা খলীলুল্লাহ ইবরাহীম আলাইহস সালামের পরিবারের সদস্যের মুখেই শোভা পায়। তিনি বললেন- যদি আল্লাহ তা’আলা সত্যিই এই নির্দেশ দিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর তা পালন করা উচিত।

শয়তান এখানে ব্যর্থ হয়ে মক্কা মুকাররামা শহরের মিনা উপাত্যাকাগামী পিতা-পুত্রের পিছু নিলো। বর্তমানে যেখানে জামারায় হাজিগণ শয়তানের উদ্দেশে পাথর নিক্ষেপ করেন, সে স্থানেই শয়তান আল্লাহর নবী ইবরাহীম আলাইহিস সালামের পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালামের মনে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে।

প্রথমে বন্ধু বেশে রাস্তায় ইসমাঈল আলাইহস সালামকে কুমন্ত্রণা দিয়ে এই মহান কাজ থেকে ফিরানোর জন্য সর্বচেষ্টা প্রয়োগ করলো। সে দ্রুত তাঁর নিকট গিয়ে বললো- ইসমাঈল! তোমাকে তো তোমার আব্বা যবেহ করার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন। তুমি কিছুতেই যেয়ো না।
ইসমাঈল আলাইহিস সালাম শয়তানের কথার উত্তরে বলতে লাগলেন- পিতা কি কখনো তার ছেলেকে হত্যা করতে পারে? তখন শয়তান বললো- তুমি বুঝতে পারছো না কেনো? আল্লাহ তা’আলা তোমার পিতাকে হুকুম দিয়েছেন, তোমাকে কুরবানী দেওয়ার জন্য।
তখন ইসমাঈল আলাইহিস সালাম আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে বললেন- তাহলে এর চেয়ে উত্তম জীবন আর কী হতে পারে, যে জীবন মহান রব্বুল আলামীন কবুল করেছেন। আল্লাহ তা’আলার নিকট অসংখ্য শুকরিয়া, তিনি আমার জীবন পছন্দ করেছেন। হায়রে শয়তান! তোর ওপর লানত হোক আল্লাহ তা’আলার। তোর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।

Jamarat Bridge 1
Jamarat Bridge

অবশেষে এখানেও ব্যর্থ হয়ে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কাছে এসে তাঁকে বাঁধা দিতে চাইলো। কিন্তু তিনি ছিলেন অনড়। ফলে শয়তান তার ওপর প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হলো না। পরে সে জামরায়ে আকাবার নিকটে এসে বৃহাদাকৃতি ধারণ করে তাঁর পথ রোধ করলো।
ঐতিহাসিক ও তাফসীরের বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়, ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সাথে একজন ফিরিশতাও ছিলেন। তিনি ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে বললেন- ওকে পাথর নিক্ষেপ করুন। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন এবং প্রতিটি কংকর নিক্ষেপ করার সময় ‘আল্লাহ আকবার’ বললেন। ফলে শয়তান বিতাড়িত হয়ে চলে গেলো।
দ্বিতীয় জামরায় গিয়ে শয়তান আবার তাঁর পথ আটকে দাঁড়ালো। তিনি আবারো ‘আল্লাহ আকবার’ বলে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন। ফলে শয়তান চলে যেতে বাধ্য হলো।
তৃতীয়বার শয়তান প্রথম জামরার নিকট গিয়ে পথ আটকে দাঁড়ালে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আগের মতো সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন। এভাবেই তিনি বিতাড়িত শয়তানের ধোঁকা থেকে বেঁচে কুরবানীর করার স্থান মিনায় পৌঁছে গেলেন।
হজ্জের আমলের মধ্যে মিনায় তিন জামারাতের মধ্যে কংকর নিক্ষেপের সূচনা শয়তানের উক্ত প্রতারনার ঘটনা থেকেই হয়েছে। আজো সেই ঘটনাটি এভাবে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।

পুত্র কুরবানীর ঘটনা

পরিশেষে পিতা-পুত্র সেই বিস্ময়কর ইবাদত করার জন্য মিনায় কুরবানীর স্থানে উপস্থিত হলেন। ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বললেন- আব্বাজান! আমাকে শক্ত করে বেঁধে নিন। যাতে আমি বেশি ছটফট করতে না পারি। তা ছাড়া আপনি নিজ কাপড়ও আমার থেকে সাবধানে রাখুন। যেনো তাতে আমার রক্তের ছিঁটা না লাগে, নতুবা আমার আম্মাজান তা দেখে চিন্তিত হতে পারেন।
আব্বাজান! মৃত্যু একটা কঠিন বিষয়। তাই আপনার ছুরিটি ভালোভাবে ধার দিয়ে নিন এবং আমার গলায় তা দ্রুত চালাবেন। যেনো খুব দ্রুত আমার প্রাণ বেরিয়ে যায়। আর আপনি যখন আমার মায়ের কাছে যাবেন, তখন তাকে আমার সালাম বলবেন। আপনি চাইলে আমার জামাটি তাকে দিতে পারেন। হতে পারে, তিনি তা থেকে কিছুটা সান্তনা লাভ করবেন।

একমাত্র ছেলের মুখে এ জাতীয় কথা শুনে একজন পিতার মন কতখানি ব্যাকুল হতে পারে, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু ইবরাহীম আলাইহিস সালাম রবের নির্দেশে দৃঢ় হয়ে জবাব দিলেন- বেটা! আল্লাহ তা’আলার হুকুম পালনের জন্য তুমি আমাকে যে সহযোগিতা করলে- তার-কোনো তুলনা হয় না। এই কথা বলে তিনি নিজ পুত্রকে চুম্বন করলেন।
(তাফসীরে মাযহারী)

পুত্রের গলায় পিতার ছুরি

ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে যবেহ করতে গিয়ে কীভাবে শোয়ানো হয়- তা বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন- وتله للجبين- অর্থঃ এবং তাঁকে উপুড় করে মাটিতে শুইয়ে দিলেন।
সাহাবী ইবনে আব্বাস রাযি. উপরোক্ত আয়াতের এই অর্থ করেন যে, তাঁকে কাত করে এমনভাবে শুইয়ে দিলেন- যাতে কপালের এক দিক মাটি স্পর্শ করেছিলো। (তাফসীরে মাযহারী)
আভিধানিক দিক থেকে এই তাফসীরই অগ্রগণ্য। কারণ আরবী ভাষায় “জাবীনা” কপালের দু’পাশকে বলা হয়। কপালের মধ্যস্থলকে বলা হয় জাবীন। এই কারণেই মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. এর অনুবাদ এভাবে করেছেন- উপুড় করে মাটিতে শুইয়ে দিলেন।

ঐতিহাসিক বর্ণনায় এভাবে শোয়ানোর কারণ এই বর্ণিত হয়েছে যে, শুরুতে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁকে সোজা করে শুইয়ে দিলেন। কিন্তু বারবার ছুরি চালানো সত্ত্বেও গলা কাটছিলো না। কেননা আল্লাহ তা’আলা স্বীয় কুদরতে পিতলের একটি টুকরো মাঝখানে অন্তরায় করে দিয়েছিলেন।
তখন পুত্র নিজেই আবদার করে বললেন- পিতা! আমাকে কাত করে শুইয়ে দিন। কারণ, আমার মুখমন্ডল দেখে আপনার মধ্যে পিতৃ¯েœহ উথলে ওঠে। ফলে গলা পূর্ণরূপে কাটা হয় না। এছাড়া ছুরি দেখে আমিও ঘাবড়ে যাই। এরপর ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁকে উপুড় করে শুইয়ে দিলেন এবং ছুরি চালাতে লাগলেন।

কুরবানীর ঘটনা থেকে তাকবীরে তাশরীকের সূচনা

সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
যখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহ তা’আলার হুকুমে নিজ পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে যবেহ করতে শুরু করলেন, তখন ফিরিশতা জিবরীল আলাইহিস সালাম জান্নাত থেকে একটি দুম্বা নিয়ে আসমান থেকে অবতীর্ণ হচ্ছিলেন। তিনি আশংকা করছিলেন- না জানি পৌঁছার আগেই যবেহ করার কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়।
ইবরাহীম আলাইহিস সালাম নিজ পুত্রকে যবেহ করে ফেলেন কিনা- এই আশংকায় জিবরীল আলাইহিস সালাম বলে উঠলেন- الله أكبر الله أكبر-

Islam and Qurbani 1
Islam and Qurbani

ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কানে এই আওয়ায ভেসে এলো। তিনি উপরের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন- জিবরীল আলাইহিস সালাম আগমন করছেন।

ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁকে দেখে বললেন- لا إله إلا الله والله أكبر-

এরপর যখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালামের ফিদিয়া সম্পর্কে উক্ত দুম্বা আনার কথা জানতে পারলেন, তখন তিনি বললেন- الله أكبر ولله الحمد-
পরবর্তীতে উপরোক্ত তিনটি বাক্য মিলে তাকবীরে তাশরীকের সূচনা হয়। এটাই সেই তাকবীরে তাশরীক- যা ইসলামী শরীয়তে সুন্নাতের মর্যাদা লাভ করেছে।

(দুররুল মুখতার লিত তাহতাবীঃ ১/৭৯৮)

পিতা ও পুত্রের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া

পৃথিবীর ইতিহাসে নজীরবিহীন এই পরীক্ষায় ইবরাহীম আলাইহিস সালাম পূর্ণ সফলতা অর্জন করেন। আর তাই আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করছেন- وناديناه أن يا إبراهيم! قد صدقت الرؤيا-

অর্থঃ আমি তাঁকে বললাম- হে ইবরাহীম! তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছো।
অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলার আদেশ পালনে তোমার যা করণীয় ছিলো- তাতে সত্যি তুমি নিজের পক্ষ থেকে কোনো ত্র“টি করোনি। এখন এই পরীক্ষা পূর্ণ হয়েছে। তাই তাঁকে ছেড়ে দাও। এরপর আল্লাহ তা’আলা বলেন-
إني كذلك نجزي المحسنين- অর্থঃ আমি সৎ কর্মশীল বান্দাদেরকে এমনি প্রতিদান দিয়ে থাকি।
অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা বলেন- কোনো বান্দা যখন আমার আদেশের সামনে নতশির হয়ে নিজের সমস্ত ভাবাবেগকে কুরবানী করতে উদ্যত হয়ে যায়- তখন আমি তাকে পার্থিব কষ্ট থেকেও বাঁচিয়ে রাখি এবং পরকালের সাওয়াবও তার আমলনামায় লিখে রাখি।

ইসমাঈল আলাইহিস সালামের বদলে জন্তুর কুরবানী

কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- إن هذا لهو البلاء المبين- وفديناه بذبح عظيم-
অর্থঃ এটা ছিলো এক মহা পরীক্ষা। আর আমি যবেহ করার জন্য এক মহান জন্তু এর বিনিময়ে পাঠিয়ে দিলাম।

ARABIC BAKRA 1 1
ARABIC BAKRA

বর্ণিত আছে, তখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম গায়েবী আওয়ায শুনে উপরের দিকে তাকালে জিবরীল আলাইহিস সালামকে একটি দুম্বা নিয়ে দন্ডায়মান দেখতে পেলেন।
কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, এটা ছিলো সেই দুম্বা- যা আদম আলাইহিস সালামের পুত্র হাবীল কুরবানী করেছিলেন। মোটকথা, জান্নাতী এই দুম্বা ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে দেওয়া হলে তিনি আল্লাহ তা’আলার নির্দেশক্রমে পুত্রের পরিবর্তে সেটা কুরবানী করলেন।
একে মহান বলার কারণ এই যে, এটা আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে এসেছিলো এবং এর কুরবানী কবুল হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ ছিলো না।

(তাফসীরে মাযহারী; মা’আরিফুল কুরআনঃ ৭/৯১)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.