কুরবানীর পরিচয় ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

0
469
Qurbani
Qurbani

কুরবানী শব্দটার উৎপত্তি হচ্ছে আরবী শব্দقربان (কুরবানুন) থেকে। কুরবান বলা হয় এমন বস্তুকে- যা আল্লাহ তা’আলার নৈকট্য লাভের মাধ্যম হয়। অর্থাৎ প্রত্যেক নেক আমল- যা দ্বারা আল্লাহ তা’আলার নৈকট্য ও রহমত অর্জন করা যায়। আর সেটা পশু যবেহ করার মাধ্যমে হোক বা দান-সদকা করা দ্বারা হোক- সবই কুরবানী বলে বিবেচিত হবে। কিন্তু সাধারণতঃ কুরবান শব্দটি পশু যবেহ করার অর্থেই ব্যবহৃত হয়। এছাড়া কুরআনুল কারীমে প্রায়ই এই শব্দ দ্বারা পশুর মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলার নৈকট্য অর্জন করাকে বুঝানো হয়েছে।

সুতরাং শরীয়তের পরিভাষায় একমাত্র আল্লাহর তা’আলার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের জন্য ঈদুল আযহার দিনে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পশু যবেহ করাকে কুরবানী বলে।
অতএব, বিবাহ-শাদীতে যদি কেউ অগণিত রুসম-রেওয়াজের পদ্ধতিতে কুরবানী করে অথবা কুরবানী করতে গিয়ে গোশত খাওয়ার নিয়ত করে অথবা লোক দেখানোর জন্য কুরবানী করে- তাহলে তা কুরবানী হবে না।

কুরবানীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
কুরবানী আদিকাল থেকেই প্রচলিত
পৃথিবীর আদিকাল থেকেই কুরবানীর প্রচলন রয়েছে। এই পৃথিবীতে প্রতিটি বস্তু, প্রতিটি জীবন অন্যের জন্য নিবেদিত। সবুজ-শ্যামল তৃণলতা নিবেদিত জীব-জন্তুর জন্য। আর জীব-জন্তু নিবেদিত মানুষের জন্য। মানুষও সর্বদা একে অপরের জন্য কুরবান হচ্ছে। মাতা-পিতা নিজ সন্তানের পিছনে বিলীন করছে নিজেদের জীবন। নীচু থেকে প্রধান সেনাপতি পর্যন্ত সকলেই নিজেদের মাতৃভূমি ও বাদশাহের জন্য কুরবান হচ্ছে। প্রচলিত কুরবানী প্রবর্তিত হয় আমাদের জাতির পিতা সাইয়্যেদুনা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মাধ্যমে।
মানুষ চায় অগ্রগতি। আর সে আশরাফুল মাখলুকাতও। সুতরাং তার একান্ত কর্তব্য আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধন। যা সকল উন্নতি-অগ্রগতির চেয়ে মহান ও শ্রেষ্ঠ। আর এই কথা তো খুব সহজেই অনুমেয় যে, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব উন্নততর বস্তুর প্রতিই ধাবিত হবে।
আল্লাহ তা’আলার সত্তা পাক ও পবিত্র। মানুষের প্রকৃতিগত আকাক্সক্ষা হচ্ছে আল্লাহ তা’আলার নৈকট্য লাভ করে তাঁর পবিত্র সত্তার মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া।

কুরবানীর সূচনা
পৃথিবীতে এমন কোনো জাতি ছিলো না- যারা স্বীয় মাযহাব অনুসারে কুরবানী করতো না। কুরবানীর এই চলমান ধারা হযরত আদম আলাইহিস সালামের যুগ থেকে চলে আসছে। তাঁর সন্তান হাবিল ও কাবিলের মধ্যে বিবাহ করা নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে তিনি তাদের ইখলাসের সঙ্গে কুরবানী করার নির্দেশ দিয়ে বলেন-
তোমাদের যার কুরবানী কবুল হবে, তার সঙ্গে আকলিমার বিবাহ দিবো। ভ্রাতৃদ্বয় কুরবানীর আদেশপ্রাপ্ত হয়ে দু’টি দুম্বা কুরবানী করলো। হাবিলের কুরবানী কবুল হলো আর কাবিলের কুরবানী কবুল হলো না। এতে সে খুব রেগে যায় এবং হাবিলকে হত্যা করে ফেলে। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
واتل عليهم نبأ ابني آدم بالحق- إذ قربا قربانا فتقبل من أحدهما ولم يتقبل من الآخر- قال: لأقتلنك- قال: إنما يتقبل الله من المتقين-
অর্থঃ তাদের নিকট যথাযথভাবে আদম আলাইহিস সালামের দুই ছেলের কথা আলোচনা করো। যখন তারা আল্লাহ তা’আলার নিকট কুরবানী পেশ করলো। তখন একজনের কুরবানী কবুল হলো। অন্যজনের কুরবানী কবুল হলো না। যার কুরবানী কবুল হয়নি- সে অপরজনকে বললো- আমি তোমাকে হত্যা করবো। প্রতি উত্তরে সে বললো- আল্লাহ তা’আলা শুধুমাত্র মুত্তাকীদের পক্ষ থেকেই কুরবানী কবুল করেন। (সূরা মায়েদাহ-২৭)

ইবরাহীম আলাইহিস সালামের বংশ পরিচিতি
তাওরাতে বর্ণিত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের বংশ পরিচয় নি¤œরূপঃ
ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম ইবনে তারেখ ইবনে না-হুর ইবনে মারুজ ইবনে রাউ ফালেহ ইবনে আ’বের ইবনে সালেহ ইবনে আরফাখশায ইবনে শাম ইবনে নূহ আলাইহিস সালাম। এই বিবরণ তাওরাত ও ইতিহাস অনুযায়ী বর্ণিত। কিন্তু কুরআনুল কারীমে তাঁর পিতার নাম আযার বলা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে-
وإذ قال لأبيه آزر أتتخذ أصناما آلهة؟ إني أراك وقومك في ضلال مبين-
আর যখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম নিজের পিতা আযারকে বললেন- আপনি কি মূর্তিগুলোকে মাবুদ সাব্যস্ত করেছেন? আমি তো আপনাকে এবং আপনার পুরো সম্প্রদায়কে স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে দেখছি। (সূরা আনআম-৭৪)
ইবরাহীম আলাইহিস সালামের পিতা কে? এই ব্যাপারে কুরআন ও তাওরাতে বর্ণিত দু’টি নাম একই ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট। তারেক ব্যক্তিবাচক নাম এবং আযার গুণবাচক নাম।
কিছু সংখ্যক আলিম এই বিশ্লেষণও পেশ করেছেন যে, আযার একটি মূর্তির নাম, তারেক সেই মূর্তির পূজারী ও অনুরক্ত ছিলো। তাই তাকে আযারও বলা হতো।

কুরআনুল কারীমে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের নাম
কুরআনুল কারীমের হিদায়াত ও নসীহতের পয়গাম যেহেতু ইবরাহীমি ধর্মেরই পয়গাম, তাই কুরআনের স্থানে স্থানে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের নাম উল্লেখ রয়েছে। আর এই আলোচনা মাক্কি ও মাদানি উভয় সূরাতেই বিদ্যমান রয়েছে।
ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ঘটনার সঙ্গে অন্যান্য নবীর ঘটনাবলীও সংশ্লিষ্ট হয়েছে। যথা- তাঁর ভাতিজা লূত আলাইহিস সালাম। এই নবী তাঁরই অনুগামী ছিলেন। অনুরূপ ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দুই ছেলে ইসমাঈল আলাইহিস সালাম ও ইসহাক আলাইহিস সালাম। তাঁরা সবাই আল্লাহ তা’আলার নবী ছিলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.