কুরবানী করার সময়সীমা কতটুকু?

0
429
calendar time
calendar time

কুরবানী করার সময় মোট তিন দিন। জিলহজ্জ মাসের ১০, ১১ এবং ১২ তারিখ- এই তিন দিন হলো কুরবানীর দিন। এটাই ইসলামে কুরবানীর বিধান। হাদীসে নববীতে এবং প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মানিত সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য থেকে এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।
এছাড়া উম্মাহর ফকীহগণ কুরবানী তিন দিন হওয়ার ব্যাপারে বিবৃতি দিয়েছেন। তবে কোনো কোনো বইয়ে এমনকি অনেকে কুরবানীর দিন চারদিন বলে থাকেন। তারা কুরবানীর দিন তিনদিন হওয়াকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। ফলে অনেক মুসলিম এই বিষয়ে ভ্রান্তির শিকার হয়েছেন।

এছাড়া কোনো কোনো হাদীসে নবীজি কুরবানীর তিনদিনের পরে কুরবানীর গোশত খাওয়া কিংবা সংরক্ষণ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। এর প্রেক্ষাপট ছিলো ভিন্ন। বিশেষ একটা সামাজিক প্রয়োজনে নবীজি তা করেছিলেন।
কারণ এর উদ্দেশ্য ছিলো দরিদ্র মানুষকে সহায়তা করা। ওই বছর কুরবানীর দিনে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মদীনা মুনাওয়ারায় অনেক দরিদ্র মানুষ সমবেত হয়েছিলো। পরবর্তীতে নবীজি এই নিষেধাজ্ঞা রহিত করে দেন। নিম্নে আমরা এই বিষয়ে আলোকপাত করছি।

হাদীসে নববীতে বর্ণিত হয়েছে-
من ضحي منكم فلا يصبحن بعد ثالثة وبقي في بيته منه سيئ-
অর্থঃ তোমাদের মধ্যে যারা কুরবানী করে, তাদের ঘরে যেনো কুরবানীর তৃতীয় দিনের পর গোশত না থাকে। (সহীহুল বুখারী- কিতাবুল আযাহীঃ হা-৫৫৬৯)
সাহাবী জাবির রাযি.-এর সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন- নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
كنا لا نأكل من لحوم بدننا فوق ثلاث مني- فارخص لنا رسول الله صلي الله عليه وسلم- فقال: كلوا وتزودوا-
অর্থঃ আমরা আগে কুরবানীর তিন দিনের পর গোশত খেতাম না। কিন্তু পরবর্তীতে নবীজি আমাদেরকে তিন দিনের পরও গোশত খাওয়ার অবকাশ দিয়ে বলেন- তোমরা গোশত খাও এবং তা সংরক্ষণ করো।
(সহীহ মুসলিম- কিতাবুল আযাহীঃ হা-৫০৬৭)
এ জাতীয় হাদীসগুলোর মধ্যে কুরবানীর গোশত সংরক্ষণ করার অবকাশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু কোথাও এই কথা বলা হয়নি যে, নবীজি গোশত সংরক্ষণ করার অবকাশ দেওয়ার সাথে সাথে চতুর্থ দিনও কুরবানী করার নির্দেশ দিয়েছেন।

কুরবানীর দিন তিন দিন হওয়ার বিষয়টি সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য থেকেও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। বলাবাহুল্য, এটা তাঁরা আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ থেকেই গ্রহণ করেছেন। কারণ ইবাদাতের সময়সীমা নিছক যুক্তি-বুদ্ধির দ্বারা নির্ণিত হতে পারে না। তাই এই ধরণের বর্ণনাকে পরিভাষায় ‘মারফূ হুকমী’ বলে- যা মারফূ হাদীসেরই একটি প্রকার। যথা-
 সাহাবী আনাস রাযি. বলেন- الذبح بعد العيد يومان- অর্থঃ যবেহ (কুরবানী) করা যায় ঈদের (দিনের) পর আরো দুইদিন।
এই বর্ণনার সনদ সহীহ। (আহকামুল কুরআন, তহাবী, ২/২০৬; আস-সুনানুল কুবরা-বায়হাকীঃ ৯/২৯৭; আল-মুহাল্লা, ইবনে হাযমঃ ৭/৪৯৯)
 সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. বলেন- الأضحي يومان بعد يوم الأضحي- অর্থঃ ঈদুর আযহার (দিনের) পর আযহা (কুরবানী) দুইদিন।
এই বর্ণনার সনদ সহীহ। বরং এটা আসাহহুল আসানীদ (শ্রেষ্ঠ সনদ)-এর অন্যতম। (আল-মুয়াত্তা-ইমাম মালিক- باب الضحية عما في بطن المرأة وذكر أيام الأضحي- ঃ হা-২০৩৮)
 সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন-
الأضحي ثلاثة أيام- وفي لفظ: النحر يومان بعد يوم النحر- وأفضلها يوم النحر-
অর্থঃ আযহা (কুরবানী) তিনদিন। অন্য বর্ণনায় আছে, কুরবানী করা যায় ইয়াওমুন নাহর (কুরবানীর দিন)-এর পর আরো দুইদিন।
উক্ত বর্ণনা বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে। ইবনুত তুরকুমানী রহ. ইমাম তহাবীর সনদকে ‘জাইয়েদ’ বলেছেন। (আহকামুল কুরআন তহাবী আল জাওহারুন নাকী, সুনানে কুবরা বায়হাকীর সাথে মুদ্রিতঃ ৯/২৯৬)
 সাহাবী আবু হুরায়রা রাযি. বলেন- الأضحي ثلاثة أيام-অর্থঃ আযহা (কুরবানী) হচ্ছে তিন দিন।
(আল-মুহাল্লা-ইবনে হাযম; ইলাউস সুনানঃ ১২/২৩২-২৩৩)
 সাহাবী আলী ইবনে আবী তালিব রাযি. বলেন- النحر ثلاثة أيام- وفي لفظ: النحر ثلاثة أيام- وأفضلها أولها-
অর্থঃ কুরবানী মোট তিন দিন। এর মধ্যে প্রথম দিন সর্বোত্তম দিন। (আল মুয়াত্তা-ইমাম মালিক; আহকামুল কুরআন, তহাবীঃ ২/২০৫; ই’লাউস সুনানঃ ১২/২৩২)
 সাহাবী ওমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. বলেন- إنما النحر في هذه الثلاثة الأيام-
অর্থঃ কুরবানী শুধু এই তিনদিনই করা যায়। (আল-মুহাল্লা- ইবনে হাযম; ইলাউস সুনানঃ ১২/২৩২)
সাহাবায়ে কেরামের উপরোক্ত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ইমাম তহাবী রহ. ওই মূলনীতি উল্লেখ করেছেন- যার ভিত্তিতে পরিস্কার প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত বিষয়টি তাঁরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকেই গ্রহণ করেছেন এবং যে কারণে এই বর্ণনাগুলো ‘মারফূ হুকমীর’ পর্যায়ভুক্ত হয়। (আহকামুল কুরআন- তহাবীঃ ২/২০৮)
বিখ্যাত তাবেয়ী ইমাম ইবরাহীম নাখায়ী রহ. বলেন-
الأضحي ثلاثة أيام: يوم النحر ويومان بعده- رواه الإمام أبو حنيفة في كتاب الآثار- وقال محمد: وبه نأخذ- وهو قول أبي حنيفة- وفي رواية أبي يوسف عنه زيادة ……. وأيام التشريق ثلاثة أيام بعد يوم النحر-

অর্থঃ আযহা (কুরবানী) হলো তিন দিন। অন্য বর্ণনায় আযহা (কুরবানী) তিনদিন। ইয়াওমুন নাহর ও তার পর দুই দিন। আর তাশরীকের দিনগুলো হচ্ছে ইয়াওমুন নাহরের পর তিন দিন।
(কিতাবুল আছার-ইমাম আবু হানীফা, (ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর বর্ণনায়) হা-৩০৬)
ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালিক, ইমাম সুফিয়ান সাওরী, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান, ইমাম জাফর ইবনুল হুযাইল, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. প্রমূখ বিখ্যাত মুজতাহিদ ইমামগণের সিদ্ধান্তও এটাই। সুতরাং একে ভিত্তিহীন বলা চরম মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

ইমাম আবু বকর রাযী আল-জাসসাস রহ. বলেন-
فدلت هذه الأخبار علي أن جواز الأضحية مقصور علي هذه الأيام- لأنه إذا كان منهيا عن تبقية اللحم أكثر من ثلاث والذبح لا محالة قبل ذلك- علمنا أن الذبح مقصورعلي ثلاث-
وقد روي في بعض ألفاظ حديث علي رضي الله عنه أن رسول الله صلي الله عليه وسلم نهي أن يبقي عندكم من نسككم شيئ بعد الثلاث- فهو علي الحي والمذبوح جميعا- لأن اللفظ يتناولهما-
(শরহু মুখতাসারিত তহাবী- জাসসাসঃ ৭/৩৩২-৩৩৩)
ইমাম ইবনে কুদামা রহ. বলেন-
قال الإمام ابن قدامة الحنبلي في المغني: ولنا أن النبي صلي الله عليه وسلم نهي عن إذخار لحوم الأضحي فوق ثلاث- ولا يجوز الذبح في وقت لا يجوز إذخار الأضحية إليه- انتهي
(আল-মুগনী- ইবনে কুদামাঃ ১৩/৩৮৭)
একই কথা ইমাম আবু বকর রাযী আল-জাসসাস রহ. অতি সংক্ষেপে অন্যভাবে বলেছেন। যথা-
فإن مقادير الأوقات التي تتعلق بها صحة الفروض لا تعلم من طريق المقاييس- وإنما طريقها التوقيت أو الإتفاق- وقد حصل الإتفاق والسنة في الثلاث- فأثبتناها ولم نثبت ما فوقها لعدم الدلالة عليه- انتهي
(শরহু মুখতাসারিত তহাবীঃ ৭/৩৩৩; আহকামুল কুরআন- জাসসাসঃ ৩/২৩৪ সূরা হজ্জের আলোচনায়)
কোনো কোনো আহলে ইলম কুরবানীর সময় চার দিন হওয়ার কথাও বলেছেন। আতা ইবনে আবী রাবাহ, হাসান বসরী, ওমর ইবনে আব্দুল আযীয রহ. প্রমুখ থেকে এমনই বর্ণিত হয়েছে। সেটাও একটা ইজতিহাদি মত। ইমাম শাফেয়ী রহ. এই মত গ্রহণ করেছেন।
তবে এই দুই মতের কেউই অপর মতকে ভিত্তিহীন বলেননি। শরীয়তের যে বিষয়গুলোতে উভয় দিক দলীল থাকার কারণে আহলে ইলমের মাঝে ইজতিহাদগত মতভেদ হয়েছে, সেসব বিষয়ে একটি মত গ্রহণ করে অন্য মতকে ভিত্তিহীন বলা অপরিপক্কতার পরিচয় বহন করে। এটা সাম্প্রতিক সময়ের এক ধরণের বিচ্ছিন্নতা- যা আগের যুগে ছিলো না। এই উপসর্গের বিষয়ে সতর্কতা কাম্য।
কুরবানীর সময় চার দিন হওয়ার বিষয়ে জুবাইর ইবনে মুতইম রাযি.-এর সুত্রে বর্ণনাকৃত যে হাদীসের কথা বলা হয়- তার সনদ মুনকাতি ও বিচ্ছিন্ন। এই হাদীসের শক্তিশালী বর্ণনাগুলোতে এই বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায় না।
(আহকামুল কুরআন-তহাবীঃ ২/২০৬; আহকামুল কুরআন- জাসসাসঃ ৩/২৩৪-২৩৫; আল-ইসতিযকারঃ ১৫/২০৩-২০৪; আল-মুগনী-ইবনে কুদামাঃ ১৩/৩৮৭; আল-মাজমু শরহুল মুহাযযাবঃ ৮/৩৬১; আল-জাওহারুন নাকী-(সুনানে কুবরার সাথে)ঃ ৯/২৯৬; নাসবুর রায়াহঃ ৪/২১২-২১৩; ইলাউস সুনানঃ ১২/ ২৩১)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.