কেমন ছিলেন তিনি !

0
991
Shaikh Sayyid Abul hasan A. Al Nadwi
Shaikh Sayyid Abul hasan A. Al Nadwi

গত বিংশ শতাব্দীতে যেসব মণীষী ইসলামের আলোকবর্তিকা হয়ে এ পৃথিবীতে আগমন করেছেন- তাঁদের মধ্যে যে মহা পুরুষ সমগ্র আরব ও অনারবে সবার শীর্ষ স্থানে সমাসীন হয়ে আছেন, তিনি হলেন সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নাদাবী রহ.। ভারতের লখনৌতে জন্ম নেওয়া এ মণীষী দাওয়াত, তালীম, তাসনীফাত, তাযকিয়াহ তথা সর্বক্ষেত্রে সমানভাবে পারদর্শী ছিলেন। তাঁর পদচারণায় পাক-ভারত উপমহাদেশে শুধু নয়; বরং সমুগ্র মুসলিম বিশ্বে দাওয়াতে ইলাল্লাহর ফিকির ও প্রেরণা জাগ্রত হয়েছে এবং তমসাচ্ছন্ন মানবজাতির সামনে দ্বীন ইসলামের আলো প্রজ্জ্বলিত হয়েছে। তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। তাঁর সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবন নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন-

হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভীর চিন্তা-চেতনা, সাইয়েদ আহমদ শহীদের দ্বীনী আন্দোলন, মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতবীর হিকমতে দ্বীন, মাওলানা মাহ্মূদ হাসান দেওবন্দীর জ্ঞান-গভীরতা, মাওলানা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরীর জ্ঞানব্যাপ্তি, মাওলানা আশরাফ আলী থানভীর সংস্কার, মাওলানা ইলিয়াস দেহলভীর বিশ্ব বিস্তৃত দাওয়াত ও ফিকির, মাওলানা সাইয়েদ হুসাইন আহমদ মাদানীর দ্বীনী মর্যাদাবোধ, মাওলানা শাহ আবদুল কাদের রায়পুরীর বাইয়াত ও ইরশাদ, মাওলানা আতাউল্লাহ শাহ বুখারীর আকীদা-বিশ্বাসের বিশুদ্ধকরণের আহ্বান-এর সমষ্টি যে ব্যক্তিত্ব তিনি হলেন আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী মিয়াঁ আল-হাসানী আন-নাদাবী রহ.।

জন্মঃ
ভারতের উত্তর প্রদেশের রায়বেরেলীর তাকিয়াকালাঁ নামক স্থানে ৬ই মহররম, ১৩৩২ হিজরী মোতাবেক ৫ ডিসেম্বর ১৯১৩ ঈসায়ী পবিত্র জুমুআর দিন তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
পিতা-মাতাঃ
তাঁর পিতার নাম হাকীম সাইয়েদ আবদুল হাই এবং তাঁর মাতার নাম খাইরুন নিসা। ড. সাইয়েদ আবদুল আলী (মৃত্যু ১৩৮১ হিজরী) তাঁর বড় ভাই। তাঁর দুইজন বড় বোন ছিলেন। একজন আমাতুল্লাহ তাসনীম (মৃত্যু ১৩৯৫ হিজরী) অপরজন আমাতুল আযীয। তাঁর শ্রদ্ধেয়া মাতা কুরআনের হাফিয ছিলেন। তাঁর খালা, খালাতো বোন, মামী এবং ফুফু সকলেই কুরআন হিফয করেছিলেন। তাঁর বয়স যখন নয় বৎসর তখন তাঁর পিতা ইনতিকাল করেন এবং তাঁর ছাপ্পান্ন বছর বয়সে ১৩৮৮ হিজরী সনে তাঁর মাতা ইনতিকাল করেন।
প্রাথমিক শিক্ষাঃ
তাঁর লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয় মায়ের নিকট। এরপর মাওলানা সাইয়েদ আযীযূর রহমান হাসানী এবং মাওলানা মাহমুদ আলীর নিকট কুরআন মাজীদ এবং উর্দূ-ফার্সী পড়েন।
আরবী তালীমঃ
তিনি আরবী তালীম গ্রহণ করেন শায়খ খলীল আরব মুহাম্মদ আনসারী ইয়ামানী ও ড. তকীউদ্দীন হেলালী মারাকেশীর নিকট থেকে।
ইলমে তাফসীরঃ
শায়খ খলীল আরব আনসারীর নিকট নির্বাচিত কয়েকটি সূরার তাফসীর পড়েছেন। অতঃপর ১৩৫১ হিজরী সনে লাহোরে অবস্থান করে হযরত মাওলানা আহমদ আলী লহোরীর (মৃত্যু ১৩৬২ হিজরী) নিকট তাঁর তারতীব ও বিন্যাস অনুযায়ী সম্পূর্ণ কুরআন মাজীদের তাফসীর পাঠ করেন।
প্রাচ্য বিজ্ঞানঃ
১৯২৭ইং সনে লাখনৌ ইউনিভার্সিটির ‘প্রাচ্য বিজ্ঞান’ বিভাগে ভর্তি হন। সে সময়ে তিনি ওই ভার্সিটির সর্বকনিষ্ঠ ছাত্র ছিলেন। ভার্সিটি থেকে সাহিত্যে ¯œাতক ডিগ্রী লাভ করেন।
ইলমে হাদীসঃ
১৯২৯ সনে দারুল উলূম নাদওয়াতুল উলামার শায়খুল হাদীস হায়দার হাসান খানের হাদীসের ক্লাসে বিশেষভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁর নিকট সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ ও তিরমিযী পাঠ করেন।
১৯৩২ইং সনে দারুল উলূম দেওবন্দে গিয়ে মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.-এর হাদীসের দরস দ্বারা উপকার হাসিল করেন এবং তাঁর তাফসীর ও উলূমূল কুরআনের ক্লাসেও তিনি অংশগ্রহণ করেন।
ইলমে ফিকাহঃ
তিনি দারুল উলূম দেওবন্দে মাওলানা এজায আলী আমরূহীর নিকট ফিকাহর দরস গ্রহণ করেন।
ইলমে তাজবীদঃ
তিনি কারী আসগর আলী সাহেবের নিকট হাফসের রেওয়ায়েত মোতাবেক তাজবীদ শিক্ষা লাভ করেন।
বিবাহঃ
১৯৩৪ইং সনে আপন মামাতো বোন সাইয়েদ আহমদ সাঈদ সাহেবের কন্যাকে তিনি বিবাহ করেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন হযরত শাহ জিয়াউন নবীর পুত্রের কন্যা এবং মুফতী আবদুর রাজ্জাকে কন্যার কন্যা। দারুল উলূম নাদওয়াতুল উলামার মুহতামিম ও শায়খুল হাদীস মাওলানা হায়দার হাসান খান তাঁর বিবাহ পড়ান। হযরত মাওলানা রহ.-এর কোন ঔরসজাত সন্তান ছিলো না, কিন্তু বিশ্বব্যাপী তাঁর মানসসন্তান ও ভক্তবৃন্দের সংখ্যা লাখ লাখ নয়; বরং কোটি কোটি।
দর্শন শিক্ষাঃ
তিনি সাইয়েদুল মিল্লাত মাওলানা সুলাইমান নদভীর নিকট দর্শনশাস্ত্রের পাঠ গ্রহণ করেন এবং তাঁর বিশিষ্ট ছাত্রে পরিণত হন। তাঁর জ্ঞান ও কর্মের ফয়েয হাসিল করেন এবং তাঁর জ্ঞান ও কর্মতৎপরতা দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন।
সুলূক ও তরীকতঃ
তিনি ১৯৩১ সনে মাওলানা আহমদ আলী লাহোরীর শায়খ মাওলানা গোলাম মুহাম্মদ ভাওয়ালপুরীর হাতে বাই’আত হন। ১৯৪২ সনে শায়খের ইঙ্গিতে মাওলানা আবদুর রহীম রায়পুরীর খলীফা মাওলানা শাহ আবদুল কাদের রায়পুরীর হাতে বাই’আত হন।
ইংরেজী শিক্ষাঃ
১৯২৭ থেকে ১৯৩০ সনের মাঝামাঝি সময়ে ইংরেজী ভাষা শিক্ষার প্রতি মনোনিবেশ করেন। ফলে ইসলাম বিষয়ক এবং আরব সভ্যতা ও ইতিহাস বিষয়ক ইংরেজী ভাষায় লিখিত পুস্তকাদি ইংরেজী ভাষায় পড়ে বোঝার যোগ্যতা অর্জন করেন।
লেবাস-পোশাক ও দৈহিক গড়নঃ
তাঁর দৈহিক উচ্চতা ছিলো মাঝারি প্রকৃতির। সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা ছিলেন। চেহারা ছিল গোলাকৃতির। গায়ের রঙ ছিল উজ্জ্বল। হাত ছিলো মখমলের ন্যায় নরম ও কোমল। সব সময় সাদা কাপড় পরিধান করতে ভালবাসতেন, পায়জামা-পাঞ্জাবী পরতেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি ও মাহফিলে যেতে শেরওয়ানী পরিধান করতেন।
মাওলানার বিশেষ খাদেম হাজী আবদুর রাজ্জাক বলেন- আমি ১৯৬০ সাল থেকে হযরতের সঙ্গে সফরে ছিলাম। তাঁর সবচেয়ে বড় চারিত্রিক গুণ ছিলো বিনয় ও ন¤্রতা। তিনি আরো বলেন- এই দীর্ঘ চল্লিশ বছরে একবার কোনো এক বিষয়ে অতিশয় অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন এবং নিজের ক্রোধ ব্যক্ত করেছিলেন শুধু এই বলে যে, কষ্ট পেয়েছি। এই দীর্ঘ চল্লিশ বছরে তাঁকে সর্বাধিক আনন্দিত হতে দেখেছি তখন, যখন হারাম শরীফের চাবি সংরক্ষক কাবা শরীফের চৌকাঠের উপর চাবি রেখে তাঁকে তালা খুলতে ইশারা করেছিলেন আর তিনি তালা খুলে কাবা শরীফের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার মহা সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন।
দুঃখের মুহূর্তেঃ
সর্বাধিক দুঃখ ও বেদানাক্রান্ত হয়েছিলেন ১৯৬১ইং সালে তাঁর বড় ভাই ড. সাইয়েদ আবদুল আলী সাহেবের ইনতিকালের মুহূর্তে তাঁর কাছে থাকতে না পেরে। সে সময় তিনি বার্মার সফরে ছিলেন।
ব্যক্তিগত পছন্দঃ
ডিসেম্বর ও জানুয়ারী ব্যতীত বছরের দশ মাসই বরফ মিশ্রিত ঠান্ডা পানি পান করতেন। সকালে নাশতার পরে এক পেয়ালা এবং আসরের পর দুই / তিন পেয়ালা চা পান করার অভ্যাস ছিলো। তাঁর চা হতে হত পেয়ালা ভর্তি এবং ঠোঁট পোড়ানো তীব্র গরম ও মুখ ফিরানো অতিশয় মিষ্টিযুক্ত।
মামুলাতঃ
রাতের শেষ ভাগে ফজরের সালাতের আগ পর্যন্ত আল্লাহ তা’আলার যিকিরে মশগুল থাকতেন। ফজরের পর গোসল করার নিয়মিত অভ্যাস ছিলো। জীবনের শেষ দিকে দুর্বলতা ও নিদ্রাহীনতার কারণে ফজরের পর বিশ্রাম করতেন। সাতটা সাড়ে সাতটার দিকে নাশতা ও লোকজনের সঙ্গে সাক্ষাত করতেন। এরপর চাশতের সালাত আদায় ও কুরআন কারীমের তিলাওয়াত করতেন। অতঃপর দুই তিন সহায়তাকারীকে নিয়ে লিখতে পড়তে বসে যেতেন। সাড়ে বারোটা পর্যন্ত লেখালেখির কাজ করতেন এবং চিঠিপত্রের জবাব লিখতেন। বাদ যোহর দুপুরের খাবার খেতেন এবং খাবার খেয়েই শুয়ে পড়তেন। আসরের আগে কখনও কুরআন মাজীদ পড়তেন।
বাদ আসর মেহমানদের সঙ্গে সাক্ষাত করতেন। মাগরিবের সালাতের বিশ মিনিট আগে সালাত আদায়ের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করতেন। রায়বেরেলীতে থাকলে মাগরিবের পর ঘরে যেতেন। এশার সালাতের পর খাবার গ্রহণ অতঃপর কিছুক্ষণের জন্য লোকজনের সঙ্গে বসতেন। অতঃপর কিছুক্ষণ ছাত্র ও শিক্ষকবৃন্দের সঙ্গে কথাবার্তা বলতেন। রাত দশটার দিকে নিয়মিত শুয়ে পড়ার অভ্যাস ছিলো।
হাস্য রসিকতাঃ
মাওলানার স্বভাবে শুষ্কতা ছিলো না। তিনি স্বভাবজাতভাবেই প্রাণবন্ত ও হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন। একবার ইঞ্জিনিয়ার ইমতিয়াজ হযরতের পা টিপতে শুরু করলেন। তিনি বললেন- ভাই! আপনি আমার পা দাবানো ছাড়–ন। কারণ যেখানে আপনার হাত লাগে সেখানে তো বিল্ডিং দাঁড়িয়ে যায়।
দারুল উলূম নাদওয়াতুল উলামার হাফিয আতিকুর রহমান সাহেবকে যখন নদভী প্রেস বিভাগ হতে দারুল উলূমের মাতবাখের (বাবুর্চিখখানা) পরিচালক হিসাবে বদলী করা হলো, তখন তিনি বিষয়টা হযরতকে জানালেন। হযরত বললেন- শুধু আরবী অক্ষর ع ও خ -এর পার্থক্য। অর্থাৎ মাতবা’ (প্রেস) থেকে মাতবাখ (বাবুর্চিখানা) বিভাগে বদলী করা হয়েছে।
এক চিঠিতে মাওলানা রহ. তাঁর একান্ত খাদেম হাজী আবদুর রাজ্জাক সম্পর্কে লিখেছেন, সে আমার জীবনের সঙ্গী এবং বৃদ্ধকালের লাঠি।

ইলমী ও দাওয়াতী জীবনঃ
১৯৩৮ইং সনে সর্বপ্রথম আরবীতে লিখিত প্রবন্ধ সাইয়েদ রশীদ রেযা মিসরীয় পত্রিকা আলমানারে ছাপা হয়। প্রবন্ধটি ছিলো সাইয়েদ আহমদ শহীদ রহ.-এর আন্দোলনের উপর লিখিত। ১৯৩৪ইং সনে দারুল উলূম নাদওয়াতুল উলামার শিক্ষক হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং তাফসীর, হাদীস, আরবী সাহিত্য, ইতিহাস ও মানতিকের দরস দেন।
১৯৩৯ইং সনে দ্বীনী প্রতিষ্ঠানসমূহ সম্পর্কে জানার উদ্দেশ্যে সফর করেন। এই সফরে হযরত শাহ আবদুল কাদের রায়পুরী এবং হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ.-এর সঙ্গে পরিচিত হন এবং সেই সময় থেকেই তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও নিয়মিত যোগাযোগ সৃষ্টি হয়ে যায়। প্রথমোক্তজনের নিকট থেকে আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও দীক্ষা লাভ করেছেন আর দ্বিতীয়জনের নেতৃত্বে ও নির্দেশনায় দাওয়াত ও তাবলীগের দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন। আমৃত্যু তাঁদের সাথে এই সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতা বজায় ছিলো।
১৯৪৩ইং সনে ‘আঞ্জুমানে তালীমাতে ইসলাম’ নামে একটি আঞ্জুমান প্রতিষ্ঠান করেন। যেখানে তিনি কুরআনে কারীম ও সুন্নাতে নববীর পাঠ দানের ব্যবস্থা চালু করেন। এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলো।
১৯৪৫ সনে নাদওয়াতুল উলামার মজলিসে এন্তেজামিয়ায় রোকন নির্বাচিত হয়।
১৯৫১ সনে আল্লামা সাইয়েদ সুলাইমান নাদাবী রহ.-এর প্রস্তাবে শিক্ষা বিভাগের নায়েব মুতামাদ হিসাবে নিয়োগ লাভ করেন।
১৯৫১ সনে তাহরীকে পয়ামে ইনসানিয়াত বা মানবতার ডাক আন্দোলনের গোড়াপত্তন করেন। যেহেতু চারিত্রিক মূল্যবোধ অত্যন্ত নিষ্ঠুরতার সাথে পদদলিত করা হচ্ছিলো, স্বার্থপরতা ও আত্মপূজার উন্মাদনা ভর করেছিলো সকল মানুষের মস্তিষ্কে, মানুষের জান-মাল, ইজ্জত ও আবরুর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছিলো দ্রুতগতিতে তাই এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রতিষ্ঠা করলেন মানবতার ডাক আন্দোলন।
১৯৫৪ সনে সাইয়েদ সুলাইমান নাদাবী রহ.-এর ইনতিকালের পর সর্বসম্মতিক্রমে মু’তামাদে তালীম হিসাবে নিয়োগ লাভ করেন।
১৯৫৯ সনে মজলিসে তাহকীকাত ও নাশরিয়াতে ইসলাম (ইসলামী গবেষণা ও প্রকাশনা পরিষদ) প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৬১ সনে বড় ভাই ড. আবদুল আলী হাসানীর ইনতিকালের পর নাদওয়াতুল উলামার নাযেম নির্বাচিত হন।
১৯৬৩ সনে জামেয়া ইসলামিয়া মদীনা মুনাওয়ারায় বেশ কয়েকটি বক্তৃতা প্রদান করেন। পরবর্তীতে যা ‘নবুওয়ত ও নবী কুরআনের আলোকে’ নামে প্রকাশিত হয়। এটা ছিলো নজিরবিহীন এক বক্তৃতা।
সম্মান ও স্বীকৃতি, বিভিন্ন দ্বীনী প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রের সদস্যপদঃ
১৯৫৭ সনে সিরিয়ার দামেস্কের মাজমাউল দুগাতিল আরাবিয়্যাহর যোগযোগ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৬২ সনে রাবেতায়ে আলমে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাকল্পে মুক্কা মুকাররমায় অনুষ্ঠিত প্রথম সম্মেলনে অংশ্রগ্রহণ করেন এবং সম্মেলন পরিচালনার দায়িত্বে আনজাম দেন। উক্ত সম্মেলনে বাদশাহ মাসউদ বিন আবদুল আযীয এবং লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট ইদ্রিস সানুসী উপস্থিত ছিলেন।
১৯৬২ সনে জামেয়া ইসলামিয়া মদীনা মুনাওয়ারা প্রতিষ্ঠালগ্নে তাঁকে মজলিসে শুরার সদস্য নির্বাচিত করা হয়।
রাবেতা আল-জামেয়াতুল ইসলামিয়ার (রাবাত, মরক্কো) সম্মেলন রাবেতায়ে আলমে ইসলামীর সেক্রেটারী জেনারেলের নেতৃত্বে অংশগ্রহণ করেন। এরপর নাদওয়াতুল উলামার প্রতিনিধি হিসাবে এই সংস্থার সদস্যপদ লাভ করেন।
১৯৮০ সনে জর্ডানের মাজমাউল লুগাতিল আরাবিয়ার রোকন মনোনীত হন। ১৯৮১ সনে কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে সম্মানসূচক পি.এইচ.ডি ডিগ্রী প্রদান করা হয়।
১৯৮৩ সনে অক্সফোর্ড ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হলে প্রতিষ্ঠাকাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এর সভাপতির পদ অলঙ্কৃত করে রাখেন।
১৯৮৪ সনে রাবেতা আল-আদাবিল ইসলামিয়া আল-আলিয়ার প্রতিষ্ঠা হয়। তখন থেকে তিনি এর আজীবন সভাপতি হিসাবে বহাল থাকেন।
১৯৬৮ সনে সউদী সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর আমন্ত্রণে শরীয়া বিভাগের পাঠ্যসূচী ও নিয়ম-কানুন প্রস্তুতের জন্য রিয়াদ গমন করেন।
১৯৩২ সনে নাদওয়াতুল উলামা থেকে প্রকাশিত আরবী পত্রিকা এবং ১৯৪০ সনে উর্দূ পত্রিকা আন-নাদওয়ার সম্পাদনায় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সনে আঞ্জুমানে তালীমাতে ইসলামিয়ার পক্ষ থেকে ‘তা‘মীর’ নামে উর্দূ পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন।
১৯৫৮-৫৯ সনে সিরিয়ার দামেস্ক থেকে প্রকাশিত ‘আল-মুসলিমুন’ পত্রিকায় নিয়মিত সম্পাদকীয় লিখেন। প্রথম সম্পাদকীয় ছিল এই শিরোনামে- যা উর্দূতে অনূদিত হয়ে ‘নতুন তুফান এবং তার মুকাবালা’ নামে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া উস্তাদ মুহিব্বুদ্দীন খতীবের ‘আল ফাতাহ’ পত্রিকাতেও তাঁর কিছু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
১৯৬৩ সনে লাখনৌ থেকে ‘নেদায়ে মিল্লাত’ প্রকাশিত হতে শুরু করলে তিনি পত্রিকাটির প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৫৫ সালে নাদওয়া থেকে আরবী পুস্তিকা এবং ১৯৫৯ সালে প্রকাশিতব্য আরবী পুস্তিকা এবং উর্দূ ম্যাগাজিন ‘পাক্ষিক তামীরে হায়াত’-এর প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮০ সালে মুসলিম বিশ্বে তাঁর অনবদ্য ইলমী ও আমলী খেদমতের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৪০০ হিজরী সনে বাদশাহ ফয়সাল এওয়ার্ড দিয়ে তাঁকে সম্মানিত করা হয়। এই এওয়ার্ডে সৌদী দুই লাখ চল্লিশ হাজার রিয়াল ও একটি সনদপত্র তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়। তৎকালীন ভারতীয় রূপী হিসাবে ওই অর্থের পরিমাণ ছিলো চব্বিশ লাখ রূপী। মাওলানা মরহুম এই অর্থের অর্ধেক দান করেন আফগান শরণার্থীদের জন্য এবং অবশিষ্ট অর্ধেক অর্থ মক্কা মুকাররমায় অবস্থিত ইদারায়ে হিফযুল কুরআন ও সাওলাতিয়া মাদরাসায় সমান ভাগে ভাগ করে দান করেন।
শায়খ সুলাইমান নাদাবী রহ. প্রণীত সীরাতুন নবী গ্রন্থখানির অষ্টম খন্ডের ভূমিকা মাওলানা লিখে দিয়েছিলেন। কিতাবটি পাকিস্তান থেকে মুদ্রিত হয়ে প্রকাশিত হলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক তাঁকে এক লাখ টাকার এওয়ার্ড দান করেন। হযরত মাওলানা এই টাকার অর্ধেক আযমগড়ের ‘দারুল মুসান্নিফীন’ প্রতিষ্ঠানে দান করেন। আর অর্ধেক সাইয়েদ সুলাইমান নাদাবী মরহুমের স্ত্রীকে দিয়ে দেন।
১৯৯৯ সনে একটি শানদার অনুষ্ঠানে ‘ইসলামী বিশ্বের মহান ইসলামী ব্যক্তিত্ব’ এওয়ার্ড মাওলানাকে প্রদান করা হয়। এই এওয়ার্ডের অর্থের পরিমাণ ছিলো এক কোটি বিশ লাখ রূপী। এই টাকাও সম্পূর্ণরূপে তিনি ভারতের বিভিন্ন দ্বীনী প্রতিষ্ঠানে দান করে দেন।
একই বছরেই অক্সফোর্ড ইসলামী সেন্টারের পক্ষ থেকে ‘তারীখে দাওয়াত ও আযীমাত’-এর জন্য তাঁকে সুলতান হাসান বুলকিয়া ব্রুনাই ইন্টারন্যাশনাল এওয়ার্ডে ভূষিত করা হয়। এই অর্থও তিনি তাঁর বন্ধু ও ঘনিষ্ঠজন ও অভাবী ব্যক্তিদেরকে দান করে দেন।

দ্বীনী প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রসমূহের রোকন হিসাবে তাঁকে নির্বাচনঃ
— ৮ই জুন ১৯৬১ দারুল উলূম নাদওয়াতুল উলামার নাযেম নির্বাচিত হন।
— সভাপতি, তালীমী কাউন্সিল, উত্তর প্রদেশ, ভারত।
— সভাপতি, অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ‘ল’ বোর্ড, ভারত।
— সভাপতি, মজলিসে ইন্তেজামী ও মজলিসে আমেলা, আযমগড়।
— সভাপতি, ইসলামিক সেন্টার অক্সফোর্ড লন্ডন, বৃটেন।
— সভাপতি, ফাউন্ডেশন ফার স্টাডিজ এন্ড রিসার্চ, লুক্সেমবার্গ।
— সভাপতি, মজলিসে তাহকীকাত ও নাশরিয়াতে ইসলামী লাখনৌ, ভারত।
— সভাপতি, আলমী রাবেতা আদবে ইসলামী।
— রোকন, মুআসসাসাহ আলে বাইত, ওমান, জর্ডান।
— প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, তাহরীকে পয়ামে ইনসানিয়াত, ভারত।
— রোকন, মজলিসে তাসীসী রাবেতা আলমে ইসলামী, মক্কা মুকাররমা, সৌদী আরব।
— রোকন, মজলিসে শুরা জামেয়া ইসলামিয়া মদীনা মুনাওয়ারা।
— রোকন, আরবী একাডেমী, দামেস্ক, কায়রো ও জর্ডান।
— রোকন, মজলিসে আমেলা, মুতামার আলমে ইসলামী বৈরুত, লেবানন।
— রোকন, মজলিসে এন্তেজামী ইসলামিক সেন্টার, জেনেভা।
— রোকন, মজলিসে ফিকহে ইসলামী, রাবেতা আলমে ইসলামী, মক্কা মুকাররমা, সৌদী আরব।
— রোকন, মজলিসে শূরা দারুল উলূম দেওবন্দ, ভারত।
— রোকন, মজলিসে আমেলা, ইসলামিক ইউনিভার্সিটিজ ফেডারেশন, রাবাত, মরক্কো।
— রোকন, একাডেমী অব অ্যারাবিক ল্যাংগুয়েজেস, ওমান।
— রোকন, ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফার ট্রান্সলেশন রিসার্চ এন্ড স্ট্যাডিজ, তিউনিস।
— ভিজিটিং প্রফেসর, দামেস্ক-মদীনা ইউনিভার্সিটি, সৌদী আরব।

মাওলানা আলী নাদাবী রহ.-এর সফরসমূহঃ
১৯২৯ সালে তিনি লাহোর সফর করেন। এটাই ছিলো তাঁর প্রথম দূরের সফর। এই সফরে লাহোরের ইলমী ও দ্বীনী ব্যক্তিত্ব ও বুযুর্গগণের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। এই সফরে প্রাচ্যের কবি ড. মুহাম্মদ ইকবালের সঙ্গেও সাক্ষাত করেন এবং তাঁর রচিত একটি কাব্যগ্রন্থের আরবী অনুবাদ তাঁর সামনে পেশ করেন। মাওলানা নিজেই আরবীতে কাব্যগ্রন্থটির অনুবাদ করেছিলেন।
১৯৩৫ সনে হরিজন নেতা ড. আম্বেদকরকে ইসলামের দাওয়াত দানের উদ্দেশ্যে বোম্বে সফর করেন।
১৯৪৭ সনে হজ্জের সফর করেন। এটাই ছিলো তাঁর হজ্জের প্রথম সফর। আর বহির্দেশের সফরও এটাই ছিলো প্রথম। কয়েক মাস হিজাজে অবস্থান করেন। হজ্জের দ্বিতীয় সফর হয়েছিলো ১৯৫০ সনে। হজ্জ শেষ করে সেখান থেকে তিনি মিশর, সুদান, জর্ডান ও সিরিয়া সফর করেন।
১৯৫১ সনে মিশরের প্রথম সফর করেন। মাওলানার গমনের আগেই তাঁর বিখ্যাত একটি গ্রন্থ সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলো এবং কিতাবটি যেমন সেখানকার সর্বস্তরের বিদ্যানদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিলো, তেমনি কিতাবটির বদৌলতে তিনিও আগে থেকেই সেখানে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিলেন। এই সফরেই ফিলিস্তিন গমন করেন এবং বায়তুল মুকাদ্দাস যিয়ারতের সৌভাগ্য লাভ করেন। ফিরতি পথে জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাত করেন।
১৯৫৬ সনে তুর্কী সফর করেন। তুর্কীতে এটাই ছিলো তাঁর প্রথম সফর। এই সফরের বিবরণী ‘তুর্কীতে দুই সপ্তাহ’ নামে প্রকাশিত হয়। এই বছরই লেবানন সফর করেন।
১৯৬০ সনে তিনি বার্মা সফর করেন।
১৯৬২ সনে কুয়েতে প্রথম সফর করেন। পরবর্তীতে কুয়েত সহ উপসাগরীয় দেশসমূহে একাধিকবার সফর করেন। জর্ডান ও ইয়েমেনেও সফর তিনি করেন।
১৯৬৩ সনে তিনি ইউরোপ সফর করেন। এটাই ছিলো ইউরোপে তাঁর প্রথম সফর। এই সফরে তিনি লন্ডন, প্যারিস, অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ ইত্যাদি জায়গায় যান এবং স্পেনের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো ভ্রমণ করেন।
১৯৭৬ সনে মসজিদে আকসা সফর করেন।
১৯৭৭ সনে আমেরিকায় তাঁর প্রথম সফর হয়। এই সফর ছিলো দুই মাস দশ দিনের। এই সফরে আমেরিকার বিভিন্ন শহরে যান এবং দ্বীনী ও দাওয়াতী বক্তৃতা প্রদান করেন। এই সফরে চোখেরও অপারেশন করিয়েছিলেন।
১৯৭৭ সনে আফগানিস্তান, ইরাক, ইরান এবং লেবাননের উদ্দেশ্যে রাবেতায়ে আলমে ইসলামীর প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দান করেন।
১৯৮৫ সনে তিনি বেলজিয়াম সফর করেন।
১৯৮৭ সনে তিনি রাশিয়ার তাসখন্দ, সমরকন্দ প্রভৃতি শহর সফর করেন। জর্ডানে সফর করেন ১৯৭৩ ও ১৯৮৪ সনে। স্পেনে ১৯৭৩ সনে। সংযুক্ত আরব আমীরাতে ১৯৭৪, ১৯৭৬, ১৯৮৩, ১৯৮৮, ১৯৯৩ এবং ১৯৯৯ সনে। উত্তর আমেরিকা সফর করেন ১৯৭৭ ও ১৯৯৩ সনে। ইউরোপ সফর করেন ১৯৬৩, ১৯৬৪, ১৯৬৯, ১৯৮৩, ১৯৮৬, ১৯৮৭, ১৯৮৯, ১৯৯২, ১৯৯৩ সনে। ইরান সফর করেন ১৯৭৩ সনে। পাকিস্তান সফর করেন ১৯৫৯, ১৯৬৪, ১৯৭৮, ১৯৮৪, ১৯৮৬ সনে। বোখারা সফর করেন ১৯৮৬ সনে। বৃটেনে সফর করেন ১৯৬৩ সনে এবং ১৯৮৫ সনে। বার্মা সফর করেন ১৯৬০ সনে। তুর্কী সফর করেন ১৯৫৬, ১৯৬৪, ১৯৮৯, ১৯৯৩ এবং ১৯৯৯ সনে। আল-জাযায়ের সফর করেন ১৯৮২ ও ১৯৮৬ সনে। হেজায সফর করেন ১৯৪৭, ১৯৫১, ১৯৬২, ১৯৬৭ ও ১৯৬৯ সনে। কাতার সফর করেন ১৯৭৯ ও ১৯৯৫ সনে। রাবাত সফর করেন ১৯৭৬ সনে। শ্রীলংকা সফর করেন ১৯৮২ সনে। সমরকন্দ সফর করেন ১৯৯৩ সনে। সুদান সফর করেন ১৯৫১ সনে। শাম সফর করেন ১৯৫১, ১৯৫২, ১৯৬৪ ও ১৯৭৩ সনে। ইরাক সফর করেন ১৯৫৬ ও ১৯৭৩ সনে। ওমান সফর করেন ১৯৫১, ১৯৭৩, ১৯৮৪ ও ১৯৯৮ সনে। ফিলিস্তিন সফর করেন ১৯৫১ সনে। কুয়েত সফর করেন ১৯৬২, ১৯৬৮, ১৯৮৩ ও ১৯৮৭ সনে। লেবানন ১৯৫৬, ১৯৭৩ সনে। লাহোর ১৯৬৯ সনে। মালয়েশিয়া ১৯৮২ ও ১৯৮৭ সনে। মরক্কো ১৯৮৬ সনে। মিশর ১৯৫১ সনে। নেপাল ১৯৯২ সনে। ইয়েমেন ১৯৮৪ সনে এবং সর্বশেষ তিনি বাংলাদেশে সফর করেন ১৯৮৪ সনে।


LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.