গবেষণাঃ অধিকার ও নীতিমালা

0
841
hand with book, islamic image,

গবেষণাঃ অধিকার ও নীতিমালা
শায়খ আব্দুল মালিক

‘গবেষণা’ একটি প্রয়োজনীয় বিষয় এবং তা শরীয়তে কাম্যও বটে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- গবেষণা কে করবেন এবং এর নীতিমালা কি হবে। অতি সাধারণ বুদ্ধিতেও এ কথাটি বোধগম্য যে, কোনো বিষয়ে গবেষণার অধিকার তারই আছে- যিনি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ ও পারদর্শী। অন্যথায় তিনি গবেষণা করবেন কিভাবে? সংশ্লিষ্ট শাস্ত্রের পান্ডিত্য ছাড়া গবেষণা কখনো গবেষণা হয় না এবং তাতে গবেষণার উদ্দেশ্যও হাসিল হতে পারে না।
তাহকীক বা গবেষণা হয়েই থাকে এমন সব বিষয়ে- যা অস্পষ্ট বা জটিল। এ জাতীয় বিষয়ে এজন্যই চিন্তা-ভাবনা করা হয়- যাতে এ বিষয়ক বিভিন্ন মতামত ও তথ্য-প্রমাণের আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে সঠিক ও বাস্তব সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়।
বলাবাহুল্য, এ কাজে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গকে গলদঘর্ম হতে হয়। প্রচুর পরিশ্রম, সম্মিলিত চিন্তা-ভাবনা এবং আলোচনা-পর্যালোচনার পরই কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়। অতএব এসব ক্ষেত্রে আনাড়ী লোকেরা- যারা সংশ্লিষ্ট শাস্ত্রে অনভিজ্ঞ, তারা কী গবেষণা করবেন।
এ ধরণের লোকদের গবেষণা অঙ্গনে অনুপ্রবেশ বিবেক ও শরীয়ত উভয় দৃষ্টিতে নিন্দনীয় হওয়া ছাড়াও বুদ্ধিমান ব্যক্তি মাত্রই এ ব্যাপারে একমত যে, এটি একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্ম-, যা কোনো বিবেকবান ও ব্যক্তিত্ববান মানুষ কখনো পছন্দ করতে পারেন না। কেননা এ ধরণের কাজ যে শুধু ব্যক্তির বিবেক-বুদ্ধির স্বল্পতারই পরিচায়ক তাই নয়; বরং তা অনধিকার চর্চাও বটে। এরূপ পদক্ষেপ সত্য ও বাস্তবতার বিকৃতি এবং ইলম ও জ্ঞান পরিম-লে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অন্যতম উপসর্গ।
এই দায়িত্ববোধ বিবর্জিত কাজটি এমন ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব- যার না আছে নিজের মান-মর্যাদার কোনো মূল্য, আর না আছে নীতি-নৈতিকতা অনুসরণের সাধারণ গুরুত্ববোধ। মানবকুলকে আহাম্মক মনে করার মতো ভুল না করলে কোনো লোক এ কাজে অগ্রসর হতে পারে না। কেননা নিজস্ব বিষয়ের বাইরে অন্য কোনো বিষয়ে গবেষণালদ্ধ সিদ্ধান্ত প্রদান করতে যাওয়া নিঃসন্দেহে শ্রোতা ও পাঠকবৃন্দকে আহাম্মক মনে করারই নামান্তর।
শরীয়তে দ্বীনী বিষয়াদি ছাড়াও সাধারণ নিয়ম-শৃঙ্খলা বিষয়ক বিষয়াদিতে মতামত প্রদানের জন্যও আহলে ইস্তিমবাতের মতো উঁচু মানের বুদ্ধি-বিবেচনার অধিকারী হওয়ার শর্ত আরোপ করা হয়েছে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
وإذا جائهم أمر من الأمن أو الخوف أذاعوا به- ولو ردوه إلي الرسول وإلي أولي الأمر منهم لعلمه الذين يستنبطونه منهم-
অর্থঃ যখন তাদের কাছে আসে কোনো সংবাদ শান্তি বিষয়ক কিংবা ভয়ের, তখন তারা সেটা রটিয়ে দেয়। যদি তারা সেটা পৌঁছে দিত রাসূল এবং কর্তাব্যক্তিদের নিকট- তাহলে তাদের মধ্যে যারা সঠিক তথ্য উদঘাটনে সক্ষম. তারা তা ভালোভাবে জেনে নিতে পারতো। (সূরা নিসাঃ আ-৮৩)
অযোগ্য লোকের গবেষণাকর্ম কিয়ামতের একটি বড়ো আলামত। জনৈক সাহাবী নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেসা করেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
যখন আমানত বিনষ্ট করা হবে- তখন কেয়ামতের অপেক্ষা করো। প্রশ্নকারী জিজ্ঞাসা করলেন- আমানত কীভাবে বিনষ্ট করা হয়? উত্তরে তিনি বললেন-
إذا وسد الأمر إلي غير أهله فانتظر الساعة-
অর্থঃ যখন অযোগ্য লোকের নিকট কর্মের ভার অর্পণ করা হবে- তখন কেয়ামতের অপেক্ষা করো।
(সহীহুল বুখারীঃ হা-৫৯)
আলোচিত হাদীসে কেয়ামতপূর্ব সময়ে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে- তার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র যদি উকীল সাহেব লেখা শুরু করেন, তাহলে চিকিৎসার ক্ষেত্রে যে চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সৃষ্টি হবে- তাতে কি কোনো সন্দেহ আছে? সোনার যাচাই যদি কামার করে- তাহলে অবস্থাটা কি দাঁড়াবে? ঠিক একই অবস্থা হবে দ্বীন ও শরীয়তের। যদি দ্বীনী বিষয়াদির ব্যাখ্যা ও উপস্থাপনা কোনো অযোগ্য লোকের হাতে অর্পিত হয়।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কারো নিকট থেকে বায়অ্াত নিতেন- তখন এই অঙ্গীকারও নিতেন যে, أن لا ننازع الأمر أهله- অর্থাৎ, আমরা দায়িত্বশীল (ও যোগ্য) লোকের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হবো না।
(সহীহুল বুখারীঃ হা-৭০৫৬; সহীহ মুসলিমঃ হা-১৭০৯)
মোটকথা, তাহকীক ও গবেষণার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পারদর্শিতা ও যোগ্যতার শর্তটি শুধু যে শরীয়তের দৃষ্টিতেই জরুরী- তা নয়; বরং এই বিষয়টি সকল বুদ্ধিমান ব্যক্তির নিকটও স্বীকৃত। যদিও জ্ঞান ও বুদ্ধির দাবীদার এক শ্রেণীর লোকেরা শুধু দ্বীনী বিষয়াদির ব্যাপারে এই সর্বসম্মত সিদ্ধান্তটি মানতে প্রস্তুত নন। এই অবস্থা নিঃসন্দেহে হাদীসে উল্লেখিত যোগ্য লোকের সাথে অযোগ্য লোকের বিবাদে লিপ্ত হওয়ার একটি নিকৃষ্টতম উদাহরণ।
হাকীমূল উম্মত শায়খ আশরাফ আলী থানভী রহ. -এর ভাষায় “জগতের সকল শাস্ত্র ও জীবনের সকল ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি বিশেষ কোনো বিষয়ে পারদর্শী নয়, সে একথা বলে দিতে কোনো সংকোচ বোধ করে না যে, আমি এই বিষয়টি জানি না। একজন বড়ো প্রকৌশলীকে যদি আপনি আপনার চোখের সমস্যার কথা বলেন- তিনি তৎক্ষণাৎ জওয়াব দেন- আমি ডাক্তার নই। অনুরূপ একজন ডাক্তারকে যদি প্রকৌশল বিষয়ক কোনো প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি তড়িৎ জওয়াব দিবেন- আমি ইঞ্জিনিয়ার নই; অথচ দ্বীন ও শরীয়তকে এমনই লাওয়ারিস মনে করা হয় যে, প্রত্যেকেই এতে নিজের মতামত ঠেসে দিতে প্রস্তুত। ‘আমি আলিম নই’ -এখানে একথা বলতে কেউ প্রস্তুত নন।
সাহারানপুরের এক ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট একবার থানা ভবনে আসেন এবং একটি আয়াতের ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন করেন। সাথে সাথে তিনি এও উল্লেখ করেন যে, অমুক ব্যক্তি আয়াতটির এই তাফসীর করেছেন, অথচ তিনি ছিলেন উর্দূ ভাষার একজন সাহিত্যিক মাত্র, আলিম ছিলেন না। আমি তার উদ্ধৃতিটির উত্তরে বললাম- জনাব, আপনি যে আইন ও বিধি মোতাবেক কোর্টে রায় প্রদান করে থাকেন, তার এক কপি আমাকে দিবেন। আমি তার উপরে একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখবো। আপনি এই ব্যাখ্যা অনুসারে কোর্টে ফয়সালা করবেন। যদি সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি উত্থাপিত হয়, তবে আমার কথা বলবেন যে, আশরাফ আলী থানভী এই বিধির এই ব্যাখ্যাই করেছেন। দেখবেন- রাষ্ট্রীয়ভাবে আপনাকে কী কী উপাধিতে ভূষিত করা হয়!!”
(মাজালিসে হাকীমুল উম্মত, সংকলন- মুফতী মুহাম্মদ শফী রহ.ঃ পৃ- ৯৯-১০০)
শাস্ত্রীয় যোগ্যতার মাপকাঠি
আশা করি উপরোক্ত আলোচনা থেকে এই ভুল ধারণার অবসানও হয়েছে- যাতে অনেক ব্যক্তি নিপতিত। কোনো বিষয়ে গবেষণার উপযুক্ততা অর্জনের জন্য যেসব শাস্ত্রীয় পারদর্শিতা প্রয়োজন- তা শিখা এবং শাস্ত্রীয় বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হয়ে তাদের তরবিয়ত ও সাহচর্য লাভ করা তো দূরের কথা, শুধু আরবী ভাষার ভাষাজ্ঞান অর্জন করা এবং এজন্য পর্যাপ্ত সময় বের করাও যাদের পক্ষে অতি কঠিন, তারা কুরআনুল কারীম ও কিছু হাদীসগ্রন্থের বাংলা-ইংরেজী অনুবাদ পড়ে নিজেকে দ্বীনীয়াতের বিশেষজ্ঞ এবং গবেষক ভাবতে থাকেন। এরা নিজেদের গবেষণার ব্যাপারে খুবই উচ্চধারণা পোষণ করেন এবং এইসব গবেষণালব্ধ (?) সিদ্ধান্তের ব্যাপারে বড়ো অহমিকায় ভুগেন। ফলে আহলে ইলমের ব্যাপারে তাদের মনে থাকে প্রচ- অবজ্ঞা। এরা তাঁদেরকে পুরনো যুগের অনভিজ্ঞ মোল্লা-মৌলভী ভাবতেই ভালোবাসেন এবং নিজেদেরকে ভাবেন দ্বীন ও শরীয়তের ব্যারিস্টার ও বিজ্ঞ চিন্তাবিদ। এ অবস্থা আজকাল ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে।
আমার মনে হয়, এ ব্যাপারে দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন নেই। কেননা এ জাতীয় পারদর্শিতার বাহকগণও যদি ঠা-া মাথায় চিন্তা করেন- তাহলে বুঝবেন যে, অনুবাদের সাহায্যে কুরআন ও হাদীসের অর্থ জানাই যদি শাস্ত্রের পারদর্শিতা হয়, তবে তা পারদর্শিতা শব্দটির অবমাননা ও বিকৃতি সাধন ছাড়া আর কিছু নয়। কোনো শাস্ত্রে এই পরিমাণ জ্ঞান ও যোগ্যতা অর্জন করাকেই পারদর্শিতা বলা হয়- যাকে সংশ্লিষ্ট শাস্ত্র বিষেশজ্ঞগণ ‘পারদর্শিতা’ বলে স্বীকৃতি দেন।

গবেষণার নিয়ম-নীতি
এ বিষয়টি সুদীর্ঘ আলোচনার দাবী রাখে। বক্ষমান নিবন্ধে শুধু এ প্রসঙ্গে দু-একটি মৌলিক নীতি উল্লেখ করেই ক্ষান্ত হবো ইনশা-আল্লাহ।
প্রথম নীতি হলো- নিজ মেধা ও সময় এমন বিষয়ের গবেষণায় ব্যয় না করা, যার কোনো দ্বীনী বা দুনিয়াবী উপকারিতা আশা করা যায় না। ইসলামে ‘গবেষণার জন্য গবেষণা’ একটি অর্থহীন কাজ হিসেবে বিবেচিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এ জাতীয় কাজ থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে-
من حسن إسلام المرإ تركه مالا يعنيه- قال النووي في الأربعين: حديث حسن-
অর্থঃ (মুসলমান) ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য হলো- অনর্থক কাজসমূহ পরিহার করা। (সুনানে তিরমিযীঃ ৪/৪৮৩)
আর এমন গবেষণা ও পর্যালোচনা তো বিশেষভাবে নিষিদ্ধ- যা পৃথিবীতে ফেতনা ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করে। মুফতী শফী রহ. -এর ভাষায় “এ জাতীয় গবেষণার উপমা হলো, কোনো সুপুত্র এই গবেষণায় লিপ্ত হলো যে, যাকে আমি আমার পিতা হিসেবে জানি, বাস্তবেই তিনি আমার পিতা কিনা। এ জন্য তিনি তার বিপুল মেধা ও সময় নিয়োজিত করলেন তার জননীর জীবন-চরিতের রিসার্চ ও গবেষণায়।” (মাকামে সাহাবাঃ পৃ-১০-১১)
মোটকথা তাহকীক বা গবেষণার প্রথম মূলনীতিটি হলো, গবেষণা এমন বিষয়ে হওয়া উচিত, যে বিষয়ে গবেষণার কোনো দ্বীনী প্রয়োজন আছে অথবা শরীয়ত অনুমোদিত কোনো দুনিয়াবী কারণ বিদ্যমান রয়েছে।
দ্বিতীয় মূলনীতি হলো- গবেষণার বিষয়বস্তু এমন না হওয়া উচিত যা বাদীহিয়্যাত (অতি সাধারণ বুদ্ধিতেও বোধগম্য) মুসাল্লামাত (সর্বজন স্বীকৃত) ও ইজামাইয়্যাত (শরীয়তের ইমাম ও আলিমগণের ঐকমত্যপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহ)-এর আওতা ভুক্ত। কেননা এসব বিষয় তো সন্দেহাতীতভাবে বাস্তব। অথচ তাহকীক বা গবেষণা হয়ে থাকে কোনো বিষয়ের বাস্তব জ্ঞান লাভ করার জন্য। অতএব যেসব বিষয় নির্জলা বাস্তব, যাতে সংশয়ের লেশমাত্রও নেই, তাতে কিসের ভিত্তিতে এবং কী কারণে পুনরায় চিন্তা-ভাবনা করতে হবে? এসব কাজ শুধু যে অনর্থক গবেষণা বিলাস তাই নয়, সর্বজন স্বীকৃত ও সর্ববাদীসম্মত এসব বিষয়াদির প্রতি সন্দেহের চোখে তাকানো এবং এসবের পেছনে পড়া বে-দ্বীনী-মানসিকতার ফলাফল। পাশাপাশি এ যে অতি স্পষ্ট নির্বুদ্ধিতা। তা তো বলাই বাহুল্য।
উপরোক্ত (মুসাল্লামাত ও ইজমাইয়্যাত) বিষয়াদির দলীলভিত্তিক জ্ঞান লাভ করা অবশ্যই কাম্য। এমন বিষয়ে যদি কোনো বে-দ্বীন লোকের পক্ষ থেকে বিভ্রান্তিমূলক বা সংশয় সৃষ্টিকারী কোনো হামলা আসে- তখন তার দলীলভিত্তিক খন্ডন করাও অপরিহার্য।
আজকাল তথাকথিত গবেষকদের মধ্যে যে রোগটি ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হচ্ছে তা হলো, এরা উম্মতের মুসাল্লামাত বা সর্বস্বীকৃত বিষয়াদি এবং আহলে ইলমের ইজমাইয়্যাত বা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত সমূহকেই নিজেদের রিসার্চ ও গবেষণার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করেন। তারা উম্মাহর সর্ববাদীসম্মত বিষয়, ইমামগণের ইজমায়ী বিষয় এবং প্রচলিত রসম-রেওয়াজ সবকিছুকেই এক নিক্তিতে ওযন করতে অভ্যস্ত। অথচ প্রথমোক্ত বিষয়গুলো হলো দ্বীনের মৌলিক বিষয় এবং শেষোক্ত বিষয়াদির সাথে দ্বীনের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রথমোক্ত বিষয়গুলোর প্রথম সারির প্রচারক হলেন আহলে ইলম ও মিল্লাতের মুজাদ্দিদবৃন্দ, অথচ শেষোক্ত বিষয়সমূহের ব্যাপারে তাঁরাই হন প্রথম প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।
মূর্খ জনসাধারণ রসম-রেওয়াজের অনুগামী হয় এবং আহলে ইলম তাদেরকে এসব থেকে বিরত থাকার উপদেশ দেন। অপরদিকে প্রথমোক্ত বিষয়াদি অর্থাৎ ‘মুসাল্লামাত’ ও ‘ইজমাইয়্যাত’-এর কোনো বিষয়ে কেউ কোনো বিভ্রান্তি বা সংশয় ছড়াবার চেষ্টা করলে সকল আহলে ইলম ঐক্যবদ্ধ হয়ে তার মোকাবেলা করেন। রসম-রেওয়াজের পেছনে কোনো শরয়ী দলীল থাকে না, অথচ মুসাল্লামাত ও ইজমাইয়্যাত -এর পেছনে শরীয়তের অন্য সব দলীলের কথা বাদ দিলেও ইজমায়ে উম্মত এর পক্ষে সবচেয়ে বড়ো দলীল।
এতসব কিছুর পরও আপনি দেখবেন, এই সব নামধারী গবেষকদের গবেষণার প্রধান ও শীর্ষস্থানীয় বিষয়বস্তুই হলো এই ‘মুসাল্লামাত’ ও ইজমাইয়্যাত’ -যার শিরোনাম তাদের ভাষায় ‘সমাজে প্রচলিত ধ্যান-ধারণা’। বলাবাহুল্য, এই শিরোনামটি ‘রসম-রেওয়াজের’ অর্থ হতে পারে। মুসাল্লামাত ও ইজমাইয়্যাতকে এই নাম দেওয়া বাস্তবতার বিকৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়।
আমাকে এ ধরণের এক গবেষণা বৈঠকে দাওয়াত করা হয়েছিলো। আমি কোনো দ্বীনী প্রয়োজনে সেখানে দু-তিনবার গিয়েছি। তাদের তখনকার আলোচ্য বিষয় ছিলো- ‘অর্থ না বুঝে কুরআন পড়া গোনাহের কাজ।’
যেখানে প্রকৃত বিষয় হলো- অর্থ না বুঝলেও কুরআন তিলাওয়াত করা অনর্থক নয়। এতে সওয়াব লাভের পাশাপাশি অন্যান্য দ্বীনী উপকারিতাও বিদ্যমান রয়েছে। একে অনর্থক বলা বে-দ্বীনী বা বদ-দ্বীনী। সেখানে গবেষণা এই করা হচ্ছে যে, এমন তিলাওয়াত গোনাহ। আর এই রিসার্চের উপকারিতা এই বলা হচ্ছে যে, লোকেরা কুরআনের অর্থ বুঝতে চায় না, তাই তাদেরকে এ কাজে বাধ্য করাই মূল উদ্দেশ্য।
এরপর আমাকে জানানো হয়েছে যে, পরবর্তী আলোচ্য বিষয় ওযু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা জায়েয। (নাউযুবিল্লাহ) এই মজলিসে যখন আমি উপস্থিত হয়েছি- তখন দেখেছি, অধিকাংশ গবেষকই দাঁড়ি- যা একটি ইসলামী শে’অ্ার তা- থেকে বঞ্চিত। উপস্থিত ব্যক্তিদের অধিকাংশের লেবাস-পোশাক ছিলো ইংরেজ জাতিদের স্টাইলের। কুরআনের আয়াতসমূহের শুদ্ধ তিলাওয়াতও তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না এবং মজলিসের সদস্যবৃন্দের মধ্যে বোধহয় একজনও এমন ছিলেন না- যিনি সরাসরি আরবী কিতাব পড়তে বা বোঝাতে সক্ষম। আজব ব্যাপার হলো এহেন মজলিসের যিনি মধ্যমণি জ্ঞান-বুদ্ধি ও লেবাস-পোশাকে তার অবস্থা অন্য অনেকের তুলনায় আরো শোচনীয়। এই হলো আমার চোখে দেখা তথাকথিত গবেষণা ও গবেষকদের একটি মাত্র চিত্র।
এখন আপনি যদি দাঁড়ি-টুপি ও পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে কিছু বলেন- তাহলে আপনি হয়ে যাবেন পশ্চাৎপদ মৌলভী। আর যদি জ্ঞানহীনতা ও শাস্ত্রীয় অযোগ্যতার কথা বলেন- তাহলে আপনি অভিহিত হবেন গবেষণার ক্ষেত্রে ইজারাদার উপাধিতে। অথচ বাহ্যিক লেবাস-পোশাকে ইসলামী বেশ অবলম্বন করাও সুন্নত। দ্বীনী বিষয়াদিতে গবেষণা ও তাহকীকে নিমগ্ন ব্যক্তিদের জন্য ইত্তেবায়ে সুন্নত, তাকওয়া ও ইখলাসের মতো গুণাবলী অর্জন করাও যরুরী। এই শর্তটিও কুরআন, হাদীস এবং ইজমায়ে উম্মত দ্বারা প্রমাণিত। শাস্ত্রীয় দক্ষতা ও পারদর্শিতার শর্তটি বুদ্ধিমান ব্যক্তিমাত্রই স্বীকৃত। এতে কোনো ধরণের সংশয় সৃষ্টি করার পরিবর্তে নিজের দুর্বলতা ও অক্ষমতাকে স্বীকার করে নেওয়াই সুস্থ জ্ঞান-বুদ্ধির পরিচায়ক।
এ জাতীয় গবেষণা এবং এর ঝা-াবাহীগণ সম্ভবত নি¤েœাক্ত হাদীসের বক্তব্যের আওতাভুক্ত হবেন-
إنها ستأتي علي الناس ستون خداعة- يصدق فيها الكاذب- ويكذب فيها الصادق- يؤتمن فيها الخائن- ويخون فيها الأمين- وينطق فيها الرويبضة- قيل: وما الرويبضة يا رسول الله! قال: السفيه يتكلم في أمر العامة- وفي رواية: الرجل التافه ينطق في أمر العامة-
حديث حسن بمجموع طريقه وشاهده- انظر الكلام عليه في حاشية مسند أحمد للشيخ شعيب أرنوط-
অর্থঃ অবশ্যই মানুষের সামনে কিছু ধোঁকাবাজ বছর অতিবাহিত হবে। যখন মিথ্যুককে সত্যবাদী মনে করা হবে এবং সত্যবাদীকে মিথ্যুক সাব্যস্ত করা হবে। খেয়ানতকারীকে আমানতদার মনে করা হবে এবং আমানতদারকে মনে করা হবে খেয়ানতকারী। তখন কথা বলবে ‘রুআইবিজাহ’। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ‘রুআইবিজাহ’ কী জিনিস? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেন- নির্বোধ ব্যক্তি যে গণমানুষের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত পেশ করবে। (মুসনাদে আহমদঃ ২/২৯১; সুনানে ইবনে মাজাহঃ ২৯২)
হাদীসে এ জাতীয় গবেষকদের বিরুদ্ধেই আহলে ইলমকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-
يحمل هذا العلم من كل خلف عدوله- ينفون عنه تحريف الغالين وانتحال المبطلين وتأويل الجاهلين-
وهو حديث حسن كما ذكره العلائي في بغية الملتمس-
অর্থঃ এই ইলমকে বহন করবে প্রত্যেক উত্তর প্রজন্মের নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিবর্গ। তারা সীমালংঘনকারীদের বিকৃতি, বাতিলপন্থীদের মিথ্যাচার ও মূর্খদের অপব্যাখ্যা থেকে এই ইলমকে পরিচ্ছন্ন করবে।
(আত-তামহীদ-ইবনে আব্দুল বারঃ ১/৫৯)
তৃতীয় মূলনীতি হলো- ইজতিহাদী (ইজতিহাদযোগ্য) বিষয়াদিতে নিজের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত মনে না করা এবং তাকে সমালোচনা ও পর্যালোচনার ঊর্ধ্বে মনে না করা। যদি এ ব্যাপারে কোনো উপযুক্ত সমালোচনা আসে, তাহলে তা সহ্য করা এবং তা থেকে উপকৃত হওয়া বাঞ্ছনীয়।
উপযুক্ত সমালোচনার ব্যাপারে সহনশীল না হওয়া রুগ্ন মানসিকতার পরিচায়ক। এ থেকে প্রত্যেক বুদ্ধিমান ব্যক্তিরই মুক্ত থাকা উচিত। বিশেষত তাহকীক ও গবেষণার ক্ষেত্রে। অন্যথায় সমাজে জ্ঞান ও শাস্ত্রের উন্নতি হবে না এবং গবেষণার দ্বার উন্মুক্ত থাকার উপকারিতা থেকেও সমাজ বঞ্চিত হবে।
এ ব্যাপারে খলীফায়ে রাশেদ সাহাবী উমর রাযি.-এর ঘটনাটি দেখুন। কী ধরণের প্রজ্ঞাপূর্ণ ও ওযনদার ঘটনা। ইমাম ইবনে আব্দুল বার রহ. ‘জামিউ বয়ানিল ইলম’ (২/৫৯) গ্রন্থে এ ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন- “কোনো এক প্রসঙ্গে এক ব্যক্তি উমর রাযি. -কে বললেন, আমি হলে অন্য রায় দিতাম।” লোকটি বললো- জনাব! তবে কেনো আপনি তাদের রায়কে পরিবর্তন করছেন না, আপনি তো এখন আমীরুল মুমিনীন। উমর রাযি. উত্তরে বললেন- “এ তো কিতাবুল্লাহ বা সুন্নাতে রাসূল নয়। এ তো হলো আমার মত والرأي مشترك এবং মত সবার হতে পারে।”
খলীফায়ে রাশেদ উমর রাযি.-এর এই বাক্যটি والرأي مشترك ‘এভাবে অন্যদেরও মতো থাকতে পারে। স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার উপযুক্ত। তবে ভুলে গেলে চলবে না যে, এ কথাটি কেবল উপযুক্ত ব্যক্তির ব্যাপারেই প্রযোজ্য।
আরো একটি মূলনীতি হলো- কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে গবেষণা করতে হলে কোনো শরয়ী প্রয়োজন ছাড়া তাদের ব্যক্তি সত্তাকে আক্রমণ করা কোনোক্রমেই বৈধ নয়। যদি তাঁদের জীবন-চরিত লিখতে হয়, তাদের শাস্ত্রীয় জ্ঞানের পরিধি নির্ণয় করতে হয়, তাদের চিন্তা-ভাবনা ও মতামতের পর্যালোচনা করতে হয়, তবে এজন্যও বেশ কিছু নীতিমালা রয়েছে। রয়েছে নির্ধারিত সীমারেখা, যা লঙ্ঘন করা কোনোক্রমেই কাম্য হতে পারে না। এখানে এসব বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব নয়। এ কাজের জন্য “ইলমু উসূলিল জারহি ওয়াত- তা’দীল ও ইলমু উসূলিত তারীখ” বিষয়ক কিতাবাদি অধ্যয়ন করা অপরিহার্য।
এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে চারটি মৌলিক নীতি সংক্ষিপ্তভাবে আলোচিত হলো। অন্যান্য বুনিয়াদি নীতিমালা সম্পর্কে ইনশা-আল্লাহ অন্য কোনো অবসরে আলোচনা করা যাবে। মহান আল্লাহ তা’আলাই তাওফীকদাতা, তাঁর উপরই ভরসা করি। আল্লাহ তা’আলা সুস্থ গবেষণা ও সুস্থ সমালোচনার উপযুক্ত ব্যক্তিবর্গ সৃষ্টি করুন এবং অযোগ্য গবেষকদের ফিতনা থেকে উম্মতকে হেফাযত করুন। আমীন!

***************************************

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.