জিলহজ্জ মাসে তাকবীরে তাশরীক

0
1068
Takbir e Tashreeq
Takbir e Tashreeq

আরাফার দিন অর্থাৎ জিলহজ্জের নয় তারিখ ফজরের নামায থেকে শুরু করে জিলহজ্জের ১৩ তারিখের আসরের নামায পর্যন্ত প্রতি ফরয নামাযের পর একাকী হোক বা জামাতে নামায আদায়কারী হোক, মহিলা হোক কিংবা পুরুষ হোক- সকলের জন্য একবার তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব। পুরুষগণ উচ্চস্বরে আর নারীরা নিম্নস্বরে বলবে।

তাকবীরে তাশরীক নিম্নরূপ-
الله أكبر الله أكبر- لا إله إلا الله والله أكبر الله أكبر ولله الحمد-
তাকবীরে তাশরীক একবারের অধিক বলার কথা উল্লেখ নেই। সুতরাং একবারের বেশি বলা সুন্নাত পরিপন্থী। (রদ্দুল মুহতার; তাহতাবীঃ ১৯৫)
জামাতের নামাযে সালাম ফিরানোর পর ইমাম উচ্চস্বরে তাকবীর পড়বেন। যেনো অন্যান্য মুসল্লীদের স্মরণ হয় এবং তারাও তাকবীর পড়ে নিতে পারেন।
যদি কেউ তাকবীর বলতে ভুলে যায়, এরপর মসজিদের ভিতরেই তা স্মরণ হয়, অথবা ময়দানে নামায পড়ার পর কাতার ভাঙ্গার আগেই স্মরণ হয়- তাহলে এমতাবস্থায় সঙ্গে সঙ্গে পড়ে নিলে আদায় হয়ে যাবে। অন্যথায় তাকবীরে তাশরীক আদায় হবে না।
মাসবুকের জন্য তাকবীর বলা ওয়াজিব। বাকী নামায আদায় করে তাকবীর বলে নিবে। যদি মাসবুক ইমামের সঙ্গে ভুলবশত তাকবীর বলে ফেলে- তাহলে এতে তার নামায নষ্ট হবে না। (তাহতাবীঃ ২৯৫)
সালাম ফিরানোর সাথে সাথে তাকবীর বলতে হবে। তবে যদি কেউ সালাম ফিরানোর পর তাকবীর না বলে কথা বলে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে ওযু ভঙ্গ করে ফেলে, তাহলে তার ওপর থেকে তাকবীরের হুকুম রহিত হয়ে যাবে। (ফতোয়ায়ে আলমগীরীঃ ২/৩)

তাশরীকের নামকরণ
তাশরীকের দিনগুলোর নামকরণের ব্যাপারে আলিমগণের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। যথা-
 কেউ বলেন- জাহিলিয়্যাতের যামানায় মুশরিকরা বলতো- হে শাবীর! তুমি শুভ্র হও। তোমার আলো দেখে আমরা চলবো। শাবীর একটি পাহাড়ের নাম। তখন সূর্য্য উদিত না হওয়া পর্যন্ত মুশরিকরা মুযদালিফার দিকে রওয়ানা হতো না। ইসলাম আসার পর তাদের এই রীতি বাতিল হয়ে যায়।
 কারো মতে আগের দিনে কুরবানীর গোশত কেটে টুকরো করে রোদে শুকানো হতো। গোশত শুকিয়ে যাওয়ার পর উক্ত গোশতকে ‘তাশরীকুল লাহাম’ বলা হতো।
 আবার কারো মতে যেহেতু সূর্য্য আলোকিত হওয়ার পর ঈদের নামায আদায় করা হয়, তাই ঈদের নামায ও কুরবানীর দিনকে তাশরীক বলা হয়। আর যে দিনগুলো এই দিনটির অনুগামী, সেই দিনগুলোকেও তাশরীক বলা হয়।

তাকবীরে তাশরীকের সূচনা
যখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহ তা’আলার হুকুমে নিজ পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে যবেহ করতে শুরু করলেন, তখন জিবরীল আলাইহিস সালাম জান্নাত থেকে একটি দুম্বা নিয়ে আগমন করলেন। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম নিজ পুত্রকে যবেহ করে ফেলেন কিনা- এই আশংকায় জিবরীল আলাইহিস সালাম বলে উঠলেন- الله أكبر الله أكبر-
ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁকে দেখে বললেন- لا إله إلا الله والله أكبر-
এরপর যখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালামের ফিদিয়া সম্পর্কে উক্ত দুম্বা আনার কথা জানতে পারলেন, তখন তিনি বললেন- الله أكبر ولله الحمد-
পরবর্তীতে উপরোক্ত তিনটি বাক্য মিলে তাকবীরে তাশরীকের সূচনা হয়। (দুররুল মুখতার লিত তাহতাবীঃ ১/৭৯৮)

তাকবীরে তাশরীক সম্পর্কিত মাসআলা
ফরয নামাযের জামাত শেষ হওয়ার সাথে সাথে তাকবীরে তাশরীক পড়বে। সাথে সাথে পড়ার অর্থ হলো, নামায এবং তাকবীরের মাঝে নামায ভঙ্গকারী কোনো কাজ না করা। যথা- কথা বলা, উঠে চলে যাওয়া অথবা খাবার খাওয়া ইত্যাদি।
সংশ্লিষ্ট বছরের কাযা নামাযের পরেও তাকবীর পড়তে হবে। কারণ, তাকবীরের সময় বিদ্যমান রয়েছে। যথা- কেউ যদি প্রথম দিন কুরবানী করতে না পারে, তাহলে দ্বিতীয় দিন কুরবানী করতে পারে। কারণ, এগুলোও কুরবানীর দিন।
দাস বা গোলামদের নামাযের জামাতের পর তাকবীরে তাশরীক পড়া সহীহ মত অনুযায়ী ওয়াজিব। (ফতোয়ায়ে শামীঃ ১/৭৯৯)
ফরযে কিফায়ার সময় যেনো তাকবীরে তাশরীকের আওতায় না পড়ে, এ জন্য ‘ফরযে আইন’-এর শর্ত লাগানো হয়েছে। তাই জানাযার নামাযের পরে তাকবীরে তাশরীক ওয়াজিব নয়। আর ফরয কাযা নামাযের পরে তাকবীরে তাশরীক পড়ার তিনটি শর্ত।
১. আদায়কৃত নামাযটি আইয়ামে তাশরীকের সময়কার হওয়া।
২. আইয়ামে তাশরীকের মধ্যেই তা আদায় করা।
৩. কাযা নামাযটি চলতি বছরের নামায হওয়া। পূর্ববর্তী বছরের কাযা নামায না হওয়া। এ থেকে বোঝা যায়, আইয়ামে তাশরীকের বহির্ভূত কাযা হওয়া নামায যদি আইয়ামে তাশরীকে আদায় করা হয়, তাহলে তাকবীরে তাশরীক পড়া ওয়াজিব হবে না।
মাসআলাঃ জামাতের সাথে নামায আদায় করুক অথবা একাকি নামায আদায় করুক, উভয়ের ওপরই তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব। এমনিভাবেন পুরুষ এবং নারী উভয়ের ওপরই ওয়াজিব। তবে মহিলারা আস্তে বলবে।
মাসআলাঃ ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মতে মহিলাদের জন্য তাকবীরে তাশরীক নেই।
(ফতোয়ায়ে শামী; ফাতাওয়া দারুল উলূম দেওবন্দঃ ৫/১৯৬)
মাসআলাঃ ইকতেদা করার কারণে নারী এবং মুসাফিরের ওপরও তাকবীরে তাশরীক ওয়াজিব হয়ে যায়। নারীরা আস্তে আস্তে পড়বে। যদি পুরুষ ইমামের ইকতেদায় নামায পড়ে, তাহলে মাসবুক ব্যাক্তি নিজ নামায শেষ করার পর তাকবীর পড়বে। ইমাম যদি তাকবীর ছেড়ে দেন (কিংবা ভুলে যান) তাহলেও তাকবীর পড়ে নিবে।
তবে মুকতাদী ইমামের পক্ষ থেকে তাকবীর না বলার ইয়াকীন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। আর এই ইয়াকীন হয়ে থাকে এমন কার্জকালাপ দ্বারা, যার পরে আর নামাযের ‘বেনা’ করা জায়েয থাকে না। যথা- মসজিদ থেকে বের হয়ে যাওয়া, ইচ্ছা করে ওযু ভঙ্গ করা, কথা বলা ইত্যাদি। যদি সালাম ফিরানোর পরে তাকবীর পড়ার আগেই ইমাম সাহেবের ওযু ভঙ্গ হয়ে যায়, তাহলে তাকবীর বলবে; ওযুু করার জন্য যেতে হবে না। (দুররুল মুখতারঃ ১/৭৬)
মাসআলাঃ তাকবীরে তাশরীক একবার বলা ওয়াজিব। একবারের বেশি বলা খেলাফে সুন্নত। সুতরাং একবার বলাই ভালো।
মাসআলাঃ ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মতে (জুমু’আর নামায ওয়াজিব নয়- এমন) গ্রামে তাকবীরে তাশরীক ওয়াজিব নয়। সাহেবাইনের মতে ওয়াজিব। তবে সাহেবাইনের মতই গ্রহণযোগ্য এবং সতর্কতামূলক অর্থাৎ গ্রামবাসীরাও তাকবীরে তাশরীক পড়বে। (ফাতাওয়া দারুল উলুমঃ ৫/২০৪, ২১৭)
তাকবীরে তাশরীক ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে অধিকাংশ আলিমগণ হানাফী মাযহাবকে গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ তা উপরোক্ত শর্ত সাপেক্ষে ওয়াজিব হবে। তবে মুনফারিদ (একাকী নামায আদায়কারী) অথবা মুসাফির যদি তাকবীর বলে, তাহলে কোনো ক্ষতি নেই। কারণ, এই বিষয়েও ফতোয়া রয়েছে।
মাসআলাঃ তাকবীরে তাশরীক ছুটে গেলে এর কোনো কাযা নেই। তওবা করলে এর গোনাহ্ মাফ হয়ে যাবে। (ফাতাওয়া দারুল উলূমঃ ৫/২১৯)
মাসআলাঃ তাকবীর মধ্যম আওয়াযে পড়া জরুরি। অনেক মানুষ এ ব্যাপারে অলসতা করে থাকে। অনেকে ক্ষীন আওয়াযে পড়ে অথবা একেবারে পড়েই না। এর সংশোধন হওয়া উচিত। (জাওয়াহিরুল ফিকাহঃ ১/৪৪৬)

জিলহজ্জ মাস ইবাদতের মাস। যে কোনো ইবাদতই এই মাসে করা যেতে পারে। তবে নির্দিষ্ট বিশেষ কোনো পদ্ধতির কোনো নামায বা অন্য কোনো আমল এই মাসে নেই।
কোনো কোনো বইয়ে জিলহজ্জের প্রথম দশকে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট সূরা দিয়ে বিভিন্ন নামাযের ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে। আবার জিলহজ্জের প্রথম দশকের প্রতি দিনের জন্য নির্দিষ্ট দো’আর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোর কোনোটির সাথে শরীয়তের কোনো সম্পর্ক নেই। হাদীসে নববীরও সম্পর্ক নেই। মোটকথা এগুলোর কোনো ভিত্তি নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.