জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের ফযীলত- আব্দুল্লাহ আল মাসুম

0
308
10 days of Zilhazz 1
10 days of Zilhazz 1

আরবী বছরের সর্বশেষ মাস জিলহজ্জ ঐতিহাসিক ও ইসলামী শরীয়ত উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই অনেক গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লাহ তা’আলার বিধান অনুসারে যে চারটি মাস পবিত্র ও সম্মানিত, তার একটি হলো জিলহজ্জ মাস। আর আল্লাহ তা’আলার নিকট এই মাসের প্রথম দশক সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও মর্যাদাপূর্ণ সময়।

ইসলামের বিধানাবলীর মধ্যে যেগুলো অন্যান্য ইবাদাত ও বিধানের চেয়ে একটু ব্যতিক্রমধর্মী এবং স্বতন্ত্র মর্যাদা ও তাৎপর্য বহন করে- এগুলোর মধ্যে কুরবানী ও হজ্জ অন্যতম। কুরবানী ও হজ্জ ইসলামের নিদর্শন বা ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত। আর এই উভয় ইবাদতই জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকে সংঘটিত হয়।
আল্লাহ তা’আলা জিলহজ্জের প্রথম দশকের সম্মান ও পবিত্রতা প্রকাশ করতে গিয়ে এই দশকের রজনীগুলোর নামে শপথ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন- والفجر وليال عشر- অর্থঃ শপথ ভোর বেলার, শপথ দশ রাত্রির।

(সূরা ফজরঃ আ-১-২)

সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি., সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযি. এবং মুজাহিদ রহ. সহ অধিকাংশ সাহাবী, তাবেয়ী ও মুফাসসিরের মতে এখানে দশ রাত্রি দ্বারা জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ রাতকেই বুঝানো হয়েছে। হাফেয ইবনে কাসীর রহ. বলেন- এটাই বিশুদ্ধ মত।

(তাফসীরে ইবনে কাসীরঃ ৪/৫৩৫-৫৩৬)

কুরআন ও হাদীসে জিলহজ্জের দশ দিনের আলোচনা

কুরআন ও হাদীসে এই দশকের বিশেষ ফযীলত ও অসীম গুরুত্ব ও তাৎপর্যের কথা বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া এই দশকের দিনে-রাতে নেক আমল ও এর সাওয়াবের কথাও বর্ণিত হয়েছে। যথা- এই দশকের নেক আমল, বিশেষত আল্লাহর যিকির সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-

ويذكروا اسم الله في أيام معلومات علي ما رزقهم من بهيمة الأنعام-

অর্থঃ নির্দিষ্ট দিনসমূহে তারা যেনো আল্লাহ তা’আলার নাম উচ্চারণ করে সেই সকল পশুর ওপর- যা তিনি তাদের দিয়েছেন।

(সূরা হজ্জঃ আ-২৮)

ইমাম বুখারী রহ. বলেন-
সাহাবী ইবনে আব্বাস রাযি.-এর মতে ‘সুনির্দিষ্ট দিনসমূহ’ দ্বারা যিলহজ্জের দশ দিনই উদ্দেশ্য। অনুরুপভাবে সাহাবী ইবনে ওমর রা., হাসান বসরী রহ., আতা রহ., মুজাহিদ রহ., ইকরামা রহ., কাতাদা রহ., ইমাম নাখয়ী রহ., ইমাম আবু হানিফা রহ., ইমাম শাফেয়ী রহ., ইমাম আহমাদ রহ. সহ অধিকাংশ আলিমগণের অভিমত অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট দিনসমূহ দ্বারা যিলহজ্জের দশ দিনই বোঝানো হয়েছে।
ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী রহ. বলেন-
আল্লাহ তা’আলাকে স্বরণ ও তাঁর নাম উচ্চারণ শুধু যবেহ করার সময় নির্দিষ্ট নয়; বরং সুনির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহ তা’আলার নাম উচ্চারণ করা অর্থ হলো, আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাদেরকে যেসব নিয়ামত দান করেছেন, বিশেষ করে বিভিন্ন জীব-জন্তুকে তাদের অধীন করে দিয়েছেন এবং এগুলোর গোশতকে তাদের খাদ্য বানিয়েছেন ইত্যাদির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।

(তাফসীরে ইবনে কাসীরঃ ৩/২৮৯; লাতায়িফুল মা’আরিফঃ ৩৬১)

জিলহজ্জের প্রথম দশ দিন সম্পর্কে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-

عن أبي هريرة رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلي الله عليه وسلم: ما من أيام أحب إلي الله أن يتعبد له فيها من عشر ذي الحجة يعدل صيام كل يوم منها بقيام ليلة القدر-

অর্থঃ সাহাবী আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের ইবাদত অন্যান্য দিনের ইবাদত অপেক্ষা আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। এই সময়ের এক দিনের রোযা অন্য সময়ের এক বছরের রোযার সমতুল্য এবং প্রতি রাত্রের ইবাদত শবে কদরের ইবাদতের সমতুল্য।

সাহাবী আবু কাতাদাহ রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

أن النبي صلي الله عليه وسلم قال: صيام يوم عرفة أني أحتسب علي الله أن يكفر السنة التي بعده والسنة التي قبله-

অর্থঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরাফার দিনের রোযা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি ইরশাদ করেন- এতে বিগত বছর ও আগামী বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যায়।

(মিশকাতঃ ১/১২৮; সুনানে তিরমিযীঃ ১/৪৯; সুনানে তিরমিযীঃ ১/১৫৭)

সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-

ما من أيام العمل الصالح أحب إلي الله فيهن من هذه الأيام يعني عشر ذي الحجة- قالوا: ولا الجهاد في سبيل الله؟ قال: ولا الجهاد في سبيل الله- إلا رجلا خرج بنفسه وماله ثم لم يرجع من ذلك بشيئ-

অর্থঃ আল্লাহ তা’আলার নিকট জিলহজ্জের দশ দিনের আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সাহাবীগণ আরয করলেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ রাস্তায় জিহাদের মতো (নেক) আমলও কি এর চেয়ে উত্তম নয়? তিনি বললেন- না। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের মতো নেক আমলও নয়। তবে যে ব্যক্তি তার জান ও মাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় বের হলো এবং এর কোনোটা নিয়েই আর ফিরে এলো না, ওই ব্যক্তির এই আমল আল্লাহ তা’আলার কাছে অনুরূপ প্রিয়।
(সুনানে তিরমিযীঃ হা-৭৫৭; মুসনাদে আহমাদঃ হা-১৯৬৮; সহীহ ইবনে হিব্বানঃ হা-৩২৪; সহীহুল বুখারীঃ হা-৯৬৯; তারগীব ওয়া তারহীবঃ হা-২৭১; সুনানে আবি দাউদঃ হা-২৪৩৮)

সাহাবী জাবির রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-

أفضل أيام الدنيا العشر- يعني عشر ذي الحجة- قيل: ولا مثلهن في سبيل الله؟ قال: ولا مثلهن في سبيل الله- إلا رجل عفر وجهه بالتراب-

অর্থঃ পৃথিবীর সর্বোত্তম দিনগুলো হলো জিলহজ্জের দশ দিন। জিজ্ঞাসা করা হলো- আল্লাহর রাস্তায়ও কি তার সমতূল্য কিছু নেই? তিনি বললেন- আল্লাহর রাস্তায়ও এর সমতূল্য কিছু নেই, তবে ওই ব্যক্তি, যার চেহারা ধুলিযুক্ত হয়েছে, অর্থাৎ শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেছে।

(মুসনাদে বাযযারঃ হা-১১২৮; মুসনাদে আবু ইয়ালাঃ হা-২০১০)

অন্য বর্ণনায় সাহাবী জাবির রাযি. থেকে বর্ণিত হয়েছে-

ما من أيام أفضل عند الله من أيام عشر ذي الحجة-

অর্থঃ যিলহজ্জের দশ দিনের চেয়ে কোনো দিনই আল্লাহ তা’আলার নিকট উত্তম নয়।

(সহীহ ইবনে হিব্বানঃ হা-২৮৪২)

সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
আল্লাহ তা’আলার নিকট যিলহজ্জের দশ দিনের আমলের চেয়ে অধিক মহৎ এবং অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সুতরাং তোমরা সেই দিনগুলোতে অধিক পরিমাণে তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ), তাহমীদ (আলহামদু লিল্লাহ), তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্) ও তাকবীর (আল্লাহু আকবার) পড়ো।
(মুসনাদে আহমাদ, হা-৫৪৪৬; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাঃ হা-১৪১১০; বায়হাকী-শু’আবুল ঈমানঃ হা-৩৭৫০; তাবারানীঃ হা-১১১১৬; মাজমাউয যাওয়ায়েদঃ হা-৫৯৩২; শরহু মুশকিলিল আছারঃ হা-২৯৭১)

জিলহজ্জের দশ দিনের বিশেষ আমল

এই দশক যেহেতু নেক আমলের বিশেষ সময়, তাই এই দশ দিনে যে কোনো আমল যেমন আল্লাহ তা’আলার নিকট অধিক প্রিয় ও পছন্দনীয়। যথা- অধিক পরিমাণে নফল নামায আদায় করা, রোযা রাখা, যিকির-আযকার, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবীহ-তাহলীল ইত্যাদি। তাই আল্লাহ তা’আলার নিয়ামত ও বিশেষ অনুগ্রহ মনে করে এই দশকে সাধ্যমতো নেক আমলের পাবন্দি করা একান্ত প্রয়োজন। তাছাড়া বিভিন্ন হাদীসে এই দশকের বিশেষ কিছু আমলের কথাও বর্ণিত হয়েছে। যথা-

হজ্জ আদায় করা
শরীয়তের হুকুমের আলোকে যাদের ওপর হজ্জ ফরয হয়েছে- তাদের হজ্জ আদায় করা। কোনো প্রকারের অহেতুক ওযর-আপত্তি দেখিয়ে অবহেলা না করা। হজ্জ ফরয হওয়ার পর তা আদায় করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে এবংআদায় করার ক্ষেত্রে দেরি করলে এই ব্যাপারে হাদীসের কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। সুতরাং এমতাবস্থায় পার্থিব জীবনের অন্যান্য প্রয়োজনকে পেছনে রেখে সবার আগে হজ্জ আদায় করা উচিত।

Hazz
Hazz

চুল, নখ, মোচ ইত্যাদি না কাটা
জিলহজ্জের চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানীর আগ পর্যন্ত নিজের চুল, নখ, মোচ ইত্যাদি না কাটা মুস্তাহাব। সাহাবী উম্মে সালামা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-

إذا رأيتم هلال ذي الحجة وأراد أحدكم أن يضحي- فليمسك عن شعره وأظفاره-

অর্থঃ জিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখতে পাওয়ার পর তোমাদের কেউ যদি কুরবানী করার ইচ্ছা করে, তাহলে সে যেনো স্বীয় চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে।

cutting hair
cutting hair

(সহীহ মুসলিমঃ হা-১৯৭৭; সুনানে তিরমিযীঃ হা-১৫২৩; সুনানে আবি দাউদঃ হা-২৭৯১; সুনানে নাসায়ীঃ হা-৪৩৬২; সহীহ ইবনে হিব্বানঃ হা-৫৮৯৭)

যে ব্যক্তি কুরবানী করতে সক্ষম নয়, সেও এই আমল পালন করবে। অর্থাৎ নিজের চুল, নখ, মোচ ইত্যাদি কাটবে না; বরং তা কুরবানীর দিন কাটবে। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-

أمرت بيوم الأضحي- جعله الله عيدا لهذه الأمة- قال الرجل: أرأيت إن لم أجد إلا منيحة أنثي أفأضحي بها؟ قال: لا ولكن تأخذ من شعرك وأظفارك وتقص شاربك وتحلق عانتك فتلك تمام أضحيتك عند الله

অর্থঃ আমি কুরবানীর দিন সম্পর্কে আদিষ্ট হয়েছি (অর্থাৎ এই দিবসে কুরবানী করার আদেশ করা হয়েছে।) আল্লাহ তা’আলা তা এই উম্মতের জন্য ঈদ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এক ব্যক্তি আরয করলো- ইয়া রাসূলাল্লাহ্! যদি আমার কাছে শুধু একটি মানিহা থাকে অর্থাৎ যা শুধু দুধ পান করার জন্য দেওয়া হয়েছে? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- না; বরং সেদিন তুমি তোমার চুল কাটবে, নখ কাটবে, মোচ এবং নাভীর নিচের পশম পরিষ্কার করবে। এটাই আল্লাহ তা’আলার কাছে তোমার পূর্ণ কুরবানী বলে গন্য হবে।
(মুসনাদে আহমাদঃ হা-৬৫৭৫; সহীহ ইবনে হিব্বানঃ হা-৭৭৩; সুনানে আবি দাউদঃ হা-২৭৮৯; সুনানে নাসায়ীঃ হা-৪৩৬৫)

অর্থাৎ যারা কুরবানী করতে সক্ষম নয়, তারাও যেনো মুসলমানদের সাথে ঈদের আনন্দ ও খুশি উদযাপনে অংশীদার হয়। তারা এগুলো কর্তন করেও পরিপূর্ণ সওয়াবের অধিকারী হবে। অনুরূপভাবে তারা হাজীদের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী হবে।

অধিক পরিমাণে নেক আমল ও দো’আ করা
জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকে আল্লাহ তা’আলাকে স্মরণ, নেক আমল করা এবং বেশি বেশি দো’আ করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে কুরআন ও হাদীসে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। সুতরাং এই সময়ে যথাসাধ্য বেশি বেশি নেক আমল ও অধিক পরিমাণে আল্লাহ তা’আলাকে স্মরণ করে দো’আ করার প্রতি মনোনিবেশ করা উচিত।

ঈদের দিন ছাড়া বাকি নয় দিন রোযা রাখা
জিলহজ্জের দশ দিনের আরেকটি বিশেষ আমল হলো, ঈদুল আযহার দিন ছাড়া প্রথম নয় দিন রোযা রাখা। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই নয়টি দিবসে (জিলহজ্জ মাসের প্রথম নয় দিন) রোযা রাখতেন।

(সুনানে আবি দাউদঃ হা-২৪৩৭; মুসনাদে আহমাদঃ হা-২২২৩৪; সুনানে নাসায়ীঃ হা-২৪১৬)

সাহাবী হাফসা রাযি. বর্ণনা করেন-

أربع لم يكن لم يدعهن النبي صلي الله عليه وسلم: صيام عاشوراء والعشر وثلاثة أيام من كل شهر وركعتين قبل الغداة-

চারটি আমল নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো ছাড়তেন না। আশুরার রোযা, জিলহজ্জের প্রথম দশকের রোযা, প্রত্যেক মাসের তিন দিনের রোযা, ফজরের আগে দুই রাকাত সুন্নত নামায।
(সুনানে নাসায়ীঃ হা-২৪১৫; সহীহ ইবনে হিব্বানঃ হা-৬৪২২; মুসনাদে আবি ইয়ালাঃ হা-৭০৪২; মুসনাদে আহমাদঃ হা-২৫৯২০, ২৬৩৩৯)

বিশেষভাবে নয় তারিখে (আরাফার দিনে) রোযা রাখা
জিলহজ্জের প্রথম নয় দিনের মধ্যে নবম তারিখের রোযা সর্বাধিক ফযীলতপূর্ণ। সহীহ হাদীসে এই দিবসের রোযার ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-

صيام يوم عرفة أحتسب علي الله أن يكفر السنة التي قبله والتي بعده-

অর্থঃ আরাফার দিনের (নয় তারিখের) রোযার বিষয়ে আমি আল্লাহ তা’আলার নিকট আশাবাদী যে, তিনি এর দ্বারা বিগত এক বছর ও আগামী বছরের গোনাহ্ মিটিয়ে দিবেন।

(সহীহ মুসলিমঃ হা-১১৬২; সুনানে আবি দাউদঃ হা-২৪২৫; সুনানে তিরমিযীঃ হা-৭৪৯; সুনানে ইবনে মাজাহঃ হা-১৭৩০)

অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে- من صام يوم عرفة غفر له سنتين متتابعتين-

অর্থঃ যে ব্যক্তি আরাফার দিনে রোযা রাখবে, তার লাগাতার দুই বছরের গোনাহ ক্ষমা করা হবে।

(মুসনাদে আবি ইয়ালাঃ হা-৭৫৪৮; মাজমাউয যাওয়ায়েদঃ হা-৫১৪১)

নয় তারিখে (আরাফার দিনে) অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত রাখা
এই দিনে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সব ধরণের নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত রাখা উচিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- يوم عرفة هذا يوم من ملك فيه سمعه وبصره ولسانه غفر له-
আরাফার দিনে যে ব্যক্তি তার কান, চোখ ও যবানকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে, আল্লাহ তা’আলা তাকে ক্ষমা করে দিবেন।

(মুসনাদে আহমাদ- লাতায়েফুল মা’আরিফঃ ৩০৮)

নয় তারিখে (আরাফার দিনে) অধিক পরিমাণে কালিমায়ে তাওহীদ পড়া
জিলহজ্জের নয় তারিখে তথা আরাফার দিনে ইখলাস ও ইয়াকীনের সাথে বেশি বেশি কালিমায়ে তাওহীদ পড়া উচিত। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. বলেন- নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরাফার দিনে এই কালিমা খুব বেশি পড়তেন-

لا إله إلا الله وحده لا شريك له له الملك وله الحمد بيده الخير- وهو علي كل شيئ قدير-

সুনানে তিরমিযীর বর্ণনায় এসেছে-
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- আরাফার দিনের দো’আ সবচেয়ে উত্তম দো’আ। আর আমি এবং আমার আগের নবীগণ যা বলেছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে উত্তম কথা হলো-

لا إله إلا الله وحده لا شريك له له الملك

কুরবানী আদায় করা
কুরবানী দেওয়ার মতো আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকলে কুরবানী আদায় করা। যাদের ওপর কুরবানী ওয়াজিব নয়; তাদেরও সাধ্যমতো তা আদায় করার চেষ্টা করা উচিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
কুরবানীর দিন আল্লাহ তা’আলার নামে পশু যবেহ করার চেয়ে উত্তম আর কোনো আমল নেই।
তিনি আরো ইরশাদ করেন-
আল্লাহ তা’আলা কুরবানীদাতাকে যবেহকৃত পশুর গায়ের পশম পরিমাণ সাওয়াব দান করেন।
তবে কুরবানীর মতো পুণ্যময় একটা আমল যেনো একমাত্র আল্লাহ তা’আলাকে সন্তুষ্টি করার জন্য হয়, সেদিকে যথেষ্ট খেয়াল রাখতে হবে। এটা যেনো কখনোই লোক দেখানো, নিজের বাহাদুরি প্রকাশ করা কিংবা দুনিয়াবি প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়ার জন্য না হয়। অন্যথায় এই কুরবানী বিফলে যাবে।

জিলহজ্জ মাসে তাকবীরে তাশরীক

আরাফার দিন অর্থাৎ জিলহজ্জের নয় তারিখ ফজরের নামায থেকে শুরু করে জিলহজ্জের ১৩ তারিখের আসরের নামায পর্যন্ত প্রতি ফরয নামাযের পর একাকী হোক বা জামাতে নামায আদায়কারী হোক, মহিলা হোক কিংবা পুরুষ হোক- সকলের জন্য একবার তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব। পুরুষগণ উচ্চস্বরে আর নারীরা নিম্নস্বরে বলবে।

Takbeer e Tashreeq
Takbeer e Tashreeq

তাকবীরে তাশরীক হলো-

الله أكبر الله أكبر- لا إله إلا الله والله أكبر الله أكبر ولله الحمد-

তাকবীরে তাশরীক একবারের অধিক বলার কথা উল্লেখ নেই। সুতরাং একবারের বেশি বলা সুন্নাত পরিপন্থী।

(রদ্দুল মুহতার; তাহতাবীঃ ১৯৫)

জামাতের নামাযে সালাম ফিরানোর পর ইমাম উচ্চস্বরে তাকবীর পড়বেন। যেনো অন্যান্য মুসল্লীদের স্মরণ হয় এবং তারাও তাকবীর পড়ে নিতে পারেন।
যদি কেউ তাকবীর বলতে ভুলে যায়, এরপর মসজিদের ভিতরেই তা স্মরণ হয়, অথবা ময়দানে নামায পড়ার পর কাতার ভাঙ্গার আগেই স্মরণ হয়- তাহলে এমতাবস্থায় সঙ্গে সঙ্গে পড়ে নিলে আদায় হয়ে যাবে। অন্যথায় তাকবীরে তাশরীক আদায় হবে না।
মাসবুকের জন্য তাকবীর বলা ওয়াজিব। বাকী নামায আদায় করে তাকবীর বলে নিবে। যদি মাসবুক ইমামের সঙ্গে ভুলবশত তাকবীর বলে ফেলে- তাহলে এতে তার নামায নষ্ট হবে না। (তাহতাবীঃ ২৯৫)
সালাম ফিরানোর সাথে সাথে তাকবীর বলতে হবে। তবে যদি কেউ সালাম ফিরানোর পর তাকবীর না বলে কথা বলে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে ওযু ভঙ্গ করে ফেলে, তাহলে তার ওপর থেকে তাকবীরের হুকুম রহিত হয়ে যাবে।

(ফতোয়ায়ে আলমগীরীঃ ২/৩)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.