জুমু’আর দিনের ইতিকথাঃ গুরুত্ব ও আমাদের করণীয়

0
673
Juma
Juma

জুমু’আর দিন অন্যান্য দিনের চেয়ে অধিক বরকতময় একটি দিন। আল্লাহ তা’আলার কাছে এই দিনের গুরুত্ব ও মর্যাদা অন্য দিনের তুলনায় বেশি। কুরআন ও হাদীসে জুমু’আর দিনের কথা আলোচিত হয়েছে। এমনকি কুরআনে এই জুমু’আর নামে আলাদা সূরা নাযিল হয়েছে।

জুমু’আর দিনের নামকরণ
এই দিনের নামকরণ নিয়ে কয়েকটি বক্তব্য পাওয়া যায়। যথা- ইবনে হাযাম বলেন- জুমু’আ একটি ইসলামী নাম। এর আগে এর নাম ছিলো আরুবা। কিন্তু ইবনে হাজার আসকালানী বলেন- ইসলামের আগেই এর নাম জুমু’আ ছিলো। এই দিনের নাম নিয়ে একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের প্রায় পাঁচশত ষাট বছর আগে আরবের নেতা কা’ব ইবনে লুয়াই এই দিনকে জুমু’আ নামে অভিহিত করেন। তিনি নবীজির পূর্বপুরুষদের একজন ছিলেন। আল্লাহ তা’আলা তাঁকে জাহিলিয়্যাতের যমানায়ও মূর্তিপূজা থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন এবং তাওহীদের বিশ্বাস দান করেছিলেন। তিনি এই দিনে আরবের লোকদেরকে একত্রিত হয়ে হারাম শরীফের সম্মান করার জন্য বলতেন। এছাড়া তিনি ওই দিন শেষ নবীর আগমণের সুসংবাদ দিতেন। (মা’আরিফে মাদানিয়াঃ ৩/৬৬)
এই দিনকে জুমু’আর দিন বলে নামকরণ করা হয়েছে। কারণ এই দিনটি মুসলিমদের সম্মিলনের দিন। আল্লাহ তা’আলা যে ছয় দিনে আসমান-যমীন ও সকল মাখলুককে সৃষ্টি করেছিলেন, সে ছয় দিনের সর্বশেষ দিন ছিলো জুমু’আর দিন। এই দিনেই সমগ্র সৃষ্টি পূর্ণতা লাভ করেছে। এই দিনেই আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে। এই দিনেই তাঁকে পৃথিবীর বুকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। (সহীহ মুসলিমঃ হা-৮৫৪; সুনানে তিরমিযীঃ হা- ৪৮৮, ৪৯১)
প্রত্যেক সপ্তাহে মানুষের সম্মিলনের জন্য আল্লাহ তা’আলা এই জুমু’আর দিনকেই নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু আগের জাতিগোষ্ঠী এই দিনের মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়। ইহুদীরা শনিবারকে তাদের মিলনের দিন বানিয়ে ফেলেছে। আর খৃষ্টানরা বানিয়েছে রবিবারকে। অবশেষে মুসলিমদের জন্য এই দিনটি এখনো সম্মিলনের দিন হিসেবে নির্ধারিত রয়েছে। (সহীহুল বুখারীঃ হা- ৮৭৬; সহীহ মুসলিমঃ হা-৮৫৬)

কুরআনে জুমু’আর দিনের কথা
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন- হে ঈমানদারগণ! জুমু’আর দিনে যখন নামাযের জন্য আহবান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহ তা’আলার স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং ব্যবসা-বানিজ্যের কাজ ছেড়ে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা তা উপলদ্ধি করতে পারো। (সূরা জুমু’আঃ আ-৯)

হাদীসের বর্ণনায় জুমু’আর কথা
সাহাবী তারিক ইবনে শিহাব রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
জুমু’আর নামায জামাতের সাথে আদায় করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ওয়াজিব। তবে এই ওয়াজিব হওয়ার বিধান থেকে চার ধরণের ব্যক্তির হুকুম ভিন্ন। এক. কারো অধীনস্থ গোলাম। দুই. নারী। তিন. নাবালক। চার. অসুস্থ ব্যক্তি। (মা’আরিফুল হাদীসঃ ৩/৩৮২)
সাহাবী ওমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. বলেন-
আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী অনুযায়ী জুমু’আর নামায পূর্ণ দুই রাকাআত। এটা কোনো কসর বা সংক্ষিপ্ত নয়। (মুসনাদে আহমাদ, সুনানে নাসাঈ, সুনানে ইবনে মাজাহ)
নবীজি আরো ইরশাদ করেন-
যে ব্যক্তি পরপর তিনবার বিনা কারণে জুমু’আ ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তা’আলা তার অন্তরকে সিলগালা করে দেন।
(সুনানে তিরমিযীঃ হা-৫০০; সুনানে ইবনে মাজাহঃ হা-১১২৫)

ইসলামে প্রথম জুমু’আ
৬২২ খৃষ্টাব্দে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরত করার সময় প্রথমে কুবা নামক পল্লীতে পৌঁছান। বর্তমানে কুবা নামক স্থানটি মদীনা মুনাওয়ারার শহরের অন্তর্ভুক্ত। সেখানে নবীজি কয়েকদিন অবস্থান করেন। এরপর যেদিন তিনি কুবা থেকে মদীনা মুনাওয়ারার দিকে রওয়ানা হন, সেদিন ছিলো রবীউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ। আবার ওই দিন জুমু’আর দিন ছিলো। তিনি কুবা থেকে রওয়ানা হয়ে বনু সালিমের বসতিতে পৌঁছালে জুমু’আর সময় হয়ে যায়। তখন নবীজি সেখানে অনেক মুসলিমদেরকে সাথে নিয়ে জুমু’আর নামায আদায় করেন। এটাই ছিলো ইসলামে সর্বপ্রথম জুমু’আর নামায।
(রহমাতুল লিল আলামীনঃ খন্ড-১, পৃ-৯১)

জুমু’আর আযান
ইসলামের প্রাথমিক যমানায় জুমু’আর আযান একটিই ছিলো। যা খোতবার শুরুতে ইমামের সামনে দাঁড়িয়ে দেওয়া হয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, খলীফা আবু বকর রাযি. এবং খলীফা উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি.-এর যমানায় এভাবেই জুমু’আর আযান কার্যকর ছিলো। কিন্তু তৃতীয় খলীফা উসমান ইবনে আফফান রাযি.-এর শাসনামলে মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পেতে মদীনা মুনাওয়ারার সীমানা যখন ছাড়িয়ে যায়, তখন আযান অনেক দূরে শোনা যেতো না। সেই পরিপ্রেক্ষিতে উসমান রাযি. মসজিদের বাইরে তাঁর যাওরা নামক স্থানের ওপর দাঁড়িয়ে আরেকটি আযানের সূচনা করেছিলেন। যার আওয়ায পুরো মদীনায় শোনা গিয়েছিলো। নবীজির সাহাবীগণের মধ্যে কেউ এই বিষয়ে আপত্তি করেননি। (সুনানে ইবনে মাজাহঃ হা-১১৩৫; সুনানে আবি দাউদঃ হা-৯৯৮, ৯৯৯)
পরবর্তীতে সমস্ত সাহাবীগণের সর্বসম্মতিক্রমে এই আযান চালু হয় এবং এর বৈধতা বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ফলে জুমু’আর আযান দুটি হয়। আর জুমু’আর আযানের পর ব্যবসা-বানিজ্য সম্পর্কিত কাজে লিপ্ত থাকা হারাম হওয়ার যে হুকুম জুমু’আর আযানের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলো, তা প্রথম আযানের সাথে সমস্ত উম্মাহর সর্বসম্মতিক্রমে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তাফসীর ও ফিক্বাহর কিতাবে এই বিষয়টি কোনো মতানৈক্য ছাড়াই উল্লেখ করা হয়েছে।

জুমু’আর দিনের কিছু ফযীলত
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
সকল দিনের মধ্যে উত্তম হচ্ছে জুমু’আর দিন। এই দিনেই আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই দিনেই তাঁকে জান্নাতে পাঠানো হয়েছে এবং এই দিনেই তাঁকে জান্নাত থেকে বের করা হয়েছে। কিয়ামত সংঘটিত হবে এই দিনেই। (সহীহুল বুখারীঃ হা-৩৪৮৬; সহীহ মুসলিমঃ হা-৮৫৪; সুনানে তিরমিযীঃ হা-৪৮৮, ৪৯১)

জুমু’আর দিন হচ্ছে অন্যান্য সমস্ত দিনের সরদার। আল্লাহ তা’আলার কাছে সকল দিনের মধ্যে এই দিন সর্বশ্রেষ্ঠ দিন। আল্লাহ তা’আলার কাছে এই দিনের গুরুত্ব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার চেয়েও বেশি। (সুনানে ইবনে মাজাহঃ হা-১০৮৪)
জুমু’আর দিন আসলে ফেরেশতাগণ মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে যান। প্রথম যারা মসজিদে গমণ করে, তাদের নাম একের পর এক লিখতে থাকেন। সর্বপ্রথম গমণকারী আল্লাহর রাস্তায় উট কুরবানী করার সওয়াব লাভ করে। এরপর যে মসজিদে আসে, সে গরু কুরবানী করার সওয়াব লাভ করে। এরপর যে মসজিদে আসে, সে দুম্বা কুরবানী করার সওয়াব লাভ করে। এরপর যে মসজিদে আসে, সে মুরগী কুরবানী করার সওয়াব লাভ করে। এর পরের গমণকারী ব্যক্তিরা ডিম দান করার সওয়াব লাভ করে। যখন ইমাম খোতবা দেওয়ার জন্য মিম্বারের দিকে আসেন, তখন ফেরেশতাগণ নাম লিখার খাতাপত্র বন্ধ করে খোতবা শোনার মধ্যে অংশগ্রহণ করেন। (সহীহুল বুখারীঃ হা-৮৮১; সহীহ মুসলিমঃ হা-৮৫০, ৮৫৬; সুনানে তিরমিযীঃ হা-৪৯৯)

জুমু’আর দিনে এমন একটা সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলমান ওই সময় আল্লাহ তা’আলার কাছে দো’আ করে, আল্লাহ তা’আলা তার ওই দো’আ অবশ্যই কবুল করেন। (সহীহুল বুখারীঃ হা-৯৩৫; সহীহ মুসলিমঃ হা-৮৫২)
যে মুসলমান জুমু’আর দিনে অথবা রাতে মারা যাবে, আল্লাহ তা’আলা তাকে কবরের আযাব থেকে হেফাযত করবেন। (সুনানে তিরমিযী)

জুমু’আর দিনে করণীয় সমূহ
 মাথা পরিস্কার করে ধোয়া।
 গোসল করা। (সহীহুল বুখারীঃ হা-৮৯৪; সহীহ মুসলিমঃ হা-৮৪৪, ৮৪৫; সুনানে তিরমিযীঃ হা-৪৯২)
 ভালোভাবে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা। অর্থাৎ, চুল ও নখ কাটা, গোঁফ ছোটো করা এবং শরীরের গুপ্ত অংশের পশম পরিস্কার করা। (সুনানে ইবনে মাজাহঃ হা-১০৯৭; মা’আরিফুল হাদীসঃ ৩/৩৮৭)

এক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, মাথার চুল, নখ, গোঁফ ও শরীরের গুপ্তাংশ পরিস্কার করা সুন্নাত হওয়ার যে কথা বলা হয়েছে, তা কোনো নির্দিষ্ট দিনের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। অর্থাৎ এগুলো পরিস্কার করা সুন্নাত। তবে তা যে কোনো দিন পরিস্কার করলেই সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে। বৃহস্পতিবার কিংবা শুক্রবারেই তা করা সুন্নাত, এমন কোনো কথা হাদীস বা নবীজি ও সাহাবীগণের জীবনীতে নেই। এখানে বিষয়টি জুমু’আর দিনে সাধারণভাবে করণীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

 উত্তম ও পরিস্কার কাপড় পরিধান করা। (সুনানে ইবনে মাজাহঃ হা-১০৯৭)
 খুশবু অথবা আতর লাগানো। (সহীহুল বুখারীঃ হা-৮৮৩, ৯১০)
 আগে আগে মসজিদে গমণ করা। (সহীহুল বুখারী; সহীহ মুসলিম; সুনানে তিরমিযী)
 পায়ে হেঁটে মসজিদে যাওয়া। এ সময় কোনো বাহনে আরোহন না করা। (সুনানে তিরমিযী)
 ইমামের কাছাকাছি বসা।
 মনোযোগ সহকারে ইমামের খোতবা শোনা।
 খোতবা চলাকালীন কোনো কথা না বলা এবং কোনো কাজ না করা। (সহীহুল বুখারীঃ হা-৯১০; সুনানে তিরমিযীঃ হা-৫২৮)
সাহাবী আওস ইবনে আওস রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
যে ব্যক্তি জুমু’আর দিনে ভালোভাবে গোসল করলো, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন করলো, আগে আগে মসজিদে গমণ করলো, ইমামের কাছাকাছি বসে মনোযোগ সহকারে খোতবা শ্রবণ করলো এবং খোতবা চলাকালীন চুপ থাকলো, আল্লাহ তা’আলা তাকে তার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে এক বছর নফল রোযা ও এক বছরের নফল নামাযের সওয়াব দান করেন। (সুনানে তিরমিযীঃ হা-৪৯৬)
 নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি বেশি বেশি দরূদ পড়া।
 সূরা কাহফ তিলাওয়াত করা।
সাহাবী ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি জুমু’আর দিনে সূরা কাহফ তিলাওয়াত করে, এর ফলে তার পা থেকে আকাশের উচ্চতা পর্যন্ত নূর হয়ে যায়। যা কিয়ামতের দিন আলো ছড়াবে। এর সাথে সাথে বিগত জুমু’আ থেকে এই জুমু’আ পর্যন্ত তার সমস্ত গোনাহ মাফ হয়ে যায়। (তাফসীরে ইবনে কাসীরঃ খন্ড-২, পৃ-৭২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.