তাওয়াক্কুল কীভাবে করবেন!

0
373
Tawakkul alallah
Tawakkul alallah

শায়খুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া রহ. বুযুর্গানে দ্বীনের আল্লাহ তা‘আলার ওপর তাওয়াক্কুল সম্পর্কিত ঘটনা উল্লেখ করার সাথে সাথে তাওয়াক্কুলের স্বরূপ, তাওয়াক্কুলের স্তর সমূহ এবং ওলীগণের পার্থিব উপকরণ অবলম্বন না করার সঠিক মর্ম ও ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন-
বুযুর্গানে দ্বীনের বর্ণাঢ্য জীবনে তাওয়াক্কুলের এমন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে, যা আমাদের মতো দূর্বল অযোগ্যদের জীবনে অর্জন করা কল্পনাতীত। এ বিষয়ে মনে রাখতে হবে, তাওয়াক্কুলের সর্বশেষ সীমারেখা এটাই- যা বিভিন্ন ঘটনাবলীতে উল্লেখ করা হয়েছে। এর সর্বোচ্চ পর্যায়ে আমরা না যেতে পারলেও চেষ্টা তো করে যেতে পারি। তবে হ্যাঁ, তাওয়াক্কুলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত না হওয়া পর্যন্ত পার্থিব উপায়-উপকরণ ছেড়ে দেওয়া যাবে না।

মোল্লা আলি কারী রহ. ‘মিশকাত’ কিতাবের ব্যাখ্যাগ্রন্থে লিখেন-
পার্থিব উপায়-উপকরণ ব্যবহার করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থি নয়। আবার কেউ সরাসরি তাওয়াক্কুলের নিয়ত করলে এতে দোষের কিছু নেই। তবে শর্ত হলো, তাকে মানসিকভাবে স্থির ও শক্তিশালী হতে হবে, যাতে পার্থিব উপায় অবলম্বন ছেড়ে দেওয়ার পর কোনো সংকটে পড়লে সাহস হারিয়ে না ফেলে। তার অবস্থা এমন হওয়া উচিত যে, একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কারো কথা তার স্মরণ হবে না। যেসব বুযুর্গ ব্যক্তিবর্গ পার্থিব উপকরণ ছেড়ে দেওয়াকে অপছন্দ করেছেন, এর কারণ এটাই যে, লোকেরা এর হক যথাযথ আদায় করতে পারে না। উল্টো তারা আসবাব-উপকরণ ছেড়ে দিয়ে অন্যদের পক্ষ থেকে দান পাওয়ার আশায় বসে থাকে। (মিরকাত শরহে মিশকাতঃ পৃ-৩০)

তাওয়াক্কুল প্রসংগে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
لو أنكم كنتم توكلون علي الله حق توكله- لرزقتم كما ترزق الطير- تغدو خماصا وتروح بطانا-
অর্থঃ তোমরা যদি আল্লাহ তা’আলার ওপর যথাযথভাবে তাওয়াক্কুল (ভরসা) করো, তাহলে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের রিজিক এমনভাবে পৌঁছাবেন, যেভাবে তিনি পাখির রিজিক পৌঁছান। পাখিরা সকালে খালি পেটে বের হয় আর সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে। (সুনানে তিরমিযীঃ হা-২৩৪৪)
তিনি আরো ইরশাদ করেন-
যে আল্লাহ তা’আলার প্রতি সর্বোতভাবে মনোনিবেশ করে, আল্লাহ তা’আলা তার সমস্ত প্রয়োজন পূরণ করে দেন। তিনি তার কাছে রিজিক এমনভাবে পৌঁছান, যা তার কল্পনায়ও ছিলো না।

ইমাম গাজালি রহ. বলেন, কেউ যদি সর্বাধিক অমুখাপেক্ষী হতে চায়, তার উচিত হলো, নিজের কাছে বিদ্যমান ধন-সম্পদের ওপর তার যে পরিমাণ আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে, তার চেয়েও অধিক আস্থা ও বিশ্বাস আল্লাহ তা’আলার ওপর রাখে। (ইহইয়াউল উলূম- ইমাম গাজালি)
নিম্নে উল্লেখিত দু‘টি ঘটনা দ্বারা উপরোক্ত হাদীস সমূহের মর্মার্থ সহজে অনুধাবন করা যায়।

প্রথম ঘটনাঃ
তাবুকে অভিযানের আগে এর জন্য মদীনা মুনাওয়ারায় সবার প্রতি সহযোগিতার আহবান করা হলে সাহাবী আবু বকর রাযি. তাঁর ঘরে বিদ্যমান সব কিছু এনে নবীজির দরবারে হাজির করেন। নবীজি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন- ঘরে কি রেখে এসেছো? আবু বকর রাযি. জওয়াবে বললেন- আল্লাহও তাঁর রাসূলকে রেখে এসেছি।

দ্বিতীয় ঘটনাঃ
এক ব্যক্তি নবীজির কাছে উপস্থিত হয়ে ডিমের আকৃতির প্রায় সমান একটি সোনার বার পেশ করে বললো- ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই সোনার বারটি একটা খনি থেকে পেয়েছি। আমি এটা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করতে চাই। আমার কাছে এই বার ছাড়া অন্য কিছু নেই। নবীজি বারটি তাকে ফিরিয়ে দিলেন। কিন্তু লোকটি আবারো সোনার বারটি নবীজির সামনে পেশ করলো। কিন্তু এবারও নবীজি তা ফিরিয়ে দিলেন। এভাবে তিনবার হওয়ার পরও লোকটি যখন নবীজির কথা মানছিলো না, তখন নবীজি বারটি দূরে এতো জোরে নিক্ষেপ করলেন, যদি লোকটির গায়ে লাগতো, তাহলে সে আহত হতো। এরপর নবীজি বললেন, কিছু লোক নিজের সমস্ত ধন-সম্পদ সদকা করে ফেলে; এরপর লোকদের কাছে হাত পেতে বসে থাকে। (সুনানে আবি দাউদ)
উক্ত লোকের ভরসা ও তাওয়াক্কুল সাহাবী আবু বকর রাযি.-এর তুলনায় কতটুকু ধর্তব্য হতে পারে যে, আবু বকর রাযি.-এর সমস্ত ধন-সম্পদ গ্রহণ করা হলো, আর তারটা ফিরিয়ে দেওয়া হলো!

ইমাম গাজলি রহ. লিখেছেন- তাওয়াক্কুলের তিনটি স্তর। যথা-
প্রথম স্তরঃ কোনো ব্যক্তি তার মামলা-মুকাদ্দামা পরিচালনার জন্য একজন অভিজ্ঞ দক্ষ ও সচেতন উকীল নির্বাচিত করে, যাতে সে মামলা বিষয়ক যে কোনো প্রয়োজনে তার শরণাপন্ন হতে পারে। এটা সর্বনিম্ন পর্যায়ের তাওয়াক্কুল। এক্ষেত্রে তার ভিতর তাওয়াক্কুলের অনুভূতি আছে মাত্র।

দ্বিতীয় স্তরঃ এই স্তরটি প্রথম স্তর থেকে উচ্চ পর্যায়ের। এর উদাহরণ হলো, একটি শিশু তার সমস্ত প্রয়োজনে মায়ের কাছে ছুটে যায়। কোনো ভীতি বা কষ্টজনক পরিস্থিতির শিকার হলে সর্বপ্রথম তার মুখ থেকে ‘মা’ শব্দ বের হয়।
হযরত সুহাইল এই দুুই স্তরের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, যখন তাকে কেউ জিজ্ঞাসা করেছিলো, তাওয়াক্কুলের সর্বনিম্ন স্তর কী? তিনি বললেন- আশা শেষ হয়ে যাওয়া। অতঃপর সে জিজ্ঞাসা করলো- মধ্যম স্তর কোনটি? তিনি বললেন- সুযোগ ছেড়ে দেওয়া। অতঃপর আবার জিজ্ঞাসা করলো- সর্বোচ্চ স্তর কোনটি? তিনি বললেন- যে তাওয়াক্কুলের দ্বিতীয় স্তরে উপনীত হয়েছে, সেই প্রথম স্তর চিনতে পারে।

তৃতীয় স্তরঃ নিজেকে আল্লাহ তা‘আলার কাছে এমনভাবে সঁপে দেওয়া, যেভাবে মৃত ব্যক্তি নিজেকে গোসল দানকারীর হাতে ছেড়ে দেয়। অর্থাৎ মৃত ব্যক্তি নিজে কোনো নড়াচড়া করে না। তাকে যেভাবে নাড়াচড়া করা হয়, সেভাবেই সে নড়ে। তাওয়াক্কুলের এই সর্বোচ্চ স্তরে উপনীত হলে আল্লাহ তা‘আলার কাছে চাওয়ার কোনো প্রয়োজনই হয় না। আল্লাহ তা‘আলা নিজেই তার প্রয়োজন পুরণের ব্যবস্থা করে দেন। যেভাবে গোসলদাতা নিজেই মৃত ব্যক্তিকে গোসল করিয়ে দেয়; মৃত ব্যক্তির গোসলের পদ্ধতি বলে দিতে হয় না।

একটি প্রশ্ন ও এর জওয়াব
এক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে। তা হলো, নবীজি তো সারা জীবন পার্থিব উপায়-উপকরণ অবলম্বন করে কাটিয়েছেন। নবীজির জীবনে তাওয়াক্কুলের এই স্তর পরিলক্ষিত হলো না কেনো?
উত্তরঃ নবীজি যেভাবে ছিলেন, সেটাই তাঁর জন্য মর্যাদাপূর্ণ ও মানানসই। তাঁর জীবনে তাওয়াক্কুলের এই স্তর সর্বক্ষেত্রে বহাল থাকলে সমগ্র উম্মাহ জটিল পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে যেতো। কিন্তু তিনি দয়া ও অনুগ্রহের কারণে উম্মতের জন্য সহজ বিষয় কামনা করতেন। তিনি এমন বিষয় থেকে সতর্ক থাকতেন, যাতে উম্মত কঠিন কোনো পরিস্থিতির শিকার না হয়।
যথা- আয়শা রাযি. বলেন-
আমি সালাতুদ দুহা আদায় করতাম, কিন্তু নবীজি তা আদায় করতেন না। তিনি অনেক আমল তাঁর ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ছেড়ে দিতেন, যাতে তা উম্মতের উপর ফরয না হয়ে যায়। (সুনানে আবি দাউদ)
আয়শা রাযি.-এর বক্তব্যের উদ্দেশ্য হলো গুরুত্ব ও স্থায়িত্ব বুঝানো। অর্থাৎ তিনি যত গুরুত্বের সাথে সালাতুদ দুহা আদায় করতেন, নবীজি সেভাবে তা আদায় করতেন না। অন্যথায় নবীজির সালাতুদ দুহা সম্পর্কে যে বিশটি রেওয়ায়াত আছে, এরপরও তিনি এই সালাতের ব্যাপারে আরো বেশি গুরুত্ব আরোপ করলে হয়তো তা উম্মতের ওপর ফরজ হয়ে যেতো। একবার তারাবীহর নামাজের ব্যাপারেও এমন ঘটনা ঘটেছিলো। নবীজি কয়েক রাকাত তারাবীহর নামাজ আদায় করার পর সাহাবীগণের মাঝে তিনি এই নিয়ে খুব আগ্রহ-উদ্দীপনা দেখলেন। তখন তিনি তারাবীহর নামাজ ফরজ হয়ে যায় কিনা- এই আশংকায় দ্বিতীয়বার তারাবীহ আদায় করেননি।

‘রওয’ গ্রন্থের লেখক লিখেছেন-
উপকারী বিষয় অর্জন এবং ক্ষতিকারক বিষয় পরিহার করার প্রতি লক্ষ্য রেখে সমস্ত নবী-রাসূলগণ এবং আওলিয়ায়ে কেরামের সাধারণ নিয়ম এটাই ছিলো যে, তারা উপায়-উপকরণ অবলম্বন করতেন। সুতরাং এক্ষেত্রে আল্লাহ তা’আলার কোনো কোনো ওলীর উপায়-উপকরণ ছাড়াই জীবন কাটিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন তোলা যায় না।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতকে শরীয়তের পথে পরিচালিত করতেন। এই কারণে তিনি এমন পন্থা অবলম্বন করতেন, যা অনুসরণ করে সাধারণ ও বিশেষ ব্যক্তিবর্গ সবাই চলতে পারে। কাফেলার নির্দেশক ও গাইড স্বীয় ব্যতিক্রমধর্মী যোগ্যতা ও বিশেষ শক্তির বলে এমন কোনো দূর্গম পথ দিয়ে যদি চলে, যে পথে কাফেলার অধিকাংশ লোকের চলার ক্ষমতা নেই, তাহলে যেনো কাফেলার লোকদের প্রতি অবিচার করা হলো। যেনো তাদের ওপর জটিল পরিস্থিতি জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হলো। নবীজির সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থা স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন-
عزيز عليه ما عنتم حريص عليكم بالمؤمنين رؤوف الرحيم-
অর্থঃ তোমরা কোনো সংকটের সম্মুখীন হলে এটা তাঁর জন্য বেদনাদায়ক হয়ে দাঁড়ায়। তিনি মুমিনগণের হিতাকাঙ্খী। তিনি তোমাদের প্রতি দয়াশীল ও মেহেরবান। (সূরা তাওবাহ-১৬)
উক্ত আয়াতের মর্মার্থ হলো, হে লোকেরা! তোমাদের নিকট এমন এক পয়গম্বর তাশরীফ এনেছেন, যিনি তোমাদেরই একজন। তোমরা কোনো জটিল পরিস্থিতির শিকার হলে তিনি বেদনাহত হয়ে যান। তিনি তোমাদের হিতাকাঙ্খী। তিনি মুমিনগণের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ও মেহেরবান।
এই কারণে নবীজি মসজিদের ইমামগণকে নামাযে কিরাআত দীর্ঘ করা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করতেন। তিনি বলতেন- যে ইমাম হবে, সে নামাযকে সংক্ষিপ্ত করবে। আর যে একাকী নামায আদায় করবে, সে ইচ্ছা করলে নামাযকে দীর্ঘ করতে পারে।

এরপর শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রহ. আরো বলেন-
কোনো সময় এসব ঘটনাবলীতে এমন বিষয়ের কথা উল্লেখিত হয়, যেগুলোকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার অর্থ হলো নিজেকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়া। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো না-জায়েয বলে মনে হয়। এই বিষয়ে অবশ্যই জেনে রাখা উচিত যে, এসব ঘটনাবলী ঔষধের মতো। চিকিৎসক অনেক সময় ঔষধের মধ্যে এমন বস্তু মিশ্রণ করেন- যা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সেবন করলে উপকার হবে বটে, কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ বা নির্দেশনা ছাড়া তা সেবন করলে হিতে বিপরীত হওয়ার আশংকা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এর ফলে মানুষ মৃত্যুবরণও করে; অথচ উক্ত বস্তুই চিকিৎসার পরামর্শে সেবনের কারণে তার সুস্থ্য হওয়ার কথা ছিলো। তাই বলে চিকিৎসকের ওপর এই বিষয়ে আপত্তি কিংবা অভিযোগ উত্থাপন করা মূর্খতা ও বোকামী ছাড়া আর কিছু নয়।
আবার কোনো কোনো পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শের কারণে এমন বিষয় মেনে নিতে হয়, যা বাহ্যত শরীয়তের হুকুমের খেলাফ হয়। তবে চিকিৎসকের পরামর্শের প্রয়োজন না হলে কিংবা অপারগতার শিকার না হলে শরীয়ত অসমর্থিত বিষয় থেকে অবশ্যই বেঁচে থাকতে হবে।
মোটকথা, কোনো শিল্প বা শাস্ত্রের জনকের ব্যাপারে না জেনে শুনে তাড়াহুড়া করে প্রশ্ন বা অভিযোগ উত্থাপন করা চরম অজ্ঞতা ও ভুল সিদ্ধান্ত। এরকম ভুল সিদ্ধান্তে জড়িয়ে নিজেকে খামাখা ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া জায়েয নেই। আর এটা কখনোই কোনো বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী লোকের কাজ হতে পারে না।

(মুফতি আবু বকর জাবের কাসেমি কর্তৃক রচিত ‘জামা’আতে তাবলীগ আওর কুতুবে ফাযায়েলঃ হাকায়েক ও গলত ফাহমিয়াঁ’নামক গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.