তাকলীদ কী ও কেনো?-আব্দুল্লাহ আল মাসুম

0
1029
Taqleed
Taqleed

বর্তমান যুগে তাকলীদ অস্বীকার করার এক প্রবণতা ব্যাপকহারে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উম্মাহর সংহতি ও তাদের জীবন গতির ভারসাম্য বিধবংস করার জন্য এটা এক ফিতনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কুরআন-সুন্নাহর আদর্শ, ইসলামের বিধি-বিধানের মৌলনীতিমালার কোনো পরওয়া না করে অজ্ঞতাবশত এক শ্রেণির লোকেরা অবলীলায় তাকলীদকে অস্বীকার করে বসে। অথচ এই তাকলীদ শরীয়তেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। নিম্নে তাকলীদের বিধান উল্লেখ করা হলো।

তাকলীদের পরিচয়

তাকলীদের বিভিন্ন সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো সংজ্ঞায় শাব্দিক অর্থের প্রাধান্য, আবার কোনোটিতে সংজ্ঞা দানকারীর চিন্তা-ধারার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। প্রকৃতপক্ষে তাকলীদকারীরা যে অর্থে কোনো ইমামের তাকলীদ করেন- তাই মূল সংজ্ঞা। সাইয়্যেদ মূসার সংজ্ঞায় এর প্রতিফলন ঘটে-
التقليد أن يعتمد الإنسان في فهم الحكم من الدليل على غيره لا على نفسه-
শরীয়তের দলীল থেকে বিধান বুঝার ক্ষেত্রে নিজের উপর নির্ভর না করে অন্যের (বিশেষজ্ঞ ইমামের) উপর নির্ভর করা।
এই সংজ্ঞায় তাক্বলীদের সঠিক ধারণা দেওয়া হয়েছে। যার সারকথা হলো-
— তাকলীদ অবশ্যই কোনো মুজতাহিদের করতে হবে।
— প্রকৃতপক্ষে তিনিই মুজতাহিদ- যিনি শরীয়তের দলীল দ্বারা ইজতিহাদ করেন।
— তাকলীদ কারী যেহেতু ইজতিহাদের যোগ্যতার অধিকারী নয়। তাই সে মুজতাহিদের গবেষণা এবং সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা রাখে।

তাকলীদের নির্দেশঃ কুরআনের আলোকে-
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
فاسئلوا أهل الذكر إن كنتم لا تعلمون-
অর্থঃ তোমরা যদি না জানো- তাহলে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা করো। (সূরা নাহলঃ আ- ৪৩)
আল্লামা আমিদী রহ. তাঁর “আল- ইহ্কাম” নামক গ্রন্থে লিখেন-
সকল বালেগ মুসলমান এই আদেশের অন্তর্ভুক্ত। (আল ইহকামঃ খন্ড-৩, পৃঃ ১৯৮)
ইবনে আব্দুল বার রহ. বলেছেন-
আলিমগণ এই বিষয়ে একমত যে, এই আয়াতে সাধারণ মানুষকে অর্থাৎ, মুজতাহিদ নয়- এমন লোকদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। (ইবনে আব্দুল বার-জামিউ বয়ানিল ইল্মঃ খন্ড-১, পৃঃ ১৪০)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ أَطِيعُواْ اللَّهَ وَأَطِيعُواْ الرَّسُولَ وَأُوْلِي الأَمْرِ مِنْكُمْ
অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! আনুগত্য করো আল্লাহর, আনুগত্য করো রাসুলের। আর তাদেরও আনুগত্য করো-যারা তোমাদের মধ্যে ‘উলিল আমর’ বা বিজ্ঞ। (সূরা নিসাঃ আ- ৫৯)
এই আয়াতে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যের সাথে সাথে ‘উলিল আমর’-এর আনুগত্যকে ওয়াজিব করা হয়েছে। আর অধিকাংশ তাফসীরকারের মতানুযায়ী ‘উলিল আমর’ শব্দ দ্বারা কুরআন-সুন্নাহর ইলমের অধিকারী ফকীহ ও মুজতাহিদ ইমামগণকে বুঝানো হয়েছে।
যারা এ মত পোষণ করেন- তাদের মধ্যে রয়েছেন- সাহাবী জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাযি., ইবনে আব্বাস রাযি., মুজাহিদ রহ., আতা ইবনে আবী রাবাহ রহ., আতা ইবনে সায়েব রহ., হাসান বসরী রহ., আবুল আলীয়া রহ. সহ আরো অনেকে।
(তাফসীরে ইবনে কাসীরঃ খন্ড-১, পৃঃ ৫৩০, থানভী- আহকামুল কুরআনঃ খন্ড-২, পৃঃ ৩০০)

হাদীসের আলোকে-
সাহাবী জাবির রাযি. সূত্রে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
ألا سألوا! إذا لم يعلموا, فإنما شفاء العى السوال-
অর্থঃ যখন তাদের জানা ছিলো না- তখন কেনো তারা জিজ্ঞাসা করলো না! নিশ্চয়ই অজ্ঞতার সমাধান হলো জিজ্ঞাসা করা।
(সুনানে আবু দাউদঃ হা-৩৪০, সুনানে ইবনে মাজাহঃ হা-৫৭২)

ইজমার আলোকে-
যারা ইজতিহাদের যোগ্যতার অধিকারী নয়- তারা কোনো মুজতাহিদের তাকলীদ করবে- এ বিষয়ে মুসলিম উম্মাহর ইজমা হয়েছে। আল্লামা আমিদী রহ. বলেন-
العامى ومن ليس له أهلية الاجتهاد وإن كان محصلا بعض العلوم المعتبرة في الاجتهاد, يلزمه اتباع قول المجتهدين والأخذ بفتواه عند المحققين الأصوليين- ومنع ذلك بعض المعتزلة البغداديين- والمختار إنما هو المذهب الأول ويدل عليه النص والإجماع والمعقول- أما الإجماع فهو أنه لم تزل العامة في زمن الصحابة والتابعين قبل حدوث المخالفين يستفتون المجتهدين ويتبعونهم في الأحكام الشرعية – والعلماء منهم يبادرون إلى إجابة سؤالهم من غير إشارة إلى ذكر الدليل ولا ينهونهم عن ذلك من غير نكير- فكان إجماعا على جواز اتباع العامى للمجتهد مطلقا-
সাধারণ মানুষ ও এমন আলিম- যার মধ্যে ইজতিহাদের যোগ্যতা নেই, যদিও বা ইজতিহাদ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের কিছু জ্ঞান রাখে, তাদের জন্য মুজতাহিদের ফতোয়া অনুসারে চলা কর্তব্য। মুহাক্কিক উসূলবিদগণ এ মতই পোষণ করেন। বাগদাদের মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের কিছু লোক এর বিরোধিতা করতো। কিন্তু এখানে প্রথম মতটিই সঠিক।

কুরআন, সুন্নাহ, ইজমায়ে উম্মত ও যুক্তি-বিবেচনা দ্বারা এটাই প্রমাণিত। ইজমায়ে উম্মতের বিবরণ এই যে, সাহাবা ও তাবেয়ীগণের যুগ থেকেই সাধারণ মানুষ মুজতাহিদদেরকে মাসায়েল জিজ্ঞাসা করতো এবং তাদের নির্দেশনা মতো কাজ-কর্ম করতো। আলিমগণও যথারীতি মাসায়েল বয়ান করতেন এবং তারা মাসআলার সঙ্গে দলীল বর্ণনা করা আবশ্যক মনে করতেন না। এটাই সে সময়ের প্রচলিত রীতি ছিলো। এ বিষয়ে কারো কোনো আপত্তি ছিলো না। এভাবেই তাকলীদের ব্যাপারে উম্মতের ইজমা হয়।
(আমিদী- আল ইহ্কামঃ খন্ড-৩, পৃঃ ২৫০)

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. বলেন-
والذى عليه جماهير الأمة أن الاجتهاد جائز في الجملة و التقليد جائز في الجملة, لا يوجبون الاجتهاد على كل أحد و يحرمون التقليد ولا يوجبون التقليد على كل أحد ويحرمون الاجتهاد وإن الاجتهاد جائز للقادر على الاجتهاد والتقليد جائز للعاجز عن الاجتهاد- فأما القادر على الاجتهاد فهل يجوز له التقليد هذا فيه خلاف والصحيح أنه يجوز حيث عجز عن الاجتهاد, إما لتكافؤ الأدلة وإما لضيق الوقت عن الاجتهاد, أو لعدم ظهور دليل له- فإنه من حيث عجز سقط عنه وجوب ما عجزعنه, وانتقل إلى بدله- وهو التقليد- كما لو عجز عن الطهارة بالماء-
উম্মাহর আলিমগণ এ বিষয়ে একমত যে, স্ব-স্ব ক্ষেত্রে ইজতিহাদ ও তাকলীদ দুটোই বৈধ। সবার জন্য ইজতিহাদ ওয়াজিব ও তাকলীদ হারাম, কিংবা সবার জন্য তাকলীদ ওয়াজিব ও ইজতিহাদ হারাম- বিষয়টি এমন নয়। ইজতিহাদের যোগ্যতা যার আছে- সে ইজতিহাদ করবে, আর যার নেই- সে অন্য মুজতাহিদের তাকলীদ করবে। এরপর প্রশ্ন থেকে যায় যে, ইজতিহাদের যোগ্যতা সম্পন্ন কোনো ব্যক্তির জন্যও তাকলীদ বৈধ কিনা? এ নিয়ে আলিমগণের একাধিক মত রয়েছে।
সঠিক মত এই যে, যেসব ক্ষেত্রে মুজতাহিদের পক্ষে ইজতিহাদ করা সম্ভব হয় না- সেসব ক্ষেত্রে তার জন্যও তাকলীদ বৈধ। কেননা বিভিন্ন কারণে ইজতিহাদ সম্ভব নাও হতে পারে। যেমন কোনো সময়ে উভয় দিকেই সমান মাপের দলীল থাকে কিংবা এ মূহুর্তে মুজতাহিদের সময়ের অভাব, অথবা এ মাসআলার দলীল তার জানা নেই ইত্যাদি।

মোটকথা, যেসব ক্ষেত্রে মুজতাহিদ ইজতিহাদে অপারগ- সেখানে তার জন্যও ইজতিহাদ ওয়াজিব থাকে না। তখন এর বিকল্প ব্যবস্থা- অর্থাৎ, তাকলীদ তার জন্যও প্রযোজ্য হয়। এর একটি দৃষ্টান্ত এই যে, কেউ যদি পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জনে অপারগ হয়- তবে তার জন্য তায়াম্মুমের বিধান কার্যকর হয়।
(ইবনে তাইমিয়্যাহ- মাজমূআ্তুল ফাতাওয়াঃ খন্ড-২০, পৃঃ ২০৩)

তাকলীদ পরিহারের পরিণতি
যখনই মুসলিম উম্মাহর কোনো শ্রেণি কুরআন ও সুন্নাহর ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের মত ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত চিন্তা-ভাবনাকে অবলম্বন করেছে, তখনই বিভিন্ন ফিতনার জন্ম দেখা দিয়েছে। ইসলামকে ধ্বংস ও ক্ষত-বিক্ষত করার জন্য এসব ফিতনাই অনেক কিছু। কুফরী তো আরও পরের কথা।

মু’তাযিলা, শীয়া, রাফেযী ইত্যাদি বিভিন্ন ফিরক্বা মুসলিম জাহানে কি যে ফিতনার ঝড় বইয়ে দিয়েছিলো- তা ইসলামী ইতিহাসের সচেতন কোনো পাঠক ও বিশ্লেষকের নিকট অস্পষ্ট নয়। তাক্বলীদের বিরোধিতাকারী- যারা ‘লা-মাযহাবী’ নামে বিশ্বব্যাপী প্রসিদ্ধ- তাদের মতবাদ ও চিন্তাধারা থেকে একই কায়দায় এই উপমহাদেশে কি সমস্যার উদ্ভব হয়েছে- তা আজ প্রত্যেক জ্ঞানী লোকের সামনে স্পষ্ট দৃশ্যমান। খোদ এই ‘লা-মাযহাবী’ সম্প্রদায়ের কর্ণধারগণ তা অনুভব করেছেন এবং এর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এখানে এমন কয়েকজনের বক্তব্য উদ্ধৃত করছি-

মুহাম্মদ হুসাইনের (বিটালভী) পঁচিশ বছরের অভিজ্ঞতা-
তিনি বলেন- আমি পঁচিশ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। যারা ইল্ম না থাকা সত্ত্বেও মুজতাহিদ বনে যায় এবং একেবারে তাকলীদ ছেড়ে দেয়- তারা পরিশেষে ইসলামকেই বিদায়-সম্ভাষণ জানায়। মুরতাদ ও ফাসেক হওয়ার বহু কারণ পৃথিবীতে আছে, কিন্তু দ্বীনদার মানুষের বে-দ্বীন হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো- ইল্ম না থাকা সত্ত্বেও তাকলীদ পরিহার করা।
(বিটালভী- রিসালা ইশাআতুস সুন্নাহঃ খণ্ড- ১১, সংখ্যা ২, ১৯৮৮)

প্রসিদ্ধ গাইরে মুকাল্লিদ আলিম কাযী আঃ ওয়াহিদ খানপুরীর বক্তব্য-
বর্তমান সময়ের বিদয়াতী ও সালাফ বিরোধী ভ্রষ্ট ‘আহলে হাদীস’- যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শরীয়ত সম্পর্কে অজ্ঞ। তারা রাফেযীদেরই উত্তরসূরী। অর্থাৎ অতীতে যেমন- শিয়াদের মাধ্যমে কুফরী ও মুনাফেকী বিস্তার লাভ করেছে এবং বে-দ্বীন ও যিন্দীক শ্রেণীর লোকজন মুসলিম পরিচয় লাভের সুযোগ পেয়েছে, তেমনি বর্তমান যুগের মুর্খ ও বিদআতী ‘আহলে হাদীস’ নামধারী বা ‘লা-মাযহাবী’ সম্প্রদায়ের লোকেরাও বে-দ্বীন ও যিন্দীকদেরকে মুসলিম সমাজে অনুপ্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে।
বিষয়টি আরো খোলাসা করে বলছি- আগের যুুগে বে-দ্বীন লোকেরা রাফেযী সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে এসে যদি নিজেদেরকে ‘রাফেযী’ সম্প্রদায়ভুক্ত বলে পরিচয় দিতো এবং হযরত আলী ও হুসাইন রাযি.-এর প্রতি অতি ভক্তি প্রদর্শন করে ইসলামী জাহানের খলীফাদ্বয়- আবু বকর রাযি., ওমর রাযি. ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামকে যালিম বলে গালি দিতো- তখন তাদের সাতখুন মাফ হয়ে যেতো। এতটুকু করার পর তারা যত ধরণের বদ-দ্বীনী প্রচার করুক- এতে রাফেযীদের কোনো মাথা ব্যাথা থাকতো না।
তদ্রুপ এই ‘লা-মাযহাবী’ সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে এসে তারা একবার রাফয়ে ইয়াদাইন করে তাকলীদ অস্বীকার করলে এবং ইমাম আবু হানীফা রহ. -এর সাথে কোনো ধরণের বে-আদবীমূলক আচরণ করলে তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। এরপর এই বে-দ্বীন লোকেরা যতই বে-দ্বীনী আর বদ-দ্বীনী তাদের মাঝে প্রচার করুক না কেনো- এতে তাদের কিছুই যায় আসে না।
(ইযহারু কুফরী সানাউল্লাহ বিজামি উসূলি আমানতু বিল্লাহঃ পৃ-২৬২)

উপরোক্ত দুটি উদ্ধৃতিই ‘লা-মাযহাবী’-দের কারণে সৃষ্ট ফিতনার ভয়াবহতা বুঝার জন্য যথেষ্ট। বর্তমানে এই উপমহাদেশের মুসলিম সমাজের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করলে এবং এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলেও ব্যাপারটি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে। যদি বলা হয়- এদের কারণে মুসলিম উম্মাহকে তাদের সর্বসম্মত কর্মধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে বিভক্তির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে- তাহলে তা কোনো ভাবেই বাড়াবাড়ি হবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.