তিউনিসিয়া এখনও আমাদের

0
183
Our Tunis
Our Tunis

তিউনিস ছিল মুসলিম খিলাফতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজধানী। উত্তর আফ্রিকার তিউনিসিয়া রাষ্ট্রের উত্তর-পূর্ব অংশে অবস্থিত তিউনিস শহর বর্তমানে এই দেশের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। এবার একটু পিছিয়ে গিয়ে দেখে নেওয়া যাক এই শহরের ইতিহাস। জানা যায়, ইসলামি শাসনকালে এই শহরে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছিল। কীভাবে শহর এমন সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল, তা-ই একটু আলোচনা করা যাক।  

খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে রোমান সম্রাট অগাস্টাসের তত্ত্বাবধানে তিউনিস শহরের পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল, তবে সেই সময় কার্থেজ-কে কোনও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। মুসলমানরা ৭২০ খ্রিস্টাব্দে এটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে এবং জায়তৌনা মসজিদটি নির্মাণ করে। তখন প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসাবে এই শহরকে ব্যবহার করা হত। এর মূল ভূমিকা ছিল সিসিলি এবং দক্ষিণ ইতালির জনবসতি রক্ষা করার জন্য জরুরি ভিত্তিতে মুসলিম সেনাবাহিনী সরবরাহ করা। তখন জায়তৌনা মসজিদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মীয় শিক্ষকদের ধর্ম প্রচার ও নতুন যারা ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেছে তাদের যথাযথ ইসলামি শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল। অন্য শিক্ষকদের পাঠানো হচ্ছিল আন্দালুসিয়া, কর্ডোবা এবং সিসিলিতে। আঘলাবিদের শাসনামল (নবম শতাব্দী) থেকে, কাইরাওয়ানকে প্রতিস্থাপিত করে তিউনিসিয়া প্রদেশ (তৎকালীন আমলে ইফরিকিয়া হিসাবে পরিচিত)-এর রাজধানী হয়ে ওঠে তিউনিস শহর। 

North East Tunisia 2
North East Tunisia

গোটা দেশের অভিভাবক হয়ে উঠার আগে, তিউনিসের আয়তন ছিল ২৭০ হেক্টর এবং তার জনসংখ্যা ৯০,০০০ (আবদেলকাফি, ১৯৮৯, পৃষ্ঠা ৩৯)। এর চার ধারে ছিল দ্বিস্তরীয় প্রাচীর ও তিন ধরনের বিশেষ সুরক্ষা স্তর। শহরের প্রাণকেন্দ্রে ছিল কেন্দ্রীয় মদিনা এবং তার জন্যও বিশেষ নিরাপত্তার বন্দোবস্ত ছিল। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে (উডফোর্ড, ১৯৯০) সেই নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছিল।

তিউনিস শহরের পরিকল্পনা, বিশেষ করে শহরের গঠন এবং ভূমির ব্যবহার পুরোপুরি ইসলামের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে প্রতিফলিত করে। প্রধান মসজিদের চারপাশে গড়ে ওঠা শহরের বৈশিষ্ট্যগুলি হল:  

প্রধান মসজিদ বা সেন্ট্রাল মসজিদ

এই প্রধান মসজিদের অবস্থান ছিল শহরের প্রাণকেন্দ্রে। টিউনিসে জাইতুনা মসজিদ এবং বিশ্ববিদ্যালয় (অন্য দুটি বানান হল- জাইতুনা এবং জায়তৌনা)-এর মধ্যে সংযোগ ছিল, এবং মূলত তার ধর্মীয় শিক্ষা ও পাবলিক লাইব্রেরির জন্য বিখ্যাত ছিল। মসজিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা শুরু ৭৩২ সাল থেকে, সেই সময় একটি “জলপাই গাছ”-এর ছায়ায় বসে এক তিউনিসিয়ান বিদ্বান ব্যক্তি তাঁর শিক্ষার্থীদের ইসলাম শিক্ষা দিতেন। পরবর্তী কালে জায়তৌনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষালাভ করে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন একাধিক মহান বিদ্বান ব্যক্তি এবং সংস্কারক। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন, প্রখ্যাত ইবন খালদুন, আবদ-আল-আ’জিজ আল-থা’আলিবি, মহম্মদ তাহার ইবন আছুর এবং কবি আবি আল-কাসেম আল-শাব্বী। ১৯৬১ সালে, তিউনিসিয়ার সরকার একে টিউনিস বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত করে।

Mosque of TUNIS
Mosque of TUNIS

 বাণিজ্যিক কেন্দ্র (সুক বা suq) 

জায়তৌনা কমপ্লেক্সের আশেপাশে সুক, বাজার এবং দোকান বসা রাস্তাগুলির একটি নেটওয়ার্ক ছিল। এগুলিই ছিল শহরের অর্থনীতির শিরদাঁড়া। মসজিদের কাছে মর্যাদাপূর্ণ ব্যবসা ও কারুশিল্পীরা যেমন, বই বিক্রয়কারী, সুগন্ধি, শুকনো ফলের বিক্রেতা এবং কাপড়ের ব্যবসায়ীরা একসাথে বসতেন। আজও অনেকে এই ঐতিহ্যের চিহ্ন দেখতে পান সুগন্ধীর সৌক, ঐতিহ্যবাহী পোশাকের দোকান এবং বাদাম ও মশলা বিক্রেতারা এখনও মসজিদের দেয়ালের একপাশে বসেন। আর যে ধরনের শিল্পের ফলে দূষণ বা শব্দ হয়, যেমন কাপড় ডাই করা ও মৃৎশিল্প, এগুলির দোকান রয়েছে প্রবেশদ্বারের ফটকের কাছে।

আবাসিক মহল

Tunis City 2
Residencial area of Tunis City

এখানকার আবাসিক মহলগুলির স্থানীয় নাম ছিল হুমাতে নামে, সেগুলি গড়ে উঠেছে কোনও স্থানীয় মসজিদকে কেন্দ্র করে। সেখানে নাগরিকরা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে যেতেন। প্রতিটি হুমাতে অনেকাংশে স্বাধীনতা ভোগ করত। প্রতিটির নিজস্ব হাম্মাম, বেকারি, প্রধান দোকানগুলি, কুরআন স্কুল (কুত্তব) এবং একটি জাওয়াইয়া (দাতব্য প্রাঙ্গণ যেখানে আশ্রয়, সহায়তা এবং ধর্মীয় শিক্ষাদান করা হত) ছিল। এদের প্রত্যেকের নিজস্ব গেট ছিল, এবং কোনও সমস্যার সময়, ওই গেট বন্ধ করে দিলে মদিনার বাকী অংশ (শহর) থেকে সেই নির্দিষ্ট হুমাতে-কে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া যেত। শহরের পূর্ব দিকে বাইরের দেয়ালের বহির্ভাগে সমুদ্রের কাছে গোরস্থান নির্মাণ করা হয়েছিল।

রাস্তার নেটওয়ার্ক

তিউনিস শহরের হুমাতেগুলি মহল সংকীর্ণ রাস্তার নেটওয়ার্ক দ্বারা সংযুক্ত ছিলয এই রাস্তা মূলত ব্যবহার করত পথচারী, ঘোড়সওয়ার এবং ভারবহনকারী পশুরা। রাস্তাগুলির মূলত দুটি বিভাগ রয়েছে। প্রথমটি হল, বেসরকারী রাস্তা। এদের বলা হত ডুরুব (একবচন হলে দার্ব)। এই সরু রাস্তাগুলির নেটওয়ার্ক গিয়ে শেষ হত কোনও না কোনও বাড়ির সামনে, ফলে মূলত আবাসিক বাসিন্দারাই এই রাস্তা ব্যবহার করতেন। দ্বিতীয় ধরনের রাস্তাগুলি ছিল সরকারি, যা আবাসিক হুমাতে-কে ঘিরে থাকত এবং বেকারি, গমের মিল, হাম্মাম এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দোকান এখানেই পাওয়া যেত। 

Tunisia AFRICAN COUNTRY
Tunisia AFRICAN COUNTRY

এই মুসলিম শহরটিকে তৎকালীন সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক মূল্যবোধ অনুসারে সাজিয়ে তোলা হয়েছিল। আর ঠিক এই কারণেই, মধ্যযুগের অন্যান্য মুসলিম শহরের মতো তিউনিস শহর এই বর্তমান যুগেও তার জনপ্রিয়তা হারায়নি। 

উউকিপিডিয়া এবং মুসলিমদের জন্য বিশ্বের প্রথম ইন্টারনেট ব্রাউজার সালাম ওয়েব থেকে সংগৃহীত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.