দাওয়াত কী ও কেনোঃ একটি বিশ্লেষণ

0
924
011
011

দাওয়াত আরবী শব্দ। এর অর্থ আহবান করা। পরিভাষার ক্ষেত্রে দাওয়াত শব্দটি খুবই ব্যাপক। এর পরিধিও অনেক বিস্তৃত। স্বাভাবিকভাবে কাউকে তলব করলে অথবা ডেকে পাঠানোর ক্ষেত্রে দাওয়াত শব্দ ব্যবহৃত হয় আবার কাউকে কোনো কিছুর প্রতি আহবান করতে গেলেও এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এমনকি আহবান করতে গিয়ে এর জন্য প্রচেষ্টা ও শ্রম দেওয়ার ক্ষেত্রেও দাওয়াত শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
কুরআন ও হাদীসে নববীতে দাওয়াত শব্দটি অসংখ্যবার উল্লেখিত হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা স্বয়ং মানুষকে শান্তি ও নিরাপত্তার দিকে আহবান করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি দাওয়াত শব্দ ব্যবহার করেছেন। ইরশাদ হয়েছে- والله يدعو إلي دار السلام-
অর্থঃ আল্লাহ তা’আলা শান্তির ঠিকানায় অর্থাৎ জান্নাতের দিকে আহবান করছেন।
(সূরা ইউনুস-২৫)
তবে দাওয়াত শব্দের সর্বাধিক ও প্রধান ব্যবহার হয় আল্লাহ তা’আলার দিকে আহবান করার ক্ষেত্রে। অন্য কথায় দাওয়াত মূলত আল্লাহ তা’আলার দিকে আহবান করার ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। আর এ কারণেই দাওয়াত শব্দটি অন্যান্য সাধারণ শব্দের চেয়ে ব্যাপক ও বিস্তৃত পরিধি লাভ করেছে।
কোনো নতুন বিষয় সম্পর্কে কাউকে অবগত করতে হলে সর্বপ্রথম ওই বিষয়টি উত্থাপন করার নামই হলো দাওয়াত। উত্থাপন করার পর সেদিকে মনোযোগী করার ফলে উক্ত নতুন বিষয়ের প্রতি মানুষ ধাবিত হয়। এ সম্পর্কে সে তৎপর হয়ে উঠে। এক পর্যায়ে যে বিষয়ে তাকে আহবান করা হয়েছে- সে সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা তার মন-মস্তিস্কে গেঁথে যায়। তখন সে এর গভীরে প্রবেশ করতে শুরু করে। ক্রমান্বয়ে এই নতুন বিষয়ের সাথে তার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠে।
সুতরাং কোনো কিছুর গভীরে কাউকে বা তার সাথে তাকে সম্পর্কযুক্ত করতে হলে সবার আগে তার প্রতি আহবান করার গুরুত্ব অনিবার্য। বরঞ্চ এর জন্য এটাই সর্বপ্রথম ও মৌলিক পন্থা। আর এটাকেই সাধারণভাবে ওই বিষয়ের প্রতি দাওয়াত বলে।
সারা জাহানের মহান বাদশাহ সমগ্র ভু মন্ডল ও নভো মন্ডলের সমস্ত সৃষ্টির প্রতিপালক ও নিয়ন্ত্রক আল্লাহ তা’আলার পরিচয় লাভ করা এবং তাঁর অবিনাশী সর্বময় মহান স্বত্ত্বা ও সুউচ্চ গুণাবলী সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে হলে তাঁর দিকে আহবান করার জন্য কুরআন ও হাদীসে যেসব নির্দেশনা ও বিধানাবলী এসেছে- সেক্ষেত্রেও দাওয়াত শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যথা- ইরশাদ হয়েছে-
ادع إلي سبيل ر بك بالحكمة والموعظة الحسنة-
অর্থঃ আপনি আপনার রবের দিকে আহবান করেন কৌশল ও উত্তম কথার দ্বারা। (সূরা নাহল-১২৫)
হিদায়াত ও কল্যাণের কাফেলায় শরিক হওয়া এবং সত্য শ্বাশত ইসলামের অনুসারী হওয়ার লক্ষ্যে সবার আগে দাওয়াতের গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ আল্লাহ তা’আলার পরিচয় লাভ না করলে ও তাঁর সম্পর্কে কোনো ধারণাই না থাকলে আল্লাহ তা’আলার বিধি-নিষেধের মূল্যায়ন করবে কীভাবে?
যার পরিচয় ও মূল্য মানুষের জানা থাকে, যার আলোচনা মানুষের সামনে থাকে, মানুষ স্বতস্ফুর্তভাবে তার কথারই আনুগত্য করে। এমনকি কেউ তাকে অবমূল্যায়ন করলে সে এর বিরুদ্ধে সরব প্রতিবাদী হয়ে উঠে। এটা মানুষের স্বভাবগত ধর্ম। পৃথিবীর বিধানও এটাই।
এ কথার আলোকেই আল্লাহ তা’আলার দিকে দাওয়াত দেওয়ার ধারা অব্যাহত থাকলে এবং আল্লাহ তা’আলার অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ গুণাবলীর আলোচনা বিদ্যমান থাকলে মানুষ আল্লাহমুখী হবে। ফলে সে আল্লাহ তা’আলার পরিচয় লাভ করতে থাকবে। আল্লাহ তা’আলার নাম ও বড়ত্বের কথার প্রভাব তার অন্তরে প্রবেশ করবে। আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর মহান রাসূলের নির্দেশনা মেনে চলা তার জন্য সহজ হয়ে উঠবে। ফলে সে ইসলামের উপর কায়েম থাকবে।
এ কারণেই আল্লাহ তা’আলার কথা ও বড়ত্ব আলোচনা করা ইসলামে একটা স্বতন্ত্র আমল। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এর জন্য নির্দেশ দেওয়া আছে। যথা- ইরশাদ হয়েছে- وكبره تكبيرا-
অর্থঃ আপনি তাঁর (আল্লাহ তা’আলা) বড়ত্ব বর্ণনা করুন। (সূরা ইসরা-১১১)
এছাড়া দাওয়াতের ফলে সর্বপ্রথম আল্লাহ তা’আলার দিকে ধাবিত হওয়ার গুরুত্বের প্রতি লক্ষ্য রেখে দাওয়াতের আমলকে সর্বকালীন ও সর্বব্যাপী করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ইসলামের অন্যান্য বিধি-বিধান পালন করার জন্য নির্দিষ্ট সময়-নিয়ম ও শর্তাবলী রয়েছে।
এগুলোর কোনো একটা না হলে কিংবা কোনো শর্ত পাওয়া না গেলে উক্ত বিধান পালন করা যায় না। যথা- প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় অনুসারে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা ইসলামে ফরয করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময় না হলে কিংবা সময় পেরিয়ে গেলে উক্ত সালাত আর আদায় করা যায় না। কিন্তু দাওয়াতের বিধান সম্পূর্ণ ভিন্ন। পৃথিবীর যে কোনো স্থানে থেকে যে কোনো সময়ে কোনো ধরণের নিয়ম বা শর্তাবলীর বাধ্যবধকতা ছাড়াই আল্লাহ তা’আলার দিকে দাওয়াত দেওয়া যায়।
আবার এই কারণেই আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক নবী ও রাসূলের দ্বারা সবার আগে দাওয়াতের আমল চালু করেছেন। তাঁরা সবার আগে মানুষকে আল্লাহ তা’আলার দিকে দাওয়াত দিয়েছেন। এরপর কিছু মানুষ আল্লাহমুখী হওয়ার পর তাদেরকে সাথে করে নিয়ে আল্লাহ তা’আলার বিধান কায়েম করেছেন।
অপরদিকে দাওয়াত বন্ধ হয়ে গেলে গায়রুল্লাহ তথা যেসব বিষয় মানুষকে আল্লাহ থেকে সরিয়ে দেয় এবং আল্লাহমুখী হওয়ার পরিবর্তে তাকে শয়তানমুখী করে দেয়, সেগুলোর প্রভাব তার অন্তরে গেঁথে যাবে। এর পরিণতিতেই সে আল্লাহ ও ইসলামের বিরোধী হয়ে উঠবে।
সুতরাং ইসলামের অবমাননা যারা করে, ইসলামের প্রতীকী নিদর্শন ও বিধানের প্রতি যারা কটাক্ষ করে, মুসলিম জাতির ধর্মীয় অনুভুতিতে যারা আঘাত হানে, তারা অবশ্যই আল্লাহ তা’আলার পরিচয় ও তাঁর সুমহান গুণাবলী সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ হওয়ার ফলেই এমনটি করছে। ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ এবং আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে মহান বার্তাবাহকের পরিচয় এদের কাছে না থাকার ফলেই তারা এমন গর্হিত ও জঘণ্য দুঃসাহস দেখাতে পারছে। আর এটা হচ্ছে তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত না পৌঁছার করূণ পরিণতি।

আব্দুল্লাহ আল মাসূম,

নির্বাহী সম্পাদক- দ্বি মাসিক কলম কালি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.