দানবীর আলেম

0
541
S. Abdul Qader Raypuri Rah.
S. Abdul Qader Raypuri Rah.

হযরত শাহ আব্দুল কাদের রায়পুরি রহ.
হযরত শাহ আব্দুল কাদের রায়পুরির জন্ম ১২৯৫ হিজরীতে সারগুন্ধা জেলায়। তাঁর পিতা হাফিয আহমদ একজন উঁচু মাপের বুযুর্গ ছিলেন। তার খানদান ছিলো একটা দ্বীনি ও ইলমী খানদান। তিনি স্বীয় ÑÑÑ মাওলানা কালীমুল্লাহর কাছে কুরআন শিখেছেন। ফারসীর কিছু কিতাবও তার কাছে পড়েন।
সরফ ও নাহুর কিতাব রশীদ আহমদ গাঙ্গুহীর ছাত্র মাওলানা রফীকের কাছে পড়েন। এরপর তিনি হিন্দুস্থানের বিভিন্ন মাদরাসায় থেকে মরসে নেযামীর বিভিন্ন কিতাব পড়েন। এরপর পড়াশোনা শেষ করেন। তিনি মানতেক ও দর্শনে খুব দক্ষ ছিলেন। তিনি হাদীসের কিতাব সমূহ দিল্লীর আব্দুর রয মাদরাসায় মাও. আ. আলীর কাছে পড়েন। দিল্লীতে থাকাকালীন তিরমিযীর কিছু হাদীস পড়েন।
পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর তিনি ইউনানী চিকিৎসা বিদ্যা অর্জন করেন। এরপর কিছু বিজনুর জেলায় চেম্বার দেন। এরপর কিছুদিন বেরেলিতে কুরআন ও হাদীসের দরস দেন। কিন্তু তার অস্থির মন কোনো কাজে তাকে লেগে থাকতে দিতো না। শেষ পর্যন্ত তিনি হকের অনুস্ধানে ব্যস্ত হয়ে পাগলের মতো হয়ে যান। এমতাবস্থায় তিনি শায়খ মাও. আ. রহীম রায়পুরির খেদমতে আসেন। প্রথম সাক্ষাতেই তিনি এতো প্রভাবিত হয়ে পড়েন যে, তার কাছেই থেকে যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নেন।

আ. রহীম রায়পুরি রহ. তাঁকে কিছুদিন গাঙ্গুহ যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি তার কাছেই থাকার ব্যাপারে পিড়াপীড়ি করতে লাগলেন। তখন শায়খ আ. রহীম তাকে বাই’আত করেন। এরপর থেকে যিকিরের তালকীন করেন। এরপর থেকে আ. কাদের রায়পুরি সারাজীবন হকের স্মরণ ও হযরত আ. রহীম রায়পুরির খেদমতে কাটিয়ে দেন। সব সময় রিয়াযত, মজুাহাদা ও যিকিরে থাকতেন। তার শায়খ তার প্রতি আজীবন সন্তুষ্ট ছিলেন। মৃত্যুর সময় তাকেই স্বীয় খলীফা করে স্থলাভিষিক্ত করেন। এবং তাকে রায়পুরেই থেকে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এ কারণেই তাঁর নামের সাথে রায়পুরি শব্দ যোগ হয়।
শায়খের ইন্তিকালের পর তিনি তার স্থালভিষিক্ত হন। এরপর দীর্ঘ পয়তাল্লিশ বছর পর্যন্ত তিনি তালকীন ও ইরশাদের কাজ করেন। স্বীয় আমল ও ইখলাস দ্বারা নবীর উম্মতের খেদমত করেন। লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে গোনহ ও নাফরমানী থেকে তওবা করান। শত শত আলিমকে রুহানি ফরয দ্বারা উপকৃত করেন। অনেককে তিনি খেলাফত দান করেন। সারাজীবন হকের অনুসন্ধানীর ইসণলাহ ও তরবিয়ত করার পর যিন্দেগীর হেদায়াত মনযিল অতিক্রম করার পর ১৩৮২ হিজরীর ১৪ই রবীউল আওয়াল চিরদিনের জন্য তিনি অস্তমিত হয়ে যান।

কিতাব শুনার আগ্রহ
হযরতে কিতাব শোনার খুব আগ্রহ ছিলো। কোনো সময় তিনি কিতাব শুনার মধ্যে এতে মগ্ন হয়ে যেতেন যে, মনে হতো, কিতাব না শুনলে তার হুশ ফিরে আসতো না। সাহারানপুরে থাকাকালীন অনেক সময় দেখা গেছে যে, ফজরের পর বিশ্রাম নেওয়া শেষ হলে সাথে সাথে আযাদ সাহেবের ডাক পড়তো। এরপর ফুতুহুশ শাম অথবা সাহাবীদের যিন্দেগীর কোনো কিতাব পড়ে শোনানোর জন্য হুকুম করতেন। আযাদ সাহেব কোনো প্রয়োজনে উঠে গেলে আবার তার ডাক পড়তো। চুপ হয়ে গেলে বলতেন- চুপ হয়েছো কেনো? তার কিতাব শুনার আগ্রহ কেমন, তা এভাবেও অনুমান করা যায় যে, একবার লেখত ৬০ হিজরীর অক্টোবরে রায়বেরেলীতে সংবাদ দিলো যে, তারিখে দাওয়াত ও আযীমতের তৃতীয় খন্ডে-খাজা নিযামুদ্দিন আওলিয়ার জীবনী সংকলন শেষ হয়েছে। এই তথ্য জানানোর কিছুদিন পর আমি রায়পুরে উপস্থিত হই। মুসাফাহা করার সাথে সাথে তিনি কিতাবের পান্ডুলিপি চাইলেন। ওই সময়ই আমাকে তা থেকে পড়ে শুনানোর জন্য নির্দেশ দিলেন। নামাযের পরও তা অব্যাহত ছিলো। কিতাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্য কোনো কাজ করার সুযোগ ছিলো না।

আত্মার অবস্থায় শক্তিবৃদ্ধি
রায়পুরে যেই প্রথম প্রথম গমন করতো, তাকে সর্বপ্রথম বেশি বেশি যিকিরের কথা বলা হতো। মনে হতো, এখানে সবসময় আল্লাহ আল্লাহ শব্দের গুনগান জারী থাকে। দিবারাত্রির খুব কম সময় পাওয়া যেতো, যখন যিকির হতো না। সামান্য যোগ্যতার অধিকারী কোনো লোকও এই বিষয় অনুভব করতে পারতো না যে, পুরো রায়পুরে যেনো শান্তি নিরাপত্তার চাদর বিছানো আছে। ওখানে এসে প্রত্যেক বিপদগ্রস্ত কিংবা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত লোক শান্ত ও চুপ হয়ে যেতো।
কোনো দূরদৃষ্টি ও সূক্ষè জ্ঞান সম্পন্ন লোক এটা বুঝতে পারতেন হযরতের নিসবতের প্রভাব পুরো পরিবেশকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে। সেখানে হযরতের যত কাছাকাছি হওয়া যেতো, ততই তা পরিস্কার অনুভব হতো। যেনো প্রশান্তির মারকায ওটাই, যা আল্লাহ প্রশান্ত আত্মা ইয়াকীন এবং সন্তুষ্টির বিনিময়ে দান কেরন।

এক মজলিসের ঘটনা
রায়পুরের খানকাহর এক ব্যক্তি হযরত শাহের মজলিসের একটা ঘটনা শুনাতে গিয়ে বলেন-
একবার মনে হলো, বুযুর্গের মজলিসে অভ্যন্তরীন অবস্তায় জোয়ার আসে কিন্তু আমি তো কিছুই দেখি না। ওই দিন আমার সেখানে অবস্থানের শেষ দিন ছিল। মাগরিবের পর যিকির করতে বসার পর আমার ভিতর বিস্ময়কর পরিবর্তন শুরু হয়ে গেলো। মনে হতে লাগলো, আল্লাহ যেনো আমার সামনে আর হযরত আমার পাশে। তারা আমাকে স্বান্তনা দিচ্ছেন। সমস্ত যাফিরীনদের অবস্থা এমন ছিলো। দীর্ঘ সময় যিকির করে শেষে অপারগ হয়ে ছেড়ে দিয়ে হযরতের খেদমতে উপস্থিত হয়ে সব খুলে বললাম। আযাদ সাহেব তো পংক্তি বলা আরম্ভ করলেন। হযরত বললেন- ÑÑÑÑ। এরপর সব অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে গেলো।

শায়খের মুহাব্বত
হযরত অত্যন্ত মুহাব্বত, দরদ-মায়ার অধিকারী ছিলেন। এটা তার স্বভাবজাত বিষয় ছিলো। এজন্য বড় বড় আলিম ও বুযুর্গ ব্যক্তিদের যারা এখানে বেশি বেশি গমন করতেন, তাঁদের প্রতি হযরতের বিশেষ দৃষ্টি ও আন্তরিক ভালোবাসা ছিলো। খাজা নিযামুদ্দিন আওলিয়ার সাথে তার আন্তরিক মুহাব্বত ছিলো।
১৯৫৯ সনে লাহোরে অবস্থানের সময় হাজী মতীন আহমদের মাও. ফযলুর রহমানের জীবনী পড়া হচ্ছিলো। ওই জীবনী নিয়ে তখনো বই ছাপানো হয়নি। আমার কাছে এর একটি অসম্পূর্ণ পান্ডুলিপি ছিলো। জীবনী পড়ার সময় পুরো মজলিসে এক ভিন্ন রকম অবস্থা পরিলক্ষিত হচ্ছিলো। যা বাস্তবে হযরতের অভ্যন্তরীণ অবস্থার বিপরীত ছিলো। যেনো কেউ বলছিলো কোনো কোনো আহলে মজলিসে বলেন- আগে কখনো মজলিসের অবস্থা এমন দেখিনি। হযরত রহ: বলেন- বড় মুহাব্বতের কথা ছিলো। মুহাব্বতের কথার প্রতিও মুহাব্বত অনুভূত হয়ে থাকে।

সুন্দর ও চাকচিক্যের মাপকাঠি
একবার হযরত মসজিদে নববীতে ছিলেন। আমি আরয করলাম, হযরত! পরবর্তী প্রজন্মের লোকেরা এই মসজিদে দারুনভাবে সজ্জিত ও আলোকময় করেছে। দামী দামী গালিচা ও কার্পেট বিছিয়েছে। হায়! যদি এই মসজিদ আগের মতো সাদাসিধে হতো। জানা ছিলোনা, ওই সময় হযরত কোন অবস্থার ভিতর ছিলেন। এ কথা শুনে হযরতের ভিতর জোশ এসে সৌন্দর্যের কিছু আছে। তার সদকাও তো আছে।

নবীর প্রতি ইশক
মৃত্যুর আগে অসুস্থতার সময় মদীনা মুনাওয়ারার কথা শুনে হযরত অন্য রকম হয়ে যেতেন। কখনো তিনি উচ্চ স্বরে কেঁদে উঠতেন। তখন মাও. মুহাম্মদ আনোরী উমরাহর জন্য রওয়ানা হচ্ছিলেন। হযরতের কাছে তিনি বিদায় নেওয়ার জন্য আসছিলেন। মদীনার কথা শুনার সাথে সাথে হযরত অঝোর ধারায় কাঁদতে শুরু করলেন। মাও. মুহাম্মদ বললেন- আমি কখনো হযরতকে এর আগে এভাবে আওয়াজ করে কাদতে দেখিনি। তখন বাুব আব্দুল আযীয আসলেন। তাকে দেখে হযরত বললেন- দেখো, এই ব্যক্তি মদীনা মুনাওয়ারা যাচ্ছে। এ কথা বলেই হযরত বেঁহুশ হয়ে গেলেন।

বিনয় ও অক্ষমতা প্রকাশ
একবার ফয়সালাবাদে থাকাকালীন হযরতের বন্ধু-বান্ধব ও খাদিমগণ পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো-
এবার হযরত রমযান মাসে কোথায় থাকবেন। ফয়সালাবাদের অধিবাসীরা ফয়সালাবাদের কথা বললো, লাহোরের লোকেরা লাহোরের কথা বললো। কুরাইশী সাহেব রাওলপিন্ডির কথা বললেন। হযরত এ অবস্থা দেখে একদিন সাহরীর উপরোক্ত তিন দলের সবাইকে ডেকে বললেন- দেখো, আমি একজন গরীব কৃষকের ছেলে। আমি ছাত্র জীবনের শুরুতে আসার সময় আমার ঘরের অবস্থা এমন ছিলো যে, আমার আম্মা চিন্তা করতেন যে, রুটির ব্যবস্থা কিভাবে হবে? আমি মেধাহীন ছেলে ছিলাম। যা পড়েছি, তা ভুলে গেছি। আর এখন তোমরা যারা আমাকে নিয়ে টানাটানি করছো, কেউ এদিকে আর কেউ ও দিকে আমাকে নিতে চাচ্ছো, এটাতো শুধুমাত্র আল্লাহর নাম নেওয়ার বরকতেই হয়েছে। তোমরা নিজে নিজে কেনো ইখলাসের সাথে আল্লাহর নাম নিচ্ছো না? আমাকে কেনো এ ব্যাপারে লজ্জা দিচ্ছো? তখন হযরতের কথায় এতো প্রভাব ছিলো যে, অনেকেই সেদিন এ কথা শুনে কেঁদেছিলেন।

দানশীলতার ঘটনা
হযরতের জন্য গায়েবীভাবে প্রয়োজন পুরণ হতো। আবার সাথে সাথে তা খরচ হয়ে যেতো। টাকা সাথে নিয়ে রাখা এবং রাতে তা নিয়ে ঘুমানো তাঁর জন্য বোঝাস্বরুপ ছিলো। খাদিম কিছু এনে দিলে তখনই অন্য খানকাহর খাদিম বা অভাবী লোকদেরকে তা দিয়ে দিতেন। হাজী ফজলুর রহমান বলেন- শুধু আমার হাত দিয়েই হযরত কয়েক লক্ষ রুপি অন্যদেরকে দান করেছেন। কোনো কোনো আলিমকে ওযীফা দেওয়ার নাম করে শত শত টাকা দেওয়ার নিয়ম ছিলো।
এক খাদিম হজের সফরে গিয়ে হিজায থেকে মিসর ও সিরিয়া চলে গিয়েছিলো। তার এক সঙ্গীকে হযরত ডেকে এক হাজার মুদ্রা দিয়ে বললেন- তাকে বলো যে, তোমার স্বাস্থ্য সামুদ্রিক ভ্রমণের জন্য উপযোগী নয়। এজন্য তুমি বিমানে সফর করো। মোটকথা, টাকার ব্যবস্থা হলেই তিনি সাথে সাথে কোনো খাতে খরচ করে ফেলতেন।

দানের পরিমাণে ঢেউ
একবার এক মজলিসের আয়োজন ছিলো। অনেক হযরত বসা ছিলেন। কোনো এক লোক হযরতের সাথে মুসাফাহা করতে গিয়ে বললো- হযরত! দশ রুপি লাগবে। খুব প্রয়োজন হযরত বললেন- আল্লাহর কাছে দো’আ করো। অতঃপর তিনি চুপ হয়ে গেলেন। একটু পর এক লোক এসে একশত রুপি এনে হযরতের হাতে দিলেন। হযরত জোরে বললেন-
আরে ভাই! যে দশ রুপি চেয়েছিলো। সে কোথায়? সে বললো- আমি আছি হযরত! হযরত বললেন- দশ রুপি নিয়ে নাও। লোকটি বললো- হযরত! এতো একশত রুপি। হযরত বললেন- নাও। তোমার জন্য ঢেউ এসেছে।

দয়া ও মায়া
হযরতের দরদ-মায়ার কথা বর্ণনা দিতে গিয়ে একজন বললেন- হযরত এতো দয়াবান ছিলেন যে, মায়েদের দয়া এর ওপর কুরবান হয়ে যাবে। আমি আমার ৫২ বছরে এবং হযরতের সাথে ২৭ বছরের সম্পর্কের যিন্দেগীতে কোনো মা, উসতাদ, বন্ধুবান্ধব বা কোনো বুযুর্গকে এরকম দয়ালু দেখিনি। হযরতের কোনো মেহমানের অসুস্থতা হলে তার রাতের ঘুম চলে যেতো।
হযরতের সাথে যারাই মিশতো, তারা প্রত্যেকেই মনে করতো যে, হযরত আমাকেই মুহাব্বত করেন। অন্য কাউকে নয়। হযরতের ভিতর বিজলীর মতো এরকম মুহাব্বত ছিলো যে, যত বড় বিপদগ্রস্থ হোক না কেনো, হযরতকে দেখেই সব কষ্ট ভুলে যেতো। অন্য একজন বলেন- আমি আমার সারা জীবনে এরকম ভালোবাসার মানুষ দেখিনি। কেউ স্বীয় বিবি কেও এতো মুহাব্বত করতে পারে না, যে রকম মুহাব্বত হযরত আমাদের মতো লোকদের করে থাকেন। একবার খাওয়ার পর আমি আরয করলাম, হযরত তো কিছুই খেলেন না। তখন হযরত অত্যন্ত মুহাব্বতের ভাষায় আমাকে বললেন- তোমার খাওয়া মানেই আমার খাওয়া।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.