নববী এবং সাহাবা যুগে দাওয়াত ও তাবলীগের সফর

0
549
Dawat Tablig
Dawat Tablig

দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত এবং এর জন্য বিভিন্ন এলাকায় একাধিক মেয়াদে সফর করা নতুন কোনো কিছু নয়। নববী ও সাহাবা যুগ থেকেই এর প্রচলন চলে আসছে। এভাবে সফর করা আল্লাহ তা’আলার রাস্তায় আমলের আওতাভুক্ত।
ইতিহাস ও সীরাতের অসংখ্য বর্ণনার আলোকে দিবালোকের মতো পরিস্কার হয় যে, সশস্ত্র সংগ্রামের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে একেক অঞ্চলে দ্বীনের দাওয়াত ও তাবলীগের উদ্দেশে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জামাত নিয়ে সফর করেছেন। কখনো তিনি নিজে আমীর হয়ে গেছেন; আবার কখনো তিনি স্বীয় সাহাবীগণের কাউকে জামাতের আমীর বানিয়ে দাওয়াত ও তাবলীগের জন্য প্রেরণ করেছেন। নিম্নে এ জাতীয় কিছু প্রমাণাদি উল্লেখ করা হলো-
عن البراء رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم بعث خالد بن الوليد إلى أهل اليمن، يدعوهم إلى الإسلام. قال البراء: فكنت فيمن خرج مع خالد، فأقمنا ستة أشهر يدعوهم إلى الإسلام فلم يجيبوه. ثم إن النبي صلى الله عليه وسلم بعث عليا رضي الله عنه فأمره أن يقفل خالدا، إلا رجل كان يمم مع خالد أحب أن يعقب مع علي فليعقب معه.
فكنت فيمن عقب مع علي. فلما دنونا من القوم خرجوا إلينا، فصلى بنا علي، ثم صفنا صفا واحدا، ثم تقدم بين أيدينا وقرأ عليهم كتاب رسول الله صلى الله عليه وسلم، فأسلمت همدان جمعا. فكتب علي إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم، فلما قرأ الكتاب خر ساجدا ثم رفع رأسه فقال: ” السلام على همدان ، السلام على همدان “.
هذا حديث صحيح أخرج البخاري بعضه بهذا الإسناد- .
অর্থঃ সাহাবী বারা রাযি. বলেন-
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইয়ামান প্রদেশে তাবলীগের উদ্দেশ্যে মহাবীর খালীদ ইবেন ওয়ালিদ রাযি.-কে পাঠান। আমিও তাঁদের সাথে ছিলাম। আমরা দীর্ঘ ৬ মাস যাবত সেখানে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ অনবরত করে চলেছিলাম, কিন্তু তাদের কেউ তখনো আমাদের দাওয়াত কবুল করছিলো না।
অতঃপর সাহাবী আলী রাযি.-কে নবীজি আমীরের দায়িত্ব দিয়ে খালীদ রাযি.-কে ফিরে আসতে বললেন এবং নির্দেশ দিলেন যে, তাঁর সাথে যারা ফিরতে চায়- তারা ফিরতে পারবে আর যারা থেকে যেতে চায়- তারা থাকতে পারে। আমি সাহাবী আলী রাযি.-এর সাথে আরো সময় বাড়িয়ে নিলাম।
অতঃপর আলী রাযি. আমাদেরকে নিয়ে সালাত আদায় করলেন। পরে আমরা কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়ালাম। এরপরে তিনি আমাদের মাঝে এগিয়ে এসে নবীজির দাওয়াতনামা পড়ে শুনালেন। সাথে সাথে হামদান গোত্রের সবাই একসাথে ইসলাম গ্রহণ করলেন।
এই খুশির সংবাদ লিখে সাহাবী আলী রাযি. নবীজির নিকট পত্র পাঠালেন। যখন নবীজি উক্ত পত্রখানি পড়লেন, তখন তিনি সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। অতঃপর মাথা উঠিয়ে বললেন- হামদান গোত্রের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক; হামদান গোত্রের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।
অন্য রেওয়ায়াতে আছে- উক্ত জামাত নিয়ে সাহাবী আলী রাযি. ৪ মাস পর বিদায় হজ্বের সময় ফিরে এলেন। অতএব উভয় আমীরের নেতৃত্বে আমাদের সময় অতিবাহিত হলো প্রায় ১ বছর।
(সহীহুল বুখারী ; হায়াতুস সাহাবাহঃ ১/১৭৯; সহীহুল বুখারীঃ ২য় খণ্ড।)

অনুরূপ বর্ণনার আরেকটি হাদীস আল্লামা ইবনে কাসীর রহ.-এর “السيرة النبوية” নামক গ্রন্থের ৪র্থ খণ্ডের ২০৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে।
এ হাদীসের আলোকে খালিদ রাযি.-এর নেতৃত্বে ৬ মাস এবং সাহাবী আলী রাযি.-এর নেতৃত্বে ৪ মাস ও তারো চেয়ে বেশি সময় তাবলীগী সফর করার প্রমাণ পাওয়া যায়।
আবু আব্দুল্লাহ হাকেম রহ. আসেম বিন ওমর বিন কাতাদাহ-এর সূত্রে বর্ণনা করেনঃ
أن ناسا من عضل والقارة وهما حيان من جديلة- أتوا النبي صلي الله عليه وسلم بعد أحد- فقالوا: إن بأرضنا إسلاما- فابعث معنا نفرا من أصحابك يقرؤوننا القرآن ويفقهوننا في الإسلام- فبعث رسول الله صلي الله عليه وسلم معهم في ستة نفر- منهم مرثد بن أبي مرثد حليف حمزة بن عبد المطلب وهو أميرهم-
অর্থঃ জাদীলার দুই গোত্র আদল ও কারাহ-এর কতিপয় লোক উহুদ যুদ্ধের পর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হলো এবং আবেদন করলো যে, আমাদের এলাকায় লোকজন ইসলাম গ্রহণ করেছে, তাই আপনার কয়েকজন সাথী আমাদেরকে কুরআন ও দ্বীন শিক্ষা দানের জন্য প্রেরণ করুন। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারসাদ বিন আবু মারসাদ-এর নেতৃত্বে ছয়জনের একটি জামাত প্রেরণ করেন। (মুসতাদরাকে হাকেমঃ হা-৪৯৭৯)
অন্য বর্ণনায় সাহাবী মু’আয ও আবু মুসা রাযি. কে ইয়ামানবাসীদেরকে কুরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রেরণ করার আলোচনা পাওয়া যায়। আবু নাঈম আল আসবাহানী “হিলয়াতুল আওলিয়া” নামক গ্রন্থে সাহাবী আবু মুসা আশআরী রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন-
أن رسول الله صلي الله عليه وسلم بعث معاذا وأبا موسي إلي اليمن وأمرهما أن يعلما الناس القرآن-
অর্থঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবী মু’আজ ও আবু মুসা রাযি. কে ইয়ামানে কুরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রেরণ করেন। (হিলইয়াতুল আওলিয়াঃ ১/২৫৬)

অন্য রেওয়ায়াতে সাহাবী আম্মার বিন ইয়াসির রাযি. থেকে বর্ণিত যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে কায়েস গোত্রের একটি দলের নিকট তাদেরকে দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য পাঠালেন। তিনি বলেন- আমি সেখানে যাওয়ার পর তাদেরকে জংলী উটের মতো পেলাম। তাদের যিন্দেগীর উদ্দেশ্য ছিলো উট ও বকরি। এই অবস্থা দেখে আমি নবীজির নিকট ফিরে এসে তাদের অবস্থা অবগত করলাম তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
يا عمار! ألا أخبرك بأعجب منهم؟ قوم علموا ما جهل أولئك- ثم سهو كسهوهم-
অর্থঃ আমি তোমাকে এর চাইতে আশ্চার্য কথা শুনাই যে, এক জাতি এমন আছে- যারা ধর্মকে জানে এবং চিনে! তারপরও তারা এসব লোকদের তুলনায় অধিক উদাসীন থাকে।
(তারগীবঃ সাহাবী আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, হা-২২০)
এছাড়াও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবাগণ কর্তৃক ৩ দিন, ১০ দিন, ১৫ দিন, ৪০ দিন, ৬০ দিন, ৪ মাস, ৬ মাস, ১ বছর, ২ বছর, ৫ বছর, ২৭ বছর, এমনকি পুরো জীবনটাই পৃথিবীর প্রান্তর থেকে প্রান্তরে দাওয়াত ও তাবলীগের সফরে সময় কাটানোর অসংখ্য প্রমাণ ইতিহাসগ্রন্থে স্বর্ণাক্ষরে লিখা আছে। নিম্নে এর কিছু বিবরণ দেওয়া হলো।

প্রাচীন ও জগদ্বিখ্যাত আরবী ভাষায় রচিত ইতিহাসগ্রন্থ ভিত্তিক দলীলঃ
১. প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে সা’আদ রচিত ‘তাবাকাত’ গ্রন্থের ২য় খণ্ডের ৫১-৫৪ পৃষ্ঠায় ৭ দিন এবং ১৫ দিনের জামাতবন্দি হয়ে সফরের কথা লেখা আছে।
উক্ত জামাতের আমীর স্বয়ং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন। এ জামাতের সফরের সময়কাল ছিলো ৪র্থ হিজরীর সফর মাস। আর রোখ (গন্তব্য) ছিলো মদীনা মুনাওয়ারাহর সুলাইম গোত্র।

২. এছাড়া ইবনে সা’আদ-এর ‘তাবাকাত’ গ্রন্থের ২য় খণ্ডের ৩৫-৩৬ পৃষ্ঠায়ও ৬০ দিনের তাবলীগী জামাতের সফরের কথা সুস্পষ্ট করে বলা আছে।

৩. আল্লামা ইবনে সা’আদ তাবাকাতে (খন্ড-৬, পৃ-৭) উল্লেখ করেন-
হারেসা বিন মাদরিব রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- একবার ওমর রাযি. কুফাবাসীর নিকট যে চিঠি প্রেরণ করেন- তা আমি পাঠ করেছি। তাতে লেখা ছিলো-
হামদ ও সালাতের পর, আমি তোমাদের নিকট আম্মার রাযি. কে শাসক ও আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি.কে শিক্ষক ও আম্মারের সহকারী হিসেবে প্রেরণ করলাম। তাঁরা উভয়ই আল্লাহর রাসূলের সাহাবীগণের মধ্যে আলিম ও সম্মানিত বলে পরিচিত। সুতরাং তোমরা তাঁদের অনুসরণ ও আনুগত্য করো। আমি তোমাদের জন্য আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি.কে আমার উপর প্রাধান্য দিলাম। (আল-মাজমা‘ঃ ৯/২৯১)

৪. ইবনে সা’আদ আবুল আসওয়াদ দুওয়ালীর সূত্রে বর্ণনা করেন- যেখানে তাঁর বসরায় আগমন এবং তথায় ওমর রাযি. কর্তৃক ইমরান ইবনুল হুসাইন আবুন নাজীদকে বসরাবাসীদের ইলম শিক্ষার জন্য প্রেরণের কথা আলোচনা করা হয়েছে।
(তাবারানীঃ হায়সামীর মতে এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য (খন্ড-৯, পৃ-২৮১, ইবনে হাজার রহ.ও একে “ইসাবাহ” নামক গ্রন্থে সহীহ বলেছেন)

৫. ইবনে সা’আদ ও আবু আব্দুল্লাহ হাকেম মুহাম্মাদ বিন কাব আল-কুরাযী-এর সূত্রে বর্ণনা করেন-
নবীজির যামানায় পাঁচ ব্যক্তি কুরআন সংকলনের কাজ করেছেন। তার হলেন- সাহাবী মা’আয বিন জাবাল, উবাদাহ ইবনে সামিত, উবাই ইবনে কা’আব, আবু আইয়ুব, আবু দারদা রাযি.।
খলীফা ওমর রাযি.-এর খেলাফতকালে ইয়াযীদ ইবনে আবু সুফিয়ান রাযি.ওমর রাযি.-এর নিকট এ মর্মে চিঠি প্রেরণ করেন যে, সিরিয়ায় জনসংখ্যা অনেক বেশি। তাদের দ্বীন ও কুরআন শিক্ষার জন্য মদীনা মুনাওয়ারা থেকে কয়েকজন মু’আল্লিম প্রেরণ করা হোক। তখন ওমর রাযি. উপরোক্ত নবীজির বিশিষ্ট পাঁচজন সাহাবীকে বললেন-
সিরিয়াবাসীগণ তিনজন শিক্ষক চেয়েছেন। তো তোমরা যদি সম্মতি দাও, তবে তোমাদের মধ্যে থেকে তিনজনকে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত করা হবে। যেহেতু সাহাবী আবু আইয়ুব রাযি. খুব বৃদ্ধ ছিলেন, উবাই ইবনে কা’আব রাযি.ও অসুস্থ ছিলেন। তাই অবশিষ্ট তিনজনই যাওয়ার জন্য সম্মতি জ্ঞাপন করলেন। যাত্রার প্রক্কালে সাহাবী ওমর রাযি. তাঁদেরকে এই দিক নির্দেশনা দিলেন যে, তারা যেনো তাঁদের শিক্ষাদান কর্মসূচি একত্রে সিরিয়ার হিমস নগরী থেকে শুরু করে।
কেননা সেখানকার লোক খুব মেধাবী ও চৌকস। যখন সেখানে কিছু যোগ্য লোক তৈরি হয়ে যাবে, তখন তোমাদের একজন তাদের কিছু লোক সাথে নিয়ে দামেষ্ক ও অন্যজন ফিলিস্তীন চলে যাবে।
এরপর কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর উবাদাহ ইবনে সামিত রাযি. হিমস নগরীতে থেকে গেলেন আর আবু দারদা রাযি. দামেস্ক ও মা’আয রাযি. ফিলিসতীন চলে গেলেন।
(ইমাম বুখারী-আত-তারীখুস সগীরঃ ১/২৮১; কাসীরের বর্ণনায় এভাবেই আছেঃ ১/২৮১)

৬. আল্লামা ওয়াকিদী এবং ইবনে ইসহাক রহ. নবীজির সাহাবাগণের যথাক্রমে ৭ দিন ও ৩ দিনের সফরের কথা উল্লেখ করেছেন।

৭. ‘তাবারী/আখবারূর রাসূল ওয়াল মুলূক’ গ্রন্থকার ইমাম আবু জাফর রহ. ৬০ দিনের জামাতের সফরের কথা পরিস্কারভাবে উল্লেখ করেছেন।

৮. ‘তারীখে ইবনে ইসহাক’ নামক ইতিহাস গ্রন্থেও তা উদ্ধৃত হয়েছে। এ জামাত ৩য় হিজরীর জুমাদাল ঊলা মুতাবিক ৬২৪ খৃষ্টাব্দের অক্টোবর/নভেম্বর মাসে রওয়ানা হয়। এ জামাতের আমীর স্বয়ং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন। রোখ (গন্তব্য) ছিলো আলফুর থেকে বাহরাইন পর্যন্ত এ বিস্তীর্ণ এলাকা। এ জামাতে অংশগ্রহণকারীগণ তাবলীগের কাজ করতে করতে এগিয়ে যেতেন। ঠিক যেনো এ যুগের সালের বা পায়দল জামাতের মতোই।
উল্লেখ্য, ৬০ দিনের সফরের ব্যপারে সকল ঐতিহাসিকই সমমত ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু মতভেদ হলো স্বয়ং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপস্থিতি নিয়ে। কেউ বলেন- ৬০ দিন; আবার কেউ বলেন- ১০দিন।
যথা- প্রখ্যাত ঐতিহাসিক তাবারী এবং ইবনে ইসহাকের মতে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উক্ত জামাতে ৬০ দিন ছিলেন। আর বালজুরী, ওয়াকেদী ও ইবনে সা’আদের মতে তিনি এ সফরে ১০দিন ছিলেন। উভয় পক্ষেই সহীহ হাদীসের পর্যাপ্ত দলীল রয়েছে।
মোটকথা, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে জামাত নিয়ে ৬০ দিনের সফরে বের হয়েছিলেন- এ বিষয়ে সকল ইতিহাসবিদ একমত পোষণ করেছেন।

৯. ‘তাবাকাত’ গ্রন্থের ১ম খণ্ডের ৩৩৩-৩৩৪ পৃষ্ঠায় আছে-
আমর বিন মুররাহ রাযি. ৬ষ্ঠ হিজরী মুতাবিক ৬২৭ খৃষ্টাব্দে মদীনা মুনাওয়ারার পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল জুহায়না এলাকায় তাবলীগ করে ২১ জনের অধিক ব্যক্তিকে তাশকীল করে মদীনায় নিয়ে এসেছেন।

১০. তাবারী কিতাবের ৩য় খণ্ডের ৩৪ পৃষ্ঠায় আছে-
সাহাবী আবু কাতাদাহ রাযি. ৮ম হিজরীর শাবান মাস মুতাবিক ৬২৯ খৃষ্টাব্দের ডিসেম্বরে ১৫ জনের এক জামাত নিয়ে খাজিরাহ আলগাবাহ নামক এলাকায় তাবলীগ করে গাতফান বংশের অধিকাংশ জনগণের এক বিরাট জামাত তাশকীল করে মদীনায় নিয়ে আসেন।

১১. এই বিষয়েই আরো উল্লেখ করা হয়েছে- ‘সীরাতে ইবনে হিশাম’ গ্রন্থের ২য় খণ্ডের ৬২৯ পৃষ্ঠায় এবং ‘তাবাকাত’ গ্রন্থের ১৩২ পৃষ্ঠায়।

১২. একই কিতাবেরই ৩য় খণ্ডের ১২৬-১২৮ পৃষ্ঠায় আরো বর্ণিত আছে-
সাহাবী মহাবীর খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযি. ১০ম হিজরীর রবীউল আউয়াল মাস মুতাবিক ৬৩১ খৃষ্টাব্দের জুন মাসে ৪০০ জনের বিরাট জামাতসহ নাজরান এলাকায় তাবলীগ করে বনু আমাদান-বনু হারিস বংশের বহু মানুষকে নগদ তাশকীল করে নিয়ে আসেন। এ সফরের সময়কাল ছিলো ৬ মাসব্যাপী।

১৩. ‘তারীখে তাবারী’ গ্রন্থেও একথা লিখা আছে যে, এ জামাত যুদ্ধের জন্য প্রেরিত হয়নি; বরং শুধুমাত্র তাবলীগের জন্যই প্রেরিত হয়েছিলো।

১৪. ‘তারীখে তাবারী’ গ্রন্থেই আরো লিখা আছে-
সাহাবী কা’ব রাযি. ৮ম হিজরীর রবীউল আউয়াল মুতাবিক ৬২৯ খৃষ্টাব্দের জুলাই মাসে ১৫ জনের জামাত নিয়ে যাতুল আতলাহ নামক স্থানে তাবলীগ করে কুযাযাহ গোত্র থেকে প্রায় দুটি দলের লোকদেরকে তাশকীল করেন।

১৫. সাহাবী আলী রাযি. ইয়ামানে ৮ জনের জামাত নিয়ে ১০ম হিজরী মুতাবিক ৬৩১ খৃষ্টাব্দের ডিসেম্বরে ৪ মাসের জন্য প্রেরিত হন।

১৬. আরো বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন- ‘তারীখে তাবারী’ গ্রন্থের ৩য় খণ্ডের ১৩১-১৩২ পৃষ্ঠায় এবং সহীহুল বুখারীর ৬২৩ নং পৃষ্ঠায়।

১৭. এছাড়া ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা সাহাবী ওমর রাযি. নিজ শাসনামলে মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষার জন্য ও সাধারণ মুসলমানদেরকে মূর্খতা থেকে বের করে আল্লাহ তা’আলার পরিচয় শিক্ষা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন সাহাবায়ে কেরামকে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরণ করেছিলেন।
নবীজির সাহাবীগণকে জামাত ও দলভিত্তিক বিভিন্ন সারিয়ায় (যুদ্ধে) পাঠানোর এই ধরণের অনেক ঘটনা ‘হায়াতুস সাহাবাহ’ কিতাবে উল্লেখ আছে। এই বিষয় স্পষ্ট যে, এসব জামাত প্রেরণের উদ্দেশ্য একমাত্র মুসলমানদের হিদায়াতের পথ দেখানোর জন্যই ছিলো।

সুতরাং এই দাবি করা যে, রাসূল ও সাহাবাদের যুগে এই নিয়মের তাবলীগী কার্যক্রমের নমুনা নেই, তা মূলত ইতিহাস ও সীরাত সম্পর্কে অজ্ঞতা ও ভালোভাবে কিতাব অধ্যয়ন না করারই বহিঃপ্রকাশ।
এমনকি বহু ধরণের ঘটনা এমনও পাওয়া যায় যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যামানায় সাহাবীগণের জামাত মুসলমানদের নিকট আত্মশুদ্ধি ও দ্বীন প্রচারের জন্য প্রেরণ করা হতো এবং মুসলমানগণও জামাতভিত্তিক নবীজির দরবারে দ্বীন শিখার জন্য আগমন করতেন।
যথা এই প্রসঙ্গে আব্দুল কাইস গোত্রের প্রতিনিধিদলের একটি ঘটনা খুবই প্রসিদ্ধ। ইমাম বুখারীসহ অন্যান্য মুহাদ্দীসিনে কেরাম তা বর্ণনা করেছেন।
এই প্রতিনিধি দল নবীজির নিকট আগমন করে আবেদন করলো- হে আল্লাহর রাসূল! মুযার গোত্রের লোকেরা আপনার মদীনা ও আমাদের এলাকার মাঝে প্রতিবন্ধক। আমরা আশহুরে হুরম (সম্মানিত চার মাস) ব্যতিত আপনার নিকট আসতে পারি না।
তাই আমাদেরকে ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলো বলে দেন। যাতে সে অনুযায়ী আমল করে আমরা জান্নাতবাসী হতে পারি এবং বাড়িতে ফিরে আমাদের গোত্রের সকলকে জানাতে পারি। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদেরকে চারটি বিষয়ের নির্দেশ দিলেন এবং চারটি বিষয় থেকে নিষেধ করলেন। (আল-বিদায়াহ- ইবনে কাসীর; হায়াতুস সাহাবাহঃ ১/১৬১)

এই গোত্রেরই অন্য এক ঘটনা- যা হাকেম রহ. আলকামা ইবনুল হারিস এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন- আমি আমার গোত্রের সাতজন ব্যক্তিসহ নবীজির দরবারে উপস্থিত হলাম। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন-
তোমরা কারা? আমরা উত্তরে বললাম আমরা মু‘মিন! তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার ইরশাদ করলেন- প্রত্যেক কথার বাস্তবতা থাকে। তোমাদের ঈমানের বাস্তবতা (হাকীকত) কী?
উত্তরে তারা বললেন- ১৫টি বিষয়। যার পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে আপনি আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন। আর পাঁচটি বিষয় আপনার সংবাদ বাহকগণ জানিয়েছেন। (এই ঘটনা দীর্ঘ হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে) তো এই হাদীসের শেষ অংশে একটা বিষয়ের প্রতি মনোযোগী করা এখানে উদ্দেশ্য।
তা হলো- নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সংবাদ বাহকগণ বিভিন্ন গোত্রের কাছে গিয়ে নবীজির বাণী ও নির্দেশনা পৌঁছিয়ে দিয়ে আসতো। (হায়াতুস সাহাবাহঃ ১/১৬২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.