পহেলা বৈশাখ উদযাপনঃ বাঙ্গালী পরিচয় ও সংস্কৃতির প্রতি উপহাস!- আব্দুল্লাহ আল মাসুম

0
416
Bangla new year 1
Bangla new year 1

মূলত পহেলা বৈশাখের মাধ্যমে বাংলা সনের নতুন বর্ষ শুরু হলেও বিভিন্ন উৎসবের ভিড়ে এর আবহ চাপা পড়ে যায়। প্রথমত নতুন বর্ষকে বরণ করে নেওয়ার প্রবণতা থাকলেও এখন তা উৎসব আনন্দের আঙ্গিকে ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে। উৎসবের আধিক্যে এক পর্যায়ে তা নানা ধরণের অপরাধ কান্ড ও অনৈতিকতার ছোবলে পর্যবসিত হয়। ঐতিহ্যগত সূত্রেই বাঙালি সমাজ উৎসবপ্রিয় বলে সর্বমহলে পরিচিত বিধায় এই দিনে উৎসবের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ার কারণ বলে মনে করা হয়।

পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন

ফলে বিশেষ করে এ জাতির নতুন প্রজন্মের কাছে পহেলা বৈশাখের উৎপত্তি কিংবা এর প্রেক্ষাপট অজ্ঞাতই থেকে গেছে। অথচ এই বাংলা সনের হিসাব পৃথিবীর প্রচলিত অন্যান্য বর্ষভিত্তিক সনের হিসাবের চেয়ে আলাদা কোনো গুরুত্ব রাখে না। পৃথিবীতে দিন ও সময়ের হিসাবের জন্য বর্ষভিত্তিক কয়েকটি সনের হিসাব প্রচলিত রয়েছে। তবে এর মধ্যে সর্বাধিক প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ হচ্ছে ঈসায়ী সন ও হিজরী সন। তবে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সভ্যতার তারতম্যের কারণে বিভিন্ন দেশে বা অঞ্চলে তাদের নিজস্ব বর্ষ গণনার পদ্ধতি চালু রয়েছে। যথা- পারস্য, চীন, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া ইত্যাদি দূর প্রাচ্যের দেশগুলোতে নিজস্ব বর্ষ গণনা রয়েছে।

Pohela Boishakh
Pohela Boishakh

ঈসায়ী সনের গণনা হয় সূর্যকে কেন্দ্র করে। ঈসায়ী বর্ষকে সৌরবর্ষও বলা হয়। পুরো পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক সময় এই সৌরবর্ষ কেন্দ্রিক হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক আদান-প্রদানের জন্য বিশ্বের সবাইকে সৌরবর্ষের হিসাব অনুসরণ করতে হয়। সৌরবর্ষের গণনার এই হিসাব ইংরেজী ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত। আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য, রাষ্ট্র-সরকার-প্রশাসন পরিচালিত হয় ইংরেজী ক্যালেন্ডারের ভিত্তিতে।
অপরদিকে হিজরী সনের গণনা হয় চাঁদের হিসাব অনুযায়ী। আর হিজরী সনের সম্পর্ক চাঁদকেন্দ্রিক আরবী মাসগুলোর সাথে হওয়ার কারণে একে চন্দ্রবর্ষও বলে নামকরণ করা হয়। ইসলামের অনেক ঐতিহাসিক ঘটনাবলী, বিধি-বিধান ও ইবাদাতের সম্পর্ক চাঁদের সাথে। চাঁদের হিসাব ছাড়া যেগুলো কখনোই নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

বাংলা সনের উৎপত্তি

বিখ্যাত ‘আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়- মুঘল বাদশাহ আকবর সর্বপ্রথম বাংলা সনের উদ্ভাবন করেন। আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগে ভারত উপমহাদেশে মুঘল বাদশাহ আকবরের রাজত্ব ছিলো। তখন এ অঞ্চলে হিজরী সনই ছিলো দিন গণনা এবং দাফতরিক কাজকর্মের একমাত্র মাধ্যম। তৎকালীন যুগে বাংলার এ অঞ্চল ছিলো কৃষিনির্ভর। তখন জমিতে ফসল উৎপাদনের সময়ের উপর ভিত্তি করে জমির খাজনা আদায় করা হতো। এক্ষেত্রে হিজরী সনের হিসাব করা হতো; কিন্তু হিজরী সন চন্দ্রমাসভিত্তিক হওয়ায় তা কোনো ফসলি মৌসুম মেনে চলতো না। এ সনের মাসগুলো কোনো নির্দিষ্ট ঋতুতে স্থির থাকে না। ফলে রাজস্ব বা খাজনা আদায়ের হিসাব-নিকাশ সংরক্ষণে সরকারের দারুণ অসুবিধার সৃষ্টি হতো।
বাদশাহ আকবরের শাসনামলের ২৯ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর এ সমস্যা সমাধানের পন্থা নিয়ে কথা ওঠে। এর সমাধান বের করতে বাদশাহ আকবর রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে একটি নতুন সৌর সন উদ্ভাবনের জন্য রাজ দরবারের একজন বিজ্ঞ পন্ডিত ইরান থেকে আগত বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমীর ফতেহ উল্লাহ সিরাজীকে দায়িত্ব দেন।

Yearly holyday
Yearly holydays

জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমীর ফতেহ উল্লাহ সিরাজীর নেতৃত্বে তিনি ভারতের বিভিন্ন এলাকার সনকে চন্দ্র ও সৌর বৈশিষ্টে সমন্বিত করেন। এরপর ফতেহ উল্লাহ সিরাজী বাদশাহ আকবরের নির্দেশ অনুযায়ী পারস্যে প্রচলিত বর্ষপঞ্জির অনুকরণে সৌরমাসভিত্তিক ফসলি সন প্রণয়ন করেন। ৯৯২ হিজরী মুতাবেক ১৫৮৪ সনে নতুন সৌর বর্ষপঞ্জি প্রচলন করেন। নতুন এই সৌর সনই বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত।
তিনি পরীক্ষা করে হিজরী সনের বর্ষকে বজায় রেখে বর্ষ গণনা ৩৫৪ দিনের স্থলে ৩৬৬ দিনে এনে একটি নতুন সন উদ্ভাবন করেন। এখানে ১, ২, ৩ এভাবে হিসাব না করে মূল হিজরী সনের চলতি বছর থেকেই বাংলা সনের গণনা শুরু হয়। তবে বাদশাহ আকবর ওই সময় থেকে ২৯ বছর আগে তার সিংহাসনে আরোহনের বছর থেকে উদ্ভাবিত নতুন সৌর বর্ষপঞ্জিকার হিসাব শুরু করার নির্দেশ দেন। এজন্য হিজরী ৯৬৩ সন থেকে বাংলা সনের গণনা শুরু হয়। হিজরী সনের প্রথম মাস হলো মুহাররম। আর বাংলা সনে বৈশাখ মাসকে প্রথম মাস হিসাব করা হয় এবং পহেলা বৈশাখকে নববর্ষ ধরা হয়।

বাংলা সনের সঙ্গে হিজরী সনের নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। ৯৬৩ হিজরীতে শুরু হয়ে ৯৬৩ বছর ধরে গণনা শুরু অর্থাৎ জন্ম থেকেই বাংলা সনের বয়স ৯৬৩ বছর। তাই হিজরী সনকে বাংলা সনের ভিত্তি বলা চলে। যেহেতু চন্দ্রবর্ষ ও সৌরবর্ষের মধ্যে ১১ দিনের পার্থক্য রয়েছে- এজন্য এ দুটির মধ্যে পরবর্তী সময়ে হিজরী সন এবং বাংলা সনের মাঝে সমতা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। কারণ হিজরী সন ছিলো চন্দ্রমাসভিত্তিক আর বাংলা বা ফসলি সনকে সৌরমাসভিত্তিক করে আবিস্কার করা হয়েছিলো।
২৯ দিন ১২ ঘন্টা ৪০ মিনিটে এক চান্দ্রমাস হয়। এ হিসেবে এক চন্দ্রবর্ষ হবে ৩৫৪ দিন ৯ ঘন্টায়। আর সৌরবর্ষ হবে ৩৬৫ দিন ৫ ঘন্টা ৪৮ মিনিটে। প্রত্যেক সৌরবর্ষ এক চন্দ্রবর্ষ থেকে ১১ দিন বেশি। ফলে প্রতি সাড়ে ৩২ বছর পর এক চন্দ্রবর্ষ বৃদ্ধি পায়। এ পর্যন্ত হিজরী সন (চন্দ্রবর্ষ) বাংলা বা ফসলি সন (সৌরবর্ষ) অপেক্ষা ১৩ বছর বৃদ্ধি পেয়েছে। এভাবে সমতা-অসমতা মাঝে দীর্ঘদিন অতিবাহিত হচ্ছিলো। অনেক সমস্যার তরী বেয়ে চলে আসা বাংলা সনের সংস্কারে কিছু করা হয়নি।
অনেক পরে এসে ১৯৬৩ সনে বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে ড. মুহা. শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে বাংলা সন সংস্কার কার্যক্রমে একটি কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত গবেষণা কমিটি ১৯৬৬ সনের ১৭ ফেব্র“য়ারী চুড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করে এবং অবশেষে বর্তমানে প্রচলিত বাংলা সন ১৯৮৮ সন থেকে কার্যকর হয়।

পহেলা বৈশাখের আলাদা কোনো গুরুত্ব নেই

বাংলা নতুন সনের সূচনালগ্নে বর্ষের হিসাব থেকে সরে গিয়ে আজগুবি এসব কর্মকান্ড কিংবা উৎসবের আমেজে ডুবে থাকার কোনো অর্থ হয় না। নিজ দেশ কিংবা জাতি অথবা দেশীয় সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যেরও এতে কোনো কল্যাণ সাধিত হয় না। যে দেশে এখনো পথচারীর চলার পাশে ফুটপাথে অসহায় দুঃখিনী মা তার কলজেছেড়া সন্তানকে পুরাতন বস্তা গায়ে জড়িয়ে ধরে রাত যাপন করেন, সেখানে হাজার হাজার টাকা অপচয় করে বিলাসে মেতে উঠা বিকৃত মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।

Bangla Year
Bangla Year

শুধু এই দিনে খাঁটি বাঙালি সেজে বছরের অন্যান্য দিনে ভিন্ন সংস্কৃতিতে দিনাতিপাত করা সভ্য স্বাধীন জাতির পরিচয় হতে পারে না। এর মাধ্যমে নিজেদের পরিচয়ের প্রতিই যেনো উপহাস করা হচ্ছে। এটা স্বাভাবিক সুস্থ মস্তিষ্কে চিন্তা করলেই সহজে বুঝে আসে। সর্বোপরি উৎসবের নামে এই দিনে মঙ্গল শোভাযাত্রা, ছায়ানটের বৈশাখীবরণ, লাল-সাদা পোশাকের মহত্ত্ব, উল্কি আঁকাসহ অনৈসলামিক কোনো ধারার সাথে একাকার হয়ে যাওয়া অথবা ইসলামের শিক্ষা ও সভ্যতার বরখেলাফ কর্মকান্ডে মেতে উঠা ঈমানের জন্য কতটা ভয়ংকর, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.