ফিকহে হানাফির ঐতিহাসিক প্রমাণ

0
473
hanafi Qazi
hanafi Qazi

মুসলিম বিশ্বে রাষ্ট্রীয় আইন হিসেবে গৃহীত

ফিকহে হানাফী ছিলো তৎকালীন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজশক্তিগুলোর রাষ্ট্রীয় আইন। বিভিন্ন সালতানাতের সময় ইরাকের কুফা ও বাগদাদ থেকে শুরু করে পূর্ব দিকে কাশগর ও ফারাগানা পর্যন্ত, উত্তরে সিরিয়ার হালাব, তুরস্কের মালাতইয়া ও এশিয়া মাইনর পর্যন্ত এবং পশ্চিমে মিশর ও আফ্রিকার কাইরাওয়ান পর্যন্ত ফিকহে হানাফী অনুসারে বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।

তাই মুসলিম জাহানের এই বিস্তৃত অঞ্চলে কুরআন-সুন্নাহর আইন বাস্তবায়ন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ফিকহে হানাফীর অবদান অনস্বীকার্য।

হিজরী দ্বিতীয় শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কুরআন-সুন্নাহর জগদ্বিখ্যাত মনীষীদের অবিরাম প্রচেষ্টায় যখন ফিকহে হানাফী সংকলিত হলো- তখন থেকেই মুসলিম জাহানের বিস্তৃত ভূখণ্ডে তা বিপুলভাবে সমাদৃত হয়। হাদীস ও ফিকহের ইমামগণের মাধ্যমে বিখ্যাত শহরগুলোতে ফিকহে হানাফীর বহু কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

ফলে ইরাকের কুফা নগরীতে সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি., সাহাবী আলী রাযি. এবং অন্যান্য ফকীহ সাহাবীদের মাধ্যমে ইসলামী ফিকাহর যে ভিত্তি গড়ে উঠেছিলো- তা ইরাকের সীমানা অতিক্রম করে গোটা মুসলিম জাহানে ছড়িয়ে পড়ে। তখন ছিলো আব্বাসীয়দের শাসন। খেলাফতে রাশেদার পর কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যদিও ‘খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওয়াহ’ থেকে বিচ্যুত হয়েছিলো, কিন্তু আইন ও বিচারের ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর শাসনই কায়েম ছিলো।

আব্বাসী শাসন ছাড়াও সাম’আনী, বনু বুওয়াইহ, সালজুকী, আফগানিস্তানের গযনী ও মিসরের বীর সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর শাসনামলেও এ ধারা অব্যহত ছিলো। রাজ্যশাসন মুসলিম শাসকদের দ্বারা পরিচালিত হলেও বিচার বিভাগ ছিলো ফিকহে ইসলামীর অধীন। এটি ইসলামী ইতিহাসের এক উজ্জল অধ্যায়।

হিজরী দ্বিতীয় শতকের শেষার্ধে ইমাম আবু হানীফা রহ.-এর বিখ্যাত সঙ্গীগণ কাযা ও বিচারের মসনদ অলংকৃত করেন। যথা-

ইরাক ও এর পাশ্ববর্তী অঞ্চল

–  ইমাম আবু ইউসুফ রহ. (১৮৩হি.) ছিলেন সারা মুসলিম জাহানের প্রধান বিচারপতি।

–  খলীফা হারুনুর রশীদের সময় ইসলামী খেলাফতের রাজধানী বর্তমান সিরিয়ার রিকা শহরে স্থানান্তরিত হলে ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান রহ. (১৮৯হি.) সে শহরে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন।

–  ইমাম যুফার ইবনে হুযাইল (১৮৫হি.) ইরাকের বসরা নগরীতে-

–  ইমাম কাসিম বিন মাঅন (১৭৫হি.) কুফা নগরীতে-

–  ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া ইবনে আবী যাইদাহ (১৮৪হি.) বর্তমান ইরাকের মাদায়েন নগরীতে-

–  ইমাম আবু মুহাম্মদ নূহ ইবনে দারাজ (১৮২হি.) ইরাকের কুফা নগরীতে-

–  ইমাম হাসান ইবনে গিয়াস (১৯৪হি.) কুফায় তেরো বছর এবং বাগদাদ নগরীতে দুই বছর-

–  আফিয়া ইবনে ইয়াযীদ আওদী (১৮০হি.) বাগদাদ নগরীতে-

–  হুসাইন ইবনে হাসান আওফী (২০১হি.) পূর্ব বাগদাদে-

–  আলী ইবনে যাবইয়ান আবসী (১৯২হি.) ও ইউসুফ ইবনে ইমাম আবু ইউসুফ (১৯২ হি.) বাগদাদে-

–  মুহাম্মদ ইবনে মুকাতিল রাযী (২২৬হি.) ও নাসর ইবনে বুজাইর যুহলী ইরানের রায় শহরে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন।

এছাড়াও ইমাম ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ ইবনে আবু হানীফা (২১২ হি.)

–  ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সামআ (২৩৩ হি.)

–  ইমাম ঈসা ইবনে আবান (২২১ হি.)

–  আব্দুর রহমান ইবনে ইসহাক (২২৮ হি.)

–  বিশর ইবনুল ওয়ালীদ কিনদী (২৩৮ হি.)

–  হাইয়ান ইবনে বিশর (২৩৮ হি.)

–  হাসান ইবনে উছমান যিয়াদী (২৪৩ হি.)

–  উমর ইবনে হাবীব (২৬০ হি.)

–  ইবরাহীম ইবনে ইসহাক (২৭৭ হি.)

–  বুহলূল ইবনে ইসহাক (২৯৮ হি.)

–  আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আল বিরতী (২৮০ হি.)

–  কাযী আবু খাযিম আঃ হামীদ (২৯২ হি.)

–  কাযী আহমদ ইবনে ইসহাক ইবনে বুুুুহলূল (৩১০ হি.)

–  আহমদ ইবনে মুহাম্মদ নাইসাবূরী (৩৫১ হি.)

–  হুসাইন ইবনে আলী সাইমারী (৪৩৬ হি.)

প্রমুখ ফিকাহ ও হাদীসের বিখ্যাত ইমাম ও তাদের শিষ্যদের উপর এ অঞ্চলের কাযা বা বিচার কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত ছিলো। বাগদাদ, বসরা, কুফা, আম্বার, হীত, মুসেল, ওয়াসিত, মাম্বিজ, ইরাক, রায়, ইরান প্রভৃতি বিখ্যাত শহরে তারা ফিকহে হানাফী অনুসারে কাযা পরিচালনা করেছেন।

মুসলিম জাহানের এই কেন্দ্রীয় শহরগুলোতে এত অধিক সংখ্যক ফকীহ ও বিচারপতি বিদ্যমান ছিলেন- যা অনুমান করা কঠিন। হাফিয আব্দুল কাদের আল-কুরাশী তাঁর “আল- জাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহ” নামক গ্রন্থে সায়েদ ইবনে মুহাম্মদের জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে তার রচিত গ্রন্থ “আল ইতিক্বাদ”-এর মধ্যে আব্দুল মালিক ইবনে আবিশ শাওয়ারিবের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেন-

أنه أشار إلى قصرهم العتيق بالبصرة, وقال: قد خرج من هذه الدار سبعون قاضيا على مذهب أبى حنيفة-

আব্দুল মালিক ইবনে আবিশ শাওয়ারিব বসরা শহরের একটি প্রাচীন ভবনের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন- এই গৃহ থেকে সত্তরজন বিচারক বের হয়েছেন- যারা প্রত্যেকে ফিকহে হানাফী অনুসারে বিচারের ফয়সালা করতেন।    (আল জাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহঃ খন্ড-২, পৃঃ ২৬৭)

খুরাসান ও মা-ওয়ারাউন্নাহার (সাবেক সোভিয়েত অঞ্চল)

সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ রহ. একবার একটি উক্তি করেছিলেন। তিনি বলেন-

شيئان ما ظننت أنهما يجاوزان قنطرة الكوفة, وقد بلغ الآفاق: قرائة حمزة و رأى أبى حنيفة-

আমার ধারণা ছিলো যে, ইরাকের দুটি বিষয়- আবু হানীফার ফিকাহ ও হামযার কিরাত কুফার পুল অতিক্রম করবে না। অথচ তা পৃথিবীর প্রান্তসমূহে পৌঁছে গিয়েছে।      (তারীখে বাগদাদঃ খন্ড-১, পৃঃ ৩৪৮)

তাঁর এই বক্তব্যের বাস্তবতা এভাবে বুঝা যায় যে, হিজরী দ্বিতীয় শতক অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই খুরাসান ও মা-ওয়ারাউন্নাহারের বিভিন্ন অঞ্চলে ফিক্বহে হানাফী অনুযায়ী কাযা ও বিচার পরিচালিত হতে থাকে। যথা-

–  ইমাম আবু হানীফা রহ.-এর শিষ্যদের মধ্যে-

–  হাফস ইবনে আব্দুর রহমান নাইসাবুরী (১৯৯ হি.) বর্তমান ইরানের নিশাপুরে-

–  নূহ ইবনে আবী মারইয়াম মারওয়াযী (১৭৩ হি.) বর্তমান তুর্কমেনিস্তানের মার্ভে-

–  ইমাম উমার ইবনে মায়মূন বলখী (১৭১ হি.) প্রায় ২০ বছরেরও অধিক বর্তমান আফগানিস্তানের বলখে-

–  ইমাম আবু মুতী’ হাকাম ইবনে আব্দুল্লাহ বলখী (১৯৭ হি.) ৮৪ বছর বয়সে বলখে-

প্রায় ১৬ বছর কাযার দায়িত্ব পালন করেন। খুরাসান ও মা-ওয়ারাউন্নাহার হলো এমন এক ভূখণ্ড- যা ইরাক ও হারামাইনের মতো এক সময় ফিকাহ ও হাদীসের অন্যতম কেন্দ্র ছিলো। অনেক বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ এখানে জন্মগ্রহণ করেছেন।

আল্লামা তাজুদ্দীন সুবকী বলেন-

وخراسان عمدتها مدائن أربعة, كأنما هى قوائمها المبنية عليها, وهى: مرو و نيسابور وبلخ وهراة- هذه مدنها العظام, ولا ملام عليك لو قلت: بل هى مدن الإسلام, إذ هى كانت ديار العلم على اختلاف فنونه والملك الوزارة على عظمتها إذ ذاك-

খুরাসানের কেন্দ্রীয় শহর চারটিঃ মার্ভ, নিশাপুর, বলখ ও হেরাত। এগুলো খুরাসানের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহর। এমনকি গোটা মুসলিম জাহানের কেন্দ্রীয় শহর বললেও অত্যুক্তি হবে না। কেননা এগুলো ছিলো উলূম ও ফুনূনের মারকায। আর বিখ্যাত মুসলিম শাসকদের রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র।        (তাবাকাতুশ শাফেইয়্যাতিল কুবরা ঃ খন্ড- ১, পৃঃ ৩২৫)

হিজরী তৃতীয় শতকে ফিক্বহে হানাফীর যেসব মনীষী এ অঞ্চলে কাযা পরিচালনা করেছেন, তারা হলেন-

–  নসর ইবনে যিয়াদ

–  হাইয়ান ইবনে বিশর (২৩৮ হি.)

–  হাসসান ইবনে বিশর (২৪৪ হি.)

–  সাহল ইবনে আম্মার নাইসাবূরী (২৬৭ হি.) প্রথমে ইরানের তূসে, পরে আফগানিস্তানের হেরাতে-

–  মুহাম্মদ ইবনে আহমদ মূসা বুখারী (২৮৯ হি.) বর্তমান উজবেকিস্তানের বুখারা নগরীতে-

–  মুহাম্মদ ইবনে আসলাম আযাদী (২৬৮ হি.) বর্তমান উজবেকিস্তানের সমরকন্দে-

–  ইবরাহীম ইবনে মাকিল (২৯৫ হি.) নাসাফ শহরে-

চতুর্থ হিজরী শতকের মনীষীদের মধ্যে হলেন-

–  আহমদ ইবনে সাহল (৩৪০ হি.)

–  ইসহাক ইবনে মুহাম্মদ ও

–  আবুল কাসিম (৩৪২ হি.) সমরকন্দে-

–  আতা ইবনে আহমদ আরবিনজানী (৩৬০ হি.) সমরকন্দের অন্তর্গত আরবিনজান শহরে-

–  তাহির ইবনে মুহাম্মদ বাকরাবাযী (৩৬৯ হি.) তুর্কমেনিস্তানের মার্ভ, আফগানিস্তানের হেরাত প্রদেশ, বলখ, উজবেকিস্তানের সমরকন্দ ও শাশ নগরীতে এবং ফারগানায়

–  আব্দুর রহমান ফুযযী (৩৭৪ হি.) উজবেকিস্তানের তিরমিয শহরে-

–  আহমদ ইবনুল হুসাইন মারওয়াযী (৩৭৭ হি.) খুরাসানে-

–  উবাইদুল্লাহ আন-নাযরী (৩৮৮ হি.) নাসাফ শহরে-

–  উতবা ইবনে খাইসামা নাইসাবুরী (৪০৬ হি.) খুরাসানে ৩৯২ হি. থেকে ৪০৫ হি. পর্যন্ত কাযা পরিচালনা করেন।

শেষোক্ত জন ছিলেন খুরাসানের বিখ্যাত ফক্বীহ। খুরাসানে হানাফী মাযহাবের কোনো কাযী এমন ছিলেন না- যিনি কোনো না কোনো সূত্রে তাঁর শিষ্য নন।  (আল জাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহ ঃ খন্ড- ২, পৃঃ ৫১১)

সিরিয়া ও তুরস্ক (ইউরোপের দ্বার)

হিজরী তৃতীয় শতক ও তার পরে সিরিয়ার রাজধানী দামেশক, হালব, হামাত ও অন্যান্য শহরে এমনকি সুদূর তুরস্কের মালাতইয়াতেও ফিকহে হানাফীর বিচারপতি বিদ্যমান ছিলেন। তাদের মধ্যে-

–  আবু খাযিম আ. হামীদ (২৯২ হি.),

–  ইমাম তহাবী রহ.-এর শায়খ আবু জাফর আহমদ ইবনে ইসহাক।

–  আবুল হাসান ইবনে ইয়াহইয়া উক্বাইলী।

–  আবুল হাসান ইবনে হিবাতুল্লাহ (৬১৩ হি.) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দামেশক, হালব ও এর পাশ্ববর্তী অঞ্চলে এরা কাযার দায়িত্বে ছিলেন।

–  আব্দুল্লাহ ইবনে ইবরাহীম ও আহমদ ইবনে আ. মজীদ তুরস্কের মালাতইয়ার বিচারপতি ছিলেন।

–  আহমদ ইবনে আ. মাজীদের পিতা আব্দুল মাজীদ হারাভী (৫৩৭ হি.) ইটালীর রোমের বিচারপতি ছিলেন।

হিজরী সপ্তম শতকে দামেশকের শাসক ছিলেন ঈসা ইবনে আবু বকর (৬২৪ হি.)। তিনি এবং তাঁর বংশধর ছিলেন ফিকহে হানাফীর অনুসারী। এ শতকে ফিকহে হানাফী অনুসারে বিচার পরিচালনাকারী কয়েকজন হলেন-

–  ইসমাঈল ইবনে ইবরাহীম শাইবানী (৬২৯ হি.) দামেশকে-

–  খলীল ইবনে আলী হামাভী (৬৪১ হি.) দামেশকে-

–  আবুল কাসিম উমর ইবনে আহমদ (৬৬০ হি.)হালবে-

–  আব্দুল কাদির (৬৯৬ হি.) হালাবে-

–  ইবরাহীম ইবনে আহমদ (৬৯৭ হি.) হালবে-

–  ইবনু আবিল ইয (৬৭৭ হি.) মিসর ও সিরিয়ায়-

–  হাসান ইবনে আহমদ তুরস্কের মালাতইয়াতে বিশ বছরের অধিক, অতপর দামেশকেও বিশ বছরের অধিক এবং সর্বশেষ মিসরে কাযা পরিচালনা করেন।

–  আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আযরায়ী (৬৭৩ হি.) দামেশকে-

–  কাযীউল কুযাত আলী ইবনে মুহাম্মদ সদরুদ্দীন (৬৪২-৭২৭ হি.) দামেশকে-

–  আহমদ ইবনুল হাসান (৬৫১- ৭৪৫ হি.) দামেশকে-

–  তাঁর পিতা ও দাদাও প্রধান বিচারপতি ছিলেন।

–  উমর ইবনে আ. আযীয ও  ইবনে আলী জারাদা (৬৭৩- ৭২০ হি.) হালাবে- তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নাসীরুদ্দীন মুহাম্মদ প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন।

–  এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার জন্য “আল- জাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহ ফী তবাকাতিল হানাফিয়্যাহ” অধ্যয়ন করা যেতে পারে।

মিসর ও আফ্রিকা মহাদেশ

লোহিত সাগরের পশ্চিমে মিসরেও ফিকহে হানাফী হিজরী দ্বিতীয় শতকেই প্রবেশ করেছিলো। এ অঞ্চলে ফিকহে হানাফীর প্রথম বিচারক ছিলেন আবুল ফযল ইসমাঈল ইবনে নাসাফী আল কূফী। তিনি মাহদীর সময়কার ১৬৪ হি. থেকে ১৬৭ হি. পর্যন্ত বিচারক ছিলেন। (আল- জাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহঃ খন্ড-১, পৃঃ ৪৩৮)

এছাড়া মুহাম্মদ ইবনে মাসরূক আল-কিন্দী ১৭৭ হি. থেকে ১৮৫ হি. পর্যন্ত-

–  হাশিম ইবনে আবু বকর আল বাকরী ১৯৪ হি. থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মিসরের বিচারক ছিলেন।

–  দ্বিতীয় হিজরী শতকের শুরুতে কাযী ইবরাহীম ইবনুল জাররাহ (২১৭ হি.) ২০৫হি. থেকে ২১১ হি. পর্যন্ত বিচার পরিচালনা করেছেন।

এ শতাব্দীতে সবচেয়ে প্রভাবশালী কাযী ছিলেন ইমাম বাক্কার ইবনে কুতাইবা (২৭০ হি.)। ২৪৬ হিজরীতে বিচারকের দায়িত্ব নিয়ে তিনি মিসরে গমন করেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত ২৩ বছরেরও অধিককাল পুরো মিসরের অ-প্রতিদ্বন্দী ব্যক্তি ছিলেন। তদ্রুপ মুহাম্মদ ইবনে আবদা ইবনে হারব, আবু আব্দিল্লাহ বসরী (৩১৩ হি.) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ছয় বছর সাত মাস বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন।

–  ইসহাক ইবনে ইবরাহীম শাশী (৩২৫ হি.)।

–  মুহাম্মদ ইবনে বদর ইবনে আব্দুল আযীয, আবু বকর আব্বাস ইবনু আবিল আওয়াম (৪১৮হি.) প্রমুখ মিসরে কাযা পরিচালনা করেছেন।

আফ্রিকার কাইরাওয়ানে যারা কাযা পরিচালনা করেছেন, তাদের মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্য হলেন-

–  মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আবদুন আর-রূআইনী (২৯৯ হি.), বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় যে, প্রায় ত্রিশ বছর যাবত তিনি কাইরাওয়ান শহরে অবস্থান করেছেন। ফিক্বহে হানাফীর উপর তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থও রচনা করেছিলেন। (আল- জাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহঃ খন্ড-৩, পৃঃ ১৮৯)

তাঁর আগে কাইরাওয়ানের বিচারক ছিলেন-

–  ইমাম আসাদ ইবনুল ফুরাত (২১৩ হি.)। তিনি যেমন ফিকহে মালেকীর ইমাম ছিলেন- তেমনি ফিকহে হানাফীরও ইমাম ছিলেন।

ঐতিহাসিক ইবনে খাল্লিকান তাঁর “তারিখ” নামক গ্রন্থে মুইয বিন বাদীসের জীবনীতে বলেন-

وكان مذهب أبى حنيفة –رضى الله عنه- بإفريقية أظهر المذاهب فحمل المعز المذكور جميع أهل المغرب على التمسك بمذهب مالك بن أنس – رضى الله عنه-

আফ্রিকায় ইমাম আবু হানীফা রহ.-এর মাযহাবই ছিলো সর্বাধিক প্রচারিত ও অনুসৃত। হিজরী পঞ্চম শতকে মুয়ীয বিন বাদীস (৪৫৪ হি.)-এর হাতে কর্তৃত্ব আসার পর তিনি এ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে ফিকহে মালেকী অনুসরণে বাধ্য করেন। (আল- জাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহঃ খন্ড-১, পৃঃ ৯)

সর্বশেষ সারকথা হলো- মাশরিক থেকে মাগরিব পর্যন্ত মুসলিম জাহানের প্রধান প্রধান শহরগুলিতে ফিকহে হানাফী দ্বারা কুরআন-সুন্নাহর আইন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। আর তখন মুসলিম সাম্রাজ্য ছিলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য এবং মুসলিম উম্মাহ ছিলো পৃথিবীর সেরা শক্তি। মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক উত্থান ও প্রতিষ্ঠার দ্বিতীয় পর্বে সালতানাতে উসমানিয়াহ ও বৃটিশের অনুপ্রবেশের আগ পর্যন্ত ভারত উপমহাদেশেও ফিকহে হানাফী অনুসারে কাযা ও বিচার পরিচালিত হয়েছে।

আজ মুসলিম জাতির যে শ্রেণী রোমান ‘ল’ ও বৃটিশ আইনের প্রতি অতি মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন- এই ইতিহাস তাদের চরম দৈন্যতাকে প্রকাশ করে। তদ্রুপ যারা আল্লাহর যমীনে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী- তাদের জন্যও এই ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.