ফিকাহ উদ্ভাবিত হয় কুরআন ও হাদীস থেকেই

0
498
Usool e Fiqah
Usool e Fiqah

কুরআনে শুধু আল্লাহ তা’আলার বিধান লিখে দেওয়া গ্রন্থই নয়; বরং এই গ্রন্থকে মানবজাতির পথনির্দেশনা বলা হয়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই বিধান ছাড়াও মানব জাতির জীবন ও জগত সম্পর্কিত সবকিছুর বর্ণনা এই কুরআনে দেওয়া হয়েছে।
বিধান বর্ণনার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ মূলনীতি অবলম্বন করা হয়েছে। যা কুরআনের আয়াত ও এর বর্ণনাভঙ্গি পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান করার দ্বারা প্রতীয়মান হয়। এখানে কুরআনের আয়াতে বিধান বর্ণনা করার ধরণ উল্লেখ করছি-

এক. সুস্পষ্ট বিধান (মুহকাম)

যথা- কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
أقيموا الصلاة وآتوا الزكاة-
অর্থঃ তোমরা সালাত আদায় করো এবং যাকাত প্রদান করো। (সূরা বাকারা-৪৩)
উক্ত আয়াতে স্পষ্টভাবে সালাত আদায় এবং যাকাত প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অতএব এখানে সালাত আদায় ও যাকাত প্রদানের বিধান সুস্পষ্ট।

দুই. অস্পষ্ট বিধান (মুশতাবিহাত)

যথা- কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِن شَعَائِرِ اللَّهِ فَمَنْ حَجَّ الْبَيْتَ أَوِ اعْتَمَرَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِ أَن يَطَّوَّفَ بِهِمَا وَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَإِنَّ اللَّهَ شَاكِرٌ عَلِيمٌ-
অর্থঃ নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া নামক পাহাড় দুটি আল্লাহ তা’আলার অন্যতম নিদর্শন। সুতরাং হজ্জ-উমরাহ আদায়কারীদের এ দুই পাহাড়ে সায়ী করতে কোনো সমস্যা নেই। (সূরা বাকারা-১৫৮)

উক্ত আয়াতে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সায়ী করার বিধান অস্পষ্ট। কারণ এ সায়ী করা কি আবশ্যক না এর বিধান সাধারণ পর্যায়ে রাখা হয়েছে- তা পরিস্কার করা হয়নি।
তবে উরওয়া রাযি. কর্তৃক আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত হাদীসের আলোকে সাফা-মারওয়া পাহাড়ে সায়ী করাকে ওয়াজিব বলা হয়েছে। উরওয়া রাযি. এ প্রসঙ্গে আয়েশা রাযি.কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন- হে উরওয়া! তুমি বলতে চাচ্ছো, সাফা-মারওয়া পাহাড়ে সায়ী করার বিধান সাধারণ পর্যায়ে; অর্থাৎ জায়েয, কিন্তু আবশ্যক নয়। প্রকৃতপক্ষে এমনটি নয়। কারণ এর বিধান সাধারণ পর্যায়ে হলে কুরআনে এভাবে ইরশাদ হতো-
সুতরাং হজ্জ-উমরাহ আদায়কারীদের এ দুই পাহাড়ে সায়ী না করলে কোনো সমস্যা নেই। অথচ এভাবে বলা হয়নি।

তিন. মূলনীতি সম্বলিত বিধান (উসুলি)

যথা- কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ-
অর্থঃ তাদের ওপর নিকৃষ্ট প্রাণি ভক্ষণ করা হারাম করা হলো। (সূরা আরাফ-১৫৭)

উক্ত আয়াতে নিকৃষ্ট প্রাণির গোশত খাওয়া হারাম বলে ঘোষণা করা হয়েছে, কিন্তু কোন কোন প্রাণি খাওয়া যাবে না- তা স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি; বরঞ্চ এখানে একটি মূলনীতি উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ নিকৃষ্ট শ্রেণির প্রাণি হারাম করা হলো।
তাই ইসলামের ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ হাদীসে দীর্ঘ অনুসন্ধান ও ইজতিহাদের আলোকে কোন কোন প্রাণি খাওয়া হারাম- তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

কুরআন-হাদীস থেকে ফিকাহ উদ্ভাবনের পদ্ধতি
কুরআন ও হাদীস থেকে ফিকাহ বা মাসআলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিম্নে উল্লেখিত বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য করতে হবে। এরপর সে অনুযায়ী মাসআলা উদ্ভাবন করতে হয়।

. শরীয়তের কোনো বিধান সম্পর্কে অনুসন্ধানের প্রয়োজন দেখা দিলে সর্বপ্রথম দেখতে হয় কুরআনুল কারীমে। কুরআনের সরাসরি বর্ণনায় উক্ত বিধানটি পাওয়া গেলে তার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত দিতে হয়। এ পদ্ধতিকে সরাসরি সূত্র (صراحة النص ) বলা হয়।
. কুরআনের সরাসরি বর্ণনায় উক্ত বিধানটি সরাসরি যদি পাওয়া না যায়; বরং বর্ণনাভঙ্গি কিংবা ইঙ্গিতের মাধ্যমে তা বোধগম্য হয়, তা হলে সে আলোকেই সিদ্ধান্ত দিতে হয়। এ পদ্ধতিকে ইঙ্গিতবহ সূত্র (إشارة النص ) বলা হয়।
. বর্ণনাভঙ্গি কিংবা কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইঙ্গিতের মাধ্যমেও উক্ত বিধান সাব্যস্ত না হয়ে কুরআনের স্বাভাবিক বর্ণনার আলোকে যদি তা বোধগম্য হয়, তা হলে সে আলোকেই সিদ্ধান্ত দিতে হয়। এ পদ্ধতিকে সাংকেতিক সূত্র (دلالة النص) বলা হয়।
. অপরদিকে কোনো বিষয়কে সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে কুরআনে যদি এমন কোনো বিষয় বর্ণিত হয়- যার অর্থ বোধগম্য হওয়ার ক্ষেত্রে অন্য কোনো কিছুকে উহ্য মানতে হয় অতঃপর তারই আলোকে উক্ত বিষয়টি বোধগম্য হয়, তা হলে সে আলোকেই সিদ্ধান্ত দিতে হয়। এ পদ্ধতিকে চাহিদা সম্বলিত সূত্র (اقتضاء النص) বলা হয়।
. কুরআন থেকে উপরোক্ত চার পদ্ধতির কোনোটিরই ভিত্তিতে কাঙ্খিত বিধান সাব্যস্ত না হলে এক্ষেত্রে হাদীস ও সুন্নাহ থেকে এ চার প্রক্রিয়ার কোনো এক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দিতে হবে।
. হাদীস ও সুন্নাহর মধ্যেও উপরোক্ত উপরোক্ত চার পদ্ধতির কোনোটিরই ভিত্তিতে কাঙ্খিত বিধান সাব্যস্ত না হলে অনুসন্ধান করে দেখতে হবে, নবীজির মহান সাহাবায়ে কেরামের এ ব্যাপারে কোনো ইজমা তথা সর্বসম্মত মতামত রয়েছে কিনা। থাকলে সে আলোকেই সিদ্ধান্ত দিতে হবে।
. উক্ত ইজমাও পাওয়া না গেলে কুরআন-সুন্নাহর সামগ্রিক প্রমাণাদি সামনে রেখে কিয়াস ও ইজতিহাদের আলোকে ফয়সালা করতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.