মাদরাসার পরিচয় ও গুরুদায়িত্বঃ সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নাদাবি রহ.

0
1076
lecture image with mic

নববী জ্ঞান অন্বেষণকারীদের মর্যাদা এবং তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য

এ বয়ানটি প্রখ্যাত ইসলামি কিংবদন্তী ভারতের মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নাদাবি রহ. ১৯৫৪ইং সনের মার্চ মাসে দারুল উলূম দেওবন্দের ছাত্রদের এক সমাবেশে পেশ করেন। এতে দ্বীনী মাদরাসা সমূহের শিক্ষার্থী ও শিক্ষা সমাপণকারীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য, তাঁদের নিকট বর্তমান যুগের চাহিদা ও প্রত্যাশা কী, এই প্রত্যাশা পূরণে দ্বীনের দাঈ ও খাদেম হিসাবে তাঁদের কীরূপ প্রস্তুতি প্রয়োজন সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। পাঠকদের উদ্দেশে তাঁর এ বয়ানটির প্রথম অংশ এখানে প্রকাশ করা হলো। বাকি অংশ একাধিক পর্বে এখানে প্রকাশিত হবে ইনশা-আল্লাহ!
(তাহরিকুল কলম ওয়েব বিভাগ কর্তৃপক্ষ)

প্রিয় ছাত্রবৃন্দ!
আপনারা একটি দ্বীনী মাদরাসার তালিবুল ইলম ও ছাত্র। আমিও দ্বীনী মাদরাসার একজন খাদেম ও সেবক এবং আপনাদেরই সফর-সঙ্গী। এই মুহূর্তে আমার জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতাসমূহ, সীমিত অধ্যবসায় ও পর্যবেক্ষণের ফলাফল এবং জীবন চলার পথে অর্জিত সর্বাধিক মূল্যবান ও প্রিয় সওগাত অকৃত্রিমভাবে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করাই সময়ের নাজকুতা ও আলোচ্য বিষয়ের গুরুত্বের দাবি। আপনারা আমাকে কথা বলার সুযোগ দান করে সম্মানিত করেছেন, আমার ওপর আপনাদের আস্থার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। আমার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ও লক্ষ্য হওয়া উচিত, আপনাদের আস্থার যথাযথ মূল্যায়ন করা, সবিশেষ মর্যাদা দান করা এবং এই স্বল্প সময়কে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগানো। কারণ এই সময়টুকু আপনারা আপনাদের মহামূল্যবান ব্যস্ত সময় থেকে বের করে এখানে সমবেত হয়েছেন। সময়টুকু ওই সকল ব্যক্তির সময় যাদের প্রতিটি সেকেন্ড প্রতিটি মুহূর্ত মাসাধিক ও বৎসরাধিক কালের সঙ্গে তুলনীয়।

মাদরাসা কাকে বলে?
আমাদের সকলের সর্বপ্রথম অবগত হওয়া উচিত যে, একটি দ্বীনি মাদরাসার মূল্যমান ও মর্যাদাগত অবস্থান কত উচ্চে? মাদরাসা একটি বৃহৎ কারখানা। মানুষ গড়ার কারখানা। ব্যক্তি গঠনের কারখানা। এখানে দ্বীনের দাঈ এবং ইসলামের সৈনিক তৈরি করা হয়। মাদরাসা ইসলামী বিশ্বের বিদ্যুৎ উৎপাদন কারখানা (চড়বিৎ ঐড়ঁংব); যেখান থেকে মুসলিম জাতির মাঝে বরং গোটা মানবজাতির মাঝে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এ এরূপ এক কারখানা যেখানে হৃদয় ও দৃষ্টি, মন ও মস্তিষ্ক যথারূপে গড়ে ওঠে। মাদরাসা এরূপ এক স্থান যেখান থেকে সমগ্র জীবন জগতকে পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং গোটা মানব জীবনের তত্ত্বাবধানকার্য পরিচালিত হয়, যেখানকার ফরমান জগতজুড়ে কার্যকর; কিন্তু জগতের ফরমান যেখানে কার্যকর নয়। তথাকথিত কোনো আদর্শ ও মূল্যবোধ, সভ্যতা ও সংস্কৃতি, কোনো ভাষা ও সাহিত্য, কোনো নির্দিষ্ট যুগ ও কালের সাথে মাদরাসার সর্ম্পক নয় যে, তা প্রাচীনত্ব দোষে দোষযুক্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে কিংবা তা কলের গর্ভে হারিয়ে যাবে। মাদরাসার সম্পর্ক সরাসরি নবুওয়াতে মুহাম্মদীর সঙ্গে, যার আবেদন জগৎ জোড়া যা চিরজীবন্ত। মাদরাসার সম্পর্ক ওই ইনসানিয়াত ও মানবতার সাথে, যা চিরযুবা, ওই জীবনের সাথে যা সদা চলমান। সত্যি বলতে কি, মাদরাসা প্রাচীন কি নবীন- এই বিতর্কের অনেক উর্ধ্বে। এ তো এমন এক স্থান যেখানে পাওয়া যায় নবুওয়াতের মুহাম্মদীর চিরন্তনত্ব, জীবনের ঊৎকর্ষের সন্ধান, জীবনের স্পন্দন ও আলোড়ন।

মাদরাসার গুরুদায়িত্ব
সুধী! মাদরাসা ‘সেকেলে শিক্ষাব্যবস্থা নমুনা সংরক্ষণকারী জাদুঘর বিশেষ’ কিংবা তা ‘পুরাস্মৃতির স্মারক বিশেষ’-মাদরাসা সম্পর্কে এতদপেক্ষা অন্যায় ও আপত্তিকর অভিধা আর হতে পারে না। আমি এটাকে মাদরাসার সাধারণ পরিচিতিরও পরিপন্থী, ন্যুনতম মর্যাদারও খেলাফ বলে মনে করি। আমি বিশ্বাস করি- মাদরাসা সর্বাপেক্ষা দৃঢ়, শক্তিশালী, সঞ্জীবনী শক্তিসম্পন্ন এবং প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর এক প্রতিষ্ঠান। এর এক প্রান্ত যুক্ত নবুওয়াতে মুহাম্মদীর সঙ্গে, অপর প্রান্ত যুক্ত এই জীবন জগতের সঙ্গে। নবুওয়াতে মুহাম্মদীর সঞ্জীবনী ঝরনা হতে তা পানি সংগ্রহ করে বিস্তীর্ণ জীবন ক্ষেত্রকে সিঞ্চিত করে। মাদরাসা যদি তার এই সেচকার্য পরিত্যাগ করে, তবে জীবনক্ষেত্র পরিণত হতে থাকবে শুষ্ক মরুভূমিতে, মানবতার ঘটবে মৃত্যু। না নবুওয়াতে মুহাম্মদীর সমৃদ্ধ ঝরনা হতে অকৃপণ দানের কোনো প্রকার অস্বীকৃতি জ্ঞাপন বিদ্যমান, না মানবজাতির অভাবী পেয়ালার পক্ষ হতে তা গ্রহণে কুণ্ঠা প্রকাশ বিদ্যমান।
এদিকে إنما أنا قاسم والله يعطي (আমি বণ্টনকারী আর আল্লাহ তা’আলা দান করেন)-এর বারংবার উচ্চারণ, ওদিকে هل من موجود؟ (আর আছে কি, আর আছে কি?)-এর অব্যাহত চাহিদাধ্বনি। এই পৃথিবীতে মাদরাসা অপেক্ষা অধিক জীবন্ত, অধিক প্রাণচঞ্চল ও ব্যস্ত প্রতিষ্ঠান আর কোনটিকে আপনারা দেখাতে পারবেন? জীবনের সমস্যা অগণিত, জীবনের নানা রকম পরিবর্তন অগণিত, জীবনের প্রয়োজন অগণিত, জীবনের ভ্রান্তি অগণিত, জীবন পথে স্থলন অগণিত, জীবনের প্রবঞ্চনা অগণিত, জীবন পথের পথ দস্যু অগণিত, জীবনের আকাঙ্খা ও উচ্চাশা অগণিত ও অসংখ্য। মাদরাসা যখন জীবনের পথ প্রদর্শন এবং পথ চলায় জীবনকে সহায়তা দানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে তখন তার ক্লান্ত সময় অতিবাহিত করার অবকাশ কোথায়? পৃৃথিবীতে প্রতিটি প্রাণীর, প্রত্যেকটি ব্যক্তির, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বিশ্রাম গ্রহণ ও অবকাশ যাপনের অধিকার আছে। তাদের সকলেরই ছুটি গ্রহণের সুযোগ লাভ হতে পারে; কিন্তু মাদরাসার কোনো ছুটি নাই। দুনিয়ায় সকল অভিযাত্রীর জন্যই বিশ্রামের সুযোগ আছে, কিন্তু মাদরাসা নামক এই অভিযাত্রীর জন্য ছুটি ভোগ হারাম। জীবন চলায় যদি কোনো বিরতি থাকত, জীবনের গতিতে যদি যতি ও স্থিরতা বলে কিছু থাকত তাহলে না হয় মাদরাসাও কিছুটা দম নিয়ে নিতে পারত। কিন্তু জীবন যখন সতত চলমান, সদা গতিশীল, তখন মাদরাসার জন্য নিষ্ক্রিয়তা ও অলস সময় উদযাপনের সুযোগ কোথায়? তাকে তো পদে পদে জীবনের হিসাব গ্রহণ করতে হবে। নিত্য পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত দানে টলায়মান পদসমূহকে দৃঢ় ও অনড় পদে পরিণত করতে হবে। মাদরাসা যদি জীবন থেকে দূরে অবস্থান করে অথবা ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়ে অথবা কোনো এক মানযিলে নিশ্চল স্থানুবৎ হয়ে পড়ে অথবা কোনো এক পর্যায়ে উপনীত হয়ে আত্মতুষ্টিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে, তা হলে জীবনের সঙ্গদান, জীবনের নেতৃত্ব দানের গুরুদায়িত্ব কে পালন করবে? জীবনকে শ্বাশত বীনার সুর-লহরি, পয়গামে মুহাম্মদী শোনাবে কে? মাদরাসার নিষ্ক্রিয়তা, নেতৃত্ব দান হতে পিছু হটা, কোন মানযিলে নিশ্চল হয়ে পড়া আত্মহত্যার শামিল, মানবতার সাথে বিশ্বাসঘাতকতার সমার্থক। আত্মপরিচয়ে সমৃদ্ধ, কর্তব্য-সচেতন কোনো মাদরাসার পক্ষে এহেন কল্পনাও দুঃসাধ্য।

চলবে……..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.