মক্কা-মদীনায় কি ‘করোনা ভাইরাস’ প্রবেশ করতে পারবে?

0
533
Masjid e Nababi during coronavirus
Masjid e Nababi during coronavirus

বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেকের মধ্যেই এই প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছে। কারণ একটি হাদীছে মক্কা-মদীনায় মহামারি প্রবেশ করবে না মর্মে বক্তব্য এসেছে। অথচ করোনা ভাইরাসের কারণে অন্যান্য জায়গার মতো মক্কা-মদীনার মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শপিং মলও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এদিকে সম্প্রতি মদিনায় কয়েকজন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। এমনকি মক্কা-মদীনা সহ গোটা সঊদী আরবে কারফিউ জারী করা হয়েছে।

তাহলে বিষয়টা কী? রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

عَلَى أَنْقَابِ المَدِينَةِ مَلاَئِكَةٌ لاَ يَدْخُلُهَا الطَّاعُونُ، وَلاَ الدَّجَّالُ

‘মদীনার প্রবেশপথ সমূহে ফেরেশতা প্রহরায় নিয়োজিত। অতএব, মহামারী (الطَّاعُونُ) এবং দাজ্জাল সেখানে প্রবেশ করবে না’।

(ছহীহ বুখারী, হা- ১৮৮০; ছহীহ মুসলিম, হা-৩২২০)

coronavirus changing all
coronavirus changing all

সম্মানিত পাঠক! আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন, তার শতভাগ সঠিক ও সত্য; এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। লক্ষ্য করুন! হাদীছটিতে ‘ত্ব‘ঊন’ (الطَّاعُونُ) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।

শব্দটির ব্যাখ্যায় ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহ বলেন,

‘ত্ব‘ঊন’ হচ্ছে ঘা-পাঁচড়া, যা বগল, কনুই, হাত, আঙ্গুল সহ সারা শরীরে বের হয়। এর কারণে শরীর ফুলে যায় এবং তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। সেই ঘাগুলো যেন অগ্নিশিখা নিয়ে বেরিয়ে আসে। এর চারপাশে কালো, সবুজ বা লালচে (খয়রী) রং ধারণ করে। এর সাথে হৃৎযন্ত্রের কম্পন ও বমি হয়।

(আল-মিনহাজ- ইমাম নববী, ১৪/২০৪)

ক্বাযী আয়ায রহিমাহুল্লাহও ‘ত্ব‘ঊন’-এর ব্যাখ্যায় ঘা-পাঁচড়ার কথা বলেছেন।

(ফাতহুল বারি- ইবনে হাজার আসকালানি রহ, ১০/২০০)

চিকিৎসা শাস্ত্রেও মহামারি ও ‘ত্বঊন’ এক নয়।

‘ত্বঊন’ এবং মহামারির মাঝে পার্থক্য

হাদিসে বর্ণিত আরবি শব্দ ‘ত্বঊন’ এবং মহামারির মাঝে বিরাট পার্থক্য রয়েছে; এ দুটি এক নয়। কারণ ‘ত্বঊন’ আরবি ভাষা ও চিকিৎসা শাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী ঘা অথবা খোস-পাঁচড়াজাতীয় একটি বিশেষ রোগ।

Taun disease
Taun disease

চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক ইবনে সীনা (Avicenna) (মৃত্যু-১০৩৭ খৃষ্টাব্দ) ‘ত্বঊন’ রোগের আলোচনা করেছেন।

অপরদিকে মহামারি বলতে যে কোনো রোগ কোনো অঞ্চলে কিংবা দেশে অথবা সমগ্র বিশ্বে ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়াকে বোঝায়। আর আরবিতে এ রকম মহামারিকে ‘ওয়াবা’ বলে; ‘ত্বঊন’ নয়।

হাদিসে নববিতে মদিনায় ‘ত্বউন’ প্রবেশ করতে না পারার কথা বলা হয়েছে; কিন্তু কোনো রোগের মহামারি মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না, এমনটি বলা হয়নি।

তাছাড়া দ্বিতীয় খলিফা ওমর রাযি. এর যুগে সিরিয়া ও মদিনায় যে মহামারি দেখা দিয়েছিলো, হাদিসের ব্যাখ্যার গ্রন্থে তা ‘ওয়াবা’ শব্দে এসেছে। দেখুন- (ফাতহুল বারি- ইবনে হাজার আসকালানি রহ., ১০/২০৩)

অন্যান্য আলেম-উলামার পক্ষ থেকেও এমন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। উলামায়ে কেরামের এ ব্যাখ্যা কিন্তু একটি হাদীছের সাথেও মিলে যায়, যেখানে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, ত্ব‘ঊন কী? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, غُدَّةٌ كَغُدَّةِ الْبَعِيرِ ‘উটের ফোঁড়ার মতো ফোঁড়া’।

(মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫১১৮, সনদ ‘জাইয়্যেদ’)

অতএব, ত্ব‘ঊন একটি বিশেষ অসুখ, যার নির্দিষ্ট লক্ষণ ও উপসর্গ রয়েছে। সে কারণে সব মহামারি ‘ত্ব‘ঊন’ নয়। মহামারির আরেকটি আরবী হচ্ছে, ‘ওয়াবা’ (الْوَبَاء) । তবে, ‘ওয়াবা’শব্দটি নির্দিষ্ট কোনো মহামারিকে বুঝায় না; বরং সব ধরনের মহামারি এর আওতাভুক্ত হতে পারে।  

একাধিক আলেম ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক ইবনে সীনার বরাতে হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী রহিমাহুল্লাহ ‘ত্ব‘ঊন’ ও ‘ওয়াবা’-এর মধ্যে পার্থক্য করেছেন।  

(বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: ফাতহুল বারি, ১০/২০২-২০৪)

অতএব, প্রত্যেক ‘ত্ব‘ঊন’ ওয়াবা; কিন্তু প্রত্যেক ‘ওয়াবা’ত্ব‘ঊন নয়। আর মক্কা-মদীনায় যা প্রবেশ করতে পারবে না, তা হচ্ছে ‘ত্ব‘ঊন’; ‘ওয়াবা’নয়। হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী রহিমাহুল্লাহ এমন কথাই বলেছেন। (ফাতহুল বারি, ১০/২০২)  

বিশ্ববিখ্যাত ফতওয়ার ওয়েবসাইট islamqa.info–এর ১৩১৮৮৭ নম্বর প্রশ্নের উত্তরেও এ কথাই বলা হয়েছে।(লিঙ্ক: https://islamqa.info/ar/answers/131887/)

ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘মক্কা-মদীনায় কখনও ত্ব‘ঊন প্রবেশ করেনি’।

(আযকার- ইমাম নববী, পৃ-২৭৬)

Masjid e Nababi and coronavirus
মসজিদে নববি

অতএব, বর্তমান বিশ্বের মরণঘাতি করোনা ভাইরাস মক্কা-মদীনায় প্রবেশ করতে পারে। কারণ করোনা ভাইরাস হচ্ছে ওয়াবা; ‘ত্ব‘ঊন’ নয়। বরং মক্কা-মদীনায় ওয়াবা (ত্ব‘ঊন ছাড়া অন্যান্য মহামারি) প্রবেশ করেছে।  

আবুল আসওয়াদ বলেন, أَتَيْتُ المَدِينَةَ وَقَدْ وَقَعَ بِهَا مَرَضٌ وَهُمْ يَمُوتُونَ مَوْتًا ذَرِيعًا

অর্থাৎ, ‘একবার আমি মদীনায় আসলাম। সেখানে তখন মহামারি দেখা দিয়েছিলো। এতে ব্যাপকহারে লোক মারা যাচ্ছিলো’… ।  (ছহীহ বুখারী, হা-২৬৪৩)  

মহান রব্বুল আলামীন আমাদেরকে বুঝার তাওফীক্ব দান করুন। বর্তমান সঙ্কটময় পরিস্থিতি থেকে তিনি মানবতাকে রক্ষা করুন। আমীন।

اللهم ارفع عنا البلاء والوباء يا أرحم الراحمين

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.