মানবতার প্রতি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপহার- আব্দুল্লাহ আল মাসুম

0
391
Rabiul Awal
Rabiul Awal

পৃথিবীর বুকে মানুষের বসবাস শুরু হওয়ার আগে থেকেই তার জীবন ও জীবন উপকরণের সব আয়োজন বরাদ্দ ছিলো। জীবনের চাকা ঘুরা তার আগমনের দিন থেকেই শুরু হয়েছিলো। পৃথিবীর যত আওয়ায, উত্থান-পতন, কায়-কারবার, লেন-দেন, বানিজ্য, কল-কারখানা, কৃষি কাজ, যোগাযোগ সম্পর্ক- এ সব কিছু মানব সন্তানকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হচ্ছে। সারা দিন খেটে রাতের আধারে পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়ে। রাত পোহালেই আবার সব কিছু জেগে উঠে। শুরু হয় তার কর্মব্যস্ততা। এ তো পৃথিবী আবাদ হওয়ার দিন থেকেই চলে আসছে। পৃথিবীর নির্মাণ ও উন্নতি সাধনে কতজনই না অকাতরে শ্রম দিয়েছেন। মানবতার সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। ইতিহাসের দিকে তাকালে অসংখ্য মানুষ চোখে পড়ে- যারা সেবা ও অবদানের মাপকাঠিতে পরিচিত ও উত্তীর্ণ হতে চায়। এরপরেও পুরো মানবতার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে একটি জিজ্ঞাসা দেখতে পাওয়া যায়- তা হলো- সবই তো চলছে, কিন্তু কোথায় যেনো অপূর্ণতা থেকে যাচ্ছে। মানব তো চলছে, কিন্তু তা লক্ষ্যহীন কিংবা ভূল পথে। মানুষ জানতো না- তার এই জীবনের মূল গন্তব্য কী? জীবন উপকরণের সব কিছুর ব্যবস্থা ছিলো, কিন্তু এর মধ্যে ছিলো না কোনো স্পন্দন।

চিন্তাবিদ, দার্শনিকদের কথা যদি বলা হয়- তাহলে পরিপূর্ণতার দিক দিয়ে এ গোষ্ঠীকে মানবতার জন্য কোনো করুণা বলা যায় না। মানবতার চাহিদা ও প্রয়োজন এমন- যা এক মূহুর্তের জন্যও ফেলে রাখা যায় না। আবার এর সমাধান ছাড়া এর গতি এক পাও এগুতে পারে না, অথচ জ্ঞানগুরু দার্শনিকরা এসব সমস্যার প্রতি একবারও চোখ তুলে তাকাননি। এ নিয়ে তাদের মাঝে আলোচনা-পর্যালোচনাও হয়নি। তারা শুধু দর্শন নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। এদের জীবনের উদাহরণ জীবন সমুদ্রে ছোটো একটি দ্বীপের মতো। যেনো সীমানা বেষ্টিত রক্ষিত একটি এলাকা ছিলো। তারা তাদের খোদা প্রদত্ত সকল শক্তি ও মেধা সেই ক্ষুদ্র রক্ষিত ভূমিতেই শেষ করে দিয়েছেন। তারা সেই জ্ঞান ভূমিতে দর্শনের দ্বীপরাজ্যে নিরাপদ শান্তিময় জীবন কাটিয়েছেন। তারা জীবন যাপন করেছেন, অথচ এই জীবনের সাথে তাদের সম্পর্কই ছিলো না।

কবি-সাহিত্যিক, কথাশিল্পী ও নাট্যকার কতই না এই পৃথিবীতে এসেছেন। এদের দ্বারা মানবতার সমস্ত চাহিদা কি পুরণ হয়েছে? বাস্তবতার বিবেচনায় দেখা যায়- এখানেও তা ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। কবি-সাহিত্যিকরা মানবতার যখম আর যন্ত্রণা দূর না করে কিছু বিনোদনমাত্রা দিয়েছেন। সুরের লহরী বাজিয়েছেন। জীবনের উত্থান-পতন বহুবার ঘটেছে। আর কবি-সাহিত্যিকরা মিষ্টি কথা শুনিয়েছেন। সুরের মূর্ছনায় ভোগ হয়। জীবন সমস্যার সমাধান এখানে খুজে পাওয়া যায় না। এর উদাহরণ হলো- কোনো এলাকায় ভূমিকম্প বা অগ্নিকান্ড ঘটেছে। কেউ জ্বলছে, কেউ মরছে। আর একজন নিশ্চিন্তে বাঁশি বাজিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এতে আহত ও যন্ত্রণায় কাতররা সাময়িকভাবে হলেও আমোদিত হবে ঠিক, কিন্তু যন্ত্রণা তো কমবে না।

এখন চলছে গণতন্ত্র ও রাজনীতির যুগ। সর্বত্র মিছিল-মিটিং ও বিক্ষোভ চলছে। রাজনৈতিক হৈঁচৈ তে সারা পৃথিবীটা আজ উত্তাল। দাবি আদায়ে রাস্তা-ঘাট অবরোধ হচ্ছে। হরতাল, ধর্মঘট কোনো কিছুই বাদ থাকেনি। কিন্তু জীবন যুদ্ধের সাথে এর কি সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে? নিপীড়িত ক্ষুধার্ত মানুষের এতে কোনো পরিবর্তন কি হয়েছে? জাতীয় চেতনার অক্ষুন্নতা ও চারিত্রিক উৎকর্ষতা নিয়ে এদের ভাবার কোনো সময় নেই।
এবার আসুক দিগি¦জয়ী বাহাদুর ও সেনাপতিদের কথা। এদের অস্ত্রের ঝনঝনানি ও তরবারীর আঘাতে বিধ্বস্ত হয় কত জনপদ। যারা জয় দেশের পর দেশ জয় করেন। ইতিহাসের মোড় তারা ঘুরিয়ে দেন। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ এদের প্রতি দূর্বল থাকে। মনে হয়- এরা মানবতার জন্য অনেক কিছু করে ফেলেছেন। কিন্তু কতক্ষণ এটা ভাবা যায়? তাদের এই অভিযান সবই কি ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে ভূমিকা রেখেছে, না ত্রাস ও আতংকও ছড়িয়েছে? লক্ষ্য লক্ষ্য নারী-পুরুষের জীবনহানি মানবতার জন্য কোনো আশীর্বাদ বয়ে এনেছে, না ধ্বংসলীলার স্বাক্ষরও রেখেছে? দেখা যায়- অনেক নির্যাতিত জাতি আজো সোজা হয়ে দাড়াতে পারেনি।
এরপর ধরা যাক আধুনিক বিজ্ঞানী ও আবিস্কারকদের কথা। এটা ঠিক যে, তারা জাতিকে কিছু যন্ত্র উপহার দিয়েছেন। যার ফলে মানুষের জীবনাচরণ হাতের মুঠোয় এসে গেছে। তাদের এই আবিষ্কার দ্বারা সবাই কম-বেশি উপকৃত হচ্ছে। কিন্তু যদি একটু অন্যভাবে ভেবে দেখা হয় যে, এগুলো কি মানবতার জন্য যথেষ্ট হয়েছে না এর মধ্যে এখনো ফাঁক-ফোকড় রয়ে গেছে? সেবার মানসিকতা, সৃষ্টির প্রতি দরদ, আন্তরিকতা ও ধৈর্য থেকে এসব আবিস্কার যদি বঞ্চিত থাকে- তাহলে এগুলো মানবতার জন্য কতটুকু কল্যাণকর?

আজ পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞানী কি দাবি করতে পেরেছে যে, তার আবিস্কারের মাঝে মানবতার আশীর্বাদ পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিলো? পৃথবী এরই মধ্যে দুটি বিশ্বযুদ্ধ পার করেছে। এই যুদ্ধ মানবতার জন্য কি বয়ে এনেছে- তা সবার সামনে বিদ্যমান রয়েছে। ঈমানী শক্তি ও চারিত্রিক বিপর্যয়ে বর্তমানে এগুলো বর্তমানে সর্বাধিক ভূমিকা রাখছে।
এসব বাদ দিয়ে এদের বাইরে আরেকটি কাফেলা পাওয়া যায়- যারা কোনো বিষয়ে বাড়াবাড়ি করেন না আবার অনর্থক নিজেদেরকে খাটোও করেন না। সব কিছুর উর্দ্ধে থেকে তারা সহজ-সরল ভাষায় বলে দেন, তোমার আর এই পুরো সৃষ্টি জগতের প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহ। পরকালের জন্যই তোমার সৃষ্টি। আল্লাহর জন্য তোমার সব কিছু। তোমার পরিচয় ও আদর্শ কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল কিংবা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক নয়। এই বার্তা পুরো জগতকে এক করে নেয়।
এর মধ্যে না আছে কোনো ভেদাভেদ, আর না আছে কোনো খুঁত। তাদের মতে ও পথে কোনো বিরোধ নেই। তারা হলেন আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম। তাদের এই নির্দেশনা ছাড়া কেউ আল্লাহ তা’আলার পথ অতিক্রম করতে পারে না। অথচ দুইজন দার্শনিক, দুইজন কবি, দুইজন রাজনীতিবিদ কিংবা দুইজন বিজ্ঞানী কোনো এক বিষয়ে একমত হতে পারেন না। তারাই প্রথম মানবতাকে এই জ্ঞান দিয়েছেন।
তারা জ্ঞান দানের সাথে সাথে বিশ্বাসও দিয়েছেন। জ্ঞান থাকলেই যে বিশ্বাস থাকবে- তা কিন্তু নয়। অন্যথায় অপরাধ প্রবনতা এত বৃদ্ধি পেতো না। কারণ যারা অপরাধ করে- তারা জানে, এটা অপরাধ। তাদের এ বিষয়ে জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু বিশ্বাস না থাকার কারণে এই জ্ঞান তাকে কোনো কাজ দিচ্ছে না। শাস্তি ভোগ করার পরও অপরাধ ছাড়ছে না। প্রাচীনকালে কত বড় বড় দার্শনিক সারা জীবনে একমুঠো বিশ্বাসও জন্মাতে পারেনি। এই আধুনিক যুগেও বিশ্বাস থেকে বঞ্চিত সন্দেহের ব্যাধিতে আক্রান্তদের সংখ্যা কম কোথায়? জানা লোকদের তর্ক-বহসে মজলিস গরম থাকে। কিন্তু মানার বেলায় সব ঠান্ডা হয়ে যায়। এটা বিশ্বাস থেকে মাহরূম হওয়ার ফল।

এর সাথে তাদের নির্দেশনার মধ্যে এটাও রয়েছে যে, তারা ভালোকে গ্রহণ করার প্রতি অদম্য বাসনা এবং মন্দ ও অপরাধ থেকে বিরত থাকার হিম্মত সৃষ্টি করেন। তারা একটি শক্তি পয়দা করেন। যার ফলে মানবতার হৃদয়ে একটি ঐশ্বিক শক্তির সঞ্চার হয়। আত্মার প্রশান্তি ও নির্মলতায় তার জীবনের সর্বত্র প্রাণ চাঞ্চলের জোয়ার উঠে।
এ কাফেলার সবাই পুরো মানবতাকে পুরো জগতকে উপরোক্ত তিনটি সম্পদ দান করেছেন। সহীহ জ্ঞান, সেই জ্ঞানের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও এই জ্ঞান ও বিশ্বাস অনুযায়ী চলার অনুপ্রেরণা। মানবতার তৃষ্ণা ও চাহিদাকে পুরোপুরি নিবারণ করতে এই তিনটি এমন ভূমিকা পালন করে- যার নযীর পৃথিবীর দ্বিতীয় আর কোনোটিও নেই।
কিন্তু পৃথিবী ক্রমান্বয়ে এই তিনটি অমূল্য সম্পদ হারাতে শুরু করে। সহীহ জ্ঞান পৃথিবী থেকে উঠে যেতে শুরু করে। বিশ্বাসের প্রদীপ নিভে যেতে শুরু করে। ভালোকে গ্রহণের স্পৃহাও নিঃশেষ হয়ে যায়। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিলো যে, বিশাল এলাকাজুড়েও এই তিনটি সম্পদের অধিকারী কাউকে খুজে পাওয়া যেতো না। যথা- সাহাবী সালমান ফারেসী রাযি. সত্যের সন্ধানে বেড়িয়ে সুদূর ইরান থেকে সিরিয়া সেখান থেকে হিজায পর্যন্ত ভ্রমণ করে মাত্র চারজন এই তিন সম্পদের অধিকারীর খোজ পেয়েছিলেন।
এমনই এক আধারময় জগতে কোনো একদিন আবির্ভাব হলো ওই কাফেলার সর্বশেষ মানবের। মানব নয় তিনি মহামানব। তিনি আমাদের মহান প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
উপরোক্ত তিন সম্পদের প্রজ্জলমাণ মশাল হাতে নিয়ে আগমন করলেন। মানব জাতির মূল লক্ষ্য কী- তা তিনি দেখিয়ে দিলেন। তিনি এ মিশন নিয়ে নেমেছেন স্বীয় পরিবার ও আপনজনদেরকে ঝুঁকিতে ফেলে। স্বীয় মাতৃভূমি ছেড়েছেন। অত্যাচার-নির্যাতন সয়েছেন। রাজ্যের লোভনীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্য্যকে অবহেলায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় পেটে পাথর বেঁধেছেন। তিনি থাকতেন বঞ্চিতদের প্রথম কাতারে আর আরাম-আয়েশে সবার পিছনে। নিরাপত্তা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, বিশ্বাস, আন্তরিকতা, সভ্যতা, সুমহান আদর্শ ও উত্তম আখলাক দ্বারা পৃথিবীকে ভরে দিলেন। মাত্র তেইশ বছরে পৃথিবীর রূপ পাল্টে গেলো। সমগ্র মানব হৃদয় জেগে উঠলো। সততার আওয়ায বুলন্দ হলো। তিনি এত বিলীন করে দান করলেন, এত ব্যাপকভাবে তা ছড়িয়ে দিলেন যে, এই মহামূল্যবান সম্পদ- যা এক সময় বিশেষ কোনো অঞ্চল বা গোষ্ঠী এবং সময়ের সাথে আবদ্ধ ছিলো, তা ব্যক্তি, গোত্র, শহর ও রাজ্যের সীমানা ভেদ করে ছাড়িয়ে গেলো।

পৃথিবীর এমন কোনো ভূমি নেই- যেখানে তাঁর এই আহবান পৌঁছেনি। কালিমায়ে শাহাদাতের বাণী কোথায় উচ্চারিত হয় না- বলুন। পানিতে ভাসমান জাহাজে, স্থলে চলমান বাহনে, আকাশে উড়ন্ত বিমানে ও শহর-বন্দর এবং মাঠে-ময়দানে কোথায় এই আওয়ায উচ্চারিত হয় না? শুধু তাই নয়, তাঁর এই মশাল পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত প্রজ্জলিত থাকবে। স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা এর ফয়সালা করেছেন। আলোর দিশা দেখিয়ে যাবে সমগ্র মানবতাকে। সর্বকালে সবখানে সবার জন্য তা জ্বলজ্বল করবে। আজ পুরো পৃথিবীতে আন্দোলিত এই বিপ্লব আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষারই ফসল।
মানব সন্তানের প্রতি তাঁর যতখানি অনুগ্রহ- তা অন্য কারো কখনোই নয়। এই অনুগ্রহকে যদি ফিরিয়ে নেওয়া হয়- তাহলে এই জগত হাজার হাজার বছর পিছনে পড়ে যাবে। সফলতা ও কল্যাণের সব আয়োজন চিরতরে হারিয়ে যাবে। তাঁর এই আদর্শ মানবতার প্রতি পরম উপহার। এর উর্দ্ধে আর কোনো উপহার হতে পারে না। কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবী ও মানবতার কল্যাণ, শান্তি ও সফলতার নিশ্চয়তা এরই মাঝে নিহিত রয়েছে- এটাই পরম সত্য কথা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.