মুসলিম বিশ্ব আজও এই ক্ষত বয়ে চলেছে !

0
462
Why Firqah
Why Firqah

তৃতীয় খলিফা ওসমান রাযি. এর শাহাদাত ও উম্মাহর বিভক্তি
তৃতীয় খলিফা ওসমান রাযি. এর নির্মম হত্যাকান্ডের পর তাঁর হত্যার বদলা নেওয়ার বিতর্কে জড়িয়ে পুরো মুসলিম উম্মাহ বিভক্ত হয়ে পড়ে। যাদের মধ্যে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবারের সদস্য ছাড়াও তাঁর শীর্ষ সাহাবীরাও ছিলেন। তাছাড়া খলিফা নির্বাচন নিয়েও তখন থেকেই সংকট শুরু হয়। এই বিতর্কের রেশ ক্রমাগত হিজাযের সীমানা অতিক্রম করে পূর্বে ইরাক ও পশ্চিরম মিসর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। সর্বত্র লোকজনের মাঝে এ নিয়ে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করতে শুরু হয়। আর সেই সূত্রে এসব বিদ্রোহী উগ্র গোষ্ঠীর তৎপরতা শুরু হয়। বর্তমানেও এদের ষড়যন্ত্র মুসলিম বিশ্বে বিদ্যমান।
কিন্তু এর প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আমাদেরকে আরেকটু আগে ফিরে যেতে হবে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ থেকেই মুসলিম ছদ্মবেশি কিছু মুনাফিক ছিলো। যারা সার্বক্ষণিক ইসলামের ক্ষতিসাধনে বিভোর থাকতো। যা তাদের উঠাবসা কিংবা আচার-আচরণে প্রকাশ পেতো। অপরদিকে ইয়াহুদি ধর্মালম্বীরা হলো এক দুর্ধর্ষ জাতি। ষড়যন্ত্র কিংবা ছল-ছাতুরি অবলম্বনে পৃথিবীর ইতিহাসে এদের কোনো তুলনা হয় না। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে মদীনা মুনাওয়ারায় ইয়াহুদিদের তিনটি গোত্র বসবাস করতো। নবীজির মাদানি জীবনে এরা তাঁকে কম জ্বালাতন করেনি।
ইসলামের বিরুদ্ধে নিজেদের সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য এই ইয়াহুদি গোষ্ঠী মদীনার কথিত উপরোক্ত মুনাফিকদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতো। নবীজি ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের বিরুদ্ধে মুনাফিকদেরকে এরা উষ্কে দিতো। কিন্তু আল্লাহ তা’আলা ওহির মাধ্যমে এদের যাবতীয় শলা পরামর্শ ও চক্রান্ত ফাঁস করে দেওয়ায় এদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে যেতো। নবীজির ইন্তেকালের পরে ওহির দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই ইয়াহুদি ও মুনাফিক গোষ্ঠী পুনরায় তৎপর হয়ে উঠে।

নবীজির ইন্তেকালের পর ইসলাম এবং মুসলিম জাতির সংহতি, শান্তি ও শৃংখলার একমাত্র উৎস ছিলো খেলাফত ব্যবস্থা। সেই ধারাবাহিকতায় তখন খেলাফতের দায়িত্বে আসেন সাহাবী আবু বকর রাযি.। তাঁর পরে খলিফা হন সাহাবী ওমর ইবনে খাত্তাব রাযি.। এই দুই খলিফার কালজয়ী আদর্শ শাসনে ইসলামের খেলাফত ব্যবস্থার কার্যকারিতা যখন সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হতে থাকে, তখনই ইয়াহুদিদের এই চক্র তাদের সকল ষড়যন্ত্রের মূল টার্গেট বানায় এই খেলাফত ব্যবস্থাকে।
ইসলাম ও মুসলিম বিশ্ব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করে খেলাফত ব্যবস্থাকে চিরতরে অকার্যকর করে দেওয়ার দুরভিসন্ধিতে ইসলামের তৃতীয় খলিফা ওসমান বিন আফফান রাযি. এর শাসনামলে ২৫ হিজরীতে এক ইয়াহুদি নেতা ছদ্মবেশ ধারণ করে মুসলিমদের দলভুক্ত হয়। তার নাম হলো আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা।
ওই সময়টাতে ওসমান রাযি. এর নেতৃত্বে পারস্য, আফ্রিকার পূর্বাঞ্চল, সিরিয়া ও ইরাক ইত্যাদি অঞ্চল বিজিত হওয়ার পর লক্ষ লক্ষ লোকের ইসলাম গ্রহণ করার হিড়িক চলছিলো। এর মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার সাথে আরো অনেক মুনাফিক ইসলামের মূলে আঘাত হানার মানসে বাহ্যতঃ ইসলাম গ্রহণ করে। এরপর থেকেই ইতিহাসের দীর্ঘ ভয়াবহতার দ্বার উম্মুক্ত হয়।

সাবায়ি দল গঠন
আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা তাদেরকে নিয়ে একটি গোপন দল গঠন করে। ইতিহাসে এরা সাবায়ি দল নামে পরিচিত। খেলাফত ব্যবস্থাকে ধবংস করার লক্ষ্যে ইবনে সাবা প্রথমে খলিফা সহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত গভর্নর সাহাবীগণের বিরুদ্ধে সাধারণ লোকদের নিকট কুৎসা রটিয়ে তাদেরকে ক্ষিপ্ত করে তোলার প্রচেষ্টা চালায়। এসব অপপ্রচারের উদ্দেশ্য ছিলো খলিফা ওসমান রাযি. এর বিরুদ্ধে জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলা এবং মুসলিমদের ঐক্যের মাঝে ফাটল ধরিয়ে বিশৃংখল পরিস্থিতি ডেকে আনা।
রাস্তাঘাটে চলার পথে এবং জন সমাগম এলাকায় তারা নবীজির সাহাবীদের সমালোচনা করতে শুরু করে। তখন ইবনে সাবা সিরিয়ায় অবস্থান করছিলো। প্রথমে সে সিরিয়ার গভর্নর সাহাবী মু’আবিয়া রাযি. এর নামে কুৎসা রটালে ধরা খায়। মু’আবিয়া রাযি. তার ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য খলিফা ওসমান রাযি. এর কাছে চিঠি লিখে পাঠান।

অতঃপর ইবনে সাবা সিরিয়া থেকে ইরাকের বসরা নগরীতে গমন করে সেখানকার কিছু দাগি সন্ত্রাসীদের সাথে মিলিত হয়। তারা সেখানে এক বাড়িতে গোপন বৈঠকে মিলিত হয়। উক্ত বৈঠকে সাংকেতিক ভাষায় কার্য পরিচালনার প্রস্তাব করা হলে তা গৃহীত হয়। বসরার গভর্নর গোপন সসূত্রে এই সংবাদ পেয়ে ইবনে সাবাকে বসরা থেকে বহিষ্কার করে দিলে সে কুফা নগরীতে গিয়ে অবস্থান নেয়। কিছুদিন পর সেখান থেকেও বহি®কৃত হয়ে মিসরে চলে যায়। আর এরই মধ্যে ইবনে সাবা এসব অঞ্চলে তার অনুসারীদের সমন্বয়ে গোপন দলের একটি স্থানীয় কমিটি গঠন করে দিয়ে যায়।
মিসরে আসার পর ইবনে সাবা অন্যান্য অঞ্চলের সাথে চিঠিপত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। তাদের মাধ্যমে তৃতীয় খলিফা ওসমান রাযি. ও তাঁর খেলাফত পরিচালনার বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করে। তারা তাঁর বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, নিজের লোকদেরকে চাকরিতে নিয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদে আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করে। অতঃপর এই অপপ্রচারের পাশাপাশি মদীনায় অবস্থানরত বিশিষ্ট সাহাবীগণের নামে খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার আহবান জানিয়ে জাল প্রচারপত্র বিলি করে। এভাবে তারা বেশ কিছুসংখ্যক জনগণকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়।

২৫ হিজরীতে শুরু হওয়া এই খেলা অন্য সবের মতো হঠাৎ করেই হয়ে যায়নি। ধীর কৌশলে চলমান প্রক্রিয়ায় এগুতে এগুতে ২৫ হিজরীতে এর চূড়ান্ত সূচনা ঘটে। একতার মূলে সংহারী বিষ মিশিয়ে শুরু হয় এদের পথ চলা। মুসলিম বিশ্ব আজও এই ক্ষত বয়ে চলেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.