যবীহুল্লাহ সম্পর্কে প্রশ্ন কেনো?? -শায়খ আল্লামা আব্দুল মালেক

0
569
research
research

আল্লাহ তা’আলা ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে তাঁর বড় পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে কুরবানী করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই আদেশ ছোট পুত্র ইসহাক আলাইহিস সালাম সম্পর্কে ছিলো না। এটাই অকাট্য সত্য।
কুরআনুল কারীম দ্বারা এটাই প্রমাণিত এবং এর ওপরই মুসলিম উম্মাহর মুহাক্কিক ও বিজ্ঞ মনীষীগণের ইজমা প্রতিষ্ঠিত। এর বিপরীতে ইসহাক আলাইহিস সালামকে ‘যবীহুল্লাহ’ সাব্যস্ত করা সম্পূর্ণ মনগড়া কথা- যার ভিত্তি হলো ইহুদীদের তাহরীফ ও অপব্যাখ্যা।
এই ফিতনার যামানায় দ্বীন ও ঈমানের বিভিন্ন প্রসঙ্গে এবং স্বীকৃত ও স্বতঃসিদ্ধ বিষয়াদি সম্পর্কে মানুষের মনে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টির অপপ্রয়াস ধারাবাহিকভাবে চলছে। এর পিছনে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বহু কারণ বিদ্যমান। ‘যবীহুল্লাহ’ সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা সেই ধারাবাহিকতারই একটি অংশ।
কিছু মুনকিরে হাদীস বেশ কিছুদিন যাবত কুরবানী সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তারা ইসলামের কুরবানীর মতো একটি বিধানকে ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক প্রমাণ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। এছাড়া কয়েক বছর আগে একটি পত্রিকা কুরবানী সম্পর্কে কিছু রিপোর্ট প্রকাশ করে।
তাতে আরবী ‘যিবহুন’ শব্দটিকে ‘যাবহুন’ ছাপা হয়। কুরআনে ইসমাঈল আলাইহিস সালামের কুরবানী প্রসঙ্গে যিবহুন শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। যার অর্থ- কুরবানীর জন্য প্রস্তুতকৃত পশু। আর পত্রিকাটিতে ছাপা ‘যাবহুন’ শব্দের অর্থ যবেহ করা। তারা এই পরিবর্তনটি নিশ্চয়ই সজ্ঞানে করেছে।
তারা বলতে চায়- আল্লাহ তা’আলার আদেশে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যে পুত্র কুরবানী করতে উদ্যত হয়েছিলেন, তার নাম ইসহাক, ইসমাঈল নয়। ইসমাঈলের পরিবর্তে অন্য কোনো পশু কুরবানী করা হয়নি। যা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভ্রান্ত।
পরবর্তী তাফসীরবিদগণের মধ্যে আল্লামা হাফেয ইবনে কাসীর, কাযী সানাউল্লাহ পানিপথী, ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহ. প্রমুখ শেষোক্ত মতের পক্ষাবলম্বন করে প্রতিপক্ষের দাবির অযথার্থতা প্রমাণ করেছেন কঠোরভাবে। উপরোক্ত এই বাস্তব সত্য কয়েকভাবে আলোচনা করা যেতে পারে। তা হলো-

কুরআন মাজীদের আলোকে-
বাইবেলের স্পষ্ট বর্ণনার আলোকে-
ইসলামের ইতিহাসের আলোকে-
মনীষীগণের গবেষণার আলোকে-

কুরআন মাজীদের আলোকেঃ
কুরআন মাজীদের ৩৭তম সূরা ‘আস-সাফফাত’-এ যবেহ (কুরবানী)-এর ঘটনা উল্লেখিত হয়েছে। পরিপূর্ণ বিশ্লেষণসহ তা লক্ষ্য করা আবশ্যক। ইরশাদ হয়েছে-
قالوا ابنوا له بنيانا فألقوه في الجحيم- فأرادوا به كيدا فجعلناهم الأسفلين- وقال إني ذاهب إلي ربي سيهدين- رب هب لي من الصالحين- فبشرناه بغلام حليم- فلما بلغ معه السعي قال يا بني إني أراك في المنام أني إضبحك فانظر ماذا تري؟ قال يا أبت افعل ما تؤمر- ستجدني إن شاء الله من الصابرين- فلما أسلما وتله للجبين- وناديناه أن يا إبراهيم- قد صدقت الرؤيا- إني كذلك نجزي المحسنين- إن هذا لهو البلاء المبين- وفديناه بذبح عظيم- وتركنا عليه في الآخرين- سلام علي إبراهيم- كذلك نجزي المحسنين- إنه من عبادنا المؤمنين- وبشرناه بإسحاق نبيا من الصالحين- وباركنا عليه وعلي إسحاق- ومن ذريتهما محسن وظالم لنفسه مبين-
অর্থঃ তারা পরস্পর বললো- ইবরাহীমের জন্য একটি অগ্নিকুন্ড প্রস্তুত করো এবং তাঁকে সে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ করো। মোটকথা তারা ইবরাহীমের অনিষ্ট করার ইচ্ছা করলো। সুতরাং আমি তাদেরকে অধঃপতিত করে দিলাম। এবং ইবরাহীম বললেন- আমি তো আমার রবের দিকে ফিরে যাচ্ছি, তিনি আমাকে (উত্তম স্থানে) পৌঁছে দিবেনই। (তিনি দো’আ করলেন-) হে আমার রব! আমাকে একটি সুসন্তান দান করুন। অতঃপর আমি তাঁকে একজন ধৈর্য্যশীল পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলাম। অনন্তর যখন পুত্রটি তাঁর সাথে চলাফেরা করার মতো বয়সে উপনীত হলো, তখন তিনি বললেন- বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে যবেহ করছি। অতএব তুমিও চিন্তা করো, তোমার কী মত?
তিনি বললেন- আব্বাজান! আপনি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছেন তা পূর্ণ করুন, ইনশা-আল্লাহ আমাকে ধৈর্য্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। অবশেষে যখন তাঁরা আত্মসমর্পণ করলেন এবং পিতা পুত্রকে কাত করে শায়িত করলেন এবং আমি তাঁকে ডেকে বললাম- হে ইবরাহীম! নিশ্চয়ই আপনি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছেন।

আমি বিশিষ্ট বান্দাদেরকে এরূপই পুরস্কার প্রদান করে থাকি। প্রকৃতপক্ষেও তা ছিলো একটি বড়ো পরীক্ষা। আর আমি তার পরিবর্তে একটি শ্রেষ্ঠ যবেহ করার পশু দান করলাম। আমি তাঁর জন্য পশ্চাতে আগমনকারীদের মধ্যে এই বাক্য থাকতে দিলাম যে, ইবরাহীমের প্রতি সালাম হোক।
আমি বিশিষ্ট বান্দাদেরকে এরূপই পুরস্কার প্রদান করে থাকি। নিঃসন্দেহে তিনি আমার ঈমানদার বান্দাগণের অন্যতম ছিলেন। আর আমি তাঁকে (পুত্র) ইসহাকের সুসংবাদ প্রদান করলাম- যিনি নবী এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। আর আমি ইবরাহীম ও ইসহাকের প্রতি বরকত নাযিল করেছি এবং তাঁদের উভয়ের বংশে অনেক নেক লোকও রয়েছে এবং অনেকে এমনও রয়েছে- যারা প্রকাশ্যে নিজেদের ক্ষতি সাধন করছে। (সূরা সাফফাতঃ আ-৯৭-১১৩)

উপরোক্ত আয়াতসমূহ ও সামনে উল্লেখিত এ সম্পর্কিত অন্যান্য আয়াত সামনে রেখে নিচের বিষয়গুলো লক্ষ্য করা দরকার।

সূরা সাফফাত-এর উপরোক্ত আয়াত সমূহে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দুইজন সন্তানের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে। প্রথম সন্তানের নাম উল্লেখ করা হয়নি; বরং ধৈর্য্যশীল একটি পুত্র সন্তান বলে উল্লেখ করে তার কুরবানীর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় পুত্র সন্তানের সুসংবাদ নামসহ দেওয়া হয়েছে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- وبشرناه بإسحاق نبيا من الصالحين-
অর্থঃ আমি তাঁকে ইসহাকের সুসংবাদ দিলাম। যে সৎ কর্মশীল ও নবী হবেন। (সূরা সাফফাত-১১২)
এই কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মাত্র দুইজন পুত্র সন্তান ছিলেন; ইসমাঈল ও ইসহাক।
সুতরাং একজন অর্থাৎ ইসহাক আলাইহিস সালামের উল্লেখ নামসহ হলে অপরজন- যাকে একজন ধৈর্য্যশীল পুত্র সন্তান আখ্যা দিয়ে তার কুরবানীর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে- তিনি ইসমাঈল আলাইহিস সালাম ছাড়া আর কে হবেন?
ইসহাক আলাইহিস সালামের আলোচনা তো কুরবানীর ঘটনার পরে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাঁর সুসংবাদ তো নিজের একমাত্র পুত্র ইসমাঈলকে কুরবানী করার আদেশ পালনের পুরস্কার হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। আয়াতের বর্ণনাভঙ্গি থেকেই তা সুস্পষ্ট।

কুরবানীর ঘটনা যে পুত্রের সঙ্গে সংঘটিত হয়েছে- তাকে কুরআনুল কারীমে সূরা সাফফাতে আয়াত- ৩৭-১০৭-এ (ধৈর্য্যশীল পুত্র সন্তান) বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। অথচ ইসহাক আলাইহিস সালামকে তো (বিদ্বান সন্তান) বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। দেখুন- সূরা হিজরঃ আ-৫৩; সূরা যারিয়াতঃ আ-২৮।
অতএব বোঝা গেলো, (ধৈর্য্যশীল পুত্র সন্তান) দ্বারা ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উদ্দেশ্য, যিনি নিঃসঙ্কোচে নিজের জীবন উৎসর্গ করাকে বরণ করে নিয়েছেন। এর চেয়ে বড় সহনশীলতা আর কী হতে পারে?
কুরআনুল কারীমে ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে (ধৈর্য্যশীল) বলেও আখ্যা দেওয়া হয়েছে। দেখুন- সূরা আম্বিয়াঃ আ-৮৫-এর মধ্যে এই গুণটিই উপরোক্ত আয়াত সমূহে কুরবানীর ঘটনায় (সূরা সাফফাতঃ আ-১০২) উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ কুরআনুল কারীমের কোথাও ইসহাক আলাইহিস সালামের জন্য এই গুণের কথা উল্লেখ নেই।
যে পুত্রের সঙ্গে কুরবানীর ঘটনা সংঘটিত হয়েছে- তার সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা’আলা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দো’আর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর সুসংবাদ প্রদান করেছেন। ইরশাদ হয়েছে-
رب هب لي من الصالحين- فبشرناه بغلام حليم-
অর্থঃ হে আমার রব! আমাকে একটি সুসন্তান দান করুন। অতঃপর আমি তাঁকে এক ধৈর্য্যশীল পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলাম। (সূরা সাফফাত-১০০-১০১)
আর ইসহাক আলাইহিস সালামের জন্মের সুসংবাদ ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দো’আ ছাড়াই বৃদ্ধ বয়সে ফিরিশতাদের মুখে প্রদান করা হয়েছে। যার কারণে তিনি অনেকটা অবাকও হয়েছেন যে, আমি তো বৃদ্ধ, আমার স্ত্রীও বৃদ্ধা ও বন্ধ্যা, তাহলে সন্তান কীভাবে হবে?
বিবি সারা রাযি.ও বিস্মিত হয়েছেন এবং এই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন। কুরআনুল কারীমে (সূরা হুদঃ আ-৬৯-৭৫; সূরা হিজরঃ আ-৫১-৫৬; সূরা যারিয়াতঃ আ-২৪-৩০)-এর মধ্যে এই ঘটনা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

লক্ষ্যণীয় বিষয় এই যে, দো’আ ব্যতীত যে (পুত্র সন্তান)-এর সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে- তার নাম ইসহাক। সূরা হুদে তা স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। আর সূরা সাফফাতের ১০০-১০১ আয়াতে এই কথা সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, কুরবানীর ঘটনা যে পুত্রের সঙ্গে সংঘটিত হয়েছে- তার সুসংবাদ ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দো’আর পরিপ্রেক্ষিতে প্রদান করা হয়েছে। সুতরাং এই ঘটনা ইসহাকের নয়; বরং তা ইসমাঈলের ঘটনা।
কুরআনুল কারীমে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, কুরবানীর আদেশ ছিলো আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে পরীক্ষা। আর এটা ইসমাঈল আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, ইসহাক আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রে নয়। কারণ ইসহাক আলাইহিস সালামের জন্মের সুসংবাদ দেওয়ার সময় আরো দুটি বিষয়ের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছিলো। প্রথমতঃ তাঁর ভবিষ্যত প্রজন্ম থেকে ইয়াকুব জন্ম লাভ করবেন। দ্বিতীয়তঃ তিনি অর্থাৎ ইসহাক আলাইহিস সালাম নবী হবেন।
প্রথম বিষয়টি সূরা হুদের ৭১ নং আয়াতে এবং দ্বিতীয় বিষয়টি সূরা সাফফাতের ১১২ নং আয়াতে উল্লেখিত রয়েছে। যেহেতু তাঁর সম্পর্কে আগে থেকেই এই দুটি বিষয়ের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে- তাই তিনি পরীক্ষার বিষয় হতে পারেন না।
কারণ পূর্ববর্তী সুসংবাদের কারণে তার সম্পর্কে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম অবগত আছেন যে, এই সন্তান বড় হবে, তাঁর বংশে ইয়াকুব জন্ম লাভ করবেন এবং তিনি নবী হবেন। আর আল্লাহ তা’আলা উক্ত দুটি সুসংবাদ প্রদানের পর এর পরিপন্থী কোনো নির্দেশ কখনো দিবেন না। অতএব পরীক্ষা ইসমাঈল আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যার জন্মের সুসংবাদের সাথে এমন কোনো সুসংবাদ যোগ করা হয়নি- যা পরীক্ষার প্রতিবন্ধক হতে পারে।

মোটকথা কুরআনুল কারীমের উল্লেখিত আয়াত সমূহ এবং বর্ণনাভঙ্গি দ্বারা অকাট্যভাবে প্রতীয়মান হয় যে, কুরবানীর ঘটনা ইসহাক আলাইহিস সালামের সাথে নয়; বরং ইবরাহীম আলাইহিস সালামের অপর পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালামের সাথেই সংঘটিত হয়েছে। এই সম্পর্কিত আরো ইঙ্গিত (যা অনেক সময় স্পষ্ট বর্ণনা থেকেও অধিক তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে থাকে) কুরআনুল কারীমে বিদ্যমান রয়েছে। এখানে শুধু চারটি বিষয় উল্লেখ করা হলো।
একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে, এতো সব আলোচনার পর যবীহুল্লাহকে (যার সঙ্গে কুরবানীর ঘটনা সংঘটিত হয়েছে) নাম উল্লেখ করে (ইসমাঈল) নির্দিষ্ট করার প্রয়োজন থাকে না। তাছাড়া উপরোক্ত বর্ণনা নাম উল্লেখ করার তুলনায় কম স্পষ্ট নয়।
এই বিষয়ে আরো জানতে হলে সূরা সাফফাতের সংশিশ্লষ্ট আয়াত সমূহের তাফসীর তাফসীরে ইবনে কাসীরঃ খন্ড- ৪, পৃষ্ঠাঃ ১৬-২১; তাফসীরে উসমানিঃ পৃষ্ঠা-৫৮৩-৫৮৪; তাফসীরে মা’আরিফুল কুরআনঃ খন্ড- ৭, পৃষ্ঠা-৪৬২-৪৬৬; তাফহীমুল কুরআনঃ খন্ড- ৪, পৃষ্ঠা-২৯৭-৩০১ দেখা যেতে পারে।
বাংলা ভাষায় কুরআনুল কারীমের সর্বপ্রথম অনুবাদক হিসাবে খ্যাত জনাব গিরিশ চন্দ্র সূরা সাফফাতের সংশ্লিষ্ট আয়াতের এই অর্থ করেছেন- হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে সাধুদিগের (একজন) দান করো। অবশেষে আমি তাহাকে প্রশান্ত বালকের (এস্মায়িল নামক পুত্রের) সুসংবাদ দান করিলাম।’ (কুরআন শরীফ-হরফ প্রকাশনী, কলকাতা-৭ থেকে মুদ্রিত, পৃষ্ঠা-৫১৩, সূরা সাফফাতঃ ৯৯-১০০)
হায়, যদি দেব নারায়ণ মহেশ্বর বাবুও এই সহজ-সত্যকে অনুধাবন করতেন!!!

বাইবেলের বর্ণনার আলোকেঃ
যেহেতু কট্টরপন্থী ইয়াহুদী ও খৃষ্টান সম্প্রদায়ই কুরআনের এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে এবং কুরবানীর ঘটনাটি ইসহাক আলাইহিস সালামের সাথে সংঘটিত হয়েছে বলে মনে করে- তাই বাইবেলের আলোকেও বিষয়টি আলোচনা করা হচ্ছে।
বাইবেলের পুরাতন নিয়মের প্রথম কিতাব ‘আদি পুস্তক’-এর ১৬, ১৭, ২১ ও ২২ নং অধ্যায়ে ইসমাঈল ও ইসহাক আলাইহিস সালামের সুসংবাদ ও জন্মের আলোচনা এবং কুরবানীর ঘটনাও উল্লেখ রয়েছে। যেখানে নিচের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে বিদ্যমান রয়েছে।
অব্রাহামের ছিয়াশি বছর বয়সে ইশ্মায়েলের জন্ম হয়েছিলো।- আদি পুস্তকঃ ১৬:১৬
অব্রাহামের বয়স যখন একশো বছর- তখন তাঁর ছেলে ইসহাকের জন্ম হয়েছিলো।- আদি পুস্তকঃ ২১:৫
অতএব বোঝা গেলো, বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ীও ইসমাঈল জ্যেষ্ঠপুত্র ছিলেন, যিনি ইসহাক থেকে ১৪ বছরের বড়। আর ১৪ বছর পর্যন্ত ইসমাঈলই আল্লাহর নবী ইবরাহীম আলাইহিস সালামের একমাত্র পুত্র ছিলেন। আদি পুস্তকের (Genesis:) ২২তম অধ্যায়ে (২২:২) কুরবানীর যে আদেশ দেওয়া হয়েছে- তাতে Only son (একমাত্র পুত্র) কে কুরবানী করার কথা রয়েছে। (বাইবেলের বাংলা তরজমায় ‘অদ্বিতীয় পুত্র’ কথাটি ভুল।)

বলাবাহুল্য, বড় পুত্র ইসমাঈলের বর্তমানে ইসহাক একমাত্র পুত্র হতে পারেন না। তবে ইসহাকের জন্মের ১৪ বছর পূর্ব পর্যন্ত ইসমাঈল পিতার একমাত্র পুত্র ছিলেন।
সুতরাং বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ীও কুরবানীর ঘটনা ইসমাইলের সাথেই সংঘটিত হয়েছে। এ বিষয়ে বাইবেলের তরজমা সমূহে ইসহাকের উল্লেখ স্পষ্ট ভ্রান্তি- যা বাইবেলের স্পষ্ট বর্ণনাসমূহেরও পরিপন্থী।
অক্সফোর্ড থেকে প্রকাশিত Short Encyclopedia of Islam -এর অনুসরণে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক সংকলিত ও প্রকাশিত ‘সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ’-এর নিচের দুটি আলোচনা লক্ষ্য করা যেতে পারে।
“ইসমাঈল আলাইহিস সালাম একজন প্রসিদ্ধ নবী, বিবি হাজেরা (রাঃ)-এর গর্ভজাত হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের জ্যেষ্ঠপুত্র। ইসমাঈল শব্দটির হিব্র“ প্রতিশব্দ হলো- …………..।
হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ৮৬ বছর বয়সে তাঁহার জন্ম (Genesis, ১৬ঃ১-১৬)। তিনি ছিলেন কুরাইশ ও উত্তর আরবের আদনান বংশীয় অধিবাসীগণের আদি পিতা। তাঁহার জন্মের অল্প কিছুদিন পর পিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছায় তাঁহাকে ও তাঁহার মাতাকে বর্তমানে যেখানে কা’বা অবস্থিত- সেখানে এক জনমানবহীন মরুপ্রান্তরে রাখিয়া আসেন …………।
ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁহার প্রচার ক্ষেত্র কান’আন এলাকার দিকে চলিয়া গিয়াছিলেন। কিছুদিন পর তিনি আসিয়া দেখিলেন- ইসমাইল আলাইহিস সালাম কিছুটা বড় এবং পিতার সহিত চলাফেরা করিতে সক্ষম হইয়াছেন। তখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম একদা স্বপ্নে তাঁহাকে কুরবানী করিতে আদিষ্ট হন। জাগ্রত হইয়া তিনি পুত্রকে বলিলেন- “হে পুত্র আমি স্বপ্নে দেখিলাম- আমি তোমাকে কুরবানী করিতেছি, তুমি কি বলো?
তিনি বলিলেন- হে পিতা! আপনি যাহা করিতে আদিষ্ট হইয়াছেন, তাহাই করুন। আপনি, ইনশা-আল্লাহ আমাকে ধৈর্য্যশীল দেখিতে পাইবেন (৩৭ঃ ১০২)।” পুত্রকে কুরবানী করিবার উদ্দেশ্যে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এক প্রান্তরে (মিনা) উপস্থিত হইলেন। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম পুত্রের গলায় ছুরি চালাইবেন এমন সময় আল্লাহর তরফ হইতে আওয়ায শুনিলেন- “হে ইবরাহীম! তুমি তোমার স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করিয়াছো। আমি এই প্রকারেই সৎকর্মশীল ব্যক্তিদিগকে পুরস্কৃত করি । (৩৭ঃ ১০১-১০৫)।”

অতঃপর আল্লাহ ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে পুত্রের পরিবর্তে এক পশু দান করিলেন কুরবানীর জন্য (৩৭ঃ ১০৭)। তখন হইতে ইসমাঈল আলাইহিস সালাম যবীহুল্ল¬াহ নামে খ্যাত হইলেন। মুসলিম বিশ্ব তখন হইতে একই দিবসে সেই মহান কুরবানীর অনুষ্ঠান করিয়া থাকে আত্মোৎসর্গের প্রতীকরূপে।
কুরবানী সংক্রান্ত আয়াতে ইসমাঈল আলাইহিস সালামের নামটির উল্লে¬খ নাই। এই সুযোগে ইয়াহুদী ও খৃষ্টান লেখকগণ তাহাদের নিকটতম পূর্বপুরুষ, সারা রাযি.-এর গর্ভজাত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দ্বিতীয় পুত্র ইসহাক আলাইহিস সালামকে যবীহুল্লাহ নামে আখ্যায়িত করেন।
তাহাদের এই দাবি ভ্রান্ত। কারণ ইসহাক বাইবেলে উল্লেখিত (Thine only son Genesis, ২২ঃ২) ইবরাহীম আলাইহিস সালামের একমাত্র পুত্র নহেন। তাঁহার পূর্বে ইসমাঈলের জন্ম হইয়াছিলো। Genesis, ১৬ঃ১৬ অনুযায়ী ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ৮৬ বছর বয়সে ইসমাঈলের জন্ম এবং Genesis, ২১ঃ ৫ অনুযায়ী ১০০ বছর বয়সে ইসহাকের জন্ম।
সুতরাং ইসহাক তাঁহার প্রথম পুত্রও নহেন। যদি হইতেন- তাহা হইলে দ্বিতীয় পুত্রের জন্মের পূর্বক্ষণ পর্যন্ত তাঁহাকে একমাত্র পুত্র বলা হইতো। কুরআনের কথায় ইসহাকের জন্মের সুসংবাদ আসিয়াছিলো প্রথম পুত্র ইসমাঈলের জন্ম এবং কুরবানী অনুষ্ঠানের পর।
খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ একদা জনৈক ইসলামে দীক্ষিত ইয়াহুদীকে এই সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলেন- ইয়াহুদীরা জানে, ইসমাঈলই প্রকৃত যাবীহ। তবে তাহারা আপনাদের প্রতি ঈর্ষাবশত ইহা স্বীকার করে না।” (সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ- ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ পৃষ্ঠা-১৮৫-১৮৬)
ইসহাক আলাইহিস সালাম ইনি বাইবেলে উল্লেখিত Issac । তালমুদ (Rosh hash – shana, পৃষ্ঠা ১১) অনুসারে তাঁহার জন্ম হইয়াছিলো Foaest of passah -এর সময়। মুসলিম কিংবদন্তী অনুসারে তাঁহার জন্ম আশূরার রাত্রিতে। (আছ-ছা’লাবীঃ পৃ-৬০; আল-কিসাঈঃ পৃ-১৫০)
ইবরাহীম আলাইহিস সালামের নিয়ম এই ছিলো যে, কোনো দরিদ্র অর্থাৎ পথিক মেহমানরূপে উপস্থিত হইলে তবে তিনি তাহার সহিত আহার করিতেন। একদা কতিপয় ফিরিশতা মানুষের রূপ ধারণ করিয়া তাঁহার মেহমান হইলেন। তাঁহাদের আপ্যায়নের জন্য তিনি একটি ভর্জিত গো-বৎস পেশ করিলেন। তাঁহারা আহার্য্য গ্রহণ করিতেছেন না দেখিয়া তিনি বিস্মিত এবং কিঞ্চিৎ ভীত হইলেন।
মেহমানগণ তাঁহাকে জানাইলেন- তাহারা ফিরিশতা। লূত আলাইহিস সালামের অবাধ্য উম্মতকে শাস্তি দানের জন্য তাঁহারা প্রেরিত হইয়াছেন। অতঃপর ফিরিশতাগণ তাঁহাকে তাঁহার স্ত্রী সারার গর্ভজাত একটি পুত্র সন্তান লাভের সুসংবাদ প্রদান করেন।
সারা এই সুসংবাদ শ্রবণে অতিশয় আশ্চার্যন্বিতা হইলেন, (১১ঃ ৬৯-৭৩), কারণ তাঁহার বয়স ছিলো নব্বই এবং তাঁহার স্বামীর বয়স একশত বৎসর। ইহার পর ইসহাক আলাইহিস সালাম জন্মগ্রহণ করেন।
বাইবেলে উক্ত হইয়াছে- ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহর আদেশে ইসহাককে কুরবানী করিতে উদ্যত হইয়াছিলেন (Genesis, ২২ঃ২)। কিন্তু ইহা ভ্রমাত্মক, কারণ উক্ত শোকে Issac -কে Thine only son বলা হইয়াছে। অথচ ইসহাক-এর জন্মের পূর্বে ইসমাঈল ছিলেন only son। অন্যপক্ষে Issac যে ইবরাহীমের দ্বিতীয় পুত্র, বাইবেলের বর্ণনায় ইহাও সুস্পষ্ট। ইসমাঈলের বংশধরগণই সেই কুরবানীর আদর্শ আজ পর্যন্ত বজায় রাখিয়াছে, ইসহাক ও তৎপুত্র ইয়াকুবের বংশধর ইহাতে শরীক নহে।
ইসহাক আলাইহিস সালাম ফিলিস্তীনের হেবরন নামক স্থানে তাঁহার পৈতৃক আবাসস্থলেই বাস করিতেন (মাওদূদী, তাফহীমুল কুরআন; ২ঃ ৩৮১)। এখানে তিনি তাঁহার পিতার স্থলাভিষিক্তরূপে বসবাস করিতে থাকেন। তিনি যথাসময়ে নবুওয়াতপ্রাপ্ত হন। ইহার পুত্র ইয়াকুব আলাইহিস সালামের বাইবেলের Jacob ইসরাঈলীদের আদি পিতা।” (সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ- ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১/২০০-২০১)
তাছাড়া বাইবেলের সবচেয়ে বিশুদ্ধতম বর্ণনা- যা ‘ইঞ্জিলে বারনাবাস’ নামে প্রসিদ্ধ- তাতে ৪৩ ও ৪৪ নং অধ্যায়ে ঈসা আলাইহিস সালামের স্পষ্ট বাণী উল্লেখ রয়েছে যে, কুরবানীর ঘটনা ইসমাঈল আলাইহিস সালামের, ইসহাক আলাইহিস সালামের নয়।

এখানে ভিন্ন প্রসঙ্গে ড. হামীদুল্লাহ রহ.-এর একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৯৯৪ খৃষ্টাব্দের কথা। ড. হামীদুল্লাহ যখন এ বিষয়ের উপর ইয়াহুদীদের কিতাবসমূহ এবং ইতিহাসের তথ্যসমূহ থেকে প্রমাণ করে দিলেন, কুরবানীর ঘটনা ইসমাঈল আলাইহিস সালামেরই- তখন ইহুদী পন্ডিতগণ তাকে নির্জনে বলেছিলো, আপনার এই গবেষণা মেনে নিলে তো আমাদের পুরো মাযহাবই বাতিল হয়ে যাবে। ড. বলেছিলেন- সঠিক বিষয় পেশ করা আমার কাজ। দলীলের আলোকে আমি তা করেছি। এখন মানা না মানা আপনাদের কাজ।
(ড. মুহাম্মাদ হাদীদুল্লাহ কী বেহতরীন তাহরীরে, সংকলক- সাইয়্যেদ কাসেম মাহমুদ- ভূমিকাঃ পৃ-২৯-৩০, সাপ্তাহিক তাকবীর এর উদ্বৃতিতে)

ইসলামের ইতিহাসের আলোকেঃ
ইতিহাসের ক্রমধারায় সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত, কুরবানীর এই ঘটনা মক্কার হারাম এলাকায় সংঘটিত হয়েছে। কুরবানীর আদেশ পালনের সময় শয়তান যে তিনটি স্থানে কুমন্ত্রণা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলো এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালাম প্রত্যেকবার তাকে ৭টি করে কংকর নিক্ষেপ করেছিলেন, মূলত তারই স্মৃতিচরণে মিনার জামরাসমূহে কংকর নিক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর তখন থেকেই হজ্জের বিধান সমূহে কুরবানী অন্তর্ভুক্ত হয়। হজ্জ ছাড়াও জিলহজ্জ মাসে কুরবানী প্রথা আরবে (যারা ইসমাঈল এর বংশধর) পালিত হয়ে আসছে।
বলাবাহুল্য, মক্কার হারাম এলাকা ইসমাঈল আলাইহিস সালামের বাসস্থান ছিলো, ইসহাক আলাইহিস সালামের নয়। কেননা তিনি শাম (সিরিয়া) এলাকায় বসবাস করতেন।
সুতরাং হারাম এলাকায় কুরবানীর ঘটনা সংঘটিত হওয়া এবং আজ পর্যন্ত এর প্রচলন অব্যাহত থাকা এই কথার প্রমাণ করে যে, উক্ত ঘটনাটি ইসমাঈলের, ইসহাকের নয়। কুরবানীর আদর্শ ইসমাঈল বংশীয়দের মাঝে পালিত হয়, ইসহাক বংশীয়দের মাঝে নয়।
(ইবনে তাইমিয়া- মাজমু’আতুল ফাতাওয়াঃ ৪/৩৩৫-৩৩৬; ইবনুল কাইয়্যিম- যাদুল মা’আদ ফী মাসাইদিশ শায়তানঃ ২/৩৮৫; তাফসীরে উসমানী-শিব্বীর আহমাদ উসমানী, সূরা সাফফাত; সীরাতুন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-সাইয়্যেদ সুলাইমান নাদাবীঃ ১/৭৮-৮৬)

বিশুদ্ধ বর্ণনা সমূহ দ্বারা এই কথাও প্রমাণিত যে, ইসমাঈল আলাইহিস সালামের পরিবর্তে যে দুম্বাটি জবাই করা হয়েছিলো- তার শিং সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযি.-এর সময় পর্যন্ত কা’বা শরীফে সংরক্ষিত ছিলো। আল-আযরকী কৃত আখবারে মক্কায় এ বিষয়ে অনেক বর্ণনা বিদ্যমান রয়েছে। মক্কা বিজয়ের সময় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা ঢেকে রাখার নির্দেশ দেন। যেনো কোনো নামাজ আদায়কারীর মনোযোগে ব্যাঘাত না ঘটে। (সুনানে আবি দাউদ- কিতাবুল মানাসিকঃ ২/২৮৯-২৯০; মুসনাদে আহমাদঃ ৪/৬৮, ৫/৩৮০)
এর দ্বারাও প্রতীয়মান হয় যে, কুরবানীর ঘটনা শাম দেশে (সিরিয়া) নয়; বরং মক্কায় সংঘটিত হয়েছে। আর ইসহাক আলাইহিস সালাম নয়; বরং তা ইসমাঈল আলাইহিস সালামের সাথেই সংঘটিত হয়েছে। এজন্য ইবরাহীম ও ইসমাঈল কর্তৃক নির্মিত কাবা ঘরে তাঁর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে (ইসমাঈলের পরিবর্তে প্রদত্ত দুম্বার শিং) সংরক্ষণ করা হয়েছিলো। (তাফসীরুল কুরআনিল আযীম- ইবনে কাসীরঃ ৪/১৮, সূরা সাফফাত)

মণীষীগণের গবেষণার আলোকেঃ
প্রত্যেক যুগের গবেষকদের বিশ্লেষণ একটি দীর্ঘ আলোচনার দাবি রাখে। এখানে শুধু নমুনাস্বরূপ কয়েকজন ব্যক্তি ও কিতাবের নাম উল্লেখ করা হলো।

 সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন-
যার পরিবর্তে দুম্বা কুরবানী করা হয়েছে- তিনি ইসমাঈল। ইয়াহুদীরা তাকে ইসহাক বলে থাকে। এটা তাদের মিথ্যাচার। (তাফসীরে ইবনে কাসীরঃ ৪/১৯)
 তাবেয়ী মুহাম্মাদ ইবনে কা’ব আল-কুরাযী বলেন-
আল্লাহ তা’আলা ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে যে পুত্র কুরবানী করার আদেশ করেছেন- তিনি হলেন ইসমাঈল। এই বিষয়টি আমরা আল্লাহর কিতাবে (কুরআনুল কারীম) পেয়েছি। কেননা, আল্লাহ তা’আলা কুরবানীর ঘটনা উল্লেখ করার পর ইসহাক আলাইহিস সালামের আলোচনা করেছেন এবং অন্য স্থানে ইরশাদ করেছেন-
فَلَمَّا اعْتَزَلَهُمْ وَمَا يَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ وَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَكُلًّا جَعَلْنَا نَبِيًّا
অর্থঃ আমি ইবরাহীমকে ইসহাক ও ইসহাকের বংশে পৌত্র ইয়াকুবের সুসংবাদ প্রদান করেছি। (সূরা মারইয়াম-৪৯)
এরপরও তাঁকে যবেহ করার আদেশ কীভাবে দেওয়া যেতে পারে? নিঃসন্দেহে যবেহ করার আদেশ ইসমাঈল সম্পর্কেই ছিলো। (তাফসীরে ইবনে কাসীরঃ ৪/২০)
 মুহাম্মাদ ইবনে কা’ব আল-কুরাযি বর্ণনা করেন-
আমার উপস্থিতিতে তৎকালীন খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে জিজ্ঞাসা করা হলো, যাবীহ ইসমাঈল ছিলেন নাকি ইসহাক? তখন মজলিসে এমন এক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন- যিনি আগে ইয়াহুদী পন্ডিত ছিলেন, পরবর্তীতে পরিপূর্ণ মুসলমান হয়েছেন।
তিনি বললেন- আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহর শপথ, তিনি ইসমাঈলই ছিলেন। ইয়াহুদিরা এই বিষয়টি জানে, কিন্তু আরবদের প্রতি ঈর্ষাবশত এই দাবি করে যে, যাবীহ হলেন ইসহাক। (তাফসীরুত তাবারী- ইবনে জারীরঃ ১০/ ৫১৪)
 আসমায়ী একবার আবু আমর আল- আলা কে জিজ্ঞাসা করলেন- যাবীহ কে ছিলেন? তিনি উত্তরে বললেন-
তোমার বুদ্ধি-বিচার কোথায় গেলো! ইসহাক আলাইহিস সালাম কি কখনো মক্কায় ছিলেন? ইসমাঈল আলাইহিস সালামই তো পিতার সঙ্গে কাবা ঘর নির্মাণ করেছেন। আর কুরবানীস্থল তো মক্কায়! (আল-বাহরুল মুহীত- আবু হাইয়্যান উন্দুলুসীঃ সূরা সাফফাত)

এর পক্ষে যুক্তি-প্রমাণ নিম্নরূপ-
— কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা’আলা পুত্রের কুরবানীর সম্পূর্ণ ঘটনা উল্লেখ করার পর বলেন-
وبشرناه بإسحاق نبيا من الصالحين-
অর্থঃ আমি তাকে সুসংবাদ দিয়েছি ইসহাক আলাইহিস সালামের। তিনি সৎকর্মীদের থেকে একজন নবী হবেন। (সূরা সাফফাতঃ আ-১১২)
— এর দ্বারা পরিষ্কারভাবে বুঝা যায়, ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে যে পুত্রের কুরবানীর ব্যাপারে হুকুম করা হয়েছিলো- তিনি ইসহাক আলাইহিস সালাম ব্যতীত অন্য কোনো পুত্র ছিলেন। কারণ ইসহাক আলাইহিস সালামের সুসংবাদ তাঁর কুরবানীর ঘটনার পরে দেওয়া হয়েছে।
— ইসহাক আলাইহিস সালামের এই সুসংবাদ আরো উল্লেখ আছে যে, তিনি এক সময় একজন নবী হবেন। উপরন্তু অন্য আয়াতে উল্লেখ আছে, ইসহাক আলাইহিস সালামের সুসংবাদের সঙ্গে এই সংবাদও দেওয়া হয়েছিলো যে, তাঁর ঔরষে ইয়াকুব আলাইহিস সালাম জন্মগ্রহণ করবেন।

এতে পরিষ্কারভাবে বুঝা যায়, ইসহাক আলাইহিস সালাম সুদীর্ঘকাল জীবিত থাকবেন। তার সন্তানাদিও হবে। এমতাবস্থায় শৈশবে তাঁকেই যবেহ করার হুকুম দেওয়া যেতে পারে না।
যদি নবুওয়ত লাভের আগে শৈশবে তাঁকে যবেহ করার হুকুম দেওয়া হতো- তাহলে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের এই কথা অনুধাবন করার বাকী থাকতো না যে, তিনি (ইসহাক আলাইহিস সালাম) তো নবী হবেন। তার ঔরষে ইয়াকুব আলাইহিস সালামের জন্ম অবধারিত। তাই যবেহ করার দ্বারা তার মৃত্যু হতে পারে না। বলাবাহুল্য, এমতাবস্থায় এটা যে কোনো বড় পরীক্ষা হতো না বা এরূপ নির্দেশ পালন করে তিনি প্রশংসার যোগ্য হতেন না- তা স্পষ্ট।
পরীক্ষা তো তখনই সম্ভব ছিলো- যখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সম্পূর্ণভাবে এই কথা মনে করেই যবেহ করতেন যে, আমার আদরের দুলালকে যবেহ করার মাধ্যমে সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। আর এটা ইসমাঈল আলাইহিস সালামের ব্যাপারেই পুরোপুরিভাবে প্রযোজ্য। কেননা আল্লাহ তা’আলা তাঁর জীবিত থাকা এবং নবুওয়তপ্রাপ্তির কোনো ভবিষ্যদ্বাণী প্রদান করেননি।
— কুরআনুল কারীমের বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, যে পুত্রকে যবেহ করার হুকুম দেওয়া হয়েছিলো- তিনি ইবরাহীম আলাইহিস সালামের প্রথম সন্তান। কেননা তিনি নিজ দেশ থেকে হিজরত করার সময় একটি পুত্র সন্তানের জন্য দো’আ করেছিলেন।
এই দো’আর ফলেই তাকে সুসংবাদ প্রদান করা হয় যে, তার ঔরষে একজন সহনশীল পুত্র জন্মগ্রহণ করবে। সঙ্গে সঙ্গে এই কথাও বলে দেওয়া হয়েছে যে, যখন সেই পুত্র পিতার সঙ্গে চলাফেরার বয়সে উপনীত হলো- তখন তাকে যবেহ করার আদেশ করা হলো।
সুতরাং ঘটনার ধারাবাহিকতায় প্রতীয়মান হচ্ছে যে, ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কুরবানীকৃত পুত্র হলো তার প্রথম পুত্র। আর এটা সর্বজন স্বীকৃত যে, ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সর্বপ্রথম পুত্র হলেন ইসমাঈল আলাইহিস সালাম। আর ইসহাক আলাইহিস সালাম হলেন তাঁর দ্বিতীয় পুত্র। তাই এই কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কুরবানীকৃত পুত্র ছিলেন ইসমাঈল আলাইহিস সালাম; ইসহাক নয়।
— আল্লমা কাযী সানাউল্লাহ পানিপথী রহ. তাঁর রচিত তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে মাযহারীতে উল্লেখ করেছেন-
তাফসীরকার আতা এবং ইউসুফ ইবনে মালেক রহ. সাহাবী ইবনে আব্বাস রাযি.-এর কথার উদ্ধৃতি দিয়েছেন যে, যাকে কুরবানী দেওয়া হয়েছিলো- তিনি ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বৈ অন্য কেউ নয়। কারণ পুত্র কুরবানীর এই ঘটনা তো মক্কা মুকাররমার নিকটবর্তী এলাকায় সংঘটিত হয়েছিলো।
এই কারণেই আরবদের মধ্যে সর্বদা হজ্জের সময় কুরবানী করার নিয়ম প্রচলিত রয়েছে। এছাড়া ইবরাহীম আলাইহিস সালামের পুত্রের বিনিময়ে যে ভেড়া জান্নাত থেকে প্রেরিত হয়েছিলো- তার শিং বহু বছর যাবত কা’বা গৃহের অভ্যন্তরে ঝুলানো ছিলো।
— ইবনে কাসীর রহ. এর সমর্থনে একাধিক রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করেছেন এবং আমের শা’বীর এ উক্তিও বর্ণনা করেছেন যে, আমি কা’বাগৃহে এই ভেড়ার শিং স্বচক্ষে দেখেছি। সুফিয়ান রহ.বলেন-
ওই ভেড়ার শিং দীর্ঘকাল যাবত কা’বায় ঝুলানো ছিলো। হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের আমলে যখন কা’বা গৃহে অগ্নিকান্ড সংঘটিত হয়- তখন ওই শিং ভষ্মীভূত হয়ে যায়। কাজেই বলাবাহুল্য, মক্কায় ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বাস করেছিলেন, ইসহাক আলাইহিস সালাম নয়। তাই এটা সুস্পষ্ট যে, যবেহ করার হুকুম ইসমাঈল আলাইহিস সালামের সঙ্গে জড়িত ছিলো, ইসহাকের সঙ্গে নয়।

এখন যেসব রেওয়ায়াতে আছে যে, বিভিন্ন সাহাবী ও তাবেয়ী যবেহ করার আদেশকে ইসহাক আলাইহিস সালামের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। সেগুলো সম্পর্কে প্রসিদ্ধ তাফসীরকার আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. লিখেন-
আল্লাহ তা’আলা ভালো জানেন। কিন্তু বাহ্যত মনে হয়, এসব উক্তি কা’ব ইবনে আহবার রহ. থেকে গৃহীত হয়েছে। কারণ তিনি সাহাবী ওমর রাযি.-এর খেলাফতকালে ইসলাম গ্রহণ করে ওমর রাযি.-কে তার প্রাচীন গ্রন্থাদির বিষয়বস্তু শুনাতে শুরু করেন।
মাঝে মাঝে খলিফা তার কথাবার্তা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। এতে অন্যরাও সুযোগ পেয়ে যান এবং তারাও তার রেওয়ায়াত শুনে তা বর্ণনা করতে শুরু করেন। এসব রেওয়ায়াতে সত্য-মিথ্যা সব বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত থাকতো।
আল্লামা ইবনে কাসীর রহ.-এর উপরোক্ত বক্তব্য খুবই যুক্তিসংগত মনে হয়। কারণ ইসহাক আলাইহিস সালামকে যবেহ করার আদেশের সাথে জড়িত করার বিষয়টি ইসরাঈলি রেওয়ায়াতের ওপরই ভিত্তি করে হয়েছে। এই কারণেই ইয়াহুদী ও খৃস্টান সম্প্রদায় ইসহাক আলাইহিস সালামকে যবেহ করার আদেশের সাথে জড়িত করে। বর্তমান বাইবেলে ঘটনাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে- এসব বিষয়ের পর খোদা ইবরাহীমের পরীক্ষা নিলেন এবং তাঁকে বললেন-
হে ইবরাহীম! তিনি বললেন- আমি উপস্থিত আছি। তখন খোদা বললেন- তুমি তোমার একমাত্র আদরের পুত্র ইসহাককে সাথে নিয়ে সিরিয়া দেশে যাও এবং সেখানে আমি যে পাহাড়ের কথা বলবো- সে পাহাড়ে তাকে কুরবানীর জন্য পেশ করো। (জন্মঃ ২২.১ ও ২)
এখানে যবেহ করার ঘটনাকে ইসহাক আলাইহিস সালামের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু বিবেকের দৃষ্টিতে দেখলে এবং তথ্যানুসন্ধান করলে পরিষ্কার বোঝা যায়, ইয়াহুদীরা তাদের ঐতিহ্যগত বিদ্বেষকে কাজে লাগিয়ে তাওরাতের শব্দ পরিবর্তন করে দিয়েছে। কারণ জন্ম অধ্যায়ের উপরোক্ত বাক্যগুলোতেই “তোমার একমাত্র পুত্র” কথাটি ব্যক্ত করেছে যে, কুরবানীর হুকুমের সাথে জড়িত পুত্র ইবরাহীম আলাইহিস সালামের একমাত্র পুত্র ছিলো। এই অধ্যায়েই আরো আছে- তুমি তোমার একমাত্র পুত্রকেও আমার জন্য উৎসর্গ করতে দ্বিধা করো না। (জন্ম: ২২.১২)

উক্ত বাক্যেও সুস্পষ্ট বলা হয়েছে যে, সে পুত্র ছিলো ইবরাহীম আলাইহিস সালামের একমাত্র পুত্র। এদিকে এটা সর্বসম্মত যে, ইসহাক তাঁর একমাত্র পুত্র ছিলেন না। একমাত্র পুত্র বলতে ইসমাঈল আলাইহিস সালামই ছিলেন। এর বিপরীতে ইসহাক কোনো দিনই পিতার একমাত্র সন্তান ছিলেন না।
এরপর জন্ম গ্রন্থের ২২তম অধ্যায়ে পুত্র কুরবানীর আলোচনায় “একমাত্র” শব্দটি পরিষ্কার সাক্ষ্য দেয় যে, ইসমাঈল আলাইহিস সালামই একমাত্র পুত্র এবং কোনো ইয়াহুদী হয়তো এর সাথে ‘ইসহাক’ শব্দটি জুড়ে দিয়ে থাকবে। আর এই জুড়ে দেওয়ার একমাত্র কারণ হচ্ছে- ইসমাঈল বংশের পরিবর্তে ইসহাক বংশের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা।
হাফেয ইবনে কাসীর রহ. এবং কাজী সানাউল্লাহ পানিপথী রহ. তাদের তাফসীর গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, ওমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.-এর শাসনামলে জনৈক ইয়াহুদী আলিম ইসলাম গ্রহণ করলে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাকে জিজ্ঞেস করলেন- ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর কোন পুত্রকে যবেহ করার হুকুম হয়েছিলো?
সে বললো- আল্লাহর কসম! আমীরুল মু’মিনীন, সে পুত্র ছিলো ইসমাঈল আলাইহিস সালাম। ইয়াহুদীরা এটা ভালোভাবেই জানে। কিন্তু প্রতিহিংসাবশতঃ তারা অন্যরকম বলে। (তাফসীরে মাযহারীঃ খন্ড-৮)
উপরোক্ত প্রমাণাদির আলোকে এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, ইসমাঈল আলাইহিস সালামকেই যবেহ করার হুকুম হয়েছিলো। ইসহাক আলাইহিস সালামকে নয়।
(তাফসীরে মাযহারী- কাযী সানাউল্লাহ রহ.; তাফসীরে কাবীর- ইমাম রাযী রহ.; তাফসীরে আবী সাঊদ রহ.; তাফসীরে মা’আরিফুল কুরআন; তাফসীরে নূরুল কুরআন)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.