রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রোযা পালনের পদ্ধতি- সাইয়িদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.

0
334
النبي ص
النبي ص

দ্বিতীয় হিজরীতে রোযা ফরয হয়। সে হিসেবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনে নয়টি রমযান মাস পেয়েছেন এবং এ নয়টি রমযানেই যথাযথভাবে রোযা রেখেছেন। রোযার বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসৃত পদ্ধতি একদিক দিয়ে যেমন ছিল পূর্ণাঙ্গ একটি পদ্ধতি এবং নফসের সংশোধন ও আল্লাহর আনুগত্য এবং দাসত্ব প্রকাশের কল্যাণকর ও কার্যকর একটি মাধ্যম, অন্যদিকে এটি পালন করারও রয়েছে খুবই সহজ ও সরলতম পদ্ধতি। এবার দেখা যাক, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাস কীভাবে কাটাতেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাসে বিভিন্ন ধরনের ইবাদতের মাত্রা বাড়িয়ে দিতেন। হযরত জিবরাঈল আসতেন, তিনি তেলাওয়াত করতেন, হযরত জিবরাঈল শুনতেন। হযরত জিবরাঈল তেলাওয়াত করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুনতেন। এভাবে কুরআনুল কারীমের সম্পূর্ণ দাওর বা শোনাশুনি তাঁরা শেষ করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনিতেই ছিলেন দানশীল। কিন্তু রমযানে হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম যখন আসতেন, তখন তাঁর এ দানশীলতা আরোও বেড়ে যেত।
রমযান মাসে তিনি এমন বহু ইবাদত করতেন, যা রমযানের বাইরে অন্য সময় সাধারণত করতেন না। অনেক সময় তিনি একাধারে কোনে কিছু ইফতার না করে কয়েকদিন একসাথে রোযা রাখতেন। এটাকে বলা হয় ‘মুসালসাল রোযা’ বা মাঝে কোনো সময় ইফতার না করে একাধারে কয়েকদিন একসাথে রোযা রাখা। কিন্তু নিজে এ ধরনের রোযা রাখলেও সাহাবীদের এ রোযা রাখতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। সাহাবীগণ যখন আবেদন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি নিজে তো এ ধরনের রোযা করেন; আমরা কি করতে পারব না!
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বলেছিলেন, আমি তো তোমাদের মতো নই। আমি তো আমার রবের কাছে এমনভাবে রাত দিন কাটাই, তিনিই আমাকে খাওয়ান এবং তিনিই আমাকে পান করান।

1527500546353
Sahri in Ramadan

রমযানে সাহরি খাওয়ার প্রতি তিনি খুবই উৎসাহিত করতেন। সাহরি খাওয়াকে তিনি মুসলমানদের জন্য সুন্নাত হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। হযরত আনাস রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা সাহরি খেয়ো। কারণ, সাহরিতে বরকত নিহিত রয়েছে। সহীহ বর্ণনায় আছে, তিনি বলেন, কিতাবিদের রোযা আর আমাদের রোযার মধ্যে পার্থক্য হলো, আমরা সাহরি খাই, আর তারা সাহরি খায় না।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইফতারি গ্রহণে দেরি করতে নিষেধ করেছেন এবং একে ইহুদি-খ্রিস্টানদের বৈশিষ্ট্য এবং অকল্যাণকর বলে অভিহিত করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুসলিমরা ততদিন কল্যাণ ও মঙ্গলের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, যতদিন তারা সময় হয়ে গেলে দ্রুত ইফতারি গ্রহণ করবে। আরো বলেন, এই দীন ততদিন বিজয়ী থাকবে, যতদিন মুসলমানরা দ্রুত ইফতারি গ্রহণ করবে। কেননা, ইহুদি ও খ্রিস্টনরা ইফতারির বিষয়ে দেরি করে।
পক্ষান্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণ ইফতারির ক্ষেত্রে দেরি না করে সাহরির বেলায় দেরি করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিবের নামাযের আগেই ইফতার করতেন। তাব বা তাজা খেজুর যদি পেতেন, তা দিয়ে ইফতার করতেন। এ খেজুর না থাকলে শুকনো খেজুর খেতেন। তাও না থাকলে এক ঢোক পানি খেয়েই ইফতার করে নিতেন। সে সময় এই দুআ পড়তেন-

اَللّٰهُمَّ لَكَ صُمْتُ، وَعَلٰى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ.

অর্থ : হে আল্লাহ, আপনার জন্যই রোযা রেখেছি এবং আপনার দেওয়া রিজিক দ্বারাই ইফতার করছি।
আরও বলতেন-

ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوْقُ وَثَبَتَ الْأَجْرُ اِنْ شَاءَ اللهُ.

অর্থ : পিপাসা মিটে গেছে, শরীরের শিরা-উপশিরাও আর্দ্র হয়ে গেছে। আর আল্লাহ চান তো পুরস্কারও নির্ধারিত হয়ে গেছে।

maxresdefault 3
Iftari and doa

রমযান মাসে তিনি সফরও করেছেন। সফরের সময় কখনো কখনো রোযা রেখেছেন, আবার কখনো রাখেননি। সফর অবস্থায় সাহবীদের তিনি রোযা রাখা না-রাখার স্বাধীনতা দিয়েছেন। জিহাদের সম্মুখীন হলে সাহাবীদের রোযা না রাখার নির্দেশ দিতেন। যাতে যুদ্ধ করার শারীরিক শক্তি অটুট থাকে। রমযান মাসেই ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও ফলাফলের নির্ণায়ক লড়াই বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। মক্কা বিজয়ের ঘটনাও ঘটেছিল রমযানে।
রমযানে তিনি তিন দিন তারাবির নামায পড়েছিলেন। জামাতের সংবাদ পেয়ে বহু লোক এসে এতে শরিক হতে থাকেন। চতুর্থ দিন এত ভিড় হয়ে যায়, মসজিদে আর জায়গা হচ্ছিল না। এ রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর তারাবিহ পড়াননি। একেবারে ফজরের সময় ঘর থেকে বের হলেন। নামায শেষে উপস্থিত মুসল্লিদের দিকে ফিরে আল্লাহর প্রশংসার পর বললেন, আজ রাতে তোমাদের ব্যাপক উপস্থিতি সম্পর্কে আমি অবহিত ছিলাম। কিন্তু আমার আশঙ্কা হলো, না জানি এ নামায তোমাদের ওপর ফরয করে দেওয়া হয়। ফরয করে দেওয়া হলে হয়তো তোমরা আর সক্ষম হবে না। কুলিয়ে উঠতে পারবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকাল পর্যন্ত বিষয়টি এভাবেই ছিল।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর সাহাবীগণ নিয়মিতভাবে তারাবির জামাত প্রতিষ্ঠিত করেন এবং এটি সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলেও পরিগণিত।

Sholat Tarabih in Masjid e Istiqlal Indonesia 2
Sholat Tarabih in Indonesia

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক নফল রোযা রাখতেন। কোনো কোনো সময় তা ত্যাগও করেছেন। যখন নফল রোযা রাখতে শুরু করতেন, তখন মনে হতো তিনি আর কখনো এটি ছাড়বেন না। আবার যখন রোযা রাখা স্থগিত থাকত, মনে হতো তিনি বুঝি আর কখনো এ নফল রোযা রাখবেন না। তবে রমযানের বাইরে পূর্ণ কোনো মাস তিনি রোযা রাখেননি। অন্যান্য মাসের মধ্যে শাবান মাসে সবচেয়ে বেশি রোযা রাখতেন। তিনি নফল রোযা রাখতেন প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার এবং এর খুবই গুরুত্ব দিতেন। হযরত ইবনে আব্বাস রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে হোক বা বাড়িতে—কোনো অবস্থাতে তিনি ‘আইয়ামে বিয’ অর্থাৎ প্রতি আরবী মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোযা বাদ দিতেন না। অন্যদেরও তিনি এর জন্য উৎসাহিত করতেন। রমযানের রোযার পর তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন আশুরার রোযার। সাহাবীগণ একবার বলেছিলেন, এ দিনটি তো ইহুদি ও খ্রিস্টানদের পবিত্র দিন। অর্থাৎ আমাদের এ সময় রোযা রাখাটা কেমন হবে? রাসূল উত্তরে বললেন, আগামী বছর যদি সুযোগ পাই, তবে নবম তারিখের রোযাও আমি এর সাথে রাখব। অর্থাৎ এতে করে আমাদের রোযা হবে দুটি। ইহুদি-খ্রিস্টানরা রাখে একটি। তখন তাদের রোযার সাথে আমাদের রোযার মিল থাকবে না।
তিনি আরাফা দিবসে রোযা রাখতেন না। সওমে দাহর বা নিরবচ্ছিন্নভাবে দিনের পর দিন নফল রোযা রাখার রীতিও তাঁর ছিল না। সহীহ হাদীসে আছে, তিনি বলেছেন, (নফল রোযার ক্ষেত্রে) আল্লাহর কাছে প্রিয় রোযা হলো হযরত দাউদ আলাইহিস সালামের রোযা। তিনি একদিন রোযা রাখতেন, আরেকদিন রাখতেন না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাধারণ আরেকটি অভ্যাস ছিল, ঘরে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে জানতেন খাবার-খাদ্য কিছু আছে কি না। যদি জানতে পারতেন তেমন কিছু নেই, তখন বলতেন, ঠিক আছে, আজ রোযা রেখে দিলাম।
ইন্তেকাল পর্যন্ত রমযানে শেষের দশ দিন ইতেকাফ করতেন। একবার কোনো কারণে রমযানে ইতেকাফ আদায় করতে না পারায় শাওয়াল মাসে সেটা পূরণ করেন। প্রতি বছরই দশ দিনই ইতেকাফ করতেন। তবে ইন্তেকালের বছরে বিশ দিন ইতেকাফ করেছিলেন। আবার প্রতি রমযানে হযরত জিবরাঈল একবারই পুরো কুরআন শরীফের খতম করতেন, কিন্তু ইন্তেকালের বছর দুবার খতম করেছিলেন।

তথ্যসূত্র: ইসলামী জীবনের রূপরেখা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.