লাল জামার কাহিনি

0
646
Islamic world. History
Islamic world. History

আব্বাসীয় খলিফা মনসুর একরাতে তাওয়াফ করছিলেন। হঠাৎ একটি করুণ সুরের আওয়াজ তার কানে ভেসে এলো। তিনি দেখতে পেলেন, একজন কেঁদে কেটে আল্লাহ তা’আলার কাছে মুনাজাত করছে। লোকটি বলছে- হে আল্লাহ! আমি এই জুলুম অত্যাচারের বিরুদ্ধে আপনার দরবারে ফরিয়াদ করছি। যে লোভের কারণে মানুষ প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে- তার বিরুদ্ধে ফরিয়াদ করছি। লোকটির চোখের পানি তার দাঁড়ি বেয়ে বেয়ে ঝরছে। এ দৃশ্য দেখে মনসুর আর স্থির থাকতে পারলেন না। তার মনে হলো- এই লোকটি তার বিরুদ্ধেই দো’আ করছে। মনসুর সেখান থেকে সরে এলেন। মসজিদুল হারামে এসে দু রাকাত সালাত আদায় করলেন। এরপর প্রহরীদের পাঠালেন লোকটিকে খুঁজে নিয়ে আসার জন্য। তারা গিয়ে লোকটিকে নিয়ে এলো।
নুরানি চেহারার এক বুজুর্গ ব্যক্তি। ধীর পায়ে তিনি খলিফার সামনে হাজির হলেন। আদবের সাথে তাকে সালাম করলেন। খলিফা সালামের জওয়াব দিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন- আচ্ছা, আমাকে একটু বলুন তো কার যুলুমের বিরুদ্ধে আপনি এভাবে দো’আ করছিলেন? কে সেই লোভী- যার লোভের কারণে মানুষ তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে?? আমাকে একটু খুলে বলুন। আপনার কথাগুলো শোনার পর মনে হয় আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছি। খলিফা অস্থির হয়ে তাকে প্রশ্ন করছিলেন।

খলিফার প্রশ্নের জওয়াবে তিনি মুখ খুললেন। তার ভয় হচ্ছিলো- খলিফা তাঁর কথা শোনার পর হয়তো তাঁকে শাস্তি দিতে পারেন। এমনকি কতলও করতে পারেন। তাই তিনি খলিফার কাছে নিরাপত্তার প্রতিশ্র“তি চাইলেন। খলিফা তাঁকে অভয় দিলেন। খলিফার আশ্বাস পেয়ে তিনি বলতে শুরু করলেন। তিনি বললেন- যার অত্যাচারের বিরুদ্ধে আমি দো’আ করছিলাম এবং যার লোভের কারণে মানুষ অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, সেই ব্যক্তিটি হচ্ছেন আপনি। এ কথা শুনে খলিফা বেশ ক্রুদ্ধ হলেন। কিছুটা অবাকও হলেন। তিনি বললেন- ওরে নির্বোধ! ধন-সম্পদ, ঐশ্বর্য সবতো আমার হাতের মুঠোয়। এরপরও আমার আবার কীসের লোভ থাকতে পারে?
বুজুর্গ লোকটি বললেন- সবচেয়ে বড় লোভ তো আপনার ভিতরে। আল্লাহ তা’আলা আপনাকে মুসলমানদের আমীর বানিয়েছেন অথচ আপনি তাদের ভুলে গিয়ে ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়েছেন। নিজের চারপাশে আপনি ইটের দেয়াল, লোহার ফটক এবং সশস্ত্র প্রহরীদের দিয়ে আড়াল তৈরি করে রেখেছেন। বিশেষ কিছু লোক ছাড়া কেউ আপনার কাছে যেতে পারে না। যারা ক্ষুধার্ত-অসহায়, তাদের আর্তনাদ আপনার কানে পৌঁছায় না। আপনি কড়া হুকুম দিয়ে তাদের বাধা দিয়ে রেখেছেন।

আপনার উদাসীনতা দেখে আপনার কর্মচারিরাও কাজে অবহেলা করতে শুরু করেছে। তারা ভেবেছে, স্বয়ং খলীফা যেখানে আল্লাহ তা’আলার খেয়ানত করছেন, তাহলে আমরা তাঁর খেয়ানত করতে অসুবিধা কোথায়? তারা ঠিক করে নিয়েছে, তাদের ইচ্ছা ছাড়া কারো অভিযোগ যেনো আপনার কানে না পৌঁছে।
তাহলে তারা ইচ্ছামতো লুটপাট করতে পারবে। এভাবে তারা সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার শুরু করেছে। ফলে মানুষ তাদেরকে ভয় পেতে শুরু করেছে। তাদেরকে খুশি রাখার জন্য ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে। তাদের অত্যাচারে দেশের মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। তাদের অভিযোগ শোনার মতো আর কেউ থাকেনি। আপনার উপস্থিতিতে আপনার খেলাফতে অন্যায় ছড়িয়ে পড়েছে। মুসলমানরা মুসলমানদের উপর যুলুম শুরু করেছে।
আমীরুল মুমিনীন! তাহলে বলুন- ইসলামের আর কী বাকি রইলো?

আমীরুল মুমিনীন! শুনুন, আমি একবার চীনে গিয়েছিলাম। তাদের সম্রাটের শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। তিনি দুঃখ করছিলেন আর কাঁদছিলেন। তার সভাসদরা তাকে সান্তনা দিচ্ছিলো। তখন তিনি বললেন- শোনো! আমার কান নষ্ট হয়ে গেছে, এজন্য আমি কাঁদছি না। আমি তো কাঁদছি এজন্য যে, আমার দরবারে এসে কোনো মাযলুম সাহায্য চাইবে, কিন্তু আমি তার কথা শুনতে পারবো না। তখন আমি কিভাবে তাকে সাহায্য করবো? তবু যাক, আমার কান নষ্ট হয়েছে, কিন্তু আমার চোখ তো ঠিক আছে। তোমরা সবাইকে বলে দাও কোনো অসহায়-দুঃখী কেউ থাকলে সে যেনো লাল রঙের জামা পরিধান করে। তাহলে আমি তাকে চিনতে পারবো।
এরপর থেকে তিনি হাতির পিঠে চড়ে বেড়াতেন আর খুঁজতেন অভাবী বা দুঃখী কেউ আছে কিনা। লাল জামা পরা কাউকে দেখলে তাকে সাহায্য করতেন।
আমীরুল মুমিনীন! সে একজন অমুসলিম বাদশাহ অথচ প্রজাদের জন্য তার মনে কত দয়া। আর আপনি মুসলমানদের খলীফা, আল্লাহর নবীর উত্তরসূরী। তবু আপনি তার থেকে পিছিয়ে আছেন।
আমীরুল মুমিনীন! আপনি কি ভাবছেন যে, আপনি আপনার সন্তানদের জন্য ধন-সম্পদ জমা করছেন? তাহলে শুনে রাখুন, ধন-সম্পদ দান করার মালিক আপনি নন। কাউকে ধন-সম্পদ একমাত্র তিনিই দেন। মায়ের উদর থেকে যে শিশু ভুমিষ্ট হয়, তার তো কোনো কিছু থাকে না। কিন্তু আল্লাহ তা’আলা একদিন তাকে ধনী বানিয়ে দেন।
আপনি কি মনে করছেন যে, আপনি নিজেকে শক্তিশালী করার জন্য এসব করছেন, তাহলে বনু উমাইয়ার ঘটনা থেকে শিক্ষা নিন। তারাও বহু অর্থের মালিক ছিলো, কিন্তু তাদের পরিণাম আল্লাহ তা’আলা যা চেয়েছেন, তাই হয়েছে।

মনসুর লোকটির কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। খলীফার লোকজন অবাক হচ্ছিলো লোকটির সাহস দেখে। এরপর লোকটি বললেন-
আমীরুল মুমিনীন! কেউ কোনো অপরাধ করলে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে আপনি তাকে শুধু মৃত্যুদণ্ড দিতে পারেন, কিন্তু সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা’আলা যাকে শাস্তি দেন, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন না; বরং তাকে চিরদিনের জন্য আযাবে নিপতিত করেন। তিনি সর্বদর্শী সর্বজ্ঞ। আপনার সবকিছু সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন। একটু ভেবে দেখুন তো, যেদিন তিনি সবার হিসাব নিবেন, সেদিন আপনার ক্ষমতা, আপনার ধন-সম্পদ আপনার কী কাজে আসবে?

এ কথা শুনার পর খলীফা মনসুর কাঁদছিলেন আর বলছিলেন- হায়! আমার কি দুর্ভাগ্য। হায়! আমার যদি অস্তিত্বই না হতো। তাঁর দু চোখ বেয়ে তখন অনুতাপের অশ্র“ ঝরছিলো। এরপর লোকটি বললেন-
আমীরুল মুমিনীন! জনগণের মাঝে যারা জ্ঞানী গুণী তাদেরকে আপনার সভাসদ বানান । রাষ্ট্রীয় কাজে তাদের কাছে পরামর্শ চান। আপনার দরবার সবার জন্য উম্মুক্ত করে দিন। গরীব অসহায়দের সাহায্য করুন। যাকাত এবং খাজনা সঠিক পরিমাণে উসূল করুন। হকদারদের মাঝে ইনসাফের সাথে তা বিলিয়ে দিন। তাহলে হয়তো দেশে শান্তি ফিরে আসবে। আল্লাহ তা’আলার আযাব থেকে আপনিও রেহাই পাবেন ।
এরপর আযান হলো। সবাই সালাত আদায় করার জন্য চলে গেলো। লোকটিও চলে গেলেন। সালাত আদায়ের পর মনসুর তাঁকে আবারো খুঁজলেন। কিন্তু তাঁকে আর পাওয়া যায়নি।
এমনই ছিলেন সে যুগের শাসক এবং আলিম। খলীফাকে হক কথা বলতে তিনি ভয় পাননি। আর খলীফাও নিজের ভুল স্বীকার করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি।

অনুবাদঃ নাজমুস সাকিব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.