শরীয়তের বিধান চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল- জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর নয়

0
1036
beautiful moon landscape
beautiful moon landscape

আধুনিক কিছু চিন্তাবিদ চাঁদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিধান সমূহকে চাঁদ দেখার উপর নির্ভরশীল না করে ক্যালেন্ডার ভিত্তিক করে দেওয়ার জন্য মতামত দিয়ে থাকেন। তাদের এই মতামত বাহ্যিকভাবে চমৎকার হলেও তা নিতান্তই বাতিল ও পরিতাজ্য। তাদের এই মতামতটি শরীয়তের নীতি ও মেযাজ এবং কুরআন ও হাদীসের স্পষ্ট নির্দেশনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কেউ যদি মনে করে- তাদের এই সমাধান শরীয়তসম্মত- তাহলে তা অমূলক দাবি। সংশ্লিষ্ট আয়াত ও হাদীসের তাহরীফ ও অপব্যখ্যা ছাড়া এই দাবি কুরআন-হাদীস দ্বারা প্রমাণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এসব আধুনিক চিন্তাবিদগণ যতই রব তুলুন না কেনো- এর সামান্যতম মূল্যও শরীয়তে নেই। 

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সমগ্র মুসলিম উম্মাহ ও চারো মাযহাবের ইমামগণের সর্বসম্মতিক্রমে চাঁদ দেখার সাথে সংশ্লিষ্ট ইবাদাতগুলো চাঁদ দেখা যাওয়ার সাথে সংযুক্ত। চাঁদের অস্তিত্ব লাভ কিংবা আকাশে চাঁদের বিদ্যমান থাকার সাথে তা সংযুক্ত নয়। জ্যোতির্বিজ্ঞান কিংবা মহাকাশবিদ্যার সাথেও এর কোনো সম্পর্ক নেই।

আল্লামা শা’রানী রহ. বলেন- اتفق الأئمة الأربعة على أنه لا اعتبار بمعرفة الحساب والمنازل

চারো মাযহাবের ইমাম এ বিষয়ে একমত যে, চাঁদের সাথে সংশ্লিষ্ট ইবাদাতগুলো কার্যকর হওয়ার জন্য অংকশাস্ত্র এবং হিসাবের কোনো ধর্তব্য নেই। (শা’রানী- আল মীযানুল কুবরাঃ ২/ ২২)

ফতোয়ায়ে শামীতে বলা হয়েছে- لا عبرة بقول المؤقتين فى الصوم

রোযা শুরু করার জন্য সময় নির্ধারণকারীদের কথার কোনো ধর্তব্য নেই। (ফতোয়ায়ে শামীঃ ৩/ ৩৫৪)

অর্থাৎ, ইসলামের যেসব বিধি-বিধান চাঁদের সাথে সংশ্লিষ্ট- শরীয়ত সেগুলো কার্যকর হওয়ার শর্তযুক্ত করেছে চাঁদ দৃষ্টিগোচর হওয়ার সাথে। চাঁদ দৃষ্টিগোচর হওয়ার সম্ভাবনা কিংবা চাঁদের অস্তিত্ব লাভের সাথে নয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব দিয়ে তা নির্ণয় করার সাথেও এর কোনো সম্পর্ক নেই।

কেননা যদি চাঁদ দৃষ্টিগোচর হওয়ার সম্ভাব্য সময় অগ্রীম নির্ধারণ করা সম্ভবও হয়, তবুও দৃষ্টিগোচর হওয়া এবং এর সম্ভাবনা এক নয়।

প্রমাণ

– হাদীসে ইরশাদ হয়েছে-

لا تصوموا حتى تروا الهلال, ولا تفطروا حتى تروه- فإن غم عليكم فاقدروا له

অর্থঃ তোমরা চাঁদ না দেখা পর্যন্ত রোযা রেখো না এবং চাঁদ না দেখে ইফতারও করো না। যদি কোনো কারণে চাঁদ গোপন থাকে- তাহলে গণনা করে মাস পূর্ণ করো। (সহীহুল বুখারীঃ হা-১৯০৬, সহীহ মুসলিমঃ হা-১০৮০)

আরো ইরশাদ হয়েছে- صوموا لرويته و أفطروا لرويته-

অর্থঃ তোমরা চাঁদ দেখে রোযা রাখো। আবার চাঁদ দেখে ইফতার করো (ঈদ উদযাপন করো)।

(সহীহুল বুখারীঃ হা-১৯০৯, সহীহ মুসলিমঃ হা-১০৮০, সুনানে তিরমিযীঃ হা-৬৮৪)

– তিরমিযী শরীফে অন্য সনদে বর্ণিত উপরোক্ত হাদীসের পরে বলা হয়েছে- فإن حالت دونه غياية, فأكملوا ثلاثين يوما-

অর্থাৎ, যদি চাঁদের সামনে মেঘখন্ড প্রতিবন্ধক হয়- তাহলে ৩০ দিন পূর্ণ করো। (সুনানে তিরমিযীঃ হা- ৬৮৮)

এই হাদীস দ্বারা স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, চন্দ্রমাস প্রমাণিত হওয়া নির্ভর করে চাঁদ দেখার ওপর, এর অস্তিত্বের ওপর নয়। শুধুমাত্র হিসাবের মাধ্যমে চাঁদ দিগন্তে থাকা বা না থাকার সিদ্ধান্ত দিয়ে মাস প্রমাণিত হতে পারে না। অতএব যদি দিগন্তে চাঁদ বিদ্যমান থাকে, কিন্তু কোনো কারণে দেখা না যায়, তাহলে শরয়ী আহ্কামে এই অস্তিত্ব ধর্তব্য হবে না।

– মুফতী শফী সাহেব রহ. স্বীয় পুস্তিকা রুইয়াতে হেলালে’ (পৃষ্ঠা-১৫) মাসআলা চাঁদের অস্তিত্বের নয়; বরং দেখা ও প্রত্যক্ষ করা’ শিরোনামে উপরোক্ত দুটি হাদীস উল্লেখ করার পর এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেন-

আলোচ্য হাদীস দুটি হাদীসের অন্য সব নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ সমূহেও বিদ্যমান রয়েছে। এগুলোর উপর কোনো মুহাদ্দিস আপত্তি করেননি এবং এই দুটি হাদীসে রোযা রাখা এবং ঈদ করার নির্ভরতা রেখেছেন চাঁদ দেখার ওপর।  روية শব্দটি আরবী শব্দ। এর অর্থ হলো- কোনো বস্তুকে চোখ দ্বারা দেখা।

এছাড়া অন্য কোনো অর্থে যদি ব্যবহার করা হয়- তবে সেটি প্রকৃত অর্থ নয়, বরং রূপক। সুতরাং হাদীসের মূল অর্থ হলো- শরীয়তের যেসব বিধি-বিধান চাঁদ দেখার সাথে সংশ্লিষ্ট- সেগুলোতে চাঁদ দেখা যাওয়ার অর্থ হলো- সাধারণভাবে তা চোখে পরিদৃষ্ট হওয়া। এর দ্বারা বুঝা গেলো- শরীয়তের আহ্কামের নির্ভরশীলতা দিগন্তে চাঁদের অস্তিত্বের ওপর নয়; বরং চাঁদ দেখার ওপর।

– হাদীসের এই মর্মার্থকে এই হাদীসেরই শেষ বাক্যটি আরো স্পষ্ট করে দিয়েছে। যথা ইরশাদ হয়েছে-

যদি চাঁদ তোমাদের থেকে গোপন থাকে অর্থাৎ, যদি তোমরা চোখ দ্বারা দেখতে না পাও- তাহলে তোমাদের ওপর এই দায়িত্ব চাপানো হয়নি যে, অংকের হিসাব লাগিয়ে চাঁদের অস্তিত্ব জেনে নাও এবং এর উপর আমল করো। অথবা টেলিস্কোপ বা দূরবীণের মাধ্যমে এর অস্তিত্ব প্রত্যক্ষ করো; বরং তিনি বলেছেন- যদি তোমাদের থেকে চাঁদ গোপন থাকে, তাহলে ৩০দিন পূর্ণ করে মাস শেষ মনে করো।

এখানে غم শব্দটি বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। এর আভিধানিক অর্থ আরবী বাগধারায় “কামূস” ও “শরহে কামূস” সূত্রে এই-

غم- غم الهلال على الناس غمّا إذا حال دون الهلال غيم رقيق أو غيره, فلم ير الهلال على الناس

উক্ত বাক্যটি তখন বলা হয়- যখন নতুন চাঁদের মাঝে মেঘ বা অন্য কোনো বস্তু প্রতিবন্ধক হয়ে যায়, আর চাঁদ দেখা যায় না। কারণ কোনো কিছু গোপন হওয়ার জন্য তা অস্তিত্বে থাকা আবশ্যক। যে  বস্তুর কোনো অস্তিত্বই নেই, সেটাকে অস্তিত্বহীন বলে। আর গোপন হতে হলে তো অস্তিত্বে থাকতে হবে। অস্তিত্বই যদি না থাকে- তাহলে গোপন হবে কিভাবে?

– সহীহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদীস দ্বারা এর সমর্থন হয়। আবুল বাখতারী সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন- خرجنا للعمرة, فلما نزلنا ببطن نحلة – قال:ترا ئينا الهلال- فقال بعض القوم: هو ابن ثلاث,

وقال بعض القوم: هو ابن ليلتين- قال: فلقينا ابن عباسرض, فقلنا: إنا رأينا الهلال- فقال بعض القوم: هو ابن ثلاث, وقال بعض القوم: هو ابن ليلتين- فقال: أيَّ ليلة رأيتموه؟ قال: فقلنا: ليلة كذا وكذا

অর্থঃ একবার আমরা কয়েকজন উমরাহ করার জন্য রওয়ানা হলাম। পথিমধ্যে চাঁদ দৃষ্টিগোচর হলো। তখন চাঁদের আকার বড় এবং উজ্বল দেখে আমাদের মাঝে আলোচনা হলো। কেউ বললেন- এটা তিন রাতের চাঁদ। কেউ বললেন- দুই রাতের। তখন আমরা সাহাবী ইবনে আব্বাস রাযি.-এর সাথে সাক্ষাত করে ঘটনা খুলে বললাম যে, আমরা চাঁদ দেখেছি। তখন কেউ বললো- এটা তিন রাতের চাঁদ। আবার কেউ বললো- এটা দুই রাতের চাঁদ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন- তোমরা এটা সর্বপ্রথম কোন রাতে দেখেছো? আমরা বললাম- অমুক রাতে দেখা গেছে। তখন ইবনে আব্বাস রাযি. বললেন-

إن رسول الله -صلى الله عليه وسلم- قال : إن الله مدَّه للروية, فهو لليلة رأيتموه

অর্থাৎ, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- আল্লাহ তা’আলা চাঁদকে দেখার প্রতি সম্বন্ধযুক্ত করেছেন। অতএব এটা সে রাতের চাঁদ মনে করা হবে, যে রাতে তোমরা দেখেছো। (সহীহ মুসলিমঃ হা-১০৮৮)

এর দ্বারা বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, এখানে বিষয়টি চাঁদের অস্তিত্বের নয়। বরং বিষয়টি হলো- সাধারণ দৃষ্টিতে দর্শনযোগ্য হওয়া। আর দূরবীণের মাধ্যমে সূর্যরশ্মি থেকে গোপন চাঁদ দেখে নেওয়া অথবা উড়োজাহাজে উড্ডয়ন করে মেঘের ওপর গিয়ে চাঁদ দেখা সাধারণ দর্শন হিসেবে আখ্যায়িত হওয়ার যোগ্য নয়। আর কোনো জিনিস দর্শনযোগ্য হওয়া বা দেখা যাওয়া এই বিষয়টির না বিজ্ঞানের, না আবহাওয়া বিভাগের, না মহাকাশ বিভাগের সহিত কোনো সম্পর্ক রয়েছে। এটা সাধারণ ঘটনার ব্যাপার। যদি কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময়ে এবং নির্ধারিত জায়গায় কোনো ঘটনা দেখার দাবিদার হয়, আর অন্যরা বলে, আমরা তখন সেখানে ছিলাম, আমরা এ ঘটনা দেখিনি- তাহলে এর ফয়সালা না আবহাওয়া বিভাগের নিকট যাওয়ার বিষয়, না আকাশ বিভাগ ও অংক শাস্ত্রের সাথে এর কোনো সম্পর্ক আছে। এর সিদ্ধান্ত ইসলামী আদালত সমূহের শরয়ী বিচারক, সাধারণ হুকুমতের কোনো বিচারপতিই করতে পারেন- যিনি সাক্ষীদের অবস্থা বিবরণ যাচাই করে নির্ভরযোগ্য-অনির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য অনুভব করতে পারেন।

যদি বিষয়টি চাঁদের অস্তিত্বের হতো- তাহলে নিঃসন্দেহে সেটি শরয়ী বিচারক অথবা আদালতের কোনো বিচারপতি দেখার বিষয় নয়। এটা মহাকাশ বিষয়ক বিশেষজ্ঞরাই বলতে পারেন। কোনো বিচারকও যদি এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতেন- তাহলে মহাকাশ বিশেষজ্ঞদের বিবরণের ভিত্তিতেই করতেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.