শুধু পড়া নয়, চাই সঠিক অনুধাবন- তামীম রায়হান

0
433
research and reading
research and reading

ইসলামের বিধানসমূহের মধ্যে জিহাদ অন্যতম একটি বিধান। তবে এর জন্য রয়েছে বেশ কিছু শর্ত ও নিয়মাবলী। রয়েছে কিছু প্রারম্ভিক ভূমিকাও। এসব ভূমিকার মধ্যে রয়েছে- যে কোনো শহরে জিহাদ শুরু করার আগে সর্বপ্রথম শহরবাসীকে ইসলামের দাওয়াত দিতে হবে। তাদেরকে এর সৌন্দর্য বোঝাতে হবে এবং চিন্তা-ভাবনার সময় দিতে হবে। যদি তারা না মানে তবে জিযিয়ার পয়গাম জানাতে হবে।
জিযিয়া বলতে কর বা ট্যাক্স উদ্দেশ্য- এবং তখন ওই শহরের নিয়ন্ত্রণভার মুসলমানদের হাতে থাকবে। যদি শহরবাসী জিযিয়া দিতে চায়- তবে অমুসলিম করপ্রদানকারী একজন মুসলমানের মতো সম্মান সুবিধা ও নিরাপত্তা পাবে। জিযিয়া প্রদানেও যদি শহরবাসী সম্মতি না দেয় তখন অস্ত্রের প্রশ্ন। যুদ্ধের দামামা কেবল তখনই বাজবে।
বৃটিশ শাসিত সময়ে এ উপমহাদেশের এক শিক্ষিত ভদ্রলোকের ঘটনা। সেকালে যে কজন মুসলিম যুবক উচ্চশিক্ষার জন্য বিলেতে গিয়েছিলেন- তিনি তাদের অন্যতম একজন।
সেখানে গিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ইসলাম সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানার জন্য অন্যান্য বইপত্র অধ্যয়ন শুরু করলেন। তখন রমজান মাস। এক অবসরে জিহাদের বিধি-বিধান সম্বলিত ফিকাহর একটি কিতাব নিয়ে তিনি পড়তে শুরু করলেন জিহাদের মাসায়েল।
জিযিয়া অধ্যায়ে এসে তিনি চমকে গেলেন। আরে এ কী! এসব কী লেখা এখানে- ‘যদি শহরবাসী জিযিয়া প্রদানে সম্মতি দেয় তবে মুসলমানরা যেন অস্ত্রের ব্যবহার থেকে বিরত থাকে। শহরের নিয়ন্ত্রণভার ছাড়া আর কোথাও কোনো জবরদস্তি করা যাবে না।”

ভদ্রলোকের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। জিযিয়ার পয়সা পেয়ে এখানে ইসলামের জিহাদ স্থগিত হয়ে গেল!! এ কেমন ইসলামের বিধান! শহরবাসী পয়সা দিয়ে কর আদায় করার বিনিময়ে রেহাই পেয়ে গেল! তবে কি ইসলাম টাকা পয়সা অর্জনের জন্য জিহাদের বিধান দিয়েছে? এ কেমন ধর্ম! কেমন এর জিহাদ!!
উচ্চশিক্ষিত ভদ্রলোক খুব দ্রুত অতল ভাবনার গভীরে ডুবে গেলেন। একপর্যায়ে তার মনে এ ‘লোভী ধর্মে’র জন্য ঘৃণা চলে এল। ছিঃ এই হচ্ছে ইসলাম! আর আমি এ ধর্মের সন্তান! নাহ, আমি এ ধর্ম মানতে পারছি না, ইসলাম আজ থেকে বাদ। জিযিয়ালোভী ইসলাম আমার দরকার নেই। ইসলাম যখন বাদ, কীসের আর রোজা-রমজান! তিনি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে উঠে গিয়ে ঢকঢক করে পানি গিললেন কয়েক গ্লাস। কপালের ভাঁজ ঠিক হয়ে আসার আগেই তিনি মুরতাদ হয়ে গেলেন।
প্রতিদিনের মতো তিনি বিকেলে হাঁটতে বের হলেন। পার্কের যে রাস্তায় প্রতিদিন তিনি বের হতেন সেখানেই ছিল তার বন্ধুর বাসা। দুজন মিলে প্রতিদিন একসাথে হাঁটতেন। এরপর একসঙ্গে মসজিদে গিয়ে ইফতার করতেন।
আজও দুজন যথারীতি হাঁটলেন, কিন্তু মসজিদের কাছে এসে তিনি দাঁিড়য়ে গেলেন। বন্ধুকে তার সব ঘটনা খুলে বললেন একরাশ ক্ষোভ আর দুঃখ নিয়ে। জানিয়ে দিলেন, তুমি যাও, আমি ইফতার করবো না, নামাজও পড়বো না। তুমি শেষ করে এসো, আমি এখানে আছি।

বন্ধুটি ছিলেন বিদ্যা-বুদ্ধিতে তার চেয়ে অনেক কম। তিনি ভাবতে লাগলেন, তাকে নিয়ে পাশের কোন আলেম এর কাছে যাওয়া দরকার। ওর যে প্রশ্ন, এর সমাধান তো আমিও জানি না।
সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলে তারা দুজন মিলে একজন আল্লাহওয়ালা হজরতের কাছে গিয়ে পৌঁছলেন। ধর্মত্যাগী বন্ধুটির চেহারায় তখনও এসব আলেম আর ইসলাম নিয়ে তাচ্ছিল্যের ভাব। কথোপকথন শুরু হলে তিনি তার সমস্যা ও প্রশ্নটি তুলে ধরলেন, নিজের ক্ষোভ আর ইসলাম ছেড়ে দেওয়ার খবরও জানালেন।
প্রবীণ ওই আলেমের মুখে ততক্ষণে হাসির আভাস। তিনি বলতে লাগলেন কাঁেধ হাত রেখে, দেখুন, আপনার মতো অনেক শিক্ষিত ভদ্রজন নিজেরা পড়তে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন, নিজেদের অজান্তে তারা ধর্মকে ছুঁড়ে ফেলে দেন না বুঝেই। মন দিয়ে শুনুন, আপনি কি এখানে প্রদত্ত জিযিয়ার মর্ম নিয়ে ভেবেছেন? দেখুন, এ জিযিয়া দিতে সম্মত হলে শহরবাসী পূর্ণ নিরাপদে থাকবে। এর নিয়ন্ত্রণভার মুসলমানদের হাতে থাকবে। আর এ সময়ে তারা সবাই মিলেমিশে থাকবেন। মুসলিম কিংবা অমুসলিম সবাই সমান সুবিধা ভোগ করবেন। আর এ মেলামেশায় মুসলমানদের উদারতা আর সরল সৌন্দর্য দেখে অমুসলিম নগরবাসী চিন্তা-ভাবনায় এসব নিয়ে ভাববে। মুসলমানদের ভালোবাসায় মোহিত হবে। একসময় তারা ইসলামের ছায়াতলে চলে আসবে। আমাদের ইতিহাসে এর সপক্ষে অনেক ঘটনা ঘটেছে।
আবার এমনও রয়েছে যে, দাওয়াত দেওয়া ছাড়া শহর জয় করার কয়েক বছর পর যখন দরবারের ফাইল ঘেঁেট এ ঘটনা জানা গেল, খলীফা নির্দেশ দিলেন পুরো মুসলিম বাহিনী যেন শহর ছেড়ে সীমানার বাইরে গিয়ে আবারও ইসলামের পয়গাম নতুন করে তুলে ধরে এবং তারা তা না মেনে নিলে জিযিয়া নয়তো জিহাদের পথ বেছে নেয় (বিস্তারিত জানতে আজারবাইজান বিজয়ের ইতিহাস দেখুন)।
সুতরাং খলীফার নিদের্শমতো পুরো বাহিনী যখন নতুন করে শহর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াতের কথা তুলে ধরলেন, এতোদিন যারা মুসলমানদেরকে দেখেছে, তাদের এ নিয়মানুবর্তিতা দেখে গোটা শহরবাসী ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিলেন।

এ কথাগুলো শুনতে শুনতে ভদ্রলোক তার ভুল বুঝতে পারলেন। তিনি অবাক হলেন হজরতের কথা শুনে। হজরত আরও শোনালেন, এজন্যই আমাদের ফেকাহর কিতাবগুলো আমরা উসতাযদের কাছে পড়ি, যাতে প্রতিটি আহকামের মর্মকথা ও উদ্দেশ্য তারা বুঝিয়ে দেন। ইসলাম যদি নিজে নিজে পড়ে বুঝে ও শিখে ফেলার ধর্ম হতো- তবে যুগে যুগে শায়খদের কাছে গিয়ে মানুষ ইসলাম শিখতো না, সাহাবীগণ প্রতিদিন নবীজির কাছে এসে হাতে কলমে তালিম নিতেন না।’
এসব শুনতে শুনতেই চোখে পানি চলে আসে অনুতপ্ত ভদ্রলোকটির। তিনি আল্লাহর কাছে তওবা করলেন। আবার কালেমা পড়ে ফিরে এলেন এ মহান ধর্মের ছায়াতলে। যার প্রতিটি হুকুমের একমাত্র উদ্দেশ্য মানব ও মানবতার কল্যাণ- পরিভাষায় যাকে বলে- মাছলাহাতুল ইবাদ।
যারা ইসলাম ধর্মের ব্যাখা করতে গিয়ে ভুল ব্যাখ্যা করেছেন তাদের বেশীরভাগের পথভ্রষ্টতা একমাত্র কারণ হল- মাসায়েল বা হুকুম সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিজেদের যুক্তি ও বুদ্ধিমত বুঝতে চেয়েছিলেন তারা। তারা ভুলে গিয়েছিলেন, কুরআনের সব আয়াতই যদি নিজেরা বুঝে নেয়ার মত হতো তবে একজন ফেরেশতা দিয়ে কুরআন মানুষের কাছে পৌঁছে দিলেই হতো। একজন নবী তবে কেন পাঠালেন? নবীর কাজ ছিল আল্লাহর আয়াত মানুষের কাছে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেওয়া। নিজের জীবনে বাস্তব প্রতিফলন দেখিয়ে শিখিয়ে দেওয়া।

আর এজন্যই ইমাম গাজালী বলেছেন, ‘ন্যায়সঙ্গত বিবেকের দাবী এবং ইসলামের সঠিক ব্যাখার মধ্যে কোনো সংঘর্ষ কিংবা দ্বন্দ নেই।’ যা কিছু দ্বন্দ বা সংঘাত- এর মূলে হয়তো বিবেকের অপূর্ণতা কিংবা ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা। কখনো কখনো এর পেছনে স্বার্থ ও সংকীর্ণতাও কাজ করে।
আমাদের আশেপাশেও প্রতিনিয়ত অনেক ভদ্র ও সুশিক্ষিত মহোদয় কেবল নিজেদের বিবেক নির্ভর ইসলামকে তাচ্ছিল্য করে হারিয়ে যাচ্ছেন ইরতিদাদের অতল সাগরে। সাধে কি আর আল্লাহ বলেছেন, যে রব তোমাকে সৃষ্টি করেছেন- তার নামেই পড়–ন (নিজে নিজে নয়)।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.