সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নাদাবির বয়ান থেকে… (দ্বিতীয় পর্ব)

2
536
Ali Nadabi Rah.
Ali Nadabi Rah.

শিক্ষার্থী ও শিক্ষা সমাপনকারী আলেমে দ্বীনের গুরুদায়িত্ব

প্রিয় বন্ধুগণ!
মাদরাসা শিক্ষার্থী ও তালিবুল ইলম হিসাবে আপনাদের দায়িত্ব সর্বাধিক নাজুক, সর্বাধিক মহান। বর্তমানে পৃথিবীতে অপর কোন দল ও গোষ্ঠীর কাঁধে এরূপ নাজুক, এত ব্যাপক ও এত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আছে বলে আমার জানা নাই। এই কথাটি পুনরায় স্মরণ করুন যে, আপনার এক প্রান্ত সংযুক্ত নবুওয়াতের মুহাম্মদীর সঙ্গে, অপর প্রান্ত সংযুক্ত জীবন জগতের সঙ্গে। এটাই আপনাদের মহান হওয়ার রহস্য। নবুওয়াতে মুহাম্মদীর সঙ্গে সংযোগ একদিকে যেমন মহা সৌভাগ্য ও মহাপ্রাপ্তি। অপরদিকে তা তেমনি মহা দায়িত্বের কারণ। আপনাদের নিকট আছে পরম সত্য এবং আকীদা-বিশ্বাস নামক মহামূল্যবান সম্পদ।
নবুওয়াতে মুহাম্মদীর সঙ্গে এই সম্পৃক্ততার কারণে আপনাদের ওপর বেশ কিছু দায়িত্ব বর্তায়। আপনাদের মধ্যে থাকা উচিত দৃঢ় ঈমান, অবিচল আস্থা ও ইয়াকীন। এরূপ সাহস দৃঢ়তা থাকা উচিত যেন সমগ্র জগতের বিনিময়েও নবুওয়াতে মুহাম্মদীর এক বিন্দু উত্তরাধিকারও হাতছাড়া হওয়ার প্রশ্নে আপোষের চিন্তাও মস্তিষ্কে স্থান না পায়। হৃদয় পূর্ণ থাকা উচিত এর নুসরাত ও সহায়তার উদ্বেল আবেগে। আপনাদের অন্তর থাকবে এই অমূল্য সম্পদের গর্বে গর্বিত ও কৃতজ্ঞ। এর সত্যতা ও যথার্থতা, এর যৌক্তিকতা ও চিরন্তনতা, এর সর্বকালীন উপযোগিতা, এর ব্যাপ্তি ও বিশালতা, এর অত্যুচ্চ মর্যাদা এবং এর বিশুদ্ধতা ও পূর্ণাঙ্গতার ব্যাপারে আপনাদের অন্তরে থাকবে অবিচল ইয়াকীন, দ্বিধাহীন বিশ্বাস। এর বিপরীতে অন্য সবকিছুকে অত্যন্ত আস্থার সঙ্গে জাহিলিয়াত ও মূর্খতার উত্তরাধিকার বলে জ্ঞান করবেন। আল্লাহ তা’আলার নির্দেশ ও ইসলামী শিক্ষা কানে পড়লে আপনারা যেখানে বলবেন آمنا و سلمنا (শুনলাম এবং মানলাম), সেখানে জাহিলিয়াত প্রসূত বিধিব্যবস্থা ও তার ধ্বজ্জাধারীদের উদ্দেশ্যে বলবেন, لا نطيعكم আমরা তোমাদেরকে মানি না। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে চিরকালের জন্য সৃষ্টি হল শত্র“তা ও বিদ্বেষ; যতক্ষণ না তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো। (সূরা মুমতাহিনাঃ আয়াত-৪)

ইসলামের দিক-নির্দেশনা এবং রাসূলের আদর্শের মধ্যেই জগতের মুক্তি নিহিত বলে বিশ্বাস রাখবেন। এই বিশ্বাস আপনাদের অন্তরে বদ্ধমূল থাকবে যে, আধুনিক নুহী প্লাবনে নুহ আলাইহিস সালামের কিশতী একমাত্র মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত এবং শুধুই তাঁর ইমামত ও নেতৃত্ব। আপনাদের ইয়াকীন থাকবে যে, ব্যক্তি ও সমষ্টির সফলতা এবং উৎকর্ষ ও উন্নতির শীর্ষে পৌঁছার শর্ত একমাত্র নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ। এটা যথার্থ সত্য যে, আরবের মুহাম্মদ উভয় জাহানের ইজ্জত ও সম্মান, যার মাঝে তাঁর আদর্শের উর্বর মাটি নেই, তার ললাট ধুলোয় লুটাক।
আপনারা নববী শিক্ষার যথার্থ মর্ম এবং এর তাৎপর্য অনুধাবন করতে সক্ষম। সুতরাং এর বিপরীতে জগতের সকল মতবাদ ও দর্শনকে সকল পরাবাস্তব ও অনুমান নির্ভর জ্ঞান বিজ্ঞানকে, সকল তত্ত্বকথা ও বুলিকে অসার ও কল্প-কাহিনী অপেক্ষা বেশি কিছু মনে করবেন না। আপনারা তাওহীদের মর্ম ও তাৎপর্য অনুধাবন করার সাথে সাথে তাওহীদের বিশ্বাসকে দৃঢ়ভাবে অন্তরে বদ্ধমূল রাখবেন। শিরকসহ জগতে প্রচলিত সকল মানব-মস্তিষ্ক প্রসূত জ্ঞান-বিজ্ঞানকে চাই তা যতই পান্ডিত্যপূর্ণ হোক না কেন, অথবা তা পরিভাষায় এবং দার্শনিক ভঙ্গিতে উপস্থাপিত হলেও এগুলোকে বাগাড়ম্বর ও ফাঁকা বুলিসর্বস্ব তুচ্ছ বিষয় বলে জ্ঞান করবেন। সেগুলোকে তাক লাগানো প্রবঞ্চনাকর বাক্য অপেক্ষা অধিক কিছু মনে করতে কখনই প্রস্তুত হবেন না। সুন্নাতের অনুসরণে প্রবল আকাঙ্খী এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শকে শ্রেষ্ঠতম আদর্শ বলে বিশ্বাস রাখবেন। বিদ’আত যে ক্ষতিকর এবং সর্বনাশা, সে সম্পর্কে আপনাদের অন্তরে থাকবে স্বচ্ছ বিশ্বাস। মোটকথা আপনারা হবেন বিশ্বাস ও মানসিকতা, চিন্তা-চেতনা ও আধ্যাত্মিকতা, মেজায ও প্রকৃতি, আমল ও কার্য ইত্যাদি সকল দিক থেকে নবুওয়াতে মুহাম্মাদীর পূর্ণাঙ্গতা ও তার বাস্তবে প্রয়োগ উপযোগিতার প্রবক্তা এবং বাস্তব নমুনা।

আলেম ও তালিবুল ইলমের স্বাতন্ত্র্য
বন্ধুগণ! পৃথিবীর অন্য সকলের তুলনায় আপনাদের স্বাতন্ত্র্য, তাদের ও আপনাদের মধ্যে পার্থক্য এই যে, উপযুক্ত সত্যসমূহে সাদামাটা ঈমান আনাই অন্যদের জন্য যথেষ্ট, কিন্তু আপনাদের জন্য এইসব বিষয়ে মানসিক প্রশান্তি, চিন্তাগত স্বচ্ছতা ও হৃদয়ে ঔজ্জ্বল্য থাকতে হবে। শুধু বিশ্বাস ও স্বীকারোক্তিই আপনাদের জন্য যথেষ্ট নয়, আপনাদের জন্য জরুরি দ্বীনের প্রচারক ও দাঈ হওয়া, দ্বীন বিষয়ে উচ্চকণ্ঠ হওয়া। অন্যদের ঈমান যদি ঈমানধারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবুও যথেষ্ট; কিন্তু আপনাদের ঈমান হতে হবে আপনাদের সত্ত্বা অতিক্রম করত অন্যদের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী, যা শত-সহ¯্র মানুষকে ইয়াকীন ও বিশ্বাস আপ্লুত করবে। আর তা ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতক্ষণ না আপনাদের এই আবেগগাপ্লুতি আত্মবিলোপের স্তরে উপনীত হয় এবং যতক্ষণ না আপনাদের মধ্যে (কুফরিতে প্রত্যাবর্তন আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ন্যায় অপছন্দ করে)-এর ভাবার্থ ও তাৎপর্য প্রতিফলিত হয়। নববী শিক্ষা সম্পর্কে অন্যদের ভাসা ভাসা জ্ঞান থাকাই যথেষ্ট। কিন্তু আপনাদের জন্য এই জ্ঞানে পান্ডিত্য ও বিদগ্ধতা, নিপুণতা ও দৃঢ়তা অপরিহার্য।
অপরিহার্য এই ইলমের প্রতি ইশক ও প্রেম, অনুরাগ ও ভালবাসা। অতীব জরুরি নববী ইলমে একাগ্রতা ও অন্যমনস্কতা। এছাড়া দাওয়াতী কার্যক্রমের কল্পনাও অর্থহীন; বরং বহুমুখী দাওয়াত ও প্রচার-প্রচারণার এই মহা প্লাবনের যুগে উপযুক্ত গুণাবলী ব্যতীত নিজের ঈমানী বৈশিষ্ট্যবলী ও ঈমানী সম্পদকে রক্ষা করাও কঠিন ও দুরূহ ব্যাপার।

চলবে …….

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.