সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস: যার নাম শুনে ক্রুসেডারদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠতো

0
254
Sultan Rukunuddin B
Sultan Rukunuddin B

“ক্রুসেড” শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে দুটি নাম ভেসে ওঠে- সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ও সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী রহমাতুল্লাহি আলাইহি। কিন্তু সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস এর নাম আমরা কেউই প্রায় জানি না। কেন জানি না, সেটা ক্রমশঃপ্রকাশ্য!

বাইবারস শব্দের অর্থ হল “great panther” বা “lord panther” – চিতাদের রাজা। যুদ্ধে অসাধারণ ক্ষিপ্রতার ও পারদর্শিতার কারণে এই উপাধি পান তিনি।

ব্যক্তিগতভাবে মুসলিম ইতিহাসে যে কয়জন সুলতান অমর স্থান দখল করে আছেন, তাঁদের মধ্যে সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস এর স্থান একেবারে উপরে। এমন আপোষহীন, দৃঢ়চেতা, মহান যোদ্ধা ও সেনাপতি এবং ইস্পাত-কঠিন মানসিকতার কারণে উনি যে কারো সমীহ আদায় করে নেন।

সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস মুসলিম ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজেতা ও মহান সুলতান হয়েও স্রেফ প্রচারের অভাবে তিনি আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের নিকট অনেকটাই অপরিচিত। অকোতুভয় এবং আপোষহীন সেই যোদ্ধাকে কিঞ্চিত পরিচিত করাতেই এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।

ইতিহাসের পাতায় সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস

সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস ছিলেন ন্যায় প্রতিষ্ঠায় আপোষহীন। তাঁর গোটা শাসনামলের ( প্রায় ১৭ বছর) একটি মুহুর্তও যুদ্ধহীন ছিল না। ভিতরে ও বাইরে তাঁকে নানা ধরনের, মাত্রার যুদ্ধে তাঁকে অবতীর্ণ হতে হয়। মুসলিম উম্মার নিরাপত্তা, ইজ্জত রক্ষার্থে তিনি ছিলেন উৎসর্গীত। তিনি যালিমকে, মিথ্যাকে মাথানত করতে বাধ্য করেছিলেন। সত্য আর ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি ছিলেন মোঙ্গলদের কাছে ত্রাস, গুপ্তঘাতকের কাছে জলজ্যান্ত অভিশাপ আর ক্রুসেডারদের কাছে শেষ আঘাত।

কেমন ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস?

ক্রুসেডাররা সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস এর ভয়ে বাস্তবে যুদ্ধে হারার আগে মানসিকভাবেই হেরে বসে থাকত। পূর্ববর্তী ক্রুসেডের যুদ্ধে মুসলিমদের গণহত্যা করার কারণে সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস ক্রুসেডারদের উপরে এতই ক্ষীপ্ত ছিলেন যে, তিনি প্রায়ই বলতেনঃ “আল্লাহ্ আমাকে জীবিত রাখলে মুসলিম ভূখন্ডের দিকে তাকানোর অপরাধে আমি ফ্রান্স, ইংল্যান্ড আর জার্মান সাম্রাজ্যে হামলা চালাবো”।

ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস এর অভিযানগুলো এতোই অবিরাম ও ক্ষীপ্র ছিলো যে- ক্রসেডাররা তাকে “Genie” অর্থাৎ জ্বীন বলে ডাকতো।

তিনি ক্রুসেডের যুদ্ধে পরাজিত খ্রীষ্টানদের শর্ত দেনঃ “হয় ইসলাম গ্রহন করে আমাদের ভাই হয়ে থাকো; তাহলে তোমাদের জমি–সম্পত্তি দেওয়া হবে। আর সেটা করতে না পারলে বিনা ক্ষতিপূরণে ইউরোপে চলে যাও, কারণ এটা তোমাদের দেশ না, আমাদের দেশ- তোমরা ডাকাতের মতো এসেছিলে, অন্যায়ভাবে আমাদের আক্রমণ করেছিলে”।

সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস এর এই হুকুম যারা মানেনি, তাদের হত্যা করা হয়। এইসব কারণেই ক্রসেডাররা তাঁর নাম দিয়েছিলো “শেষ আঘাত” অর্থাৎ যে আঘাতে মৃত্যু ঘনিয়ে আসে। এসব কারণেই ক্রুসেডাররা সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারসকে ঘৃণা করতো।

সুলতান সালাহউদ্দীন নিয়ে এত আলোচনা; কিন্তু সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস নিয়ে কোন আলোচনা করে না কেন খ্রিস্টানরা?

কোন সন্দেহ নেই যে সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী ছিলেন একজন মহান শাসক ও নিবেদিতপ্রাণ মুসলিম। তিনি বিরাট সাম্রাজ্যের অধিকারী হয়েও ইন্তেকালের সময় কিছুই রেখে যেতে পারেন নি। নিঃস্বার্থভাবে কাটিয়েছেন গোটা জীবন। তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুলতানদের মধ্যে একজন। কিন্তু খ্রিস্টানরা তাঁকে নিয়ে বই লেখে, সিনেমা তৈরি করে কিন্তু সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস নিয়ে একেবারেই চুপ থাকে, তার কারণ অন্য।

ক্রুসেডাররা জেরুজালেমে এত মুসলিম গণহত্যা করেছিল যে সেখানে হাঁটু পরিমাণ রক্ত জমে গিয়েছিল, কিন্তু সুলতান সালাহউদ্দীন যখন জেরুজালেম পুর্নদখল করেন তখন কিন্তু কাউকে হত্যা করেন নি, সবাইকে নিরাপত্তা ও অভয় দিয়েছিলেন।

আক্কার যুদ্ধে জয়লাভের পর ১মাস পরেও মুক্তিপণ না পাওয়ার কারণে ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট ২,৭০০ মুসলিম বন্দীকে হত্যা করেন! কিন্তু টা সত্বেও সুলতান সালাহউদ্দীন জেরুজালেম থেকে ১জন খ্রীষ্টানকেও বিতাড়িত করেন নি।

অর্থাৎ এক কথায় বলতে গেলে সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী ছিলেন ভীষণ ক্ষমাশীল, খ্রিস্টানরা সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী এর কাছ থেকে পেয়েছে ক্ষমা যার কারণে তাঁকে খ্রিস্টানরা “Great Saladin” ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করেছে এবং তাদের গবেষণা, নাটক, উপন্যাসে ও সিনেমাতে তাঁর বন্দনা করেছেন।

এখন পাঠকদের মনে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, তাহলে খ্রিস্টানরা কেন সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস উনাকে ঘৃণা করে! এর উত্তর হল খ্রিস্টানরা বাকী সুলতানদের ক্ষমাশীল স্বভাবের কথা খুব ভালভাবেই জানত। তারা বহুবার ক্ষমা পেয়েছে যা এখানে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হল না। সেই কারণে এদের মনে এই বিশ্বাস জন্মেছিল যে “যুদ্ধ করতে অসুবিধা কি? হেরে গেলে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া যাবে!”

কিন্তু সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস ছিলেন একেবারে ভিন্ন প্রকৃতির। তাঁর কাছে খ্রিস্টানদের কোন জারিজুরি খাটে নি, তাঁর সাথে কোনরকম চালাকি করার কোন সম্ভাবনাই ছিল না। একই জাতি, একই ধর্মীয় বিশ্বাস, একই আদর্শ কিন্তু একেবারে ভিন্ন ধাতুতে তৈরি! যার সাথে খ্রিস্টানদের আগে কখনও পরিচয় হয় নি। তিনি যুদ্ধে জিতলে খ্রিস্টান শক্তিকে তছনছ তো করবেনই, কিন্তু তাঁকে হারিয়ে জিততে গেলে বিপদের সম্ভাবনা আরও বেশী কারণ তিনি পরাজিত হলে আবার শক্তি সংগ্রহ করে কয়েকশত গুণ বেশী আক্রোশ নিয়ে আবার আক্রমণ করবেন! [যদিও তিনি জীবনে কখনও পরাজিত হন নি।]

তাঁর কাছে হারলেও বিপদ, আবার তাঁকে হারিয়ে জিতলেও বিপদ! – ক্রুসেডের ইতিহাসে এমন সঙ্কটে কখনও পড়ে নি খ্রিস্টানরা।

ঠিক এই কারণেই খ্রিস্টানরা তাঁকে ঘৃণা করত!

[ এইখানে বলে দেওয়া দরকার, আমি কোন ভাবেই সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবীকে ছোট করতে চাইছি না, তিনি মুসলিম ইতিহাসের একজন শ্রেষ্ঠ সুলতান এবং আমার অন্যতম প্রিয় একজন সুলতান। বরং এখানে দেখাতে চাইছি যে কেন খ্রিস্টানরা কেন সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস উনাকে নিয়ে আলোচনা করে না, কেন তাঁকে ঘৃণা করে।]

জন্ম ও শৈশবকাল

সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস ১২২৩ সালের ১৯ জুলাই বর্তমান কাজাখস্থান এ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁকে খুব অল্প বয়সে ৮০০ দিরহামের বিনিময়ে ক্রীতদাস হিসেবে দামাস্কাসে বিক্রি করে দেয়া হয়। তাকে ক্রয় করেন আইয়ুবী সুলতান আল-সালিহের এক সেনা কম্যান্ডার ‘আলাউদ্দিন আইতাকিন বান্দুকদার’। এইখান থেকেই তিনি ‘বান্দুকদারী’ উপাধিটি পেয়েছেন।

এরপর তিনি দ্বীনী শিক্ষা ও রণবিদ্যায় পারদর্শী হলে মিশরে সুলতান সালিহের খেদমতে প্রেরিত হন। দীর্ঘকায়, কৃষ্ণবর্ণ, নীল চোখের অধিকারী বাইবারস ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও কর্মচঞ্চল। গমগমে কন্ঠস্বরে ছিল কর্তৃত্বের সুর। এক কথায় নেতৃত্বের সব গুণই তার মধ্যে ছিল।

সুলতান তুরান শাহকে হত্যা

১২৫০ সালে মানসূরাহ্ এর যুদ্ধে সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস ক্রুসেডের নেতৃত্ব দানকারী সম্রাট ৯ম লুই-কে স্বপারিষদে বন্দী করেন। এটা ছিল বিরাট এক সাফল্য কারণ ক্রুসেডের ইতিহাসে এই প্রথম বারের ক্রুসেডের নেতৃত্ব দানকারী কোন সম্রাটকে স্বপারিষদে বন্দী করা গেল। ক্রুসেডের নেতৃত্ব দানকারী খোদ ফ্রান্সের সম্রাট বন্দী সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস এর কাছে!

সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস চাইছিলেন যে সম্রাটকে মুক্তি দেওয়ার শর্ত হবে ১টাই- সেটা অল কান্ট্রি অব ত্রিপোলী মুসলিমদের কাছে ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু সুলতান তুরান শাহ্ সম্রাট ৯ম লুইকে অর্থের বিনিময়ে মুক্ত করে দিলে সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস এতই ক্রুদ্ধ হন যে, – সুলতান তুরান শাহকে হত্যাই করে ফেলেন। কারণ তার মতে অর্থের বিনিময়ে সম্রাট ৯ম লুইকে মুক্ত করে দেওয়া ছিল মুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা।

আইন জালুতের যুদ্ধে নেতৃত্ব ও ‘অপরাজিত’ মুশরিক মোঙ্গলদের পরাজয়

মঙ্গোলদের সাথে আইন জালুতের যুদ্ধ ১২৬০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে তখন “অপরাজিত” বলে খ্যাত মঙ্গোলদের সাম্রাজ্য বিস্তার থেমে যায়।

মুশরিক মঙ্গোলরা ইতোপূর্বে একের পর এক যুদ্ধে জয়লাভ করে এবং বাগদাদ সহ সমৃদ্ধ মুসলিম নগরী ধ্বংস করে ফেলেছিল।

আইন জালুতের যুদ্ধে অত্যন্ত অপমানজনক চিঠি বহন করে আনা মোঙ্গল দূতদের হত্যা করা আর কায়রো শহরের ৪ দরওয়াজায় তাদের কাটা মাথা ঝুলিয়ে দেওয়া – সবাই এই ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল যে এর পিছনে আছেন সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস।

আসুন! সেই চিঠি পড়ে নেওয়া যাকঃ

“পূর্ব ও পশ্চিমের শাহেনশাহ মহান খানের পক্ষ থেকে এটি প্রেরিত হচ্ছে মামলুক কুতুজের উদ্দেশ্যে যিনি আমাদের তলোয়ার থেকে পালিয়ে গিয়েছেন। অন্যান্য রাজ্যসমূহের কী পরিণতি হয়েছে তা চিন্তা করে আপনার উচিত আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করা। আপনি শুনেছেন কিভাবে আমরা একটি বিশাল সাম্রাজ্য জয় করেছি এবং পৃথিবীকে দূষিতকারী বিশৃঙ্খলা থেকে একে বিশুদ্ধ করেছি। আমরা বিশাল অঞ্চল জয় করেছি, সব মানুষকে হত্যা করেছি। আপনি আমাদের সেনাবাহিনীর ত্রাস থেকে বাঁচতে পারবেন না। আপনি কোথায় পালাবেন? আমাদের কাছ থেকে পালানোর জন্য আপনি কোন পথ ধরবেন?

আমাদের ঘোড়াগুলি দ্রুতগামী, আমাদের তীর ধারালো, আমাদের তলোয়ার বজ্রের মত, আমাদের হৃদয় পর্বতের মত কঠিন, আমাদের সেনারা বালুর মত অগণিত। দুর্গ আমাদের আটকাতে পারবে না, কোনো সেনাবাহিনী আমাদের থামাতে পারবে না। আল্লাহর কাছে আপনার দোয়া আমাদের বিরুদ্ধে কাজে আসবে না। অশ্রু আমাদের চালিত করে না এবং মাতম আমাদের স্পর্শ করে না। শুধুমাত্র যারা আমাদের সুরক্ষা চাইবে তাদেরকে নিরাপত্তা দেয়া হবে। যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠার আগে দ্রুত আপনার জবাব দিন।

প্রতিরোধ করলে আপনি সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগের মুখোমুখি হবেন। আমরা আপনাদের মসজিদগুলি চুরমার করে দেব এবং আপনাদের আল্লাহর দুর্বলতা দেখতে পাবেন এবং এরপর আপনাদের সন্তান ও বৃদ্ধদেরকে হত্যা করা হবে। এই মুহূর্তে আপনি একমাত্র শত্রু যার বিরুদ্ধে আমরা অগ্রসর হয়েছি।”

সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক আইন-জালুতের যুদ্ধে অসামান্য রণদক্ষতা ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। তীব্র রক্তক্ষয়ী সেই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী মোঙ্গলদের পরাজিত ও বিধ্বস্ত করতে সক্ষম হয়। এভাবে “মঙ্গোলদের পরাজয় অসম্ভব”- এই প্রবাদ বাক্য মিথ্যায় পর্যবসিত হয়। শুধু তাই নয়, এ যুদ্ধের পরেই মঙ্গোলদের জয়রথ পুরোপুরি থমকে দাড়ায়।

সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী দীর্ঘ ৩০০ কিলোমিটার পথ তাড়িয়ে গুটি কয়েকজন বাদে সকল হানাদার মঙ্গোল সৈন্যকে হত্যা করে যা বিশ্ব ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা।

এই যুদ্ধেই প্রথম সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস দ্বারা প্রবর্তিত হাত-তোপ বা হ্যান্ড-ক্যানন ব্যবহার করে মুসলিম বাহিনী যাকে “মিদফা” বলা হত।

আইন জালুতের যুদ্ধ কেবল মিসর ও ইসলামের ইতিহাসে নয়,বরং সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা। যদি ধ্বংসাত্মক মোঙ্গল শক্তি এ যুদ্ধে জয় লাভ করত, তাহলে তারা উত্তর আফ্রিকা,স্পেন এবং ইউরোপের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে যুগপৎ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের নগরী, সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে ধ্বংস করে দিত। তাই আইন জালুতের যুদ্ধে একই সঙ্গে ইসলাম ও বিশ্বসভ্যতা রক্ষা পেয়েছিল।

সিংহাসনে আরোহণ

কিছু ঐতিহাসিকরা বলেন যে সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস এর আশা ছিল আইন জালুতের যুদ্ধে বীরত্বের পুরস্কার হিসেবে সুলতান কুতুয তাঁকে আলেপ্পোর শাসনভার দেবেন। কিন্তু সুলতান কোন এক কারনে তাঁর সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেননি, তাই সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস তাকে হত্যা করেন। কিন্তু সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস এর গোটা জীবন বিশ্লেষণ করলে যে কেউ বলতে পারবে না যে সামান্য পুরস্কারের লোভে তিনি কাউকে হত্যা করতে পারেন না। তাই এটা একটা মিথ্যা অপবাদ বলেই মনে হয়।

সুলতান কুতুয নিহত হওয়ার পর অক্টোবর ১২৬০ খ্রীস্টাব্দে সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস মিশরের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর অসাধারন রণনৈপূণ্যে মামলুক সালতানাত দূর্ধর্ষ মঙ্গোল,ক্রুসেডার এবং গুপ্তঘাতকদের হাত থেকে নিরাপদ হয়ে পরবর্তী ২৫০ বছর পর্যন্ত টিকে ছিল।

রণাঙ্গনে সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস

এদিকে আইন জালুতের চরম প্রতিশোধ নিতে সেই হালাকু খান আবার ধেয়ে আসে মিসর-সিরিয়ার দিকে। মহানদী ফোরাত অতিক্রম করে তার অজেয় বাহিনী একসময় আছড়ে পড়ে মামলুক সীমান্তের অভ্যন্তরে। চোখের পলকে সিরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল হালাকু খান ফের কব্জা করে নেয়। ১২৬২ খ্রিস্টাব্দের জুলাইয়ে সিরিয়ার বুকে আবারও বয়ে চললো রক্ত নদী! এবারও তাদের দম্ভ চূর্ণ করলেন দুর্ধর্ষ বীর সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস।

অবাক বিশ্ব আবার দেখলো মামলুক চমক! সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস প্রচণ্ড আক্রমণে তাদের পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ আস্বাদন করালেন। বাধ্য হয়ে তারা শান্তিচুক্তি করতে চাইল। কিন্তু সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস তাদের বিশ্বাসঘাতকতার দীর্ঘ ইতিহাস সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত ছিলেন, তাই তিনি তাদের শান্তি প্রস্তাবে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। প্রতিটি রণক্ষেত্রে তাদের পরাজিত করতে থাকলেন। ১২৭৩ খৃস্টাব্দে বীরা নামক স্থানে তাদেরকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। একপর্যায়ে তারা এশিয়া মাইনরের রোম্যান সালজুক সালতানাতের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে ১২৭৭ সালে মামলুকদের বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এলবিস্তান নামক স্থানে সংগঠিত এই যুদ্ধে সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন মঙ্গোল বাহিনী ও তাদেরভ মিত্র সালজুক বাহিনীকে।

এছাড়াও সুলতান বাইবার্স আইন জালুত যুদ্ধে মঙ্গোলদের সাহায্যকারী ক্রুসেডারদেরকে বিশেষ করে এন্টিয়কের রাজা ৬ষষ্ঠ বহিমন্ডকে শায়েস্তা করতে চাইলেন। এন্টিয়ক ছিল এশিয়ায় খৃস্টানদের সর্বশ্রেষ্ঠ ঘাঁটি । সুলতান বাইবার্স এন্টিয়ক অবরোধের জন্য একটি বাহিনী প্রেরন করেন এবং দীর্ঘদিন তা অবরোধ করে রাখেন। অবশেষে আর্মেনীয় রাজা হিথম তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসলে সুলতান বাইবার্স অবরোধ তুলে নেন। এরপর ১২৬৩ সালে তিনি ক্রুসেডারদের অন্যতম শক্ত দুর্গ আক্কা অবরোধ করেন। এরপর তিনি একে একে ক্রুসেডারদের সকল দুর্গগুলো গুঁড়িয়ে দিতে থাকেন। ১২৬৫ সালে ক্রুসেডারদের দখলে থাকা জেরুজালেমের নিকটবর্তী কাইসারিয়া ও হাইফা শহরদুটি জয় করেন। বিনা যুদ্ধে জাফাও দখলে নেন। এরপর ৪০ দিনের অবরোধ শেষে আরসুফও দখল করে নেন। ১২৬৬ সালে সাফেদ ও রামলা শহর দুটিও ক্রুসেডারদের দখলমুক্ত করে ফেলেন। এভাবে একের পর রাজ্য হারিয়ে ক্রুসেডাররা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে।

এবার সুলতান তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন ঔদ্ধত্য প্রদর্শনকারী ক্ষুদ্র আর্মেনীয় সাম্রাজ্যের প্রতি। তিনি প্রথমে আর্মেনীয় রাজা হিথমকে আনুগত্য প্রদর্শন ও কর প্রদান করতে বলেন। কিন্তু মঙ্গোলদের চাপে সে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। ফলে সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস আমির সাইফুদ্দিন কালাউনের নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরন করেন তাকে শায়েস্তা করতে। ১২৬৬ সালে সংগঠিত রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধে মামলুকদের হাতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় আর্মেনীয় বাহিনী। এরপর ধীরে ধীরে এ সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে।

১২৬৮ সালে সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস এশিয়ায় খ্রিস্টানদের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি হিসাবে খ্যাত এন্টিয়ক জয় করেন। এ সময় ১৬ হাজার ক্রুসেডারকে হত্যা এবং বন্দী করা হয় আরও ১ লাখ ক্রুসেডারকে। এন্টিয়কের পতনের সঙ্গে সঙ্গে আশেপাশের ছোটখাটো ক্রুসেড রাজ্যগুলিও ভেঙ্গে পড়ে। আর এভাবেই সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারসের মাধ্যমে মুসলিম ভূখণ্ডগুলো থেকে স্থায়িভাবে ক্রুসেডাররা বিতাড়িত হয়, মুসলিম উম্মাহ ফিরে পায় তার হারানো গৌরব।

ক্রুসেডের ইতিহাসে সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারসই সব থেকে বেশি ক্রুসেডার হত্যাকারী ও তাদের শহর ও দুর্গ ধ্বংসকারী ব্যক্তি। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে অসংখ্য যুদ্ধই মূলত তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে গেছে।

সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস এর রাজত্বকালে হাসান বিন সাবাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত গুপ্তঘাতক হাশাশিন সম্প্রদায় পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। গুপ্তঘাতক সম্প্রদায় মিসরের জন্য হুমকি সৃষ্টি করলে তিনি তাদের মোকাবিলা করেন। ১২৭০-১২৭৩ সালের মধ্যে বাইবার্স তাদের ৯টি দূর্গই দখল করে উক্ত অঞ্চলসমূহকে তার সম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। এই আক্রমণে গুপ্তঘাতকদের ক্ষমতা চিরতরে খর্ব করেন তিনি। এইভাবে যবনিকাপাত হয় ত্রাস ও ষরযন্ত্রে ভরা দীর্ঘ এক শাসনকালের। ১২৭৬ খৃস্টাব্দে বাইবার্স নুবিয়া অধিকার করেন এবং উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকাও তাঁর করদরাজ্যে পরিণত হয়।

আব্বাসি খেলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা

ক্ষমতায় এসেই কায়রোতে আব্বাসীয় খেলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস এর রাজত্বকালের উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা। ১২৫৮ খৃস্টাব্দে বাগদাদে হালাকু খান কর্তৃক আববাসীয় বংশের শেষ খলিফা আল-মুসতাসিম বিল্লাহ নিহত হলে মুসলিম জাহান খলিফাশূন্য পয়ে পড়ে। মামলুক সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস এই খেলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে মুসলিম বিশ্বের বিরাট উপকার সাধন করেন। তিনি সিরিয়া থেকে আব্বাসি বংশের এক ব্যক্তি আবুল কাসেম আহমাদ বিন মহাম্মাদ জাহের বিন আমরিল্লাহকে সসম্মানে ডেকে এনে তার কাছে বাইয়াত করেন। মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টিতে খেলাফতের পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

শিল্প ও সংস্কারে বাইবার্স

এরপর সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস পবিত্র স্থানসমূহ সংস্কারের কাজে মনোনিবেশ করেন। প্রথমেই তিনি ঐতিহ্যবাহী আল-আজহার মসজিদের সংস্কার করেন এবং নব উদ্যমে সেখানে লেখপড়া ও খুৎবার ব্যবস্থা করেন। অতঃপর সেখানে শাফি মাযহবের একজন প্রধান বিচারকের অধিনে প্রতিটি মাযহাবের প্রতিনিধি হিসাবে চারজন কাযীকে নিযুক্ত করেন যারা পবিত্র কোরআন ও হাদীস অনুসারে বিচার কার্য পরিচালনা করতেন।

এছাড়াও মিশরের বাইরে তিনি বেশি কিছু সংস্কারমূলক কাজ করেন। এর মধ্যে রয়েছে মদিনায় মসজিদে নববীর উন্নয়ন এবং ফিলিস্থিনের আল খালিলে মসজিদ ইব্রাহীম এর সংস্কার। তিনি জেরুজালেম পরিদর্শন করেন এবং সেখানেও পবিত্র স্থানসমুহের প্রয়োজনীয় উন্নয়ন সাধন করেন। সাম্রাজ্যের মধ্যে সুন্দর সুন্দর মসজিদ তাঁর স্থাপত্য শিল্পের প্রতি অনুরাগের পরিচয় বহন করে। তিনি ধর্মীয় ও জনহিতকর নানা প্রতিষ্ঠানও তৈরী করেছিলেন। তাঁর আমলের স্থাপত্যের মধ্যে তাঁর নামাংকিত মসজিদ এবং বিদ্যালয় (Al-Madrassa al-Zahiriyy) আজও বিদ্যমান। দামাস্কাসে তাঁর সমাধিক্ষেত্রেই আজকের জাহিরিয়া পাঠাগার তৈরী হয়েছে।

মৈত্রী স্থাপনে সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস

সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস এর শাসনকালের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল মঙ্গোল এবং বেশ কয়েকজন ইউরোপীয় শাসকের সঙ্গে তার মৈত্রী। সুলতান হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে তিনি যাযাবরদের একটি গোষ্ঠির প্রধান অথবা ভলগা উপত্যাকায় কিপচাকের মঙ্গোলদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরী করেন। কনস্ট্যানটিনোপলের শাসক মাইকেল প্যালিওলোগাসের সঙ্গেও তাঁর সমঝোতা হয়। লাতিন খ্রিস্টানদের কট্টর বিরোধী প্যালিওলোগাস তার শহরে ক্রুসেডারদের হাতে বিধ্বস্ত প্রাচীন মসজিদের পুননির্মাণের নির্দেশ দেন। তারই অনুরোধে এই কাজ তদারকের জন্য সুলতান রুকনদ্দীন বাইবারস একজন মালিকী মতবাদের নেতাকে কনস্ট্যান্টিনোপল পাঠান। নবম লুইয়ের ভ্রাতা ও সিসিলির রাজার সাথে সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস এর বাণিজ্যিক চুক্তি হয়। বাণিজ্যিক চুক্তি হয় আরাগনের জেমস এবং সেভিলের আলফন্সোর সঙ্গেও।

মঙ্গোলদের ইসলামের পথে নিয়ে আসার ব্যাপারে তাঁর ভূমিকা প্রধান। তিনি মঙ্গোলদের সাথে গোল্ডেন হোর্ড-এ (ততকালীন মঙ্গোল-তাতার সাম্রাজ্য) মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ হন এবং তাদের মিশর পরিভ্রমণের ব্যবস্থা নেন। মিশরের সাথে যোগাযোগের ফলে বিপুল সংখ্যক মঙ্গোল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি সিংহলের সহিত দূত বিনিময় করেন এবং দূরপ্রাচ্যের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন। তাছাড়া তিনি কনস্টান্টিনোপল, সিসিলি, আরাগণ ও অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তাঁর বৈদেশিক নীতির ফলে মামলুক সাম্রাজ্যের গৌরব বৃদ্ধি পায়। সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস একজন বিচক্ষণ-ন্যায়প
রায়ণ শাসনকর্তা ছিলেন। অনুগত প্রজাদের প্রতি তিনি ছিলেন দয়াশীল। কিন্তু অবাধ্য আমীরদের তিনি কঠোর শাস্তি দিতে দ্বিধা করেননি। তিনি তাঁর রাজ্যে মদ,জুয়া প্রভৃতি অনৈসলামিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করেন। সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস একজন ধর্মপ্রাণ সুন্নী মুসলমান ছিলেন। তিনি একটি আদর্শ মুসলিম রাষ্ট্র গঠন করতে চেয়েছিলেন।

সংস্কৃতি এবং বিজ্ঞানে অবদান

সাম্রাজ্যে নানা প্রকার জনহিতকর কাজের পাশাপাশি তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের একজন অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত চিকিৎসক আবু-আল-হাসান আলী ইবনে-আল-নাফিস এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক যিনি ফুসফুসে রক্ত চলাচল সম্পর্কে স্পস্ট ধারণার কথা জানিয়েছেন। অথচ এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেয়া হয় স্পেনের সারভেটাসকে যার তত্ত্ব রচিত আলী-ইবনে নাফিসের ২৫০ বছর পরে। সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম জীবনী রচয়িতাদের অন্যতম ইবনে-খাল্লিকান (খ্রিঃ ১২১১-৮২) তাঁর সময়েই রচনা করেন ‘ওফাইয়াত-উল-আ- ইয়ান ওয়া আনবা-উজ-জামান’ শিরোনামের একটি জীবনীমূলক অভিধান গ্রন্থ যাকে নিকলসন সর্বোৎকৃষ্ট জীবনীগ্রন্ত বলেছেন। তাঁর জীবনী ‘সিরাত আল-জাহির বাইবার্স’ (Life of al-Zahir Baibars) হল একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় আরবীয় সাহিত্য যেখানে রচিত আছে তাঁর যুদ্ধ জয় অর্জনের কথা। কাজাখস্থান, মিশর সিরিয়াতে তিনি বীরের মর্যাদা পান।

সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস এর ইন্তিকাল

১২৭৭ সালের ১ জুলাই এই মহান সুলতান দামাস্কাসে তিনি ইন্তেকাল করেন। কিন্তু মুসলিম উম্মার স্মৃতিতে তিনি অমর।

মহান আল্লাহ পাক তাঁকে জান্নাত নসীব করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.