সূর্যগ্রহণঃ ইসলাম কী বলে?- আবদুল্লাহ আল মাসুম

0
419
Surya Grahan
Surya Grahan

সূর্যগ্রহণ ( الكسوف ) কী?

সূর্যগ্রহণকে কেন্দ্র করে জাহেলি যুগের অন্ধবিশ্বাসের মতো অনেক মুসলিম একে সূর্য ও চাঁদের ওপর মহাদুর্যোগ বলে ধারণা করে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে এটি সৃষ্টিজগতে এটি বিষ্ময়কর এক মহজাজাগতিক ঘটনা।

সূর্য ও পৃথিবীকে নিয়ে একটি তল কল্পনা করলে চাঁদ সাধারণত সেই তলে থাকে না। কিন্তু কোনো কোনো অমাবস্যায়, পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে চাঁদ সেই তলে একই সরল রেখায় চলে আসে। এর ফলে সূর্য চাঁদের আড়ালে চলে যায় এবং চাঁদের সংকীর্ণ ছায়া তখন পৃথিবীর বুকে ভ্রমণ করে। সেই ছায়া যেসব জায়গার ওপর দিয়ে যায়, সেখান থেকে মনে হয় সূর্য ধীরে ধীরে ঢেকে যাচ্ছে। ছায়ার কেন্দ্রে যেসব অঞ্চল পড়বে সেখান থেকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যায়। কেন্দ্রের বাইরে আংশিক গ্রহণ দেখা যাবে।

main 1907011028 1
الكسوف

সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা

জাহিলি যুগে মানুষ ধারণা করত, বিশ্বে কোনো মহাপুরুষের জন্ম বা মৃত্যু কিংবা দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ প্রভৃতির বার্তা দিতে সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ হয়ে থাকে। ইসলাম এটাকে একটি ভ্রান্ত ধারণা আখ্যায়িত করেছে এবং ‘গ্রহণ’কে সূর্য ও চন্দ্রের ওপর একটি বিশেষ ক্রান্তিকাল বা বিপদের সময় বলে গণ্য করেছে। এ জন্য সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণের সময় মুমিনদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যেনো এ সময়ে অন্য কাজকর্ম বন্ধ রেখে আল্লাহর তাসবিহ পাঠ, দোয়া, সালাত আদায় প্রভৃতি আমল করে থাকে।

এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত সাহাবি মুগিরা ইবনে শো’বা রাযি. বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পুত্র সন্তান ইবরাহিম যেদিন মৃত্যুবরণ করেন, ওইদিন সূর্যগ্রহণ দেখা দেয়। এতে লোকেরা বিভ্রান্ত হয়ে বলতে থাকে, নবীপুত্র ইবরাহিমের মৃত্যুর কারণেই এমনটি হচ্ছে।
তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন- ‘সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর অন্যতম দুটি নিদর্শন। এগুলো কারো মৃত্যু কিংবা জন্মের জন্য ‘গ্রহণ’ হয় না, অতএব তোমরা যখন তা দেখবে, তখন আল্লাহর কাছে আকাশ পরিস্কার হওয়ার আগ পর্যন্ত দোয়া এবং সালাত আদায় করবে।’

(সহিহ বুখারিঃ হা-১০১২, ১০৬৩, ৩২০১; মুসনাদে আহমাদঃ হা-১৭৭১৩)

হাদিসে সাহাবি আবু বাকরা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অবস্থান করছিলাম। ওইদিন সূর্যগ্রহণ হচ্ছিল। নবীজি দ্রুত গায়ে চাদর টানতে টানতে মসজিদে প্রবেশ করলেন। এরপর আমাদের নিয়ে দুই রাকাত সালাতুল কুসুফ (সূর্যগ্রহণের নামাজ) আদায় করে আমাদের উদ্দেশে ইরশাদ করলেন-

‘সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর অন্যতম দুটি নিদর্শন। এগুলো কারো মৃত্যু কিংবা জন্মের জন্য ‘গ্রহণ’ হয় না, অতএব তোমরা যখন তা দেখবেو তখন আল্লাহর কাছে দোয়া করবে, তাকবির বলবে, সালাত আদায় করবে করবে।’

অন্য বর্ণনায় সদকা আদায় করার কথাও এসেছে।

(সহিহ বুখারিঃ হা-১০৬৩, ১০৪৪; সহিহ মুসলিমঃ হা-৯১১, ৯১২)

সূর্যগ্রহণকালে নবীজির নামাজ

আরবিতে সূর্যগ্রহণকে ‘কুসুফ’ বলা হয়। আর সূর্যগ্রহণের নামাজকে ‘সালাতুল কুসুফ’ বলা হয়। দশম হিজরিতে যখন পবিত্র মদিনায় সূর্যগ্রহণ হয়, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা দিয়ে লোকদের নামাজের জন্য সমবেত করেছিলেন। সেই নামাজের কিয়াম, রুকু, সিজদাসহ সব রুকন সাধারণ নিয়মের চেয়ে অনেক দীর্ঘ ছিল।

সূর্যগ্রহণের সময় মুমিন ব্যক্তিদের করণীয়

সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণকালে মুমিনদের করণীয় হচ্ছে তাৎক্ষণিকভাবে একত্র হয়ে সালাত আদায় করা এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকা। এ সালাত আদায় করা নফল। এই নামাজে আজান ও ইকামত দিতে হয় না। তবে লোকজন ডাকার জন্য الصلاة جامعة  ‘আস-সালাতু জামিয়া’ (নামাজ সমাগত) বা এ জাতীয় বাক্য ব্যবহার করে ডাকার অবকাশ রয়েছে।

হাদিসে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাযি. ও আয়েশা রাযি. বলেন, নবীজির যুগে সূর্যগ্রহণ দেখা দেওয়ার পর الصلاة جامعة  ‘আস-সালাতু জামিয়া’ (নামাজ সমাগত) বলে নামাজের আহবান করা হয়েছিল।

(সহিহ বুখারিঃ হা-১০৪৫, ১০৬৬)

সূর্যগ্রহণের নামাজ কিভাবে আদায় করতে হয়? 

সমাবেশস্থলে জুমু’আর নামাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইমাম উপস্থিত থাকলে তিনি সূর্যগ্রহণের সালাত জামাতে আদায় করাবেন। আর ইমাম বা তাঁর প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকলে একা একা সালাত আদায় করা যাবে। এ সালাত অন্য সালাতের চেয়ে অধিক দীর্ঘ হওয়া উচিত। কারণ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সালাতের কিরাত, কিয়াম, রুকু, সিজদাসহ অন্য আমলগুলোও অনেক দীর্ঘ করেছেন।

images 1
সূর্যগ্রহণ

সাহবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সালাতে কিয়াম, রুকু ও রুকু থেকে দাঁড়ানো অবস্থা অত্যধিক দীর্ঘায়িত করেছেন। এমনকি কিয়াম অবস্থায় প্রায় সুরা বাকারা তিলাওয়াত করার মতো সময় অতিবাহিত করেছেন এবং রুকু থেকে দাঁড়িয়ে এর চেয়ে তুলনামূলক কম সময় অবস্থান করেছেন। আর দ্বিতীয় রাকাত প্রথম রাকাতের চেয়ে ছোট করেছেন।

তিনি কিয়ামের মধ্যে কিরাত ছাড়াও তাসবিহ-তাহলিল, তাকবির-তাহমিদ এবং দোয়া পড়েছেন বলে অন্য হাদিসে বর্ণিত আছে। সালাত আদায় শেষ হলে সূর্য পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত দোয়া করতে হয়।

(সহিহ বুখারিঃ হা-১০৪৬)

সূর্যগ্রহণের নামাজ কয় রাকাত??

হানাফি মাজহাবে অন্য সালাতের মতো এ সালাতেও প্রতি রাকাতে একটি মাত্র রুকু আদায় করতে হয়। শাফিয়ি মাজহাবে প্রতি রাকাতে দুটি রুকু করতে হয়।

অবশ্য হাদিসের বর্ণনাগুলোতে এ সালাতে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই বা ততোধিক রুকু করেছেন বলেই উল্লেখ রয়েছে। এ সালাতের রাকাত সংখ্যা দুই। তবে চার রাকাত বা তার বেশিও আদায় করা যায়। সেক্ষেত্রে প্রতি দুই বা চার রাকাতের পর সালাম ফিরাতে হবে।

সালাতের শেষে কোনো খুতবা পড়তে হয় না। কোনো কোনো বর্ণনায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক খুতবা পাঠের কথা বর্ণিত থাকলেও তা সালাতের সংশ্লিষ্ট হিসেবে নয়; বরং তা ছিল ‘গ্রহণ’ সম্পর্কে জাহিলি যুগের ভ্রান্ত ধারণা নিরসনের জন্য দেওয়া বিশেষ বিবৃতি।

(আল-আদাবুল মুফরাদ- ইমাম বুখারি রহ.)

জ্যোতির্বিজ্ঞান ও চিকিৎসা শাস্ত্র কী বলে???

তাছাড়া সূর্যগ্রহণ কোনো দলবেধে উদযাপন করার বিষয় নয়। খালি চোখে সূর্যগ্রহণ দেখা জ্যোতির্বিজ্ঞান ও চিকিৎসা শাস্ত্রমতে চোখ ও মস্তিস্কের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

এমনকি এক্স-রে ফিল্ম, নেগেটিভ, ভিডিও-অডিও ক্যাসেটের ফিতা, সানগ্লাস, ঘোলা বা রঙিন কাচেও এসব ক্ষতিকর অতিবেগুনি ও অবলোহিত রশ্মি আটকায় না। তাই কোনোভাবেই এগুলো দিয়ে সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করা যাবে না।

solar eclipse 1
solar eclipse

আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনে সৃষ্টিজগতের চলমান বিষয়ে সকলের সচেতনতা কাম্য। সঠিক বিষয় জেনে ছড়িয়ে দিন সবার মাঝে …….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.