স্বাগতম ১৪৪২ হিজরী বর্ষ!

0
258
1442 H.
1442 H.

হিজরী সনঃ ইতিহাস ও গুরুত্ব

ইসলামের আগে থেকেই আরবে চন্দ্রমাস ভিত্তিক দিন ও বছর গণনার প্রচলন ছিলো। ইসলাম এই ব্যবস্থাকে এখনো বহাল রেখেছে। এই চন্দ্রমাস আরবী মাস নামেও পরিচিত। আরবী মাসগুলোর নাম হলো- মুহাররম, সফর, রবীউল আউয়াল, রবীউস সানী, জুমাদাল উলা, জুমাদাল উখরা, রজব, শাবান, রমযান, শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ্জ। হিজরী সন এই আরবী মাসগুলোকে নিয়েই চালু হয়েছে। আরবী মাসগুলো স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা নির্ধারিত করেছেন। চন্দ্রমাসের হিসাব সম্পূর্ণ চাঁদের ওপর নির্ভরশীল। যা একমাত্র আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা ও নিয়ন্ত্রণে নির্ণিত হয়। হিজরী সনের কোনো মাস ২৯ দিনে হবে, না ৩০ দিনে হবে- তা একমাত্র তিনিই নির্ণয় করেন। পৃথিবীর কোনো বুদ্ধি বা প্রযুক্তি এখানে অকার্যকর। চাঁদকে কেন্দ্র করে সময় নির্ণয় সম্পর্কে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-

يسئلونك عن الأهلة- قل هي مواقيت للناس والحج-

অর্থঃ তারা আপনার কাছে নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। আপনি বলে দিন, চাঁদ হলো মানুষের জন্য সময় নির্ণয় এবং হজ্জের সময় নির্ধারণের মাধ্যম। (সূরা বাকারাহঃ আ-১৮৯)

وقدره منازل لتعلموا عدد السنين والحساب-

অর্থঃ আর তিনি চাঁদের জন্য নির্ধারণ করেছেন মনযিলসমূহ, যাতে তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পারো। (সূরা ইউনুসঃ আ-৫)

হিজরী সনের গণনা ও কার্যকর হওয়ার ইতিহাস

প্রিয় নবীর মক্কা থেকে মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরতকে বরণীয় করে রাখার জন্য দ্বিতীয় খলীফা সাহাবী ওমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. হিজরী সনের প্রবর্তন করেন। তবে হিজরী সনের প্রচলন নবীজির জীবদ্দশায় হয়নি। তবে হিজরী সনের প্রচলন নবীজির জীবদ্দশায় হয়নি। ওমর রাযি. তাঁর শাসনামলে হিজরী সনের প্রচলন ও কার্যকারিতা সম্পর্কে ঘোষণা দেন। হিজরী সনের প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট হলো, ইসলামের আগে থেকেই চন্দ্রমাসের হিসাবের প্রচলন ছিলো। কিন্তু তখন বর্ষ গণনার প্রচলন ছিলো না। তৎকালীন যামানায় চিঠিপত্রে মাসের নাম ও তারিখ লেখা হতো। কিন্তু বছরের কথা উলে¬খ থাকতো না। এতে নানা রকমের বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতো। ইসলামের আবির্ভাবের পর চন্দ্রমাসের হিসাব বহাল থাকে। নববী যুগ হয়ে ইসলামের প্রথম খলীফা আবু বকর রাযি.-এর শাসনামল পর্যন্ত এভাবেই চলে যায়। তবে দিন দিন ইসলামী সাম্রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে রাষ্ট্রীয় হিসাব-নিকাশে বর্ষ গণনার হিসাব অনিবার্য হয়ে উঠে।

ওমর রাযি.-এর যুগে তাঁর সামনে একবার একটি চুক্তিপত্র উপস্থিত করা হলো। উক্ত চুক্তিপত্রে শুধু শাবান মাসের কথা লিখা ছিলো। ওমর রাযি. জিজ্ঞাসা করলেন- এটা কোন শাবান মাস? বিগত শাবান না আগামী শাবান মাস? তখন এর সময় নির্ণয় করতে না পারার কারণে জটিল সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া ওমর রাযি.-এর পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রদেশে রাষ্ট্রীয় ফরমান লিখে প্রেরিত চিঠিপত্রে তারিখ নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ না থাকার কারণে নানা বিশৃংখলা দেখা দিতো। এদিকে গভর্নর সাহাবী আবু মূসা আশআরী রাযি. এ জাতীয় সমস্যা নিরসণের লক্ষ্যে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার আহবান জানিয়ে খলীফা ওমর রাযি.-এর কাছে চিঠি প্রেরণ করেন। তখন তিনি সবার মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে একটি সন নির্ধারণ ও গণনার সিদ্ধান্ত নেন।

সন গণনার পরামর্শ সভায় সৌরবর্ষ বা ইংরেজী সনের সূচনার সাথে মিল রেখে নবীজির জন্ম লাভের সন থেকে ইসলামী সনের সূচনা করার আলোচনা উঠে। এরকম আরো কিছু উপলক্ষের কথাও আলোচিত হয়। কিন্তু বিভিন্ন উপলক্ষ থেকে সন গণনার মতামত আসলেও শেষ পর্যন্ত হিজরতের ঘটনা থেকে সন গণনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তখন ছিলো হিজরতের ১৭ তম বর্ষ। অর্থাৎ এটি ছিলো নবীজির হিজরতের ১৭ বছর পরের ঘটনা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুয়ত লাভের ১৩ বছর পর মক্কা থেকে যে বছর মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরত করেন, সেই বছরকে প্রথম বর্ষ ধরে হিজরী সন গণনার সূচনা হয়। নবীজি হিজরত করেছিলেন রবীউল আউয়াল মাসে। সে বছরের মুহাররম মাসকে প্রথম মাস ধরে হিজরতের বছরকে হিজরী সনের প্রথম বর্ষ বলে গণ্য করা হয়।

হিজরতের বছর থেকে সন গণনার রহস্য হলো, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরত ছিলো ইসলামের ইতিহাসে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময় একটি ঘটনা। এই হিজরতকে মূল্যায়ন করা হয়- ‘আল-ফারিকু বাইনাল হাক্কি ওয়াল বাতিল’ অর্থাৎ, সত্য-মিথ্যার মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্যকারী ঘটনা হিসেবে। কারণ হিজরতের পর থেকেই মুসলিমরা প্রকাশ্যে ইবাদাত আদায় ও ইসলামী সমাজ গঠন করতে পেরেছিলেন।
এছাড়া প্রকাশ্যে আযান, ইকামাত, জামাতে নামায আদায়, জুমু’আ ও ঈদ সবকিছু হিজরতের পর থেকেই শুরু হয়েছে। এসব তাৎপর্যের দিকে লক্ষ্য করেই ওমর রাযি. নবীজির হিজরতকে বরণীয় করে রাখার জন্য হিজরী সনের প্রবর্তন করেন।

হিজরী সনের গুরুত্ব

ইসলামের অনেক ঐতিহাসিক ঘটনাবলী, বিধি-বিধান ও ইবাদাতের সম্পর্ক চাঁদের সাথে। চাঁদের হিসাব ছাড়া যেগুলো কখনোই নির্ণয় করা সম্ভব নয়। চাঁদকেন্দ্রিক বর্ষের বিভিন্ন মাসে কিছু আমল আছে- যেগুলোর গুরুত্ব ও ফযীলত কুরআন-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। যথা- আশুরা, শবে বরাআত, শবে কদর, রোযা-তারাবীহ, রমযানের ইতিকাফ, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা, কুরবানী ও হজ্জ ইত্যাদি ইবাদাতগুলো চাঁদ কেন্দ্রিক হিজরী সনের মাসের হিসাব অনুযায়ী সংঘটিত হয়। এছাড়াও নারীর ঋতুস্রাবের হিসাব, বিধবা কিংবা তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দতের সময়সীমা এবং মানুষের বালেগ হওয়ার চূড়ান্ত হিসাব চন্দ্রমাস অনুযায়ী নির্ণিত হয়।
তাই ইসলামের এসব বিধি-বিধানের সাথে হিজরী সনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণে ইসলামী জীবনে হিজরী সনের হিসাব রাখার গুরুত্ব অপরিহার্য। এছাড়া আল্লাহ তা’আলার কাছেও হিজরী সনের মাসগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানিত।


হিজরী সন শুধু আরবদের নয়; এটি ইসলামী সন

অনেকের ধারণা হলো, অন্যান্য জাতির নিজস্ব সনের মতো হিজরী সন শুধু আরবদের সন। এটা তাদের জন্যই প্রযোজ্য। অথচ হিজরী সন চালু হয়েছে আরবী মাসকে কেন্দ্র করে। আর আরবী মাসগুলো মূলত চন্দ্রবর্ষের মাস। সুতরাং হিজরী সনও একটি চন্দ্রবর্ষ। আর হিজরী সনের মাসগুলো আরবী হলেও তা শুধু আরবদের মাস নয়; বরং তা ইসলাম ও সমগ্র পৃথিবীর মুসলিমদের মাস। যেমনিভাবে ঈসায়ী সনকে সৌরজগতের সূর্য্যরে পরিক্রমায় ১২ মাস কেন্দ্রিক হওয়ায় সৌরবর্ষও বলা হয়।

এছাড়া ইসলামের অনেক ঐতিহাসিক ঘটনাবলী, বিধি-বিধান ও ইবাদাতের সম্পর্ক চাঁদের সাথে। চাঁদের হিসাব ছাড়া যেগুলো কখনোই নির্ণয় করা সম্ভব নয়। যথা- আশুরা, শবে বরাআত, শবে কদর, রোযা, তারাবীহ, রমযানের ইতিকাফ, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা, কুরবানী ও হজ্জ ইত্যাদি ইবাদাতগুলো চাঁদ কেন্দ্রিক হিজরী সনের মাসের হিসাব অনুযায়ী সংঘটিত হয়। এছাড়াও নারীর ঋতুস্রাবের হিসাব, বিধবা কিংবা তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দতের সময়সীমা এবং মানুষের বালেগ হওয়ার চূড়ান্ত হিসাব চন্দ্রমাস অনুযায়ী নির্ণিত হয়।

তাই ইসলামের এসব বিধি-বিধানের সাথে চন্দ্রবর্ষ হিজরী সনেরও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। আর ইসলামের এসব বিধি-বিধান ও ইবাদাত শুধুমাত্র আরবদের জন্য নাযিল হয়নি; বরং সমগ্র পৃথিবীর গোটা মুসলিম উম্মাহর জন্য নাযিল হয়েছে। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে হিজরী সন ইসলামী সন। এই হিজরী সন শুধু আরবদের জন্য নয়। কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা গোষ্ঠীর জন্য এই হিজরী সন নির্দিষ্ট নয়; বরং জাতি, বর্ণ ও অঞ্চল নির্বিশেষে এই হিজরী সন সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.